তোমার মধ্যেই আমি

image_1438_350736‘তুমি যে তুমি ওগো
এই তব ঋণ,
আমি মোর প্রেম দিয়ে
শুধি চিরদিন’।

বন্ধু পুরুষ হলে, বন্ধুত্বের আবেগে আমরা আপনা থেকে সহজেই তুইয়ে চলে যাই। আর বন্ধু যদি নারী হয় তাহলে আমরা তাকে ‘তুই’ বলি না; বলি, তুমি। ‘তুমি’র মধ্যে একটা নীরব, প্রায় নিঃশব্দ চুম্বনের ধ্বনি আছে।
আমরা ‘তুমি’ বলতে বলতে নারীর অতি নিকটে পেঁৗছে যাই। এবং নারী সমস্ত লাজ-লজ্জা পার হয়ে ‘আপনি’ ধাপ অতি সংকোচের সঙ্গে অতিক্রম করে একদিন হঠাৎ বলে_ ‘তুমি না আমার সঙ্গে বাড়াবাড়ি করছো’। এ কথার পর আত্মীয়তার আবহাওয়া পাল্টে গিয়ে বাতাসের পরিবেশ বদলে যায়। মনে হয়, আমরা দু’জনেই দু’জনকে দরজার খিল খোলার শব্দের মতো অতিক্রম করে যাই। আমাদের হৃদপিণ্ড আমাদের ভেতরেই অতি সংকোচে কিংবা অসংকোচে ধুকপুক করতে থাকে। হয় বদন ফ্যাকাশে হয়ে যায় অথবা সহসা রক্তিম আভায় লাল হয়ে ওঠে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস হয় অতি দ্রুত কিংবা অতি ধীরে বইতে থাকে। বুকের ওঠানামা কারও কারও দৃশ্যগোচর হয়, কারও বা হয় না।
আমরা শুধু বাড়ির ভেতরটা দেখি না। পুরুষ হলে সে নারীর ভেতরটা দেখতে পায়। তখন আত্মীয়তার রকমটা পাল্টে যায়। মনে হয় এই বাড়িতে আমার জন্য যেমন প্রশ্রয় আছে তেমনি পরিণতিও আছে। সেই পরিণতি প্রেম হলে আমরা নিজেকে অতি ধীরে নিরাভরণ করে মেলার ইচ্ছা ব্যক্ত করতে সাহসী হয়ে ওঠি। কিন্তু নিরাভরণ শব্দের অর্থ নগ্ন হয়ে যাওয়া নয়। অদৃশ্য বর্ষণে শরীর মন ও অস্তিত্ব আবরিত রেখেই আমরা অতি সাবধানে, সতর্কতায়, সাহসে কাঁপতে থাকি। তখন কারও মুখে বাক্যস্ফূর্তি হয়, কারও হয় না। মনে হয়, বুঝি বা বাতাস থমকে গিয়েছে, মেঘের ভেতর রোদ্র মুখ লুকিয়েছে। এই লুকোচুরি কম-বেশি সব নর-নারীর মধ্যে দেখা যায়।
প্রেম হলো এক স্বর্গীয় অনুভূতি। যা কেবল মানুষের মর্মে বাসা বেঁধে আছে। এ কারণেই মানুষ মৃত্যুর সামনেও মেরুদণ্ড সোজা করে চোখের ওপর চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সবই যখন পরাজিত হয় তখনও মানুষ লড়াইয়ের ময়দানে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ এটা পারে বলেই সে কবিতা লেখে এবং মৃত্যুতে কাতর হয় না। একই সঙ্গে আমরা বলি, এই তো মানব-মানবী জোড় বেঁধে আছে। এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে জগতের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল কর্ম, সব শিল্পই এই পরিস্থিতির কাছে কোনো না কোনো সময় একবার নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে মানবিকতাকে, প্রেমকে একই সঙ্গে প্রেমের পরিণতিকে শ্রদ্ধা জানায়। এতে কার কী লাভ হয় কে জানে। কিন্তু অনেক নর-নারী অমরতার স্বাদ পেয়ে আত্মদানে তুষ্ট হয়ে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়েছে। এটা শুধু মানুষই পেরেছে, আর কেউ পারেনি। কবিতায় যদি বলি_
‘গতিই যদি জীবন তবে তোমার আমার মধ্যে সুস্থিরতা কি আর অবশিষ্ট থাকে?
এখন তুমি একটা চাদরে নকশা তুলছ। আর আমি দেখছি
তোমার সর্বাঙ্গে লাবণ্যের ঘামে স্থির ছায়ার স্থবিরতা।
তোমার আত্মার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে তোমার অমৃতের আধার দুটি।
যা সন্তানের লেহনে, পানে আর তৃপ্তিতে অফুরন্ত।
ও আমার অবাধ্য দৃষ্টি, তুমি স্থিরতার বেদীর ওপর
এই বিশ্বময়ীকে দ্যাখো। লোকে যাকে সুখে ও যন্ত্রণায়
প্রেম নাম কহে।’
[লোকে যাকে প্রেম নাম কহে]
মানুষকে সৃষ্টিশীলতার উন্মাদনায় রাখতে হলে সব সময় একটি উত্তেজক বিষয় থাকা দরকার। মানুষকে শুধু কর্তব্যের তাগাদা দিলে চলে না। তাকে সুখ দিতে হয়। শান্তি দিতে হয়, তৃপ্তি দিতে হয় এবং সর্বোপরি অনুপ্রেরণায় অভিষিক্ত রাখতে হয়। মানুষ সব পারলেও যাকে বলে সৃজনক্ষমতা সেটা নিজের মুঠোতে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। এর জন্য দরকার ক্রমাগত সৃজনশীলতার বেদনাকে বেগবান করা। আর মানুষ যখন সৃষ্টির আনন্দ একবার নিজের করতলে নিয়ে আসতে পারে, তখন সে নিজেই নিজের বেদনাকে সুখে পর্যবসিত করে দিতে পারে। তখন তার হাসিতে কোথাও যেন রোদনধ্বনি লুকিয়ে আছে বলে শ্রোতাদের ধারণা হয়। এ অবস্থা বুকের মধ্যে পুলকঘন শিহরণ সৃষ্টি করে দেয়। মানুষ আবিষ্কার করে বাঁচার প্রকৃত অর্থ বা আনন্দ।
বাঁচতে হলে সাজতে হয় এবং সেই সাজ সবারই চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। মানুষের সাজসজ্জা সৌন্দর্য সব কিছু মিলিয়ে এমন একটা পরিবেশ তাকে ঘিরে ধরে যে, সে মনে করে তার দেহ থেকে আনন্দের বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আপনা থেকেই সৃষ্টি হয় না। এর জন্য দরকার গভীর আত্মোপলব্ধি। নিজকে জানতে জানতে প্রেমকে জানা। আর প্রেমের হাতে সমর্পণ করে দেওয়া নিজের সব গোপনীয়তা। যেন কোনো কিছুই লুকায়িত নেই। সবই ভালোবাসার হাতে সমর্পিত।
বর্তমানে একাকী কাটছে সময় আমার। একা থাকার বিপদটা উপলব্ধি করতে শুরু করেছি। আমার নিয়তি যখন আমাকে নিঃসঙ্গ হওয়ার পরামর্শ দেয়, তখন আমার ভেতরটা সঙ্গ-কামনায় অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়ে। অথচ এই বৃদ্ধ বয়সে কে আমার সাহায্যের জন্য সময় ব্যয় করবে? ফলে আমাকে শেষ পর্যন্ত নানা বিষয়ের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহ জোগায়। গাছের সঙ্গেও কথা বলি। অনেকে ভাবতে পারেন, গাছের সঙ্গে কথা বলা তো পাগলামির লক্ষণ! কিন্তু গাছ যখন আমাকে শাখা নাড়িয়ে জবাব দিতে থাকে, তখন এতটুকু অবাক হই না। কারণ শৈশবকাল থেকেই একাকী থাকতে গিয়ে প্রকৃতির ভেতর বিচরণ করতে শিখেছিলাম। কথা বলতে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন আছে বলে মনে করতাম না। একাকী কথা বলতাম, মনের আনন্দে হাঁটতাম আর কেবল দেখতাম। দৃশ্যের পর দৃশ্য আমার চোখের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেত। এই যে প্রকৃতির ভেতর নৈঃসঙ্গ্যের গুণকীর্তণ করার অভ্যাস, এটা শৈশবেই শিখেছিলাম। আজও এর মহিমা বিস্মৃত হইনি। লেখক হতে হলে ‘দেখক’ হতে হয়। আমি দেখতে দেখতে মাঠঘাট পেরিয়ে প্রায় আশির কোটা ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম করেছি। আমার কোনো অনুতাপ নেই, অনুশোচনাও নেই। এই দেখার মধ্যে কেবল যে মানুষকেই বেশি পছন্দ হয়েছে, এমন নয়। গাছকেও পছন্দ হয়েছে। আমি গাছগুলোর নাম বলতে পারব না বটে, তবে তারা আছে। অনেক পথের বাঁকে, অনেক মাঠের পাশে, অনেক ঘাটের পৈঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে চেনে, আমিও চিনি। এই চেনাজানার মধ্যে তেমন কোনো বৈপরীত্য নেই। আবার আনন্দ-উৎফুল্ল হওয়ার মতোও কিছু নেই।
কথা হলো, জীবনের বিশাল ব্যাপ্তি আমাকে অভিজ্ঞ করে তোলার বদলে অনেকটা বোকা শিশু বানিয়ে দিয়েছে। আমি শৈশব পেরোতে পারি না কিংবা বলা যায়_ চাইও না। মানুষের ভালোবাসা শুধু মানুষের ওপরই ভর করে থাকবে, এটা আমাকে অবাক করে। মানুষের ভালোবাসা তো পাখি-পতঙ্গ, গাছপালার ওপরও সমানভাবে বেষ্টন করে থাকতে পারে। এমন হয় না কেন জানি না।
একটা কথা আছে, ‘লাজ-লজ্জা-ভয়, এই তিন থাকতে নয়’। তিন থাকতে কী নয়? প্রেম নয়। পরিণতি নয়। যেন মনের ভেতর গোপনে এক গোমতি নদীর জল ঢেউ তুলে বয়ে যাচ্ছে। এই স্রোতস্বিনী নদীর নামই কবিরা দিয়েছেন ‘ভালোবাসা’। একবার হৃদয়ে, অন্তকরণে ভালোবাসার গোপন স্রোত বইতে থাকলে আমরা সামনে যা কিছু দেখি তা আর দৃশ্যগোচর হয় না। চোখ চলে যায় দ্রষ্টব্যকে অতিক্রম করে অনেক অনেক দূরে, বহু দূরে। সামনে যে দৃশ্যপট থাকে তা কাঁপতে কাঁপতে বাতাসে বিলীন হয়ে যায়। আমরা হারিয়ে যাই নিজের মধ্যে। আমাদের আর অতীত থাকে না। বর্তমানও দৃশ্যগোচর হয় না। শুধু ভেসে উঠে ভবিষ্যৎ। যেন একটি কম্পিত নৌকার ভেতর আমি বসে আছি। পারাপারের মাঝি সামনে। সে মাঝিটি এক পরিশ্রমী নারী। আমি তাকে দেখি। শরীরে তার যৌবন ফেটে পড়ছে। কেবল দেখি পেশির দুলুনি। ঘাম ঝরছে ভেতরে। কামার্ত আহ্বান যেন আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অজানা কোন সমুদ্রের দিকে। কেবল তরঙ্গের শব্দ আমার মর্ম ভেদ করে, ধর্ম ভেদ করে প্রচলিত নিয়মকানুন পার হয়ে চুম্বকের টানে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি বিনা প্রতিবাদে কেবল চোখ দুটি খোলা রেখে চলে যাচ্ছি সব কিছু পার হয়ে। যেন কোনো এক নদীর পাড় ধরে আমি শুধু চলে যাচ্ছি। এক মায়াবী ডাক আমাকে নাম ধরে ডেকে কেবল সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত দৃশ্য-অদৃশ্য আমার শরীর ঘেঁষে পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে। এসো, এসো প্রতিধ্বনি আমার কর্ণকুহরে ঠাণ্ডা হাওয়ার মতো ঢুকে, মুখে ফুঁ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোথায়? তা আমার একেবারেই অজানা।
আমার অজান্তে কোনো এক তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে চেনা সমস্ত ঘাট পেরিয়ে আমি কেবল পার হয়ে যাচ্ছি। আমার শক্তি আমাকে আর কোনো সাহায্য করছে না। আমি শুধু বয়ে যাওয়া নদীর স্রোত হয়ে এবং অন্যের দূত হয়ে চলে যাচ্ছি। প্রেম নয়, কাম নয় শুধু ঘামের ফোঁটা আমার ললাট বেয়ে গণ্ডদেশ ভিজিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে দেহের লবণ, ঘাম, নুন।
এই হলো হয়তো বা প্রেমের পরিণতি। কোনো আশা বা ভাষায় ব্যক্ত করার বিষয় এটা নয়। এটা শুধু চলে যাওয়া, বয়ে যাওয়া, বায়ুর বেগ আয়ুর সঙ্গে মিলে আমাকে আহ্বান করছে। আয়, ওরে আয়। তোর কোনো দায় নাই। দায়িত্ব নাই। তবে নির্ভার অস্তিত্ব আছে। যা দেখা যায় না। অনেকটা মাকড়সার জালের মতো। মুখে লাগলে বুঝতে পারি কিন্তু খুঁজলে আর পাই না তারে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s