আল মাহমুদ কবিতার সঙ্গে বসবাস

আল মাহমুদের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অনেক পরে তার সঙ্গে আলাপ এবং পরিচয়। আমি যখন খুব তাস খেলতাম [এখনও সুযোগ পেলে খেলি], সে সময় আল মাহমুদের ‘ব্রে’ নামে একটি কবিতা পড়েছিলাম। কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এ মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না, কবিতাটি পড়ে আমি কেঁপে উঠেছিলাম। তাস নিয়ে যে কবিতা লেখা যায়, এটা আমার জানা ছিল না। সেই থেকে আল মাহমুদের নামটি মনে গেঁথে যায়। এরপর তার সঙ্গে পরিচিত হলাম। এবং তার প্রথম বই ‘লোক-লোকান্তর’-এর প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। লোক-লোকান্তর প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। এ দেশের প্রকাশকরা সেই সময় তরুণ কবিদের কবিতার বই প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। এবং তখন পর্যন্ত আল মাহমুদের কোনো কবিতার বই প্রকাশিত হয়নি। মুহম্মদ আখতার, তাঁরই নেতৃত্বে আমরা কয়েকজন_ রফিক আজাদ, শিল্পী হাশেম খান, শাহজাহান সাহেব, আমার সহপাঠী হেলাল, কথাশিল্পী শহীদুর রহমান, ইত্তেফাকের সাংবাদিক শাহাবুদ্দীন সাহেবসহ আরও অনেকে মিলে মাসে মাসে চাঁদা দিয়ে কপোতাক্ষ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা গঠন করে লোক-লোকান্তর প্রকাশ করেছিলাম। ‘লোক-লোকান্তর’-এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানের বেশ খানিকটা ঝামেলা আমার ওপর দিয়ে গিয়েছিল। দোকানের বাকি, কিছু নগদ টাকা দিয়ে ইত্তেফাক প্রেস থেকে লোক-লোকান্তরের কিছু কপি আনাসহ নানা রকমের ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। লোক-লোকান্তর প্রকাশের পর আল মাহমুদ রাতারাতি তরুণদের কাছে দারুণ প্রিয় হয়ে উঠলেন। লোক-লোকান্তরের সফলতায় মুহম্মদ আখতারের উসকানির ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, বইটির প্রকাশনা উৎসব করব। কিন্তু সমস্যা বাধল অন্য জায়গায়। যে প্রেসে বইটি ছাপা হয়েছিল, শ’দুয়েক টাকা না পেলে তারা কিছুতেই বইয়ের একটি কপিও দেবে না। এদিকে সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। বাংলা একাডেমীর মূল ভবনের তিনতলায় একটি মিলনায়তন ছিল, অনুষ্ঠানের সভাপতি সৈয়দ আলী আহসান, প্রধান অতিথি ইত্তেফাকের সিরাজ ভাই [শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন]; সায়ীদ ভাইও [আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ] কিছু বলতে রাজি হয়েছেন। আমাদের মাঝে আরও ভয় ছিল, অনুষ্ঠান শেষে আগত অতিথিদের যে চা-নাশতা দেওয়া হবে, সেই খরচটাই বা কে দেবেন? আমাদের মধ্যে যারা উদ্যোগী, তাদেরও পকেটের অবস্থা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল মধুদার কথা। মধুর ক্যান্টিনের মধুদা, শ্রী মধুসূদন দে। তিনি আমার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়েছিলেন, এই সুযোগটা এখন নেওয়া যায়। মধুদা বাকিতে শিঙাড়া, সন্দেশ আর চা দিতে রাজি হলেন। এবং অনুষ্ঠানের সামান্য আগে কাজ চালানোর মতো বইয়ের কিছু কপিও চলে আসে। সে সময় আল মাহমুদ পায়জামার ওপর একটা প্রিন্স কোট চাপাতেন। ছিপছিপে শরীর, গলার বোতামটাও আটকাতেন। সবাই চলে এলেন, আমিও সাধ্যমতো স্মার্ট হয়ে হাজির হলাম। ভালোয় ভালোয় অনুষ্ঠানটি শেষ করতে পেরেছিলাম সেদিন। এরপর তো আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে যোগদান করি সে বছরের শেষ মাসে, ডিসেম্বরে। তিনি তখন ইত্তেফাকে যোগ দিলেন। পরে ‘৭০-এর দিকে তিনি যখন চট্টগ্রামে গেলেন, সেই দুই সময়েই তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। আল মাহমুদের কবিতা আমার অভিজ্ঞতাকে খুব বেশি স্পর্শ করেছিল এবং আমার ইচ্ছাকে অনেক বেশি উসকানি দিত। আমি অবাক হয়ে যাই, তার এই ক্ষমতা কত বড় ক্ষমতা। আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পর তার কবিতার গ্রহণযোগ্যতা এবং সনেটের প্রতি মানুষের ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ হতে বাধ্য হয়েছিলাম। তখনকার সময়ে পড়া তার একটি কবিতা দ্বারা আমি এত বেশি প্রভাবিত যে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কবিতায় আছে_ ‘কালতলী ব্রিজ পার হলে মানুষের সাধ্যমত ঘর বাড়ি’, সাধ্যমতো ঘরবাড়ি এই শব্দবন্ধের গভীরতা অত্যধিক, তার এই অভিজ্ঞতা চমকে দেওয়ার মতো। কিংবা ‘কতদূর এগুলো মানুষ’ এই কবিতাগুলোর তাৎপর্য অনেক। তখনও মানুষ চাঁদে যায়নি। কিন্তু এই আধুনিক যুগে, এই বিশ্বায়নের যুগে এসে যখন মনুষ্যত্বের অবমাননা দেখি, তখন ক্ষমতাবান মানুষদের, ক্ষমতাহীন মানুষদের, ক্ষমতালোভী মানুষদের, ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা মানুষদের কানে কানে গিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ‘কতদূর এগুলো মানুষ’। আমার মনে আছে ‘৬৯-এর দিকে তার কবিতায় তিনি বলেছেন_ ‘বাংলা, বাংলা, কে আমার নিদিতা মায়ের নাম/ ইতস্তত উচ্চারিত হলো’। এখানে তো তিনি শুধু বাংলা ভাষাকে বোঝাতে চাননি। এই বাংলা তো সমগ্র বাংলা ভূখণ্ড। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আল মাহমুদ লিখেছেন_ এ এমন নিষ্ফল প্রহর, এখানে কোন সবুজের চিহ্ন নেই। এভাবে তিনি বর্তমান সময়কে মনে করিয়ে দিচ্ছেন আমাদের। এবং অনেক পরে আমি দেখলাম তার ‘খনা সিরিজ’, যে কবিতাগুলো তেমন করে আলোচিত নয়। কবিতাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল কায়সুল হক সম্পাদিত একটি পত্রিকায়, পত্রিকাটির নাম এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। অসাধারণ সেই কবিতাগুলো নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনতে পাইনি। আমাদের এখানকার মানুষদের একটি বড় প্রবণতা হচ্ছে প্রতিভাকে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতা থেকে বিচার করা। এবং এর ফল যে কত মর্মান্তিক হতে পারে আল মাহমুদ তার বড় প্রমাণ। শুধু আল মাহমুদ কেন, কবি গোলাম মোস্তফার জন্মশতবর্ষ কি আমরা পালন করেছি? গোলাম মোস্তফার ঋণ কি আমরা শোধ করতে পেরেছি? হ্যাঁ, দু’একটি ভুল তিনি করেছেন সত্য। কিন্তু আমাদের এখানে ধোয়া তুলসী পাতাটি কে? মাঝে মধ্যে জানতে ইচ্ছে করে। শুধু একজনের দিকে আঙুল তুলে সবাই পার পেয়ে যায়, এটি কীভাবে হয়, এই প্রশ্নই আমার মনে জাগে। আমরা প্রতিভার মূল্যায়ন করতে শিখিনি, তার মর্যাদা দিতে শিখিনি। তার রাজনৈতিক তৎপরতা খুঁজতে গোয়েন্দাগিরি করতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করি না। এই যে প্রবণতা এই প্রবণতা থেকে আমরা কবে মুক্তি পাবো তা জানি না। আল মাহমুদ এই সমাজের একজন প্রতিনিধি। তাকে যখন আমি একজন মৌলিক কবি বলতে যাই অনেকে আমার চোখে আঙুল দিয়ে বলেন_ আল মাহমুদের কবিতায় জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রভাব আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কার কবিতা প্রভাবমুক্ত? আমরা সমাজে কি কাজ ভাগ করে নিই না? কোনো সমাজ এগোবে না যদি আমরা কাজ ভাগ করে না নিতে পারি। এবং যার ভাগে যতটুকু কাজ পড়ে, তাকে ততটুকু কাজই তো করতে হয়। আল মাহমুদের গ্রাম, আল মাহমুদের শহর, আল মাহমুদের নাগরিকতা এ সবই তো তার আওতার মধ্যে। আল মাহমুদ যখন ঢাকায় আসেন তখন এই শহরের জনসংখ্যা কত ছিল? ত্রিশ হাজারও হবে কি-না সন্দেহ আর আজ ঢাকার লোকসংখ্যা কত? সেই সময় আধুনিকতার সংজ্ঞা বা প্রভাব কী ছিল আর আজ আধুনিকতার সংজ্ঞা বা প্রভাব কী? রবীন্দ্রনাথ তো অভিযোগই করেছেন_ আধুনিকতা আমাকে দেউলিয়া করেছ। পশ্চিমের ওপর সেই সময়ই আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল সবাই আর আমরা এই সময়ে পশ্চিমের ওপর আস্থা রেখে হাজারো সমস্যা নিজেরা নিজেদের জন্য তৈরি করছি প্রতিনিয়ত। আজ আমার বলতে ইচ্ছে করছে, আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য ফাঁদ পাতি আর নিজেরাই এই ফাঁদে ধরাশায়ী হই এবং অভিযোগ করি অন্যদের বিরুদ্ধে। এই জায়গা থেকে বলতে হয়_ আমাদের পায়ের নিচের মাটি শনাক্ত করতে যেমন শিখিয়েছেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তেমনি শিখিয়েছেন আল মাহমুদ। আমি শামসুর রাহমানের কথা ভুলে যাইনি। আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, সিকান্দার আবু জাফর, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, সানাউল হক_ কবি হিসেবে এঁরা আমাদের দু’হাতে দান করেছেন। সেখানে আল মাহমুদ আমাদের নগর জীবনের, আমাদের গ্রাম জীবনের, ছোট ছোট বেঁচে থাকার উপাদানগুলো যত্ন করে তুলে এনেছেন। এরপর আমরা দেখব এখানে এসে আল মাহমুদের বেশ বড় রকমের পরিবর্তন হয় বিশ্বাসের জায়গায়। ইসলাম বা আল্লাহ-রসুল বলব না আমি; এক ধরনের ধর্মীয় বোধের কাছে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেন। তাই বলে কি আমরা তার অসাধারণ সৃষ্টির কথা ভুলে যাবো? তার অসাধারণ গদ্য, যা আজও বিমোহিত করে সবাইকে। তার ছড়া; যা কি-না আমাদের শিশুদের মনের খোরাক জোগায় এখনও। আল মাহমুদকে নিয়ে অনেক প্রচার-অপপ্রচার রয়েছে। এর অনেকটা অসত্য বলেই আমি জানি। কারণ অনেক কিছুই স্বচক্ষে দেখার এবং জানার সুযোগ আমার হয়েছে। আল মাহমুদের আরেকটি জন্মদিন চলে গেল। তিনি আরও অনেক দিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তার আরও অনেক সৃষ্টি দ্বারা আমরা মোহিত হবো। আল মাহমুদকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s