হুমায়ূন ও চাঁদের মাটি

humayun ahmedমাত্র এক বছর। হ্যাঁ, এই এক বছরেই যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে হুমায়ূন। না, ভুল বললাম। হুমায়ূন নয়, তাকে নিয়ে আমাদের আগ্রহটাই যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করেছে। অথচ এমনটি তো হওয়ার কথা নয়। তিরোধানের এক বছরের মধ্যেই যে তার জনপ্রিয়তা উবে গেছে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এই তো ২০১৩-র অমর একুশে গ্রন্থমেলাতেও হুমায়ূনই ছিল বরাবরের মতো জনপ্রিয়তম ও বিক্রি তালিকায় শীর্ষতম লেখক। শুধু তার বই নয়, তাকে নিয়ে লিখিত অন্য লেখকদের বইয়ের কাটতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। আমাদের জনপ্রিয় জীবিত লেখকরা যে এগিয়ে আসছেন না এমন নয়, তবে তাদের আকর্ষণের বৃত্ত এখনও অতো বড় নয়। বিশেষত যে তরুণসমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে হুমায়ূন-রুচি, তা থেকে তারা এখনও সরে আসার ক্ষেত্র বা যুক্তি খুঁজে পায়নি। এর একটি বড় কারণ বোধ করি এই যে, হুমায়ূন ঘরানার লেখক বাংলাদেশে আর নেই বললেই চলে। হুমায়ূন নিজেও তার রচনাশৈলীর কোনো যোগ্য সাহিত্যিক উত্তরসূরী রেখে যায়নি, যার রচনা পড়ে পাঠক-পাঠিকা হুমায়ূন-রুচির স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। আসলে তাৎপর্যপূর্ণ ও ক্ষমতাবান লেখকদের ক্ষেত্রে এমনটিই হয়ে থাকে। আমরা হাজার চেষ্টা করেও আরেকজন শরৎচন্দ্র পাইনি। সহজে একইসঙ্গে ভালো ও জনপ্রিয় লেখকের দেখা মেলে না এক লেখকের মধ্যে। আশার কথা, হুমায়ূনের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে শুরু থেকেই। তার প্রথম গ্রন্থ ‘নন্দিত নরকে’ নান্দনিক উৎকর্ষে ও পাঠপ্রিয়তায় প্রায় সমভাবেই উত্তীর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে, তার সব গ্রন্থের ক্ষেত্রেই কি এমনটি ঘটেছে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, তার রচিত তিন শতাধিক গ্রন্থের প্রায় প্রতিটিই পাঠপ্রিয়তায় উত্তীর্ণ ও ব্যবসাসফল, কিন্তু প্রতিটি গ্রন্থ শৈল্পিক উৎকর্ষে সমান নয় অবশ্যই। তবে তার কোনো গ্রন্থ যে নান্দনিক পাল্লায় একবারে অপাঙ্ক্তেয়, এমনও নয়। কাঠামোগত বিন্যাস, সহজ বর্ণনাশৈলী, চরিত্র সৃষ্টি, সংলাপ, নাটকীয়তা, চলমান জীবনের অসঙ্গতি পর্যবেক্ষণ ইত্যাদির কারণে তার প্রায় প্রতিটি রচনা নান্দনিক গ্রাহ্যতায় উৎকীর্ণ।
আমি আমার বক্তব্যের সমর্থনে হুমায়ূনের যে কোনো গ্রন্থের কথা বলতে পারি। ঠিক এই মুহূর্তে আমার হাতের কাছে আছে তার কয়েকটি গ্রন্থ। তারই একটি ‘মে ফ্লাওয়ার’। আগে বইটি উল্টে পাল্টে দেখলেও পুরোটা পড়ে দেখিনি। এটি তার একটি ভ্রমণকাহিনী বিশেষ। হুমায়ূন এই গ্রন্থ উৎসর্গ করেছে তার ভগি্নপ্রতিম ড. ইয়াসমিন হককে। “আমার খণ্ডকালীন প্রবাসজীবন যে হৃদয়ের সমস্ত মমতা দিয়ে ভরে দিতে চেষ্টা করেছে।” মাস তিনেকের জন্য হুমায়ূন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া সিটিতে প্রবাসজীবন কাটিয়েছিল লেখক হিসেবে; আর তারও আগে অধ্যয়নসূত্রে নর্থ ডেকোটায় ছিল বেশ কয়েক বছর। প্রবাসজীবনে এই বিদুষী নারী তাকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন; কখনও কর্তব্যে ব্রতী হয়ে; কখনও কোনো সুবোধ্য কারণ ছাড়া; তবে মানবিক সহমর্মিতার বশে তো বটেই। এই গ্রন্থে প্রবেশ করতে গিয়ে এই সাধারণ বিষয়টি কেমন যেন অসাধারণ হয়ে উঠল আমার কাছে। আরও লক্ষ্য করলাম, মূল গ্রন্থের পাঠ-প্রবেশের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কবি রবার্ট ফ্রস্টের একটি উদ্ধৃতি :’ঐবধাবহ মরাবং রঃং মষরসঢ়ংবং ড়হষু ঃড় ঃযড়ংব/ঘড়ঃ রহ ঢ়ড়ংরঃরড়হ ঃড় ষড়ড়শ ঃড়ড় পষড়ংব.্থ ‘খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় না যাদের, স্বর্গদৃশ্য ধরা দেয় কাছে কেবল তাদের।’ রবার্ট ফ্রস্টের এ-ধরনের উদ্ধৃতি গ্রন্থের আরও দু’জায়গায় আছে। তার মনের ভেতর বারবার গুণ গুণ করেছে সেই বিখ্যাত পঙক্তিটিও, ‘অহফ সরষবং ঃড় নবভড়ৎব ও ংষববঢ়/অহফ সরষবং ঃড় মড় নবভড়ৎব ও ংষববঢ়্থ. ‘ঘুমোবার আগে যেতে হবে বহুদূর, ঘুমোবার আগে যেতে হবে বহুদূর’। উৎসর্গপত্র কিংবা বইয়ের অন্যত্র এ ধরনের অন্য লেখক বা তাদের লেখার প্রসঙ্গ এসেছে বিস্তর। আমরা সবগুলো এখানে উল্লেখ করার সুযোগ পাব না। অন্য যে লেখকের উদ্ধৃতি দিতে চাই, সেটি হচ্ছে হুমায়ূনের ব্যক্তিজীবনের একটি চমকপ্রদ গল্প শুনে শ্রীলংকার নারী কবি জেন কর্তৃক রচিত একটি ইংরেজি কবিতা। আইওয়া প্রোগ্রামের কর্ণধার অধ্যাপক ক্লার্ক ব্লেইস ছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় ঔপন্যাসিক ভারতী মুখোপাধ্যায়ের স্বামী। এক দুপুরে তারা হুমায়ূনকে নিমন্ত্রণ করল খাওয়ার জন্য। ইংরেজি ভাষায় লেখা তার ‘জেসমিন’ উপন্যাসটি বেশ সুপরিচিত। এটি একসময় যুক্তরাষ্ট্রে বেস্ট সেলার ছিল। হুমায়ূনের সঙ্গে নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন শ্রীলংকার কবি জেন ও তার স্বামী। অনর্গল কথা বলা আর স্বরচিত কবিতা পাঠ করা জেনের স্বভাব। বলা যেতে পারে, জেন একজন অনুপ্রাণিত ও স্বতঃস্ফূর্ত কবি। সেই জেনকে কথায় কথায় হুমায়ূন তার মেজো মেয়ে শীলার জন্মের গল্প শুনিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে কাজ করার সময় নর্থ ডেকোটায় এক হাসপাতালে শীলার জন্ম হয়। হুমায়ূন সেই বিদেশ-বিভূঁইয়ে সন্তানপ্রসবকালে প্রিয়তমা স্ত্রী গুলতেকিনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল অপারেশন থিয়েটারে। এই গল্প আমাদের অনেকেরই জানা। যা-হোক, হুমায়ূন গল্পটি বলার সঙ্গে সঙ্গে কবি জেন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার পর একসময়ে এই বিষয়টি নিয়ে লিখে ফেলেন একটি আবেদনশীল কবিতা। তারপর দিন সাতেক পর সন্ধেবেলা প্রেইরি বুক স্টোরে একটি কবিতা পাঠের আসর বসে। সেখানে জেন তার কবিতাটি আবৃত্তি করেন। ‘মে ফ্লাওয়ার’ গ্রন্থে হুমায়ূন পুরো কবিতাটি ইংরেজি ভাষায় উদ্ধৃত করে। বলা বাহুল্য, মূল কবিতাটি ইংরেজি ভাষাতেই লিখিত হয়েছিল। শ্রীলংকার বেশ কিছু কবি ও ঔপন্যাসিক ইংরেজি ভাষাতেই সাহিত্য চর্চা করে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন। আমি জেনের এই কবিতাটির একটি খসড়া অনুবাদ এখানে উপস্থাপন করছি :
দেশ
[হুমায়ূনের জন্যে কবিতা]
তোমার সহধর্মিনীর প্রসবশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে
তোমার সন্তানের জন্মের প্রতীক্ষায় তুমি
বহু বহু বার উচ্চারণ করলে
স্রষ্টার নাম
আল্লাহু আকবর_

এই দেশ তোমার ছিল না,
তুমি তোমার দেশ থেকে বহু দূরে;
কিন্তু কেউ কি কখনও দূরে থাকতে পারে
সেইসব দেবতার কাছ থেকে
যারা তার জীবনের অন্তরঙ্গ অংশ?
এখানে তুমি কখনও নিঃসঙ্গ নও,
তুমি একা নও শীতকালের তুষারাবৃত মরুপ্রান্তরেও,
না, তুমি একা নও যখন বৃক্ষের সব পাতা ঝরে যায়,
এমনকি তুমি একা নও যখন তুমি প্রার্থনা কর
তোমার সন্তানের জননীর নিরাপত্তার জন্য।

দেবতারা তোমাকে অনুসরণ করে তাদের মতো করে,
আর তুমিও তাদের তোমার সঙ্গে নিয়ে চলো তোমার মতো করে,
যেভাবে মহাসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তুমি তোমার করতলে ধরে রাখো
তোমার দেশের একখণ্ড মাটি, তোমার ক্ষুদে এক দেশ,
আর তোমার একাকীত্বের সময়ে তুমি তাকে ছুঁয়ে দেখ
যেন তুমি স্পর্শ করছ তোমর মাঠ-ঘাট, নদী-নালা আর গাছপালা_
আর এভাবেই তুমি অনুভব কর তোমার বাড়িঘর,
তোমার স্বত্ব, তোমার অস্তিত্বের শেকড়।

আমি মনে রেখেছি তোমার কথাগুলো, বন্ধু হে আমার।
‘মা আমাকে বলেছিল,
তোমার করতলে ভরে নাও দেশের মাটি
যখন জন্ম নেবে কন্যাসন্তান,
তা নাহলে মাটির জন্য কান্নায় ব্যাকুল হবে শিশুটি।’

আর সেই অশ্রুগুলো কি সিক্ত করবে না
আমাদের জীবনের বিশুষ্ক মৃত্তিকা?

কেবল অপত্য স্নেহ বা ভালোবাসা বা দেশপ্রেম নয়, এই কবিতার মধ্যে আছে সারা পৃথিবীকে মানুষের ঘর হিসেবে দেখে অঞ্চল ও সর্বাঞ্চলের সঙ্গে এক মানবিক সমীকরণের স্পর্ধিত প্লাবন।
‘মে ফ্লাওয়ার’ গ্রন্থটির শিরোনাম এসেছে সেই হোটেল থেকে, যেখানে আইওয়া রাইটিং প্রোগ্রামের অধীনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পঁয়তালি্লশ জন লেখক-কবি একত্রিত হয়ে তিন মাস সৃষ্টিশীলতায় সমর্পিত ছিলেন। হুমায়ূন তাদের প্রত্যেকে যথাসম্ভব তার দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও চমকপ্রদ প্রবণতাগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করেছে। ৭১ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের ১৫টি ছোট-বড় অধ্যায়ে তার যৎসামান্য বর্ণনাও আছে। যৎসামান্য বলছি এজন্যে যে, হুমায়ূন বর্ণনায় ডিটেলের পক্ষপাতী নয়, বরং কম কথায় জাপানি চিত্রকরের মতো নকশা আঁকাতেই তার আনন্দ। বিচিত্র মানুষের দেশ আমেরিকা, যেখানে পৃথিবীর সব প্রান্তের সব দেশের সব জাতির সব ভাষার মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। আসলে আমেরিকা মানেই সারা পৃথিবীর মানবগোষ্ঠীর মিলনমেলা। আর আইওয়ার এই লেখক প্রকল্পটিও তারই একটি অণুভাষ্য বিশেষ। হুমায়ূন তার বর্ণনা দিয়েছে রসিয়ে রসিয়ে। দু-একটি উদাহরণ। চীনা লেখক জং ইয়ং। খুব হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু কথা বলেন কম। রহস্যটা জানা গেল তার সঙ্গে কথা বলেই। যা-ই তাকে বলা হয়, তার উত্তরে হাসতে হাসতে বলে, ‘ইয়েস, ইয়েস’। অর্থাৎ তার ইংরেজির দৌড় ওই একটি শব্দেই সীমাবদ্ধ। ইন্দোনেশিয়ার কথাসাহিত্যিক আহমেদ তোহারি কম্পাস খুঁজে বেড়াচ্ছেন কেবলা ঠিক রাখার জন্যে। আবার সেই তোহারিই সন্ধ্যায় হুইস্কির বোতল খুলে বসেছেন। হুমায়ূনের প্রশ্নের জবাবে বলছেন, মাওলানা রুমী নাকি সুরা পান করতেন। ভারতের সুন্দরী তরুণী কবি গগণ গিল। বয়স চবি্বশ পঁচিশ। সেই সুন্দরী কবি ডলার বাঁচার জন্যে নাকি আলজেরীয় লেখকবন্ধুর সঙ্গে এক কক্ষে থাকছেন। এটি, আর যা-হোক, উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে বেমানান। আবার মাতৃভাষা ভুলে যাওয়া এক বাঙালির প্রসঙ্গও এসেছে তার রচনায়। সেই ছেলেটির নাম আহসান উল্লাহ আমান। সে নাকি বাংলা ভাষাই ভুলে গেছে। এ কথা শুনে হুমায়ূন নয়, ক্ষেপে গেল ফিলিপিনের জনপ্রিয় লেখক সিকাট। মাতৃভাষা ভুলে যাওয়া এই নরাধমকে তিনি ঘুষি মেরে হুঁশ ফেরাতে চান। সব-সম্ভবের দেশ আমেরিকায় শিশুর বয়স বার বছর হওয়া মাত্র সরবরাহ করা হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের সাজসরঞ্জাম। পুরুষে পুরুষে বিয়ে আর হোমোসেক্সুয়ালিটি এখানে বৈধ। রবীন্দ্রনাথও তার কন্যা মীরা দেবীকে এক পত্রে জানিয়েছিলেন, “মীরু, এখানে মেয়েদের বেশিদিন থাকার ক্ষতি আছে। তার কারণ এখানকার মানুষ সঙ্কীর্ণ এবং যারা আছে তারা অনেকেই নীচের স্তরের মানুষ” ইত্যাদি। কিংবদন্তির পিয়ানোবাদক লেবারেচি অবাধ যৌনাচারের ফলে এইডস রোগে মারা গেছেন, এই সংবাদে মর্মাহত হুমায়ূন। ঐশ্বর্য, প্রাচুর্য বা জৌলুস সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ থেকে হুমায়ূন_ কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি এই জীবনকে বেছে নেওয়া। তারা দু’জনেই প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মৌলিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে। এইসব আদিখ্যেতা হুমায়ূনকে এতোটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, সে নিয়মিত আসরে পাঠ করার জন্যে কোনো কিছুই ইংরেজিতে লেখেনি। যা লিখেছে তার সবটাই বাংলায়। এটি তার দ্রোহী নীরবতা, এটি তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিমুদ্রা। এই ব্যক্তিক অনমনীয়তার প্রমাণ সে আগেও একবার দিয়েছিল, পিএইচডি করার সময়ে। বলতে গেলে কততটা না জেনেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি উচ্চতর কোর্স নিয়েছিল সে। প্রথম পরীক্ষায় পেল একবারে শূন্য। প্রফেসর তাকে সাজেস্ট করল অপেক্ষাকৃত নিচের একটি কোর্স নিতে। কেননা ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ই ত্যাগ করতে হবে। হুমায়ূন কিন্তু অনড়। শেষমেশ দেখা গেল, ফাইনাল পরীক্ষায় হুমায়ূন পেয়েছে পুরোপুরি ১০০, যা সচরাচর দেখা যায় না। ফলে সেই প্রফেসরই তাকে বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ অফার করল। এভাবেই হুমায়ূন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জিরো থেকে হিরো হওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে।
সেই হুমায়ূনকে, আর সৃষ্টিবৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই কাজ। এক্ষেত্রে পারিবারিক ও জাতীয় উদ্যোগের সমন্বয় সর্বাধিক জরুরি। জীবিত হুমায়ূনকে নিয়ে তার পরিবার বা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে সহমর্মিতা দেখেছি, তাকেই বহুগুণ বাড়িয়ে তার চর্চায় ব্রতী হতে হবে। কাজে লাগাতে হবে নুহাশপল্লীকে। সংকীর্ণতা ও স্বার্থচিন্তা পরিহার করে এই নুহাশপল্লীতেই শুরু করতে হবে হুমায়ুন চর্চা কেন্দ্র বা অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান। ‘মে ফ্লাওয়ার’ গ্রন্থের সর্বশেষ অধ্যায়ে আমরা হুমায়ূন ও তার পত্নী গুলতেকিনকে দেখছি এক বিরল মুহূর্তে, স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটে। গুলতেকিন হুমায়ূনকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ করে আমেরিকা এসে স্বামীর সঙ্গে মিলিত হয়। যথার্থ স্বামীর যথার্থ স্ত্রী বটে। যা-হোক, আমেরিকা ছেড়ে আসার দু’দিন আগে তাদের ড. ইয়াসমিন হক এই ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন চাঁদের মাটি দেখা ও ছুঁয়ে দেখার জন্যে। চাঁদের মাটি স্বচক্ষে দেখা ও হাতে স্পর্শ করার অনুভূতি নিয়ে হুমায়ূন নিজেই লিখেছে, ‘আমি এবং গুলতেকিন এক সঙ্গে চাঁদের পাথরে হাত রাখলাম। গভীর আবেগে চোখে পানি এসে গেল। কত না পূর্ণিমার রাতে মুগ্ধ চোখে এই চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিস্ময় ও আবেগে অভিভূত হয়েছি। সেই চাঁদ আজ স্পর্শ করলাম। আমার মানব জীবন আজ ধন্য।’ তারপর হুমায়ূনের মন খারাপ হয়ে গেল। ড. ইয়াসমিন দু’জনের যুগল ছবি তুলে তাদের মন ভালো করে দিতে চাইলেন। আমাদের হাতের কাছে ছুঁয়ে দেখার মতো চাঁদের মাটি নেই। কিন্তু আছে হুমায়ূন। আমাদের হাতে-পাওয়া এক চাঁদ-মানব। নুহাশপল্লীর লিচুতলায় রোদে-জোছনায় চাঁদের দিকে চোখ রেখে হুমায়ূন শুয়ে আছে পৃথিবীর মাটিতে। প্রতি পূর্ণিমায় সেখানে বসে জোছনা উৎসব। জোনাকিরা আলো জ্বালে তার আলোকশরীর ঘিরে। আমরা তার স্বজন-বান্ধব-অনুরাগীরাও কি অন্তত জোনাকির মতো হতে পারি না? গুলতেকিন-ইয়াসমিন-শাওনসহ সবাই এককাতারে মিলে আমরা কি নুহাশপল্লীকে হুমায়ূন চর্চার জোছনাপল্লীতে রূপান্তরিত করতে পারি না? যাপিত জীবনের তাবত সংকীর্ণতা ও ব্যক্তিবিবেচনার ঊর্ধে উঠে আমার কেন যেন গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করবো কী’!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s