বিকেলের বেহাগ

bikeler behag-1তিন
এ বাড়িতে তিনজন কাজের লোক এখন। আমেনার মা সবচেয়ে পুরনো। ও এখানে বিশ বছর থেকে আছে। তার বয়স কত তা সে বলতে পারে না, তবে দেখে মনে হয় পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। সে
যখন কাজ করতে আসে সঙ্গে এক ছেলে আর মেয়ে ছিল, কিশোর বয়সের।

তার স্ত্রী প্রথমে ইতঃস্তত করে পরে বলেছিল, থাকুক এরা। সবাই মিলে কাজ করবে। আমেনার মা রান্না বান্না  করবে, আমেনা ঘরদোর গুছাবে, রাধবে। তার ভাই দোকানে যাবে, চানাশতা
দেবে।

সেইভাবেই তারা থেকেছে এ বাড়িতে অনেক বছর। চার বছর হলো আমেনার বিয়ে হয়েছে। এখন থাকে শ্বশুরবাড়ি। তার বড় ভাই চাকরি নিয়ে চলে গেছে তার স্ত্রী বেঁচে থাকতেই। আমেনার মা এখনো রানড়বাঘরের দায়িত্ব নিয়ে আছে। তাছাড়া বাড়ির দেখাশোনার ভারও তার ওপর। ছোট একটা কাজের ছেলে রাখা হয়েছে, নাম রাজু। কাজকর্ম শিখে উঠতে পারেনি ভালো করে এখনো। আমেনার মা বলে তার বুদ্ধি কম, কাজ কখনোই ভালো করে শিখতে পারবে না। তা হোক। ডাকলেই ছুটে আসে, এটা-ওটা এনে দেয়। বেশ চটপটে। আর আছে দারোয়ান বরকত। ১০ বছর থেকে আছে। প্রতিবছরই বেতন বাড়াতে বলে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তা উল্লেখ করে। বিশ্বস্ত লোক বরকত, তাই বেতন বাড়ানো হয়েছে।
এক সকালে রাজুকে ডেকে এনায়েতুল্লা ওয়ারড্রোব থেকে পুরনো কাপড় নামালেন। নামেই পুরনো, দেখতে সবই নতুন। সুটগুলো কতদিন আর পড়েছেন? বিদেশ থেকে কেনা দামি সুট, টাই দেখে
মনে হয় না ব্যবহার করা হয়েছে। চকচক করছে, মসৃণ দেখায়। ক্রিশ্চিয়ান ডিওর, আরমানি, ক্যালডিন ক্লায়েন, হিলফিগার, অস্কার ডেলা রেন্টা, অস্টিনরিড, এসব ব্র্যান্ড নামের কাপড়। কোনোটা লন্ডনে কেনা, কোনোটা প্যারিসে। আবার কোনোটা মিলানে। নিউইয়র্কের ফিফথ এভেন্যুর দোকান থেকে কেনা বেশ কয়েকটা সুট। বেশ শৌখিন ছিলেন এনায়েতুল্লা। যখনই বিদেশে গেছেন, কাপড়
কিনেছেন বেছে বেছে। বিলেতে হাই স্ট্রিটের সিঅ্যান্ড এ অথবা মার্কস অ্যান্ড স্পোন্সারের দোকান থেকে কখনো কোনো কাপড় কেনেননি তিনি, সেসব খুব সাধারণ। ডিজাইনের ড্রেস না।
সুট আর শার্টগুলো টেবিলে রেখে দেখলেন কিছুক্ষণ। হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। দাউদ ঘরে এলো।

দেখে বলল সব কাপড় নামিয়ে রাখছেন দেখি। ওয়াশ করতে দেবেন?
তিনি কাপড়গুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, না।
বিলি করে দেব। প্রেজেন্ট করব।
বিলি করে দেবেন? প্রেজেন্ট করবেন? কাকে? এত শখের কাপড় আপনার।
হ্যাঁ। শখের কাপড়। কিন্তু পড়া হয় না আজকাল।
পড়ে বাইরে কোথায় আর যাই এখন। তাই ভাবছি দিয়ে দেব। অন্যেরা পড়বে। এ সবের ব্যবহার হবে। ওয়ারড্রবে ঝুলিয়ে রাখার মানে হয় না।
কাকে দেবেন? দাউদ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এমন দৃষ্টিতে তাকায়।
হু, কাকে দেয়া যায়? তোমরা দুই ভাই আমার চেয়ে
লম্বা, তোমাদের সাইজের সঙ্গে মিলবে না। তাই অন্যদের দিতে হবে। এই ধরো আমেনার ছেলেকে। দারোয়ান বরকতকে। ড্রাইভার সালামকে। গ্রামের গরিব আত্মীয়স্বজন যারা আছে, তাদের।
এত দামি দামি কাপড় তাদের দেবেন? বলেন কী?
ওরা এসব কাপড়ের মূল্য বুঝবে? না, না। তা করতে যাবেন না।
তাহলে? পরে থাকবে ওয়ারড্রবে? ধুলো জমবে
তাদের ওপর?। পোকায় কাটবে? এনায়েতুল্লা ছেলের দিকে তাকান।
দাউদ কিছুক্ষণ ভেবে বলে, এক কাজ করা যায়।
বিজ্ঞাপন দিতে পারি। সুট বিক্রি  করা হবে। সেই সঙ্গে অ্যাচ করা শার্ট, টাই। ব্র্যান্ডনেমও বলে দেয়া হবে। শৌখিন লোকেরা আসবে। বিদেশে যেমন হয়, দেখেছেন নিশ্চয়ই। সেই রকম। বারগেইন
সেল। গ্যারাজ সেল।
শুনে তিনি কিছুক্ষণ ভাবেন। তারপর বলেন, না তা করা যাবে না। আমার কাপড় কেনা কে পরে বেড়াবে। তাদের চিনি না, নাম জানি না। এ হতে পারে না। জানাশোনা লোককেই দেব আমার
কাপড়। গ্যারাজ সেল খুবই কমার্শিয়াল। আমি লাভ করার জন্য কাপড় বিক্রি করতে চাই না। জানাশোনা লোক ব্যবহার করলে ভালো লাগবে। মনে হবে আমিই পড়ছি।
দাউদ খুব খুশি হলো না। বললে, ভেবে দেখেন। এখনই সিদ্ধান্ত নেবেন না। রাখতে তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ওয়ারড্রব এখন দুটো। আম্মারটা প্রায় খালি। বলে সে দেয়ালে পাশাপাশি দুটো
আলমারি দেখলো।

একই সাইজের, একই রকমের।
এনায়েতুল্লা বললেন, আমি মন ঠিক করে ফেলেছি। জানাশোনা লোকদেরই দেব। তোমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ থাকলে নিয়ে এসো।
দাউদ বলল, আপনি চাকর-বাকরদেরও দিচ্ছেন শুনলে ভদ্র যারা কেউ আসবে না।

তারপর সে বলে,
আমার বন্ধুদের কেউ কেউ হয়তো পুরনো কাপড় কেনে, কিন্তু প্রকাশ্যে না। তারা আসতে চাইবে বলে
মনে হয় না।
দাউদ চলে গেলে তিনি রাজুকে বলেন, সালামকে ডেকে আন। বরকতকেও। দেখি তাদের কোন কোট ফিট হয়।
রাজু টেবিলের কাপড়ের স্তূপ দেখে নিয়ে বলে, আমার কোনোটা ফিট করব না স্যার?
স্যার বলবি না। বলেছি তোকে। বলবি, নানা।
রাজু বলে, স্যার-  নানা আমার গতরে লাগব না এসব কাপড়?
তিনি হেসে বলেন, না। তোকে আরো বড় হতে হবে। অনেক বড়। যা ওদের দুজনকে ডেকে নিয়ে আয়, দেখি কোনটা কার গায়ে লাগে। আমেনার মায়ের ছেলেকেও ডেকে পাঠাতে হবে। আমেনার
স্বামীকেও।
রাজু ঘর থেকে বের হতে হতে বলে, আহারে। যদি বড় হইতাম। কি সুন্দর সুন্দর কাপড় সব। দেখলেই চোখ জুড়াইয়া যায়।
তিনি পেছন থেকে বলেন, তোকে নতুন কাপড় কিনে দেব। আফসোস করার কিছু নেই। বলে তিনি টেবিলে রাখা কাপড়গুলোর দিকে যান। হাত দিয়ে স্পর্শ করেন একেকটা। মনে করার চেষ্টা করেন
কবে কোনটা কোথা থেকে কিনেছিলেন। কোনটা পড়ে কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন। কিছু মনে আসে, বাকি মনে করতে পারেন না। কাপড় গুলোয় হাত রাখতে থাকেন। স্মৃতি ফিরে আসে টুকরো টুকরো হয়ে ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s