শূন্যতায় ভর করে

শূন্যতায় ভর করেসৃজন মুহূর্তের আগে মনটা থাকে শূন্য ক্যানভাসের মতো। শূন্য হলেও একেবারে শূন্য নয়। এই শূন্যতারও একটা রঙ বা ধরন আছে। এটাই মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তারপর মনের ওপর ভাসতে থাকে নানা ছায়াছবি, স্মৃতি-বিস্মৃতির কাহিনী। বহু মুখ মনে পড়ে, যা এখন ভুলে গিয়েছি। কিংবা মনের কোণে পুরনো আসবাবপত্রের মতো পড়ে আছে, যা ফেলতেও পারি না আবার রাখারও স্থান সংকুলান হচ্ছে না। এই অবস্থায় মন ও শরীর, ইচ্ছে করে শুয়ে পড়ে ওপরের দিকে যেখানে ছাদ_ তার ওপর দৃষ্টিপাত করে বসে থাকি।
কিন্তু সৃজনশীল মন কোনো সময়ই একেবারে শূন্য থাকে না। নানা রেখার আঁকিবুঁকি, কল্পনা চলতে থাকে। চলতে চলতে বলতে থাকে কাহিনী, গল্প, কল্পনা কিংবা কাব্যের সারাৎসার। এর মধ্যেই নানা স্ফুলিঙ্গ ওঠে, সেই স্ফুলিঙ্গ থেকে প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে সহসা কোনো অনল প্রবাহ। এই আগুন কোনো কিছুকে দহন করে না। পোড়ায় না। আবার জুড়ায়ও না। ধূম্রকুণ্ডলীর সৃষ্টি হওয়ার মুহূর্তের মতো। কিন্তু কবির সৃষ্টি কোনো অবস্থাতেই ধোঁয়া বা কুণ্ডলীকৃত কোনো বস্তু নয়।
যেহেতু সারাজীবনই কবির বিষয় প্রেম, আমি ভালোবাসার কথাই লিখেছি প্রচুর। নারী আমার সাহিত্যে মূর্ত হয়ে আছে। জীবনে আমি ছিলাম বিরামহীন পথচারী। দিক-দিগন্তের তেপান্তরে আমি বুকে কাব্যের তৃষ্ণা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। আর মানুষের সৃজন মুহূর্তের কথা ব্যক্ত করা খুবই জটিল কর্ম। আমার একটা সময় ছিল_ সৃজন মুহূর্তে আমি যেখানেই থাকি লেখার টেবিলে এসে আড়াল গ্রহণ করেছি এবং স্বাভাবিক সততায় হৃদয়ের জমানো কথা উজাড় করে পাঠকের জন্য প্রস্তুত করেছি। আজও একই রীতি অনুসরণ করে লিখতে চাই। একসময় কিছু লিখতে চাইলে তা কাগজে সাজানো আমার জন্য মোটেও কষ্টসাধ্য ছিল না। কিন্তু এখন ভাবনাকে ভাষায় বর্ণনা করতে গেলে সাহায্য দরকার। অবশ্য আমি লিখলে দৈবভাবে পেয়ে যাই। ভাবি লেখাটাও বোধহয় কোনো একটা দৈব ব্যাপার। লেখা হয়ে গেলে আমি নিজেও এখন একটু বিস্মিত হই। তবে আমার জীবনের সব কাজই লেখা। লেখা ছাড়া আর কিছু নয়। সৃষ্টির আনন্দে লিখতে লিখতেই জীবনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে এসেছি।
আগে বলতাম, লিখতে লিখতে শিখতে শিখতে যাই। এখন আর বলি না। কারণ শেখার বিষয়টা এখন আর খুঁজে পাই না। প্রশ্ন জাগে মনে, কে আমার শিক্ষক? এখন অদৃশ্য থেকে কিছু ব্যঙ্গবিদ্রূপের হাসি শুনতে পাই। তারপর স্থির করি আমার মতো কিছু লোক আছে যাদের কেউ শেখায়নি; তারা নিজেরাই নিজেদের শিক্ষক এবং একান্ত বাধ্য ছাত্র। অতীতে যখন আমি ছোট ছিলাম তখন আমার একজন গৃহশিক্ষক আমাকে একটা বই দিয়েছিলেন। বইটির নাম ঠাকুরমার ঝুলি। দক্ষিণারঞ্জনমিত্র মজুমদারের লেখা এ বইটি আমার জীবনের গতি পরিবর্তিত করে দেয়। পাঠ্যবই ছাড়াও যে পড়ার একটি বিশাল জগৎ আছে তা আমি বুঝে ফেলি। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত যা পড়েছি তা পাঠ্য বা বাধ্যতামূলক কোনো শিক্ষা নয়। বরং বলা যায়, আমি চলে গেলাম অবাধ্যতার জগতে। যেখানে অসংখ্য বই-পুস্তক জগতের আবরণ খুলে ভেতরের যাবতীয় কিছু দেখিয়ে দেয়। সেই বয়সে আমার বয়সী যারা ছিল তারা অনেক পেছনে পড়ে ছিল। আমি কেবল বেশি জানতাম। এই বেশি জানার নেশা সাহিত্যকে আমার পেশায় পরিণত করে। এ অবস্থায় আমার মতো কিশোরের বন্ধু জোটে না। আমি একাকী থাকতাম। একাকী ঘুরে বেড়াতাম এবং একাকী বিশ্রামে সময় কাটাতাম। আমার হাতে থাকত একটা বই। এই বই-ই ছিল সব বন্ধ দরজা খোলার অদৃশ্য চাবি। এই সর্বনাশের পথ থেকে আমাকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু আমি তখন নেশাগ্রস্তের মতো কেবল পড়ছি এবং এক অদৃশ্য হাতল ধরছি যা আমাকে আছাড়ি-পিছাড়ি খাইয়ে নিয়ে চলেছে এক অদৃশ্য বাগানে; যেখানে আমার জন্য অদৃষ্টের শিলালিপি লেখা হয়েছিল। আমাকে কেউ প্রশ্ন করলে বলতাম, আমি কবি হবো। এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে কেউ আর প্রশ্ন করত না। আমি প্রশ্ন করার আগেই জবাব দিতে জানতাম। ফলে আমার আশপাশ থেকে কৌতূহলী নরনারীকে সরে যেতে দেখলাম। তার পর থেকে জগৎ-সংসার আমার কাছে খুবই বিষণ্ন মনে হতে লাগল! অথচ আমি ছিলাম অপার কৌতূহলে ভরা উচ্ছ্বসিত এক ডাঙার মতো। আস্তে আস্তে আমার মধ্যে কৌতূহলের বদলে জেগে উঠল বিশ্বাস এবং মানসিক দৃঢ়তা। আমি ধীরে ধীরে আমার লেখাকে, আমার সৃষ্টিকে বিশ্বাসের বারান্দায় পরিণত করতে পারলাম এবং বিশ্রামের জন্য ইচ্ছামতো ঘুমিয়ে পড়লাম। যা কিছু স্বপ্ন দেখেছি সেসব লিখতে গিয়ে এখন দেখছি কথা আর ফুরায় না।
লেখা হলো শূন্য থেকে শুরু করা। বিষয়টি এভাবেই বলি না কেন একটি শব্দ থেকে জ্বলে ওঠে একটি রেখা। রেখা ভেঙে শুরু হয় লেখা, যাকে আমরা রচনা বলি। কল্পনায় কোনো নারী বা সঙ্গিনী বা নারী ছায়া হয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়। আমি তখন একটি শব্দ, তারপর শব্দ থেকে একটি পঙ্ক্তির বিস্তার করি। এই পঙ্ক্তি থেকেই আয়োজন হয় একটি কাব্যের। এভাবে কবিতা শুরু হয় বলে কবিতার এত স্ফূর্তি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তারপর আসে ছন্দ, গন্ধ এবং আনন্দ। কবি তখন ওই কয়েকটি লাইনকে নিয়ে চঞ্চল হয়ে পায়চারি করতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে ঘাঁটতে থাকে নিজের ভেতর স্মৃতি-বিস্মৃতি, চেহারা, ছবি, সুরত। যেন একটি তীরবিদ্ধ হৃদয়ের হাহাকার চলতে থাকে। এটা শান্তির মুহূর্ত না আবার অশান্তি ও নিরানন্দের মুহূর্তও না। এ হলো কাব্য সৃষ্টির আদি যন্ত্রণার কাহিনী। এভাবেই শুরু হয় কবিতা। শেষ হয় না। লেশমাত্র হলেও মনে থেকে যায়। কিন্তু পাঠকদের জন্য পড়ে থাকে অসমাপ্ত কয়েকটি পঙ্ক্তি, আমরা যাকে কাব্য বলে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।
একটা শূন্যতা থেকে দায়িত্বের বোধে লিখে চলেছি সময়ের ও সমাজের ভেতরকার খুঁটিনাটি। আমি ইতিহাসের সাক্ষী না হলেও ইতিহাসের ইতিবৃত্ত জানি। তার সারাৎসার গ্রহণ করে একদা সাহিত্য রচনা করেছি। কাব্য হয়েছে। স্বপ্ন দেখিয়েছি। আমাকে জাগিয়ে তুলেছি। কবির কাজ হলো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সব সময় সতর্ক-সজাগ করে রাখা। আর আমার দেহে রক্তের ভেতর আছে স্বপ্নেরই ডালপালা। সে কারণে এখনও বৃক্ষের মতোই শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
কবির সর্বমুহূর্তের চিন্তাশীলতা সমাজে ব্যক্ত করার পন্থা হলো কেবল লিখে যাওয়া। লিখতে লিখতেই একসময় রচনাগুলো গ্রন্থের আকার ধারণ করে। আমি বহু বইয়ের প্রণেতা হলেও লেখায় ক্লান্তি বোধ করি না। তবে লেখার সঙ্গে দেখার যে প্রসঙ্গ আসে, সেটা আমার দ্বারা আর সম্ভবপর নয়। কারণ দেখার জন্য স্বচ্ছ দৃষ্টি এবং সুস্থ শরীর দরকার। সম্প্রতি এই দুটি বিষয়েই আমার খানিকটা ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে। লেখাটা আমার পেশা বলে আগেই উল্লেখ করেছি। লিখে চলেছি। তবে বক্তব্য কবির মতো উদাসীন নয়। আমিও কবি। তবে আমার চৈতন্য অন্যভাবে লালিত হয়েছে। আমি সমাজের বহু বিচিত্র বিষয়ের মধ্যে বয়সের এই প্রান্তে পেঁৗছেছি। আমি দেখেছি প্রচুর। লিখেছি বিচিত্র বিষয়গুলো নিয়ে। এ কথা বলতে পারব না যে, আমার লেখা পাঠকদের সদাসর্বদা পরিতৃপ্ত করতে পেরেছে। তবে আমি দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা করিনি। কারণ আমি জানি, সব সময় জেতা যায় না। কখনও কখনও হার মেনে হেরে যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করতে হয়। হারজিৎ যা-ই হোক, আমি কবি হিসেবে, লেখক হিসেবে, কথাশিল্পী হিসেবে এ দেশে খানিকটা স্বীকৃতি পেয়েছি। সেই সূত্রে বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে আমার মেলামেশার সুযোগ হয়েছে। আমি দেখেছি, বুদ্ধিজীবী আত্মসচেতন ব্যক্তিকে সবাই একটু এড়িয়ে চলতে চায়। আমি এই অবস্থাটি কাটিয়ে ওঠার কোনো পন্থা আবিষ্কার করতে পারিনি। ফলে একাকী থাকা আমার নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। আমি একলা থাকি। একক চিন্তায় বাঁচি এবং একাধিক ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করি। আমার যে ক’টা অভ্যেস ছিল, সেসব একে একে ধসে পড়েছে। শুধু একটি অভ্যেসই টিকে আছে। সেটা বদ অভ্যেস হলেও আমার প্রশ্রয়েই টিকে আছে। সেটা হলো লেখার অভ্যেস। তার সঙ্গে দেখার অভ্যেসটি থাকলে আরও ভালো হতো।
যৌবনে ভালোবাসতে শিখেছিলাম। মনে পড়ে খুব অন্তরাত্মা দিয়ে আমি ভালোবাসার চর্চা করতে করতে অগ্রসর হয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিপক্ষ কিংবা অপর পক্ষ আমার এই ভালোবাসায় আস্থা স্থাপন করতে না পেরে আমাকে আঘাত দিতে লাগল। আমি অনিচ্ছায় প্রেম প্রত্যাখ্যান করলাম। তার পর থেকেই আমি একাকী এটা বুঝতে শিখেছি। আমার একাকিত্ব আমাকে সব ব্যাপারে সতর্ক করলেও ভালোবাসার ব্যাপারে উদারতা দেখিয়েছিল। আমি এই উদারতা ঠিকমতো হজম করতে পারিনি। যদিও জানতাম পরিণাম মন্দ হবে, তবুও আমি প্রেমের চর্চা ছাড়িনি। আমি জানি না ভালোবাসার পুরস্কার কী। না জেনেই ভালোবেসে যাওয়া একটা অনিশ্চিত বিপজ্জনক কাজ। আক্ষেপের বিষয়, এ কাজে আমি দক্ষ হয়ে উঠেছি। আর এই দক্ষতা থেকে জন্ম নেয় দুঃখবোধ আর বিষাদের বিস্তৃত আকাশ। সেই আকাশ আবার শূন্যতায় ভরা।
জানি কিছুই ফিরে আসে না। কিছুদিন ব্যাকুলতায়-ভাবনায় কয়েকটি দিবস অতিবাহিত হয়ে যায়। সবকিছু স্মৃতিতে-বিস্মৃতিতে আপল্গুত হয়ে ভেসে গেছে। মনে হয় আমি সুদূরের যাত্রী। বহুদূর পথ পাড়ি দিয়েছি।
কিন্তু সব সময় মনে হয় আমার পাশে একজন ছিল। কোথায় তাকে রেখে এলাম, কখন রেখে এলাম, কীভাবে ভুলে গেলাম। এটা একটা বিস্ময়ের ব্যাপার বটে। মাঝে মধ্যে বলি, আমি তো আছি। প্রকৃতির মধ্যে যেমন লতাগুল্ম বাতাসে দোল খায়, আমিও তেমনি দুলছি। আমার চক্ষু বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আমারই অশ্রু-জল। কার যেন কাজলমাখা দুটি চোখ আমাকে নিয়ত দেখছে। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই না। ভুলতে পারি না তার হাসি, বিদ্রূপ এবং কৌতুকের কলরব। সেই বিস্মৃত কিংবা অচেনা মুখটির কথা ভেবে সাহস পাই শূন্যতা থেকে কিছু একটা সৃষ্টি করতে। শিল্পীর সাদা ক্যানভাসের মতো চিন্তাও তখন থাকে শূন্য। সেখানে আমি এঁকে চলছি অবিরাম রেখামালা। সেই রেখা থেকে লেখার শুরু হয়। আর লেখাই আমার প্রাপ্তি, বেঁচে থাকার কৌশল।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s