থেকে যাও

theke jao
চল্লিশ বছর আগে এই জায়গা কেমন ছিল, এটা আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না।
এই কথা বলে সেলিম এমনভাবে শোয়েবের দিকে তাকাল, যেন সে খুবই উল্লেখযোগ্য একটা কথা বলেছে। শোয়েব বলল- চল্লিশ বছর আগে আমার জন্ম হয় নাই।
সেলিম বিজয়ীর মতো হাসল- তাইলে, তাইলে বুঝবেন না।
আপনি আছেন না?
কী?
আপনি আছেন। আপনি বুঝিয়ে দেবেন।
আরে, এইটা কি সম্ভব! এইটা কি বুঝান যায়! এই স্টেশনের কথাই ধরেন…।
শোয়েবের সঙ্গে সেলিমের দেখা এই রেলস্টেশনে। এখন স্টেশনের যে মাস্টার, খন্দকার, খন্দকার গত পরশু শোয়েবকে নিয়ে সেলিমের সামনে এসে বলল- আঙ্কেল, শোয়েব ভাইরে একটু টাইম দেন।…শোয়েব ভাই, সেলিম আঙ্কেল এলাকার পুরান মানুষ, এই স্টেশনের তিনি প্রথম মাস্টার। ব্যাপার আছে।
সেলিমের নিজেরও মাঝে মাঝে এ রকম মনে হয়- ব্যাপার আছে।
ব্যাপার নানা রকম। এই স্টেশনের সে প্রথম মাস্টার, এটা একটা ব্যাপার। এই স্টেশন তার চোখের সামনে বদলিয়েছে, এটা একটা ব্যাপার। নিজের এলাকায় না ফিরে সে এই এলাকায় থিতু হয়েছে। এটা একটা ব্যাপার। এই ব্যাপারগুলো তার ভেতর কমবেশি কাজ করে।
খন্দকার বেশিক্ষণ থাকল না। শোয়েবকে প্রায় গছিয়ে দিয়েই সে চলে গেল। শোয়েব বলল, সে একজন সাংবাদিক। অফিস থেকে কাজ নিয়ে সে বের হয়েছে। দেশের পুরনো রেলস্টেশনের ওপর সে লিখবে তার পত্রিকায়। সে এই সুখানপুকুরকেও রেখেছে পুরনো রেলস্টেশনের তালিকায়।
সেলিম বলল- কিন্তু এই স্টেশনের বয়স মাত্র একচল্লিশ। একচল্লিশ পুরা হয় নাই।
শোয়েব বলল- সেইটা জানি।
চল্লিশ- একচল্লিশ বছরের আগের স্টেশনরে পুরান বলবেন। দেশে পুরান স্টেশন।…
জানি। ধরেন সেই ব্রিটিশ আমলেরও আছে।
তাইলে?
এইটা দ্বিতীয় হিসাব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর যেগুলো হয়েছে, সেগুলোও হিসাবে আনব। এইটা তো ধরেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই হয়েছে।
বাহাত্তরের শেষ দিক। আমি জয়েন করলাম তিহাত্তরের প্রথমে।
আপনিই প্রথম?
আমিই।
আপনার কাছে আমার অনেক জানার আছে।
সেলিমেরও এ রকম ধারণা। এই স্টেশন সম্পর্কে কেউ যদি জানতে চায়, তার কাছেই চাওয়া উচিত। এই স্টেশন তার হাতে আর তার চোখের সামনেই বড় হলো। আর সে তো এই এলাকারই হয়ে গেছে। নিজের এলাকা সম্পর্কে সে অনেক কিছুই বলতে পারবে।
সেলিম ঢাকায় থাকত তার খালুর বাসায়। তার মা মারা গেছে তার কৈশোরে। মা মারা যাওয়ার দু-তিন বছর পর তার বাবা হঠাৎ একদিন নিখোঁজ। তার আর কোনো খোঁজ নেই। কোনো কোনো আত্মীয় তাকে জিজ্ঞেস করল, কী রে সেলিম, তোরে কিছু বলে নাই?
কী বলবে?
এই যে সে নাই। তোর বাবায়।
না। কিছু বলে নাই।
সকালে যখন বাইর হইল, তখন বলে নাই কিছু?
সকালে বাইর হয় নাই তো। আমি স্কুলে গেলাম, বাবায় বাসায় ছিল।
অ! আত্মীয়স্বজনকে হতাশ দেখাল। কিন্তু সে না বইলা কোথায় গেল!
এই প্রশ্ন সেলিমকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে, আজও মাঝে মাঝে সে খেয়াল করে, এই প্রশ্ন তার ভেতর থেকে গেছে- তার বাবা তাকে না বলে কোথায় গেল! মায়ের যাওয়াটা সে বুঝতে পেরেছিল, বাবারটা এখন পর্যন্ত কিছুই বোঝেনি।
বাবা চলে যাওয়ার পর খালু-খালার বাসায় তার বড় হওয়া। থাকাটা আনন্দের ছিল না, আবার কষ্টেরও না। তাঁরা ধমকাধমকি করতেন, ভালোও বাসতেন। কিন্তু সেলিমের মন বসত না। তার ওই বাসায় থাকতে ইচ্ছা করত না, আবার কোথায় তার যেতে ইচ্ছা করে, এটাও সে বুঝত না। তবে সুখানপুকুর এসে তার থেকে যেতে ইচ্ছা করল। এই চাকরিটা তার খালুই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তখনকার হিসাবে ঢাকা থেকে সুখানপুকুর বেশ দূরে। কিন্তু সেলিম আপত্তি করল না। ঢাকায় তার কোনো টান নেই। তার বন্ধুবান্ধব নেই তেমন, আত্মীয়স্বজনও কম। খালু যখন তাকে এই চাকরির কথা বলে জিজ্ঞেস করল, যাবা? সে বলল, যাব না ক্যান!
সে সুখানপুকুরে এসে কাজে যোগ দেওয়ার কয়েক বছর পর তার খালুর মৃত্যু, তার পরপর খালার। সুখে-দুঃখে, অবহেলায় বা ভালোবাসায় সেলিমের যেটুকু সম্পর্ক ছিল, এ দুজনের সঙ্গেই ছিল। এরপর সেলিমের আর ঢাকায় যাওয়া হয়নি। ইচ্ছাও হয়নি। সে মনে করে, এই এটাও সে ঠিক করেছে।
শোয়েবও তাকে বলল- এই যে আপনে যান না, এইটাই ভালো হয়েছে।
যায়া কী করব? কেউ নাই।
কেউ থাকুক না থাকুক, পুরান জায়গাগুলো আছে।
তা অবশ্য আছে।
তবে এখন গেলে চিনবেন না। আমার বয়স ৩২। আমি নিজেই কিছুদিন পর ঢাকা শহরের অন্যদিকে গেলে শহর চিনি না।
রোজ একটু করে বদলায়?
সেই রকমই।
আমাদের সুখানপুকুরও বদলায়। এইটা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।
বোঝানোর দরকার নেই। আপনি বলেন। আপনি আপনার মতো বলবেন, আমি আমার মতো বুঝব। পাঠক পড়ে যা বোঝার তার মতো বুঝবে।
তিন হাত?
বুঝতে একটু সময় নিল শোয়েব। বুঝে হাসল, হ্যাঁ, তিন হাত। এখন বলেন, শুরু করেন। এই স্টেশন কত বড় ছিল?

রাকা কম্পিউটার বন্ধ করে দিল। তবে তখনই সে উঠল না চেয়ার থেকে। সে টের পেল, তার ভালো লাগছে না। যদিও ভালো না লাগার কোনো কারণ সে খুঁজে পেল না। কিছুদিন পর, ছোট মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে বাড়িটা খালি হয়ে যাবে বলে? হতে পারে, ভাবতে ভাবতে সে উঠল। নিজেকে বলল, এসব নিয়ে আমার মন খারাপ হয় না, মন খারাপের কারণ অন্য। কারণটা খুঁজে পেলে ভালো হতো। না পাওয়ার কারণে অস্বস্তি।
সপ্তাহ দুয়েক আগে সে হাসনাইনকে ডেকে পাঠিয়েছিল। ডেকে পাঠিয়েছিল মানে মেয়েকে বলেছিল ছেলেটাকে নিয়ে আসতে। তা মাহজাবিন নিয়ে এলো হাসনাইনকে। তাকে দেখে রাকার মেজাজ আরো বিগড়াল। এই ছেলে কোন সাহসে মাহজাবিনের কথা ভাবে! আর মাহজাবিনই বা কী দেখে এই ছেলেকে পছন্দ করেছে। রাগ হলো মাহজাবিনের ওপর, তবে সে রাগ ঝাড়ল হাসনাইনের ওপর- কী করো তুমি?
হাসনাইনের মুখে মুচকি হাসি- আপনি জানেন, মাহজাবিন বলেছে না?
মাহজাবিন বলেছে কি বলেনি, সেটা ব্যাপার না। আমি জিজ্ঞেস করেছি, তুমি উত্তর দেবে।
জি। এখন বলব?
ছেলেটাকে নিতান্তই বেয়াদব মনে হলো রাকার। সে মুখ খুলল। একটানা বলে যখন থামল, দেখল ছেলেটার মুখে সামান্য হাসি, বোঝা যায় কি যায় না, এমন সামান্য। রাকার ইচ্ছা হলো আবার মুখ খোলার। কিন্তু যা বলার সে বলেই ফেলেছে। সে বলল- আমার কথাগুলো মনে রেখো। রাখলে তোমারই উপকার হবে।
জি। আপনি যা বললেন, মনে রাখব। হাসনাইন মাথা কাত করল।
এসব কথা পারসোনালি নেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু এটা তো বুঝতে পারছ, তুমি আর মাহজাবিন এক জায়গায় বিলং করো না।
জি না, তা করি না।
ঠিক আছে, এখন যাও তুমি। তোমার জন্য বেস্ট উইশেস।
ধন্যবাদ। যাওয়ার আগে দুটো কথা বলা যাবে?
যাবে।
বলো।
এই যে আপনি আমাকে এতগুলো কঠিন কঠিন কথা বললেন, ওসব বলে এখন আপনার খারাপ লাগছে না?
রাকা রেগে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলাল- আমি তোমাকে একটাও অপ্রাসঙ্গিক কথা বলিনি। যা বলেছি তা তোমার শোনা, জানা ও মানা দরকার বলেই বলেছি।
তাহলে আপনার মন খারাপ হয়নি?
না। মন খারাপ হয়নি।
আমি যদি কাউকে রাগের মাথায় কঠিন কথাও বলে ফেলি, পরে মন খারাপ হয়।
ঠিক আছে। যাও এখন।
দ্বিতীয় কথাটা…। আমি কি চলে যাওয়ার আগে বারান্দায় বসে মাহজাবিনের সঙ্গে এক কাপ চাপ খেয়ে যেতে পারি?
নিজেকে সামলাতে রাকা কিছুটা সময় নিল, ঠাণ্ডা গলায় বলল- চা খেয়ে বিদায় হও।
রাকার কখনো মনে হয়, ইদানীং এই যে মাঝে মাঝে তার মন খারাপ হয়, এটার পেছনে ওই ছেলেটা আছে। ওই যে ছেলেটা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল- আপনি আমাকে এত এত কঠিন কথা বললেন, ওসব বলে এখন আপনার মন খারাপ হচ্ছে না? না, ছেলেটাকে অত সব কথা বলার কারণে তার মন খারাপ হয় না। হবেও না, সে জানে। তার মন খারাপ হয় ছেলেটা তাকে অমন একটা প্রশ্ন করেছিল বলে। ছেলেটার বেয়াদবির জন্য না, খোঁচা মারার চেষ্টার জন্য না। যেন প্রশ্নটা করে মজা করছে, এর জন্য, তবে প্রশ্নটার জন্যও না।
ছেলেটা বিদায় নিলে সে মাহজাবিনকে নিয়ে পড়েছিল কিছুক্ষণের জন্য- তোমাকেও কি আমার কিছু বলতে হবে?
মাহজাবিন মাথা নাড়ল- বলেছ তো।
আবার বলার দরকার আছে কি না, ভাবছি।
শোনো না, তোমার যদি মনে হয় আবারও আরো বলার দরকার আছে, বলতে পারো। তবে আমার মনে হচ্ছে দরকার নেই।
তোমার বয়স কম।
এমন কোনো কম না। আমার বয়স হয়েছে। বেশ বয়স হয়েছে।
এ বয়সে কাউকে হঠাৎ ভালো লাগতেই পারে।
আহা মা…।
কিন্তু ভেবে দেখতে হয়- এখন ভালো লাগলেও সংসারজীবনে এই ভালো লাগাটা থাকবে তো? ভালো লাগা আর সংসার করা এক জিনিস না।
মা, তুমি তো তোমার ভালো লাগার মানুষের সঙ্গে দিব্যি সংসার করে গেলে।
কী ভয়ংকর কথা! তোর আব্বা আর ওই ছেলে এক হলো?
মেপে দেখিনি। বলতে পারব না। আমি একটা উদাহরণ দিলাম মাত্র।
কোথায় তোর আব্বা…।
তোমরাও প্রেম করে বিয়ে করেছিলে, বয়স কম… আব্বা তেমন কিছু করেন না…।
তুই কী বলতে চাচ্ছিস?
মা, এ বয়সেও তোমার চেহারায় এত মায়া, কিন্তু তোমার কথা…মাশাল্লাহ…। তোকে এত করে বোঝানো কী বৃথা গেল!
মাহজাবিন তখন হাসল- একটুও বৃথা যায়নি মা। তুমি সাকসেসফুল। আমি সত্যি বলছি, হাসনাইনকে নিয়ে আমার একটুও মাথাব্যথা নেই। তুমি নিশ্চিত মনে আপার সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে পারো।…এখন ফোন করবে সাজরিনকে?
সাজরিনের সঙ্গে তার কথা নিয়মিত হচ্ছে। এমনিতেও হতো। বড় মেয়ে বলে কথা। বিয়ের পর থেকে আছে আমেরিকার ডেনভারে। ছেলে বেশ অনেক দিন হলো ওখানে। ভালো চাকরি করে, আবার একটা ড্রাগ স্টোরও আছে। লেখাপড়া জানা ছেলে, পয়সাও অনেক, এমন একটা ছেলের কথা মুখ ভরে বলতেও আনন্দ।
তা, মাহজাবিনের জন্য প্রস্তাবটা সাজরিনই আনল। এক দুপুরে ফোন- মা, জরুরি কথা আছে।
রাকা বলল, এত রাতে! তুই এখনো জেগে আছিস! খারাপ কিছু?
আরে না মা। আজ কী বার, খেয়াল করো। আমাদের পার্টি চলছে।
খুব মজা করছিস? সেবার তো দেখলাম তোদের হুল্লোড়।
হুঁ, মজা হচ্ছে।…একটা দরকারি কথা আছে। মাহজাবিনের বিয়ের কথা ভাবছ?
ভাবছি। ওর বিয়েটা হয়ে গেলে বাঁচি। ওর মাথায় ছিট আছে।
এখানে একটা ছেলেকে আমার আর দাস্তগীরের খুব পছন্দ হলো। ওই ছেলেটার কথা একটু কি বলব তোমাকে?
তো, এখন ওই ছেলের সঙ্গেই মাহজাবিনের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। রাকা তার অভিজ্ঞতায় দেখেছে, সেটেলড ম্যারেজ দুভাবে হয়। হয় হুট করে, না হয় সময় নিয়ে। এটা সময় নিচ্ছে। নিক। তাদেরও তাড়া নেই কোনো। তবে তাড়াতাড়ি হয়ে যাওয়াটা ভালো। হয়ে গেলে সে আর ইমাম হাত-পা ঝাড়া। তখন তাদের তিন ছেলেমেয়েই বিদেশে। তখন তারা পালা করে এর এখানে, ওর ওখানে গিয়ে থাকবে। তার আসলে বেশিটা সময় বিদেশেই থাকার ইচ্ছা। এখানকার মতো স্যাঁতসেঁতে জীবন না। ইমামের সঙ্গেও তার এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তারা বাইরে বাইরেও থাকবে। এই, হঠাৎ কখনো দেশে এসেও কিছুদিন থেকে যাবে।

ফারুকের ডাক শুনে হাসনাহেনা ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। ফারুক গেটের কাছে। তার পরনে নতুন পাঞ্জাবি, হাতে একটা প্যাকেট। সে বলল- কই, সেলিম কই?
সেলিম কই?…ফারুক ভাই, আপনে বড় হইবেন না?
এইটা কী বলো! আমি আবার কী করলাম?
আপনার বন্ধুর খোঁজে আসছেন?
এক সপ্তাহ সেলিমের সঙ্গে দেখা নাই। ছিলাম না।
কিন্তু গেটের কাছে আইসা আপনে আমার নাম ধইরা ডাকলেন…!
অ।…সেইটা ব্যাপার না হেনা। ডাকলেই হইল। সেলিম কই?
সে কই, এইটা আপনে জানেন না? এই সময় সে কই থাকে?
তার জন্য একটা পাঞ্জাবি আনছিলাম।
আমার জন্য তো কিছু আনেন নাই।
ফারুক একটু হাসল, লাজুক হাসি, একবার ভাবলাম কিনব।
আপনি ভাবতে ভালোবাসেন। ভাবেন কিন্তু করেন না।
ফারুকের মুখে বোকা বোকা হাসি। সে পাঞ্জাবির প্যাকেটটা একবার তুলে ধরল।
যান, বন্ধুর কাছে যান। তারে দেন গিয়া।
যাব?
তো কী করবেন?
আচ্ছা যাই। ফারুক একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে আরম্ভ করল। দরজা বন্ধ করতে গিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকল হাসনাহেনা। একটু নুয়ে পড়েছে ফারুক, হাঁটছেও ধীরে। হাসনাহেনার হঠাৎ এ রকম ভেবে খুব অবাক লাগল।
কী করে কী করে তাদের সবার কত বয়স হয়ে গেল!
দরজা বন্ধ করতে সে সময় নিল। ফারুককে দেখা যাচ্ছে না, ফারুককে দেখার ইচ্ছা তার করলও না। তবে খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভালো লাগল। কিছুক্ষণ পর সে সামনের বাগানে নামল। ফুলের বাগান। সব গাছে ফুল নেই। এদিক-ওদিক কিছু ফুটে আছে। ফুটে থাকা সেসব বাগানের জৌলুস বাড়ায়নি। এখন এ বাগানের পেছনে তেমন সময় দেওয়া হয় না। একসময় সে আর সেলিম দুজন মিলে বাগানের যত্ন নিত। এখন সেলিম সময় দেয় না, সে মাঝে মাঝে ভাবে দেবে, দেওয়া হয় না।
পাশের বাড়িটা তাদের ছেলে ফয়সালের। এই ব্যবস্থা ফারুকই করেছে। বিয়ের পর সে-ই আলাদা করে দিয়েছে ছেলেকে। হাসনাহেনাকে সে বলেছে- এইটাই ভালো ব্যবস্থা। ছেলের বউ ঝামেলা করতে পারবে না।
তুমি ধরেই নিতেছ ছেলের বউ ঝামেলা করবে?
তুমিও ছেলের বউয়ের সঙ্গে ঝামেলা করতে পারবা না।
আমি…তুমি ভাবো আমি ঝামেলা করব!
ধরো, আমিও করতে পারি। আলাদা থাকা ভালো।
ছেলে ফয়সাল আর ছেলেবউ নিশাত আলাদা থাকে। ছেলে অবশ্য থাকে ঢাকায়। তার চাকরি সেখানে। মাসে দু-তিনবার আসে। বাকি সময় নিশাত একা। এতে অবশ্য সমস্যার কিছু নেই। একে তো পাশাপাশি বাড়ি, তা ছাড়া এ গ্রামের সবাই তাদের চেনা। সে এ এলাকার মেয়ে। তার বাবার প্রতাপ কমতে কমতে এখনো কিছুটা আছে, আর ফারুক এ এলাকার না হলেও সে বেশ আগেই এখানকার হয়ে গেছে।
হাসনাহেনা বাগান থেকে ঘরে ফিরে গেল। এ রকম একটা চিন্তা তার মাথায়- সে ফারুককে বলবে, ফারুক রাজি না হলে বা গাঁইগুঁই করলে বা রাজি হয়েও সময় না দিলে সে একাই বাগানের পেছনে কিছু কিছু সময় দেবে। সারা দিন তার আর কী কাজ! তার কোনো কাজ নেই। সেলিমও বাসায় থাকে না। সকাল-বিকাল দুবেলা স্টেশনে না গেলে তার চলে না। সে বহুবার জানতে চেয়েছে- স্টেশনে এত কী, এত কী!
সেলিম বলেছে- বুঝবা না।
বুঝাও।
আরে, এইটা বুঝা তো সহজ।…ধরো, এইটা হইলো অভ্যাস।
বাড়িতে থাকা কি অভ্যাস না? তোমার বাড়িতে থাকা অভ্যাস না?
বাড়িতে থাকি না! কী বলো! হিসাব করো।
হাসনাহেনা হিসাব করে দেখেছে- বাড়িতে থাকা সেলিমের অভ্যাস না, তার রেলস্টেশনে থাকা অভ্যাস। সে ফারুককে বহুবার বলেছে- চাকরিটা ছাড়লা ক্যান!
এই চাকরি তোমার ছাড়া উচিত হয় নাই।
ছাড়ায়া দিল যে! তবে এইটাই ভালো। তখন দায়িত্ব ছিল, এখন নাই।
দায়িত্ব নাই বইলা স্টেশনে গিয়া বইসা থাকো!
বইসা থাকি। তুমি এইটা বুঝবা না হেনা। অভ্যাস, ট্রেন থামে, মানুষ নামে, ট্রেন যায়, মানুষও যায়। আসা-যাওয়া দেখতে ভালো লাগে। বুঝবা না।

সেলিম দূর থেকে ফারুককে দেখতে পেল। মুখ নিচু করে মৃদু পায়ে হেঁটে আসছে। ফারুককে দেখে তার মুখে হাসি ফুটল, সে তাকাল শোয়েবের দিকে- আমার এক বন্ধু আসতেছে। ওই যে, দেখেন।…না, ওই যে নীল পাঞ্জাবি। মুখে দাড়ি।…আন্দাজ করেন।
কী আন্দাজ করব? শোয়েব অবাক গলায় জানতে চাইল।
মানুষটা কেমন? এইটা আন্দাজ করেন।
শোয়েব অল্পক্ষণ তাকিয়ে বলল- আল্লাওয়ালা লোক।…
আল্লাওয়ালা?
ফারুক হাসল, মুখে দাড়ি, পরনে পাঞ্জাবি, তাই আল্লাওয়ালা? অবশ্য ভুল বলেন নাই, ফারুককে আল্লাওয়ালা। তবে তার হিস্টোরি আছে।
শোয়েবকে উৎসাহী দেখাল না- আচ্ছা।
বলব একসময়। সেলিম বলল। সুখানপুকুরে সে আমার পুরান বন্ধু।
দূর থেকে সেলিমকে দেখতে পেয়ে ফারুক হাত তুলল। তার মুখে হাসি। এগোতে এগোতে সে গলা তুলে বলল- ফিরছি।
গেছিলা?
দুই-তিন দিন ছিলাম না। খেয়াল করো নাই?
সেলিম ফারুকের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সে তাকিয়ে থাকল ফারুকের দিকে। ফারুক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে কাছে চলে এসেছে, কাছে এসে সে শোয়েবকে দেখতে পেয়েছে। সেলিমের পাশে আরেকজন এবং তাকে সে চেনে না। দূর থেকেও সে এমনই দেখতে পেয়েছিল, তবে গুরুত্ব দেয়নি। স্টেশনে, যদিও সেলিম একাই থাকতে চায়, সে জানে, তবে তার পাশে কেউ থাকতেই পারে। কিন্তু একদম অচেনা মুখ দেখে ফারুকের সহজ ভাবটা থাকল না। সেলিম বলল- ফারুক, আসো, তোমারে পরিচয় করায়া দেই। এনার নাম শোয়েব। উনি সাংবাদিক। আমাদের এই স্টেশনের ওপর লেখবেন।
এইটা তো আমাদের স্টেশন না। ফারুক বলল। এই স্টেশন তোমার।
ফারুকের এই কথায় সেলিম হাসতে আরম্ভ করল- এইটা ঠিক এইটা ঠিক। শোয়েব ভাইকে আমি সেই গল্পই বলতেছিলাম।
কিন্তু এই স্টেশন নিয়া তিনি কী লিখবেন? মানে আমি বলতে চাই, এইটা নিয়া লেখার কী আছে!
আছে। শোয়েব বলল। আমি পুরনো দিনের রেলস্টেশনে নিয়ে লিখছি। ধরেন, একটা স্টেশন যত পুরনো হয়, তত তার গল্প বাড়ে। এই গল্পগুলো লিখব। আর এই স্টেশনটা কবে হলো, কী রকম ছিল, একটু একটু করে কিভাবে বড় হলো, এসব।
ওহ্। সেলিম আপনারে এসব বলতে পারবে।
তুমিও পারবা। তুমি আর আমি এখানে বসে কত গল্প করছি। সেসব দিনের কথা মনে হইলে ফারুক, মাঝে মাঝে বড়ই উতলা হই।
ফারুক মাথা ঝাঁকাল- কথা মিথ্যা না।…সেলিম, তোমার জন্য একটা পাঞ্জাবি আনছিলাম।
পাঞ্জাবি আনছ কেন?
পরবা।
পরব, তা বুঝতেছি। কিন্তু আনলা ক্যান?
কী আশ্চর্য!
এইবার কিনলা?
হুঁ। ফারুককে দেখে মনে হলো সে আলোচনা চালিয়ে যেতে চাচ্ছে না।
কতদূর গেছিলা?
ফারুক পাঞ্জাবির প্যাকেট সেলিমের কোলের ওপর রেখে দূরে তাকাল- তোমরা কথা বলো। আমি আসতেছি। সে শোয়েবের দিকেও একবার তাকাল- আসতেছি।
ফারুক হাঁটতে আরম্ভ করলে সেলিম তাকিয়ে থাকল, ফারুক বেশ কিছুটা দূরে চলে গেলে সেলিম চোখ ফেরাল কোলের ওপরে পরে থাকা পাঞ্জাবির প্যাকেটের দিকে। প্যাকেটটা সে কোল থেকে উঠিয়ে পাশে রাখল- শোয়েব ভাই।…
আপনার বয়স আটষট্টি।
আটষট্টি।
আমার ঊনত্রিশ। আমি ঊনত্রিশবার আপনাকে বলেছি আমাকে ভাই বলবেন না।
ভাই যে বলি, এইটার সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নাই। এইটা সম্মান।
আমি এমন কিছু করিনি, এমন কিছু হইওনি। আমাকে সম্মান করার কোনো কারণ নেই। আমাকে আর ভাই বলবেন না। শুধু শোয়েব বলবেন। তুমি বললে আরো খুশি হব।
জি শোয়েব ভাই…।
শোয়েব হাসল, সেই হাসি সেলিম খেয়াল করল না। সে বলল- আপনার বুদ্ধির পরীক্ষা নিব।
আমার বুদ্ধি কম। সবাই জানে, আমি নিজেও।
এই যে ফারুক, সে আমার পুরান বন্ধু, আমার জন্য সে পাঞ্জাবি আনছে, আনতেই পারে, কিন্তু পাঞ্জাবি সে ক্যান আনছে, এইটা বলতে পারবেন?
পাঞ্জাবি কেন আনে কেউ? আর উনি বললেই আপনি পরবেন বলে এনেছেন।
এর মধ্যে ব্যাপার আছে। এইটাই আপনার পরীক্ষা।
আমি পারব না।…আমরা আমাদের কথায় যাই?
বলছিলাম না হিস্টোরি আছে? ফারুক মাঝে মাঝে রওনা দেয়।
শোয়েবকে কিছুটা উৎসাহী দেখাল- রওনা দেয় মানে!
ধরেন, সে স্টেশনে আসে, চুপ কইরা বইসা থাকে। বইসা থাকতে থাকতে হঠাৎ কোনো ট্রেনে উইঠা বসে।
তারপর যায়।
কোথায়? শোয়েব কৌতূহল নিয়ে তাকাল।
সেইটা ঠিক নাই। সে যায় আর কী! কিন্তু সে আসলে যাইতে পারে না। সে হঠাৎ কোথায় নাইমা পড়ে। তার যে যাওয়া হয় নাই, সে যে ফিরা আসছে- এই পাঞ্জাবি হইল গিয়া তার প্রমাণ।
আশ্চর্য তো!
এইটা আশ্চর্যই।
কিন্তু উনি যেতে চান কোথায়?
এইটা তো নিশ্চিত না। এইটা নিশ্চিত বলা কঠিন, কোথায় সে যাবে না।
মানে! আপনি, আপনারা জিজ্ঞেস করেননি?
এইটা ধরেন সে নিজেও ঠিক জানে না, তবে তার যাওয়ার ইচ্ছা।
মজার মানুষ।
শোয়েব ভাই, রেলস্টেশন এই রকমই। এইখানে কত ব্যাপার, কত ঘটনা।
ঘটনা শুনব। শোয়েব বলল, ঘটনা শুনব, তার পরপরই তার ফোন এলো। সে স্ক্রিনে নম্বর দেখে নিয়ে একটু হাসল- আমি ভেবেছিলাম তোমার রাগ পড়তে আরো সময় লাগবে।
রাগ? না তো। তোমার মধ্যে যদি মানুষ মানুষ কিছু ব্যাপার থাকত, রাগ করা যায় কি যায় না, ভাবতাম। কিন্তু তুমি হচ্ছো ওরাংওটাং, তোমার ওপর রাগ করা অর্থহীন।
আমি ওরাংওটাং?
কেন, তুমি কি বেবুন?
তোমার এই আদরের ডাকগুলো আমার খুব ভালো লাগে।
তোমার গলার দড়ি তোমাকে কোথায় টেনে নিয়ে গেছে?
আমি এখন সুখানপুকুর।
থেকে যাবে ভাবছ?
জায়গাটা পছন্দ হয়েছে।
থাকো তাহলে।
আমি রেস্ট হাউসে ফিরে তোমাকে ফোন দিচ্ছি।
দিতে পারো। ইচ্ছা করলে কথা বলব।
শোয়েবের মুখ কিছুক্ষণ হাসিতে ভরে থাকল। সে যখন মুখ তুলল, দেখল সেলিম সামান্য হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে- মনের মানুষ?
মাথা ঝাঁকাল শোয়েব- হুঁ।…আমরা যেন কী কথা বলছিলাম।
কথা শুনে মনে হলো, আপনাদের সম্পর্কটা মজার।
মজার। আমরা খুব ইয়ার্কি মারতে ভালোবাসি।
আমি একটা ব্যাপার খেয়াল করি- সম্পর্কের ধরন বদলে গেছে।
কী রকম? শোয়েবের জানার ইচ্ছা হলো।
আমাদের সময় সম্পর্ক ছিল গম্ভীর, চাপা। এখন একটু ইয়ার্কি ইয়ার্কি…।
হুঁ।
ভালোবাসা কইমা গেছে, এইটা বলি না, তবে এখন ভালোবাসা কতটা গভীর, এইটা বুঝিও না। না…ভাই, আপনি রাগ করলেন?
না। কারণ আমাদের ভালোবাসা অনেক গভীর, এটা আমি জানি।
শুধু প্রকাশ ভিন্ন?
শোয়েব হাসল- সব কিছু বদলাচ্ছে না?
বুঝলাম। বিবাহের পর তাকে নিয়া এইখানে বেড়াইতে আসবেন। দাওয়াত থাকল।
যদি বিয়ে হয়। নাও হতে পারে। কারণ তার অন্য জায়গায় বিয়ের কথাবার্তা চলছে।
সেলিম নড়েচড়ে বসল- এই কথা আপনি এত সহজে বললেন!
কারণ কথা সত্য। সত্য কথা সহজে বলা ভালো।
কথা যদি সত্যও হয়, কথা খারাপ। খারাপ কথা এইভাবে বলে?
বাদ দেন। কথার কথা বলেছি।…আমরা কী বলছিলাম?
ফারুকের কথা। ফারুক আসলে কোথায় যাইতে চায়…।
না, তারও আগে।
এই স্টেশন। এই স্টেশনের কথাই শুধু ক্যান বলি। আপনি তো স্টেশনে স্টেশনে ঘুরলেন, অনেক স্টেশন দেখলেন। যদি থিতু হইয়া বসতেন, বুঝতেন- স্টেশন হইল অদ্ভুত- এইখানে আপনি যাওয়ার জন্য আসতেও পারেন, এইখান থেইকা আপনি যাইতেও পারেন। স্টেশন হইল যাওয়া আসার ব্যাপার, থাকার না। স্টেশনে শুধু স্টেশনই থাকে, আর কিছু থাকে না।

মাহজাবিনের মনে হলো, হাসনাইনের সঙ্গে সে যদি এখন সুখানপুকুর থাকত, তার ভালো লাগত। বাসায় তার কিছুই করার নেই। আজ সে অফিসেও যায়নি। অফিসটা যদি তাদের নিজেদের না হতো, তবে অবশ্য এখানে হুটহাট না গিয়ে পারা যেত না। নিজেদের বলে সে যদি দেখে তার একটু একটু ইচ্ছা করছে না, সে যায় না। এই নিয়ে বাবা রাগারাগি করেন- তোর কি কাজ শেখার ইচ্ছা নেই?
আমাকে দিয়েছ এমন কোন কাজটা ফেলে রেখেছি বাবা, বলো?
সেটা বুঝলাম। কিন্তু অফিসে যাওয়া একটা অভ্যাসের ব্যাপার। অভ্যাসটা রাখতে হয়।
ঠিক আছে বাবা, কাল থেকে নিয়ম করে।
জানি, কত রেগুলার হবি। তোর মা-ও কেন তোকে এটা নিয়ে কিছু বলে না, বুঝি না।
এই প্রশ্নটা মাহজাবিনেরও। মা উঠতে বসতে পাশ ফিরতে তাকে নিয়ে আছে- এটা কেন করলি, ওটা কেন করলি না। এই ড্রেসটা তোকে মানাচ্ছে না। চুলটাও ঠিকমতো আঁচড়াসনি। তোর দেখি আমার কোনো কথাই শুনতে ইচ্ছা করে না। আমি তোর মা, না…।
দুশমন।
কী?
মা না, দুশমন।
মানে!
বায়েজিদকে বলল এই নামে ও যেন একটা সিনেমা বানায়- মা না, দুশমন; হিট হবে।
তোর সঙ্গে কথা বলা আর কেউটের সঙ্গে কথা বলা একই কথা।
তা, মা তার অফিস না যাওয়া নিয়ে কিছু বলে না। তার চেঁচানোর কথা, ঠেলে অফিসে পাঠানোর কথা, খুব রেগে যাওয়ার কথা, একটু ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার কথা- তোর বাবার বয়স হলো প্রায় সত্তর। এই মানুষটাকে একটু রেস্ট দিতেও ইচ্ছা করে না?
মা-র মধ্যে এই ব্যাপারটা নেই- ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল। তার যা কথা, তা সরাসরি। বাবার রেস্ট নিয়েও তার মাথাব্যথা নেই। বরং তার ভাবনাটা এ রকম, মাহজাবিন জানে- কাজের মধ্যে থাকলেই ফিট থাকা। কাজ নেই বয়সের সমস্যাগুলোর নড়েচড়ে ওঠা।
সে যা-ই হোক, ইচ্ছা হলেই সে যে অফিসে যায় না, এটা নিয়ে মা তাকে কিছু বলে না। না, বলুক। বরং সে এখন মাকে গিয়ে বলতে পারে- একটা কথা মা। একটু সুখানপুকুর যেতে চাচ্ছি।
মা নিশ্চয়ই বুঝবেন না, মা নিশ্চয়ই অবাক হবেন- সুখানপুকুর! সুখানপুকুর মানে কী!
এটা একটা জায়গার নাম মা।
ওহ্। তা, ওখানে যাবি মানে!
দেখব, পুকুর কতটা শুকাল।
আবার ইয়ার্কি মারতে এসেছিস!
তাহলে সত্যি কথাটা বলি। হাসনাইন গেছে ওখানে।
তো? হাসনাইন গেছে তো তোর কী তাতে?
ও বলল জায়গাটা খুব সুন্দর। আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।
জাবিন, তুই সর তো আমার কাছ থেকে। যা, সর।
সুখানপুকুর যাব তাহলে?
খবরদার!
দেখো মা, তোমার পছন্দের পাত্রের সঙ্গে আমি কি বিয়েতে রাজি হইনি?
হবি না কেন! পাত্র কতটা ভালো, এটা না বোঝার কিছু নেই।
বুঝেছি বলেই রাজি হয়েছি। তাই বলে সুখানপুকুর যেতে পারব না?
জ্বালাস না জাবিন। সর আমার সামনে থেকে।
মাহজাবিন জানে, মা-র সঙ্গে কথাবার্তা এমনই হবে। মা-র রাজি হওয়ার কোনো কারণ নেই, মা রাজি হবে না। এমনকি সে যে সত্যিই যেতে চাচ্ছে, ইয়ার্কি মারছে না, এটাও মা বুঝবেন না। আচ্ছা, তার ইচ্ছা করছে- এই কারণে সে কি নিজেই চলে যেতে পারে না? সে তো বাচ্চা নয়, সব ব্যাপারে মা-বাবার অনুমতি নিতে হবে। এখন সে যা করতে পারে, হাসনাইনকে ফোন করে সে জেনে নিতে পারে হাসনাইন ওখানে কত দিন থাকবে, যদি আরো কয়েক দিন হয়, তবে ওখানে যাওয়ার পথটা সে জেনে নেবে, খুব সাধারণ ভঙ্গিতে, হাই তুলতে তুলতে সে জেনে নেবে যেন হাসনাইন কোনো সন্দেহ না করে। তারপর ব্যাগ গুছিয়ে সে বের হয়ে পড়বে। হাসনাইন কি তাকে দেখে খুব অবাক হবে- তুমি, মানে মাহজাবিন, তুমি!
আর কদিন পর বিয়ে, তোমার সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে যেতে এলাম।
ভালো করেছ। খুব ভালো করেছ।
ভালো না ছাই! লোকজন শুনলে আমাকে খারাপ বলবে। বিয়েটাও ভেঙে যেতে পারে।
তাহলে তো বাজে একটা ব্যাপার হবে।
হুঁ। কারণ এমন নয় যে ওই লোককে বিয়ে করতে আমি চাই না।
কী করবে তাহলে? ফিরে যাবে?
তুমি বলো, ফিরে যাওয়া উচিত না?
মাহজাবিন ভাবল, এই প্রশ্ন, তার ফিরে যাওয়া উচিত কি না, সে শুধু হাসনাইনকে করবে না। তার যার সঙ্গে বিয়ে প্রায় ফাইনাল, তাকেও করবে। লোকটার নাম সানি। মাহজাবিন তার কয়েকটা ছবি, তার বড় বোনের বাসায় পার্টির ভিডিও দেখেছে। কথাও হয়েছে একদিন। কথা বলে মাহজাবিনের ভালো লেগেছে। গুছিয়ে কথা বলে, কণ্ঠস্বর সুন্দর। তবে মাহজাবিনের সবচেয়ে বেশি যেটা পছন্দ হয়েছে- মানে তার সঙ্গে সীমানা বজায় রেখে কথা বলেছে। লোকটাকে তাই তার স্থির ও সংহত মনে হয়েছে। এ রকম একটা লোককে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করা যায়।
মাহজাবিন তাকে বলল- আপনার সঙ্গে একটা পরামর্শ ছিল।
হ্যাঁ, বলুন। শুনছি।
আপনার যা মনে হবে, তা-ই বলবেন। আমাকে খুশি করার দরকার নেই।
আমার যা মনে হবে, আমি তা-ই বলব।
আমি একটু সুখানপুকুর যেতে চাচ্ছিলাম…।
সুখানপুকুর কী, আমি তা জানি না। বুঝতে পারছি ওটা একটা জায়গা। কিন্তু আপনি যাবেন…আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন!
কারণ ওখানে এখন হাসনাইন আছে।
হাসনাইন কে?
এই এটাই হলো প্রশ্ন। হাসনাইন কে। হাসনাইন আমার প্রেমিক।
ও।…জানলাম হাসনাইন আপনার প্রেমিক।
হাসনাইন সুখানপুকুর গেছে অফিসের কাজে। আর ও গেছে শুনে আমারও খুব যেতে ইচ্ছা করছে।
এখানে আমার ভূমিকাটা ঠিক বুঝতে পারছি না।
আপনার ভূমিকা পরামর্শকের। আপনি বলবেন- যেতে ইচ্ছা করছে বলেই আমার যাওয়া উচিত হবে কি হবে না।
আপনার যদি ইচ্ছা হয় তবে যাবেন। ইচ্ছার মূল্য অনেক।
না, ভুল বললেন। ইচ্ছার মূল্য অনেক না। অনেক সময়ই ইচ্ছার কোনো মূল্যই নেই।
আমি আমার ইচ্ছাটাকেই জোর দিই।
আপনার সব ইচ্ছাই কি তবে বাস্তবায়িত হয়?
তা হয়তো না। কিন্তু আবারও বলি, ইচ্ছা আমার কাছে মূল্যবান। আপনি সুখানপুকুর যান।
ভেবে দেখুন, আপনার সঙ্গে বিয়ের পর হাসনাইন কিন্তু আমার প্রেমিক থাকবে না, প্রাক্তন প্রেমিক হয়ে যাবে।
তাই কি? অনেক সময় প্রাক্তন হয় না।
কিন্তু আমি থাকব আমেরিকায়, ও এখানে। এত দূরত্বে প্রেম হয় না। আমি, থাকুক মাঝে অসীম দূরত্বজাতীয় প্রেমে বিশ্বাস করি না।
বেশ। তাহলে তখন আপনার নতুন জীবন শুরু হবে।
আগের যা কিছু ধুয়েমুছে যাবে?
তা হয়তো যায় না, তবে চাপা পড়ে যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী সেটা থাকে।
আপনি বুদ্ধিমান।…যাব তাহলে?
আপনি জানেন।
আপনার খারাপ লাগবে না?
আমি জানলাম বলে কিছু খারাপ লাগতেও পারে। আমাকে না বললেই হতো।
মানে, আপনি ভালো। আমি আপনার মতো পরিষ্কার ও স্পষ্ট মানুষ পছন্দ করি।

একবার একটা মেয়ে এসেছিল। সেলিম বলল। এই কথা বলে সেলিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তার মনে হলো। মনে হলো সে দুপুরবেলা ভরপেট নেশা করেছে। আজ দুপুরে, বহুদিন পর তার সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেছে। তার মনে হলো, ঠিক এইভাবে বলা উচিত হচ্ছে না, এই যে সে বলল- বহুদিন পর সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেছে- এটা ঠিক না, মনে তার পড়েই, প্রায় রোজই, তবে আজকের ব্যাপারটা অন্য রকম। শোয়েব তাকে জিজ্ঞেস করল- আর কিছু বলবেন? ধরেন, আমি জানতে চাইনি কিন্তু আপনার মনে হচ্ছে জানানো উচিত।
শোয়েবের কথা শুনে সমস্যায় পড়ল সেলিম। কী সে বলবে, তার আগে না তার বুঝতে হবে কী বাদ পড়ল, তা, কী বাদ পড়ল কী পড়ল না, এটা সে কী করে বোঝে! সে বলল- এইটা তো আমি বলতে পারব না শোয়েব ভাই।
কোনো ঘটনার কথা বলেন।
ঘটনা?
কত ঘটনা না এখানে? এখানে কত কী দেখেছেন না? এমন কত কী যা দেখবেন ভাবেননি, কিংবা এমন ঘটনা যা ঘটতে পারে ভাবেননি।
চুপ করে থাকতে থাকতে হাসিতে মুখ ভরে গেল সেলিমের- তা তো আছেই।
তেমন কোনো ঘটনার কথা বলেন। পাঠক পড়ে মজা পাবে।
পাঠক?
আমার পাঠক নিয়েই কাজ।
হ্যাঁ।…একবার একটা মেয়ে এসেছিল। এটুকু বলেই সে চুপ করে গেল। তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল, তার মনে হলো দুপুরবেলা সে ভরপেট নেশা করেছে। তার অবশ্য নেশা করার অভিজ্ঞতা কম, কখনো ফারুক তাকে জোর করে নিয়ে গেছে, সে যত না নেশা করেছে তার চেয়ে বেশি ফারুকের পাশে বসে থেকেছে। ফারুক বলত- তুমি এইটার মজা বুঝলা না।
শোয়েবকে, একবার একটা মেয়ে এসেছিল বলে ফেলে সেলিমের মনে হলো- ফারুকের কথা ঠিক না, সে নেশার মজা বুঝতে পেরেছে। সে চোখ তুলে দেখল। শোয়েব তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাই দেখে সে আবার বলল- একবার একটা মেয়ে এসেছিল।
ঘটনা আছে তো?
ঘটনা আছে। সেলিম একটু লাজুক হাসি হাসল।
বলেন।…পাঠক মজা পাবে তো?
পাঠক? সেলিমকে এবার কিছুটা দ্বিধান্বিত দেখাল।
হুঁ, পাঠক। বললাম না আপনাকে!
সেলিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল- ভাই, এটা আমার নিজের ব্যাপার।
বড় কোনো ব্যাপার?
বড় বললে বড়।…আমি তো জানি আমার কাছে কত বড়।
শোয়েব একটু ইতস্তত করল- দেখুন, আসলে পাঠকের ভালো লাগবে কি না, সেটাই বড় কথা।
একটু ম্লান হলো সেলিম- বুঝতেছি।…ঘটনাটা বড়। অনেক বড়।
শোয়েব হাসল- বলেন।
সেলিম একটু মাথা চুলকাল, ভাবল, বলল- না, থাক।
কেন! আপনিই না বলতে চাচ্ছিলেন।
নাহ্, এইটা পাবলিকের না। এইটা আমার।
বুঝলাম। অনেক সময় কারো একার কিছু অনেকের হয়ে ওঠে।
না, না, এইটা আমার।
কিন্তু ঘটনা এই এখানের, এই স্টেশনের, তাই না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই তো এখানের। তখন অবশ্য এই স্টেশন ছিল ছোট, চুপচাপ…ট্রেন আসত একটা দুটা…।
বলেন।
সেলিম চুপ করে থাকল।
বলেন। আপনার বলতে ইচ্ছা করছে।
সেলিমের মুখ মুহূর্তের মধ্যে হাসিতে ভরে গেল- আপনি বুঝলেন কী করে আমার বলতে ইচ্ছে করতেছে?
মনে হলো। আপনার চেহারা দেখে মনে হলো।
সে এক কাহিনী! অনেক দিন আগের। কিন্তু আমি কিছুই ভুলি নাই।
আপনি বললেন, একবার একটা মেয়ে এসেছিল। এই মেয়েটা কে?
এইটা তো বলা মুশকিল।
কিন্তু আপনি বলতে চাইলেন।
আমি কাহিনী বলতে চাইছি। মেয়েটা কে, এইটা আমি শিওর না।
খুব জমজমাট ঘটনা।
সেলিম তখনই সজোরে মাথা নাড়ল- না, না, বলতে গেলে ঘটনাই নাই।
কিছু অবাক দেখাল শোয়েবকে- বুঝতে পারছি না।
বললে বুঝবেন।
আমি তো বলতেই বলছি আপনাকে।
অনেক অনেক দিন আগের ঘটনা, কিন্তু একটুও ভুলি নাই, বুঝছেন। সেই মেয়েকে আমি এখনো পরিষ্কার দেখি।…শুনবেন?
আহা!
এইটা আমি বলতে চাই, আবার এইটা আমি বলতে চাইও না।
কী করবেন?
বলব। কিন্তু এইটা আপনার পাঠকের জন্য না।
তাহলে? আমার জন্য?
না, তাও না। এইটা আমি বলতে চাই- এইটা হচ্ছে এই জন্য বলা।

জেলা পরিষদের ডাকবাংলো পুরনো ও অপরিষ্কার। এ দুটো সমস্যা শোয়েবের কাছে সমস্যা না। সে এসবে অভ্যস্ত। এর চেয়েও অনেক নোংরা গা ঘিনঘিনে জায়গায় তাকে রাত পার করতে হয়েছে। উপায় নেই, সুতরাং সে মাথা ঘামানো বন্ধ করে দিয়েছে।
সেলিম তাকে বারবার তার বাসায় নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। সে যায়নি, তবে কাল হয়তো যেতে হবে। একটা বাড়তি দিন তাকে এখানে থেকে যেতে হচ্ছে। নিয়মমাফিক হলে তার আজ রাতেই রওনা দেওয়ার কথা, শরীর যদি ক্লান্ত লাগে, তবে কাল সকালে। সে জানে কাল সকালে হচ্ছে না, হতে হতে কাল বিকাল হয়ে যাবে। সেলিমের গল্প অর্ধেক সে শুনেছে, বাকি অর্ধেক শুনতে হবে।
অবশ্য এক অর্থে, সেলিমের গল্প পুরোই তার শোনা হয়ে গেছে। গল্প তো ছোট, দেড়-দুই ঘণ্টার। আর গল্প হচ্ছে সরল, একটাই ঘটনা। কিন্তু এই গল্প সেলিম তার কাছে ৩৮ বছর ধরে রেখে দিয়েছে। গল্পটা কি রেখে দেওয়ার মতো, ৩৮ বছর ধরে? কেউ কেউ কেন, অনেকেই বলবে- না, এর মধ্যে রাখার কী আছে! এমন কিংবা এ রকম কত গল্প জীবনে, রেখে কী হবে? এটা একটা কথা, রেখে কী হবে, রাখলে নতুন করে হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু রাখলে ক্ষতিই বা কী! যে রাখে না, তার কাছে ওটা না রাখার মতো, কিন্তু কারো না কারো কাছে সে তো রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ। এই যেমন সেলিম রেখেছে যত্ন করে, এতই যত্ন করে যেন ওটা হালকা কাচের গোলাপ ফুল, একটু ফসকালে ভেঙে চৌচির হবে। চৌচির হলে সেলিম নিজেকে নিঃস্ব মনে করবে।
গল্প শেষ করতে সময় লেগেছে মিনিট পনেরো। তারপর অনেকটা সময় সেলিম চুপ করে থেকেছে। তাকে বিমর্ষ ও মগ্ন দেখিয়েছে। এইভাবে সে হয়তো আরো কিছুটা সময় থাকত। কিন্তু তার বাসা থেকে তাকে নিতে লোক এলো। সেলিম বলল- সত্যিই তো দেরি হয়ে গেছে। হেনা আজ খেপবে। শোয়েব ভাই, আপনি চলেন, একসঙ্গে খাব।
শোয়েব যায়নি, সে জেদাজেদিতে পড়ে কাল যাবে বলেছে, আর সেলিম বলেছে- কাল তাইলে বাকি গল্পটা শুনবেন।
মেয়েটা না চলে গেল!
জি, তা গেল।
তাহলে?
কিছু থাকল। শুনলে বুঝবেন।
বাকি অর্ধেক কী হতে পারে, এই নিয়ে শোয়েব ভেবেছে। সে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
আচ্ছা, ঘটনা কি এমন, মেয়েটা ফিরে এসেছিল?
নাকি কোনোভাবে ঠিকানা জোগাড় করে সেলিম নিজেই রওনা দিয়েছিল?
বিয়ের পর ওই মেয়ে বেড়াতে এসেছিল সুখানপুকুর? তারপর কোনো ঘটনা?
আন্দাজ করা মুশকিল। শোয়েবের কখনো কখনো মনে হচ্ছে গল্পের বাকি অংশ শোনার আসলে দরকার নেই। যেটুকু সে শুনেছে, গল্প এখানেই, তারপর নাটক থাকতে পারে, কিন্তু গল্প ওই ওইটুকুই। সুতরাং বাকি অংশ না শুনলে ক্ষতি নেই বলে তার ধারণা।
একসময় সে ফোন করল মাহজাবিনকে- একটা কথা ছিল।
মাহজাবিন নরম গলায় বলল- বলো। আর খুব তো বেশি দিন তুমি আমার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবে না। বলো।
তুমি এখন সুখানপুকুরে থাকলে ভালো হতো।
ইতিহাস কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিত?
না, আমি তোমাকে গল্প শোনাতে পারতাম। শোনা গল্প।
তোমার নিজের না যে গল্প, সে গল্প শুনে লাভ?
নিজের গল্প ইন্টারেস্টিং হয় না জাবিন, অন্যের গল্পই মন কাড়ে।
ঠিক। বেশ, শোনাও তাহলে। কিভাবে? ফোনে?
কেন? ব্যালান্স নাই?
ছোট গল্প। খুব ছোট। তবে কিছু কিছু ছোট গল্প, যার গল্প তার কাছে অনেক বড় হয়ে থাকে। এই গল্পটাও তেমন, যার মুখে শুনলাম, বুঝলাম, গল্পটা তাকে জুড়ে আছে।
আমার খারাপ লাগছে, এ রকম কোনো গল্প আমার থাকবে না।
তুমি যখন দূর বিদেশ থাকবে, আমাদের দেখা হবে না, যদি সময় কাটাতে সমস্যা হয়, আমাকে নিয়ে কোনো একটা গল্প তুমি বানিয়ে নিও।
নেব। কিছু সত্য কিছু মিথ্যা, কিছু সত্যর মতো মিথ্যা…।
গল্পটা বলি তাহলে?
হ্যাঁ, শুনছি। বলো তুমি।
সুখানপুকুর তখন ছোট্ট একটা রেলস্টেশন। বছর দুই হলো হয়েছে। তার আগে এখানে কোনো স্টেশন ছিল না। এলাকার লোকজন বেশ কিছুটা এগিয়ে কিংবা পিছিয়ে অন্য স্টেশন থেকে ট্রেন ধরত। তবে তাদের সংখ্যাও কম। স্টেশন হওয়ার পর যিনি স্টেশন মাস্টার হলেন, তিনিই জানালেন, সারা দিনে দুটি কি তিনটা ট্রেন থামত। কখনো এমনও হতো, ট্রেন থামত বটে তবে কেউ উঠত না ট্রেনে, কেউ নামতও না, ট্রেন শুধুই থামত। সে হিসাবে এখানে স্টেশন হওয়ার কথা না, কিন্তু হয়েছিল।
হাসনাইন, তুমি একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ?
উঁহু। কী?
এই যে বললে না, স্টেশন হওয়ার কথা না, কিন্তু হয়েছিল।
হুঁ। কী বলবে?
স্টেশনটা না হলে কিন্তু এই গল্পটা, যেটা তুমি বলছ, তৈরি হতো না। সুতরাং ওখানে ট্রেন নিয়মিত না থামলেও স্টেশন হওয়ার একটা বড় কারণ আমরা পাচ্ছি। তারপর আরো অসংখ্য গল্প নিশ্চয় ওখানে তৈরি হয়েছে।
কিন্তু আমরা এই একটা গল্পই জানি। ওখানকার আরো গল্প নিশ্চয় ভিন্ন ভিন্নজন জানে।
ঠিক। তোমার জানা গল্পটা বলো তুমি।
স্টেশন মাস্টারের বলতে গেলে কোনো কাজই নাই। তার নাম সেলিম, বয়স ২৯। সে সারা দিন কখনো তার ছোট্ট কামরায় বসে থাকে, কখনো তার কামরার চেয়ে কিছু বড় প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করে। এলাকার লোকজনের সঙ্গে তার কিছু পরিচয় হয়েছে, এদের মধ্যে একজন হচ্ছে ফারুক। ফারুক এসে মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে গল্প করে সময় কাটিয়ে যায়। এলাকার আরো কিছু লোক আসে, তাদের সঙ্গে সেলিমের তেমন সখ্য গড়ে ওঠেনি। সুতরাং সেলিম বলতে গেলে সারা দিনই একা, স্টেশনটাও চুপচাপ।…এখানে একটা কথা বলে রাখা উচিত। সেলিমের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, সে ওই বয়সে এমনিতেও কিছুটা একা ছিল। তার মা মারা গেছে তার ছোটবেলায়। তার বাবা হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে কে জানে কোথায় চলে গেছে। তার বড় হওয়া তার খালুর বাসায়, এই খালা-খালুর সঙ্গে তার কোনো মানসিক সম্পর্ক তৈরি হয়নি, তার খুব একটা বন্ধু ছিল না, ঢাকা থেকে বেশি দূরের সুখানপুকুরে চাকরি নিয়ে থেকে যেতে তার অসুবিধা হয়নি।
তাহলে ওখানকার একা জীবন তার ভালো লাগত! লাগারই কথা।
ভালো লাগত কি লাগত না, এই ব্যাপারটা আসলে মীমাংসা করার দরকার নেই। আমরা বরং এ রকম বুঝতে পারি, ঢাকার তুলনায় সেই জীবন নিঃসঙ্গই ছিল। ঢাকা ছিল তার নিজস্ব পরিবেশ। সে অংশ নিক বা না নিক, ইচ্ছা করলেই বন্ধুদের কোনো আড্ডায় থাকতে পারত, ওখানে সেটা সম্ভব ছিল না।…এখন মূল গল্পে ফিরি। এই রকম যখন সেলিমের জীবন, সারা দিন অলস পার করা ছাড়া তার যখন কিছু করার নাই, এমন এক দিনে, এক দুপুরে এক তরুণী নামল তার স্টেশনে।
এক তরুণী?
এক তরুণী। সেলিমের অনুমান তার বয়স ২২-২৩। তরুণী একা।
একা একটা মেয়ে নেমে পড়ল?
নামতে পারে না?
পারে।
একা এসেছে সে। হয়তো এ এলাকায়ই কারো বাসায় যাবে সে। একটু পরই তাকে কেউ নিতে আসবে। তবে সেলিম খুব অবাক হয়েছিল। দুই বছর হলো সে এখানে আছে। এই দুই বছরে সে এ রকম ঘটনা ঘটতে দেখেনি। সে অবাক হয়ে তরুণীর দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর তরুণীকে কেউ নিতে এলো?
না, ব্যাপারটা তখন ঠিক সে রকম না। তরুণী ছোট একটা স্যুটকেস হাতে ট্রেন থেকে নামল, ট্রেন এখানে বেশিক্ষণ থামে না। ট্রেন ছেড়ে দিল। তারপর পুরো স্টেশনে শুধু সেলিম আর ওই মেয়েটি।
হয়তো আরো কেউ আছে ওখানে, ওই স্টেশনে, কেউ হয়তো পায়চারি করতে এসেছে, কেউ হয়তো ট্রেন দেখতে, কিন্তু তাদের থাকা কোনো ব্যাপার না। যেহেতু এটা সেলিম আর ওই মেয়েটির গল্প, অন্য কারো উপস্থিতি-অনুপস্থিতি তখন জরুরি নয়, যদি না তারা এই গল্পের অংশবিশেষ হয়, সুতরাং আমরা ধরে নেব স্টেশনে শুধু সেলিম এবং মেয়েটি।
হুঁ, এভাবেই। অন্য কেউ এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। তবে এটা শুধু সেলিমের গল্প জাবিন, এটা ওই মেয়েটিরও গল্প কি না, তা জানার উপায় নেই।
অর্থাৎ আমরা একটা গল্পের একটা দিক জানব শুধু।
কোনো কোনো গল্পের শুধু একটাই দিক থাকে, এমন কি হতে পারে না?
পারে। আমরা বরং তেমনই ভাবি।
সেলিম কাছেই ছিল। সে কাছ থেকেই তরুণীকে দেখল। তরুণী বিব্রত, অগোছালো।
পোশাক? তাহলে অন্য ইঙ্গিত থাকছে।
না, পোশাক না। তরুণী সব মিলিয়েই অগোছালো। সে নেমেছে বটে, কিন্তু জানা নেই কোথায় সে নেমেছে কেন সে নেমেছে। সেলিম একবার ভাবল, জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু তার মনে হলো, সে কাছেই আছে, কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে মেয়েটি তাকে জিজ্ঞেস করুক।
মেয়েটি তাকে কী জিজ্ঞেস করল?
মেয়েটি তাকে জিজ্ঞেস করল- এটা কি সুখানপুকুর?
তারপর?
খুব বেশি কথা কিন্তু মেয়েটি বলেনি। এটা কি সুখানপুকুর প্রশ্নে সেলিম যখন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল, মেয়েটি চারপাশে তাকাল। ধীরে ধীরে চারপাশে। যেন সে কোথায় নেমেছে, এটা বোঝার চেষ্টা করল। তারপর হাতের স্যুটকেস নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। সেলিম বলেছে, মেয়েটিকে ভীত ও ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সেলিম বলেছে, সে মেয়েটিকে দেখে খুবই অবাক বোধ করছিল।
অবাক বোধ করারই কথা। বেমানান একটা ব্যাপার।
হ্যাঁ, বেমানান। তা, সেলিম একটু ইতস্তত করল, একটু অপেক্ষাও, তারপর জিজ্ঞেস করল- আপনি কোথায় যাবেন? এই প্রশ্নে মেয়েটি মাথা নাড়ল। আপনি কোথায় যাবেন প্রশ্নে মাথা নাড়ার কারণ নেই, কিন্তু মেয়েটি মাথা নাড়ল এবং সেলিমের মনে হলো ঠিকই আছে।…ঠিকই আছে না হয়, কিন্তু তারপর কী? মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, সেলিমও; মেয়েটি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, তার দেখাদেখি সেলিমও, আর এই সময় চারদিক খাঁ খাঁ নিঝুম।
মেয়েটি কি সুন্দরী?
সুন্দরী। সেলিম বলেছে, সুন্দরী। তবে আসলে সে যা বলেছে তা হলো স্নিগ্ধ। ঠিক ‘স্নিগ্ধ’ শব্দটা সেলিম বলেনি, তবে সে এমনই বোঝাতে চেয়েছে। খুব নরম, স্নিগ্ধ, মায়াময় একটা মেয়ে।
আহা। সেলিম কি তার প্রেমে পড়ে গেল?
গল্পটা ঠিক ও রকম না।…আবার ও রকমও। জাবিন, আমরা জানি, একই গল্প নানা রকম হয়। বলি বরং। তো, মেয়েটি ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে আর সেলিমও, এটা চলতে পারে না। আবার সেলিম ওখান থেকে সরে আসবে, তার রুমে গিয়ে বসবে, তাও হয় না। সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি ভুল করে নেমে পড়েছেন?
দেখো, মেয়েটি যদি এর আগে জিজ্ঞেস না করত- এটা কি সুখানপুকুর, তবে আমিও ভাবতাম সে ভুল করে নেমে পড়েছে। ভুল করে নেমে পড়লে একটা গল্প শুরু হতে পারে।
তা কেন হবে, সব গল্পের শুরু ভুল থেকে নয়। ভুল থেকে শুরু না হলেও গল্প হয়। এই এটা যেমন। সেলিম মেয়েটিকে আরো দু-তিনটা প্রশ্ন করল, কিন্তু মেয়েটির উত্তর থেকে সে কিছুই বুঝল না। কারণ মেয়েটি স্পষ্ট করে কোনো উত্তর দিল না, স্পষ্ট করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ও সে বলল না। সে হয় মাথা ঝাঁকাল, দুপাশে নাড়ল, এমন প্রশ্নের উত্তরে দুপাশে মাথা নাড়ল, যে প্রশ্নের উত্তরে দুপাশে মাথা নাড়লে কিছুই বোঝা যায় না, এর বাইরে সে উত্তর না দিয়ে মাথা না নেড়ে সেলিমের দিকে তাকালও। সেলিম তাকে বলল, আপনি একটু বসুন বরং। ঠিক এভাবেই সে হয়তো বলেনি, তবে সে বসার কথা বলেছিল। আর কিছুটা ইতস্তত করে মেয়েটিও রাজিও হয়েছিল। সেলিম বলেছে, তার পেছনে পেছনে মেয়েটি যখন ঘরে ঢুকল, সেলিমের মনে হলো তার ঘর ঝলমল করে উঠল। দেখো, এ রকম হয় না, তবে সেলিমের এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আমরা ওর তখনকার মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পারি। ওর মনে হচ্ছে ওর ঘর আলোয় ভরে গেছে, ওর মনে হচ্ছে চারপাশ সবুজ সবুজ হয়ে গেছে।
অবস্থা দেখছি খারাপ। তারপর কী হলো ওদের? সেলিমের কী হলো, এটাই জিজ্ঞেস করা উচিত, কারণ তুমি বলেছ, এটা সেলিমের গল্প। এটা একই সঙ্গে মেয়েটার গল্প কি না, তা আর জানার উপায় নেই।…বলো, তারপর?
তারপর তারা বসে থাকল। সেলিম এ রকমই বলেছে আমাকে। তারা বসে থাকল। সেলিম বলেছে কতক্ষণ তারা বসে থেকেছে তা সে এখন আর মনে করতে পারে না। তার মাঝে মাঝে মনে করার ইচ্ছা হয়, সে চেষ্টা করে, কিন্তু প্রতিবারই সময়ের হিসাবটা এলোমেলো হয়ে যায়। তবে এমনও সে বলে, সময়ের হিসাবই গুরুত্বপূর্ণ না, সেটা পনেরো মিনিট হোক কিংবা দুই ঘণ্টা, গুরুত্বপূর্ণ না।
বেশ। কিন্তু এই যে তারা বসে থাকল, তাদের কথাবার্তা হলো না।
সেই আগের মতো। সেলিম জিজ্ঞেস করে, মেয়েটি সেভাবে উত্তর দেয় না। উত্তর দেয়, কিছু বোঝা যায় না। তবে একসময় নীরবতা কিছু ভাঙলও বৈকি। টুকটাক কথা। যেমন মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আমি কিছুক্ষণ আপনার রুমে বসলে কোনো অসুবিধা নেই তো? সেলিম বলল, না, নেই। মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, পরের ট্রেন কখন আসবে? সেলিম জানাল, পরের ট্রেন কখন আসবে…এ রকম।
আচ্ছা, তুমি যখন এই গল্প শুনছিলে সেলিমের মুখ থেকে, কিছু আন্দাজ করতে পারছিলে?
মেয়েটি সম্পর্কে?
হ্যাঁ, ধরো, মেয়েটি কী, কেন সে ওই নির্জন স্টেশনে নেমেছে একা…?
না, আমি পারছিলাম না। পারছিলাম না যে তার বড় প্রমাণ হলো, সেলিম এই গল্প করতে করতে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল- আপনি কি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন? আমি জানতে চাইলাম, কী? সেলিম বলল, ধরেন ওই সময় আমার জায়গায় আপনি। আপনি কি কিছু বুঝতে পারতেন কী হচ্ছে? আমি তাকে বললাম, না, আমি বুঝতে পারতাম না।
বুঝতে পারার কথা না। এ রকম ঘটনা ঘটে না।
ঘটে না- এটা কি বলা যায়? কী ঘটতে পারে, কী পারে না, আমরা তার কতটুকু জানি!
তা জানি না। কিন্তু সব মিলিয়ে এটা কোনো নিয়মের মধ্যে পড়ছে না।
নিয়মের বাইরে কিছু ঘটে না, আমরা বলি- কী আশ্চর্য! ভাবাই যায় না। ধরে নাও, এটা সে রকম কোনো ঘটনা।
হাসনাইন, ধরো আমরা আরো একটা ব্যাপার ঘটে নিতে পারি।
বলো, শুনি।
খুব তো একা থাকত ওই সেলিম, তাই না?
হুঁ, খুব একা।
ট্রেনও খুব একটা আসত না। যাত্রীও কম?
আসত না। হুঁ, যাত্রীও কম।
সারা দিন সেলিমের কিছু করার নেই।
না, নেই। সময় পার হতো না তার।
এই মেয়েটি, এই যে মেয়েটি, একদিন যে একা নামল, সেলিমের ঘরে ঢুকলে সেলিমের ঘর আলো-আলো হয়ে উঠল, এই মেয়েটি আসেনি, সেলিম ভেবে নিয়েছে, এমন কি হতে পারে না?

এই যে প্রতি সকালে, সকালে কোনো কারণ না হলে বিকেলে, সেলিম রেলস্টেশনে আসে, এটা নিয়ে হাসনাহেনা আর কিছু বলে না। তার যখন বিয়ে, তখন চাকরি ছিল সেলিমের, তাকে চাকরি করতে যেতে হবে, রেলস্টেশনে যেতে হবে, এটা ছিল ধরাবাঁধা ব্যাপার। চাকরি ছাড়ার পরপর যখন যেত সেলিম, তখনো হাসনাহেনা কিছু মনে করত না। তার মনে হতো, আহা, মানুষটা এত বছর যেখানে চাকরি করেছে, সেখানে তার যেতে ইচ্ছা করবেই। স্টেশনটা বলতে গেলে তার হাতেই তৈরি, তা মানুষটা যাবে, সময় কাটাবে, স্বাভাবিক।
এই অভ্যাসটা যখন থেকেই গেল সেলিমের, রোদ উঠুক বা বৃষ্টি পড়ুক, ঝড় হোক বা তেমন কিছু, স্টেশনে না এলে তার চলে না, একটু একটু করে বিরক্ত হতে লাগল হাসনাহেনা। আচ্ছা, এটার কোনো মানে হয়, এই যে প্রতিদিন স্টেশনে যাওয়া আর এতটা সময় কাটিয়ে আসা। বাসায় কাজ আছে না? আচ্ছা, কাজ নেই ধরে নিলাম, সংসারে তেমন কোনো কাজ নেই, তাই বলে বাসায় থাকবে না মানুষটা! এই নিয়ে একসময় টুকটাক লাগল। হাসনাহেনা ঝগড়া করতে জানে না, সেলিমও। তাদের ঝগড়া কিংবা কথাকাটাকাটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যেটুকু হয়, তার শেষে হাসনাহেনার এমন একটা বাক্য থাকে- আব্বায় যদি শুধু ফারুক ভাইয়ের কথা না শুনত…।
তাদের বিয়েটা ফারুক দিয়েছে। ফারুক এ অঞ্চলে সেলিমের প্রথম বন্ধু এবং এক অর্থে একমাত্রও। কারণ ফারুকের পর এক এক করে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সেলিমের, বন্ধুত্বও এবং একসময় সেলিম পুরোপুরিই এ এলাকার হয়ে উঠেছে। তবে ভালো বন্ধুত্ব আসলে ওই ফারুকের সঙ্গেই।
বিয়ের প্রসঙ্গ ফারুক সরাসরি তুলেছিল- একটা কথা বলব তোমারে।
গোপন কথা?
বিবাহের কথা। বিবাহের কথা কিছু ভাবো নাই?
বিয়ের কথা সেলিম তখনো ভাবেনি। বছরখানেক আগে ফারুক বিয়ে করেছে। সেই বিয়েতে তারা সবাই খুব হৈচৈ করেছে।
সেলিম বলল, ভাবি নাই।
ভাবা দরকার। বিবাহের কথা ভাবতে হয়।
এই কথা কি তুমি তোমার বিবাহের পর বুঝলা?
সেই রকমই। এখন তোমার বিবাহ আমি দিতে চাই।
ধরো, বিবাহের কথা আমি ভাবলাম। কিন্তু আমার চাল-চুলা নাই, আমার পরিচয় নাই, আমাকে বিবাহ করবে কে, কে কন্যা দেবে?
তুমি ভাববা না। কন্যা আছে। সুন্দরী…ভালো বংশ।
বংশ নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না সেলিমের, তার নিজেরই বা কী বংশ। সে বলল, দোস্ত, বউ সুন্দরী, এইটা ভাবতে ভালো লাগে।
হাসনাহেনারে তুমি চিনো। ফারুক বলল। চিনো না? সে সুন্দরী।
সেলিম স্বীকার করল হাসনাহেনা সুন্দরী; কিন্তু আমাকে পাত্র হিসেবে তার বাড়ির লোকজনের কেন পছন্দ হবে?
সেই দায়িত্ব আমার।
তুমি কেন তাদের জোর করবা?
না, না, তা কেন! তুমি কি পাত্র হিসেবে ভালো না? শুনো, সেদিন আমি হাসনাহেনার বাবাকে বললাম, মেয়ের তো বয়স হইছে, বিবাহ দেবেন না? তার বাবা বলল, তুমি নিজের মানুষ, পাত্র দেখো। আমি ইঙ্গিতে তোমার কথা বলেছি। তাদের আপত্তি নাই।
বিয়েটা হয়ে গেল। একটু তাড়াতাড়িই হলো। ফারুক বলল, বন্ধু, শুভ কাজে দেরি করতে নাই।
আপত্তি ছিল না সেলিমের, তবু সে বলল ধরো, তৈয়ার হওয়ার ব্যাপার আছে।
তোমার আত্মীয়স্বজন কেউ নাই। আছে?
না, না, সেই কবেই…।
তাহলে দেরি করবার কারণ দেখি না। শুভ কাজ। বিসমিল্লাহ বলো।
ফারুক বৈষয়িক লোক। সে জমিজমা, টাকাপয়সা ভালো বোঝে। সে বিয়ের পর সেলিমকে বলল, তোমার জমি কেনা দরকার। মাথা গোঁজার ব্যবস্থা দরকার।
বলল! আমি কয় পয়সা বেতন পাই, তুমি জানো।
আমি আছি। তুমি ভাববা না।
এই যে কিছু জমিজমা, বাড়ি, এসব ফারুকের কারণেই। সেলিমের তেমন নগদ পয়সা কোথায়। সে কিছু দিল, বাকিটা ফারুক, বলল- ধার দিতেছি। তুমি ধীরে ধীরে শোধ দিবা।
কিছু কিছু শোধ করেছে সেলিম, বেশ কিছু পারেনি। সেসব এত আগের কথা, পুরনো হতে হতে ‘ধার’ শব্দটার অস্বস্তি দূর হয়ে গেছে। সেলিম অবশ্য ভুলে যায়নি, সে হঠাৎ কখনো বলে, বন্ধু, তুমি আমার কাছে কত পাও, এইটা কি খেয়াল আছে?
ফারুক জিভ কাটে- এইটা কী বলো! আমি কিছু পাই না।
এইভাবে বললেই তুমি যে পাও, সেইটা মিথ্যা হইয়া যায় না।
আচ্ছা, পাই। দোস্তের কাছে পাই, দোস্তের কাছে থাকুক।
ফেরত যখন দিতে পারি না, তখন থাকবেই।
এই রকম ভাববা না। ওই কয় ট্যাকা ফেরত পাইলে না পাইলে কী আসে যায়। আল্লাহ আমারে কম দিচ্ছে, বলো?
তা, হাসনাহেনা যখন ঝগড়ার শেষে এসে বলে- আব্বায় যদি শুধু ফারুক ভাইয়ের কথা না শুনত…সেলিম কথাটা লুফে নেয়- ঠিক, এই একটা ব্যাপারেই আমি ফারুকরে পছন্দ করি না। তারে এই বিবাহের দায়িত্ব কে নিতে বলছিল!
আজ ঝগড়াটা লাগত না। কারণ সেলিম ঘরে ঢুকে দুহাত জোড় করল- ক্ষমা। ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ, এইটা তো বইয়ে পড়ছ। পড়ো নাই?
পড়ছি। বিশ্বাস করি নাই। হাসনাহেনা এ রকম বলল যদিও, ঝগড়া শুরু করল না, তবে গম্ভীর হয়ে থাকল। তার গম্ভীর হয়ে থাকার পেছনে যথার্থ কারণ আছে, সেলিম সাধারণত যে সময়ে বাড়ি ফেরে, তার চেয়ে ঘণ্টাখানেক বেশি সময় নিয়েছে আজ। সেলিম অবশ্য বলল, আর বলবা না, এক সাংবাদিক আসছে, আমার সঙ্গে কথা না বইলা সে ছাড়বেই না। আমাদের এই স্টেশন নিয়া। স্টেশনের হিস্টোরি জানতে চায়।
হাসনাহেনা গম্ভীর মুখে বলল, এই স্টেশন আমাদের না, তুমার, তুমার একার।
সেলিম বলল- অ।
তারপর সে অবেলায় গোসল করে ভাত খেয়ে ঘুমাতে গেল। ঘুম যখন ভাঙল সন্ধ্যার আগে আগে, বোঝার চেষ্টা করল, হাসনাহেনার রাগ পড়েছে কি না। হাসনাহেনার যে রাগ পড়েছে, সেটা সে বুঝতে পারল, সে বারান্দায় বসলে হাসনাহেনা যখন চা আর বিস্কিট নিয়ে এলো এবং তার পাশেও বসল। বলল, ফারুক ভাই যে পাঞ্জাবিটা আনছে, কেমন?
দেখি নাই তো। দেখব।
একজন একটা জিনিস দিছে। দেখবা না?
সেলিম দ্বিতীয়বার এ প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে অন্য এক প্রসঙ্গ তুলল- হেনা, এইবার, ফারুক অনেক দিন বাইরে ছিল।
ছিল। কম না। তিনি প্রায়ই যান। কিন্তু এত দিন থাকেন না।
তুমি কি বলতে পারবা, সে কি পারবে?
কী পারবে?
এই যে সে যায়, না ফেরার জন্য যায়। কিন্তু সে পারে না। সে আবার ফেরত আসে। কিন্তু একবার সে ফেরত আসবে না। এই রকম কি সে পারবে?
হেনা নিশ্চুপ থাকল, সে ভাবছে, এমনও মনে হলো না, সে বলল, এইটা আমি বলতে পারব না।
তোমার কোনো ধারণা নাই?
হাসনাহেনা দুপাশে মাথা নাড়ল।
আমার ধারণা, সে পারবে না।
হাসনাহেনা সেলিমের দিকে তাকাল।
তার যাওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু সে যাওয়ার মানুষ না। আমার ইচ্ছা হয় তারে বলি- বন্ধু, তুমি এইটা ছাড়। তুমি এইটা পারবা না।
একটুক্ষণ ভেবে হাসনাহেনা মাথা ঝাঁকাল- হইতে পারে। সেই কবে থেইকা ফারুক ভাই এই রকম। হঠাৎ নাই, কিন্তু ফেরতও আসেন।
সেলিম মাথা ঝাঁকাল- তোমার মনে আছে, প্রথম সে কবে গেল?
হাসনাহেনা দুপাশে মাথা নাড়ল।
তোমার মনে থাকনের কথা না।…ফয়সাল সেদিন হইল। ফয়সাল হইল সকালে। আমরা সবাই খুশি, আনন্দ করি, ফারুকও করে, কিন্তু হঠাৎ বিকেল থেইকা সে নাই।…লাভ নাই, সে বারেবারেই ফেরত আসবে।
বদরুল রাকার কথা শুনে হাসতে আরম্ভ করল। এই হাসি দেখে রাকা বিরক্ত বোধ করল। সে এমন কিছু বলেনি যা শুনে বদরুল হাসতে পারে। সে বদরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তাই দেখে বুঝি বুঝল বদরুল, সে হাসি থামিয়ে বলল, হাসতেও পারব না।
রাকা, বদরুল আর মাহজাবিন রাতের খাবার সেরেছে একটু আগে। সাধারণত মাহজাবিন তাদের সঙ্গে খায় না। সে বলে, এই সন্ধ্যাবেলায় ডিনার করতে আমার ইচ্ছা করে না। …না, মা, বলতে হবে না এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। আমি জানি, কিন্তু আমার ইচ্ছা করে না।
সে বলল- বাবা, ঠিক করেছি এই কটা দিন একসঙ্গে খাব।
গুড। শুনে খুব খুশি হলাম।
মা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। খুব বেশি দিন তো এ বাসায় থাকা হবে না, তাই।
রাকা বলল, তোমাকে বিয়ে দিতে চেয়ে যেন মহা অপরাধ করে ফেলেছি।
অপরাধ কেন হবে মা! এ উপলক্ষে আমরা কয়েক দিন খাবার টেবিলে একসঙ্গে বসব, এর একটা মূল্য আছে না?
রাকা বিরক্ত হলো- তুই কি ইয়ার্কি ছাড়া আর কিছুই বুঝিস না। সংসারেও এ রকমই করবি! তুই কী, বল তো?
মাহজাবিন বলল, তোমার ছোট মেয়ে মা।
বদরুল খাবার টেবিল কাঁপিয়ে হাসতে আরম্ভ করল। রাকা খুবই বিরক্ত হয়ে মাহজাবিনের দিকে তাকাল, তারপর বদরুলের দিকে ফিরে বলল, তোমার বয়স হয়েছে, অত জোরে হাসবে না।
বদরুলের হাসিটা আবার ফিরে এলো, তাদের ঘরে, তখন রাকা বলল, আমি জাবিনকে বিশ্বাস করি না, ওর একটা অ্যাফেয়ার আছে। ওর বিয়েটা নেক্সট মান্থে।
বদরুল হাসতে আরম্ভ করল। তাকে হাসতে দিল রাকা, তারপর জিজ্ঞেস করল, আমি কি তোমার হাসির কারণ জানতে পারব?
অ্যাফেয়ার তোমারও ছিল।
হুঁ। তো?
তোমার বাবা-মাও তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল।
হুঁ। তো?
তুমি বাড়ি থেকে পালিয়েছিলে।
তুমি কি চাও জাবিনও পালাক?
না।…ও পালাবে না।
তুমি জানো?
আমার মনে হয়। তোমার?
একটু ভাবল রাকা, একটু মাথা নাড়ল, তাকে মোটামুটি দ্বিধাহীনই দেখাল- না, মনে হয় না।…আরেকটা ব্যাপার…।
বদরুল তাকাল রাকার দিকে।
ছেলেটাকে আমি দেখেছি। জাবিনকে তো দেখছিই। ওদের দুজনকে একসঙ্গেও দেখেছি। ঠিক বুঝি না, মনে হয় এই জেনারেশনের মধ্যে এসব নিয়ে সম্পর্কের কথা বলছি, কোনো সিরিয়াসনেস নেই। ধরো, দুজনের সম্পর্ক হলো, হলো- এইটুকুনই; ভেঙে যদি যায় সমস্যা নেই। গেলে যাবে- এ রকম আর কি।
তোমার যে ধমক খেয়েছে ওই ছেলে, তারপর আর আসে! বদরুলের মুখে সামান্য হাসি।
আবার খোঁচাতে শুরু করলে! না, আমার ধমকে না। প্রেম গভীর হলে ওই ধমক কেন, ওর চেয়ে হাজার বেশি ধমকেও কিছু হয় না। কিন্তু আমাদের আপত্তি আছে বলে জাবিন বা ওই ছেলে কারো কিছু যেন এসে গেল না।
হয়তো …।
আমাদের সময়ে ব্যাপারটা অন্য রকম ছিল।
একটা সিগারেট খেতে দেবে?
না।
একটা।
আধটাও না।…আচ্ছা, আধটা খাও।
বদরুল সিগারেট ধরিয়ে হালকা টান দিল, আগে সিগারেট ধরানো মানে লম্বা লম্বা টান। শেষ টানটা হতো অনেক বড়। এখন জোরে টান দিলে বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।
থাক, জোরে টান দিতে হবে না। সেই বয়স নেই।
নেই। কবরে পা। বদরুলকে অন্যমনস্ক দেখাল। রাকা- সে বলল।
কী? আরেকটা বাজে কথা বলার অনুমতি নেবে?
আরেকটা? আগের বাজে কথাটা কী বললাম!
কবরে পা…। কী বলবে?
মাঝে মাঝে আমার খুব মন খারাপ হয়, তখন ভাবি। মনে হয় এই সেদিনের কথা, কিন্তু হিসাব করলে দেখি অনেক দিন…।
হিসাব করার কী দরকার! তোমার মনে হয়- এই সেদিনের কথা। তা এই এটুকু পর্যন্ত মনে করলেই হয়।
হুঁ।…তবে মাঝে মাঝে মনে করতে ইচ্ছা করে।…তোমার বাসায়ও রাজি ছিল না।
তোমার ছিল না চালচুলো। রাজি কেন থাকবে, বলো?
কিন্তু তুমি বাসার কথা শুনলে কোথায়!
আমার মনে হলো, এই মানুষটা ছাড়া আমার আর ভাবার নেই।
তোমার বাবা আর ভাইরা খুব খেপেছিল। তুমি পালানোর পর কী যে অবস্থা। সে একসময় গেছে বটে। কিছু বোকামিও ছিল আমাদের।
কী রকম?
খুব বেশি রিস্ক নিয়েছিলাম আমরা। সেই কোথায় কোথায় না থাকলাম আমরা, তুমি তার আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গেলে সেই কোথায়…।
কিছু কিছু রিস্ক নিতে বদরুল।
বদরুল মাথা ঝাঁকাল।
কিছু কিছু রিস্ক না নিলে জীবন সুন্দর হয় না।
বদরুল চোখ বড় বড় করে তাকাল- বাহ্, আজ দেখি মূল্যবান সব কথা বলছ!
ইয়ার্কি আমার ভালো লাগে না। আর কথা তো তুমিই তুললে।…শোনো।
দাঁড়াও। বদরুলের সিগারেট শেষ। সে উঠে দাঁড়াল। সিগারেটের শেষাংশ অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে রাকার দিকে তাকাল- আমি একটু পায়চারি করছি। তুমি বলো।
জাবিনের বিয়েটা। রাকা বলল। একটা কাজ করলে হয় না…বিয়েটা স্টেটসে হলো?
মানে ছেলের ওখানে!
ওভাবে ভাবলে চলবে না। ওখানে আমাদের মেয়েও আছে। সুতরাং ওটা আমাদেরও জায়গা।
তবু লোকজন ভাববে আমরা মেয়ে বিয়ে দিতে গেলাম।
ভাবুক। আমরা যাব আমাদের মেয়ের বাসায়। ওখানে বিয়েতে অনেক মজা হয়।
এক কাজ করলে বরং হয়। বিয়েটা এখানেই হোক। ওরা যখন ফিরে যাবে, তখন আমরাও বরং যাব ওদের সঙ্গে।
একটু ইতস্তত করল রাকা- তাও হয়। তবে আমি চাচ্ছিলাম বিয়েটাই ওখানে…।
দেখা যাক…।
দেখা যাক বললে হবে না বদরুল। হাতে কোনোই সময় নেই।
কী বলো, এখনো তারিখই ঠিক হয়নি।
হয়ে যাবে। আজও আমার সাজরিনের সঙ্গে কথা হয়েছে। ছেলে ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা চিটাগাং থেকে যে কোনো দিন চলে আসবেন কথা বলতে। তাঁদেরও নাকি এই এক কথা- ছেলের যদি পছন্দ হয়ে থাকে, তবে দেরি করার কোনো অর্থ তাঁরা দেখেন না।
আমরাও দেখব না। রাকা, আমাদের লোকজন আছে, আমাদের সামাল দিতে ঝামেলা হবে না। এর চেয়ে কত কঠিন সময় সামাল দিয়ে এসেছি।
কিন্তু তুমি নার্ভাস হয়ে যাও।…ওই যে, আমি অপেক্ষা করছিলাম, তুমি দেরি করে পৌঁছালে। কী যে নার্ভাস তোমাকে লাগছিল!
লাগবে না! জানি তুমি পৌঁছে গেছ, একা আছ, আমি পৌঁছাতে পারিনি…তখন আমার নার্ভাস লাগবে না!
আমিও ভয় পেয়েছিলাম…।
তোমার বয়সও তখন কম…।
হুঁ, জাবিনের চেয়েও বেশ কম। কিন্তু ভয়টা আমি আমার ভেতরে বসতে দিতে চাচ্ছিলাম না। আবার ভয়ের পাশাপাশি একটা সাহসও ছিল…যেন সব পারব।
বদরুল কিছু বলল না, তার মুখ স্মিত হাসিতে ভরে থাকল।
রাকা বলল, সাহসটা ছিল, কারণ আমি জানতাম, ভুল কিছু করছি না।…বদরুল, জাবিন একটা ভুল করেছে। ওই ছেলেকে তুমি দেখনি, আমি দেখেছি। ওই ছেলের সঙ্গে জাবিন যায় না, আমরা যাই না।…বিয়েটা হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমার একটা অস্বস্তি থাকবে।
ওরা তেমন সিরিয়াস না, তুমি বললে।
না, না, সিরিয়াস না। ওদের সম্পর্কের মধ্যে আমি সিরিয়াসনেস দেখি না। তবু…বিয়েটা হয়ে যাক না।
বদরুল বলল- হুঁ। তারপর আমরা টোনাটুনি।

রাতে ঘুম না হওয়ার সমস্যা ফারুকের অনেক দিনের। তার ঘুম হয় না রাতে, অন্য সময়েও হয় না, এতে সে বিরক্ত না। ঘুম না হওয়া নিয়ে সে বিরক্ত না, সে বিরক্ত অন্য কারণে- এই যে জেগে আছে, সে দেখবেটা কী! যদি রাত জেগে অনেক কিছু দেখার থাকত, সে জেগে থাকতে আপত্তি করত না। কিন্তু জেগে থাকলে সেই একই রকম সব কিছু। একই রকম সব কিছু- এই নিয়ে সে বিরক্ত বোধ করে।
তার বউ মারা গেছে বছর কয়েক। তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তার বাড়িটা বড়। বড় বাড়িটায় সে একাই থাকে। এদিক-ওদিকের আত্মীয়স্বজন থাকে কিছু, তারা থাকে অন্যদিকে, তাদের থাকাকে থাকা মনে করে না ফারুক, তাদের অনেকের সঙ্গে মাসে একটা কথাও তার হয় না।
একা থাকা নিয়ে ফারুকের কোনো অসুবিধা নেই। তার বয়স হলেও, তার কোনো অসুখ-বিসুখ নেই, অন্তত নিজে সে তা টের পায় না। সে দেখেছে সে এখনো এমন অনেক কাজ পারে, যা অল্পবয়সীরা পারে না। এই পারার মধ্যে আনন্দ আছে। তবে সে যা পারতে চায়, তা তার পারা হয়ে ওঠে না। এখানে যখন রেলস্টেশন হলো, তখন থেকে স্টেশন ব্যাপারটা তাকে টানে। আর টানে ট্রেন। একবার বহু আগে, তার মধ্যে এই ভালো লাগাটা তৈরি হয়েছিল। সে তখন সেলিমের সঙ্গে বসে স্টেশনে আড্ডা দিচ্ছে। সেলিমের এখানে আসার তিন-চার বছর হয়েছে, সেলিমের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। তারা আড্ডা দিচ্ছে, এর মধ্যে সেলিম একটু ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সেলিমের ব্যস্ততা দেখে নয়, স্টেশনে বসে আড্ডা দিতে দিতে তার ট্রেনের আসা-যাওয়ার সময় মুখস্থ হয়ে গেছে। সে বুঝল ট্রেন আসছে। ট্রেন এলো, অত রাতে একজনও নামলও না, ট্রেনটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর নড়ে ওঠে চলতে আরম্ভ করল। আর ফারুকের মুখ ফসকে হঠাৎ বেরিয়ে গেল- আহা, যদি যাইতে পারতাম।
কী বলল সে, খেয়াল করেনি সেলিম। সে জিজ্ঞেস করল- কিছু বললা?
হুঁ। হঠাৎ মনে হইল যদি যাইতে পারতাম।
কই? গলায় কৌতূহলও নেই, সেলিমের ছিল সাদামাটা জানতে চাওয়া।
ফারুক বলল- ধরো, সেইটা ভাবি নাই।
কিছুটা কৌতূহলী দেখাল সেলিমকে- ভাব নাই?
না।
যাওয়ার কথা বললা…।
বললাম। কোথায় যাব, এইটা ভাবি নাই। কিন্তু ধরো, এই যে ট্রেনটা গেল, হঠাৎ ভাবলাম, ধরো, যদি যাইতে পারতাম।
সেলিম তাকিয়ে থাকল ফারুকের দিকে। তার অপলক তাকানো দেখে ফারুক ভুরু নাচাল- তাকায়া আছ ক্যান!
এইটা তুমি কী বললা!
কোনটা?
এই যে যাওয়ার কথা বললা।
ইচ্ছা করল যে! মনে হলো যদি যাওয়া যাইত।
এই কথা আর বলবা না।
সেলিমের বলার মধ্যে কিছু একটা ছিল, ফারুক ফিরে তাকিয়েছিল- সমস্যা কী?
ফারুক বলেছিল তারও মাঝে মাঝে এ রকম ইচ্ছা করে। সে প্রায় রাতে একা থাকে, ফারুক রোজ আসে না, অন্য কেউও না। তখন কোনো কোনো রাতে হঠাৎ তার ইচ্ছা হয় ট্রেন চলতে আরম্ভ করলে সেও উঠে আসবে।
ওঠো না ক্যান! ফারুক জিজ্ঞেস করেছিল।
আমি ভীতু মানুষ। সাহস হয় না। সেলিম বলেছিল। কিন্তু টান লাগে। বুঝছ? একটা টান। যেন কেউ টান দেয় ট্রেন চলতে আরম্ভ করলেই।
সেলিম বলেছিল, তার ভয় লাগে। মাঝে মাঝে রাতের ট্রেনে তার উঠে বসতে ইচ্ছা করে; কিন্তু তার সাহস হয় না। ফারুক সেদিন না বুঝলেও পরে বুঝেছিল, এখানে ইচ্ছার পাশাপাশি ভয় পাওয়ারও একটা ব্যাপার আছে। সে দেখল, এই ভয়টা সেও জয় করতে পারছে না। তবে ইচ্ছাটা তার থেকে গেল। হ্যাঁ, সত্যিই সে একদিন রাতের ট্রেনে চড়ে বসবে। তারপর যাবে।
সেলিম তাকে বলেছে, কোথায় যাবা, এইটা ভাবলে যাওয়া হয় না।
কিন্তু ধরো, কোথাও না কোথাও ট্রেন থামতেছেই।
এইটাই সমস্যা। তাইলে আর যাওয়া হইল কই!
সেলিমের এই কথায় নিরাশ হয়নি ফারুক, সে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তার সেই দিনের কথা মনেও আছে। সেলিম আর হাসনাহেনার ছেলে হয়েছে। সেলিম আনন্দে ফারুককে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। সেই রাতে জ্যোৎস্নাও নামল অনেক। ফারুকের মনে আছে, সে আর সেলিম গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে মিষ্টি পৌঁছে দিচ্ছিল।
সেই রাতেই সে ট্রেনে চেপে বসল। সে স্টেশনে এসেছিল মিষ্টি নিয়ে। সেলিমও আসতে চেয়েছিল; কিন্তু ফারুক তাকে বাড়ি পাঠিয়েছিল- বাড়ি যাও। হাসনাহেনা তোমারে খোঁজে।
সেলিম দ্বিমত করেনি- তবে যাও তুমি।…তবে এত টাকার মিষ্টি না কিনলেও পারতা।
মিষ্টি বিলিয়ে স্টেশনেই বসে ছিল ফারুক। তারপর রাত হলো, তারপর স্টেশন নির্জন হলো, তারপর পূর্ণিমাও বাড়ল। ফারুকের ভেতর ইচ্ছাটা প্রবল হয়ে উঠল একসময়, সে এক ট্রেনে উঠে গেল একসময়। সেই যাত্রায় সে এক দিনের বেশি থাকতে পারেনি। সে ফিরে এসে বলেছিল- কঠিন।
সেলিম বলেছিল- কঠিন। বাদ দাও।
বাদ দেওয়ার ইচ্ছা হয়নি ফারুকের কিংবা বাদ দেওয়া হয়নি। তারপর আরো অনেকবার অনির্দিষ্ট ট্রেনে উঠে গেছে সে। এক দিন থেকেছে, দুই দিন থেকেছে, তিন দিন থেকেছে, তারপর আবার ফেরতও এসেছে। ফেরত যে ক্যান আসি, এইটা বুঝি না। শুধু বুঝি- ফেরত আসলাম।
একটা সময় ছিল, সেলিম তার কথায় হাসত- ফারুক, তুমি ফেরত আসবাই।
ক্যান! ফেরত আসব ক্যান!
কারণ তুমি হইতেছ ফেরত আসইন্যা মানুষ। আমি বুঝি।
এসব ভাবতে ভাবতে নির্ঘুম ফারুক টের পায় তার দুই চোখ ভিজে গেছে। তার চোখ মুছতে ইচ্ছা করে না। সে ফেরত আসইন্যা মানুষ। হ্যাঁ, সে ফেরত আসইন্যা মানুষ!

পরদিন বিকেল পর্যন্ত চমৎকার কাটল শোয়েবের। সকালে, তেমনই কথা ছিল, সে সেলিমের সঙ্গে গ্রাম দেখতে বেরিয়েছিল। এ রকম সাধারণত হয় না। সে তার কাজ করার সময় কাজটুকুই করে। কোথাও কারো সঙ্গে বাড়তি সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। বাড়তি সম্পর্ক কিছুটা হলেও এতটা না যে সকালে উঠে সে লোকের সঙ্গে ঘুরতে বের হবে। ঘুরতে বের হওয়ার কারণ শুধু এই নয়- সেলিম তাকে অনুরোধ করেছে। ব্যাপার এ রকম- সেলিমের মুখ থেকে বাকি গল্প তার শুনতে হবে। সে শতভাগ নিশ্চিত, সেলিম নিজেই তাকে গল্পের বাকি অংশ শোনাবে। কারণ এ গল্পটা সে শোনাতে চায়। এর বিপরীতে খুব সামান্যই আশঙ্কা তার- সেলিম অর্ধেক গল্প শুনিয়েছে। অর্ধেক শুনিয়ে বলেছে, বাকিটা পরে শোনাবে। এখন সে হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আর সে শোনাবে না। সে বলবে- ভাই, গল্প আসলে ওই পর্যন্তই। নির্জন দুপুরে এক মায়াময় তরুণী নামল স্টেশন থেকে- এই এটুকুই গল্প।
তাদের গ্রাম দেখা শেষ হলে শোয়েব হাসতে হাসতে বলল- ভাই, আপনাদের গ্রাম সুন্দর না।
সেলিম বলল- এইটা কী বলেন! আমাদের গ্রাম সুন্দর না?
না। আমি বাংলাদেশের অনেক গ্রাম দেখেছি। সব গ্রাম এ রকম। এটাও সেই রকম।
সেলিম প্রতিবাদ করতে চাচ্ছিল, ফারুক শোয়েবের সঙ্গে একমত হলো। সে সেই শুরু থেকেই তাদের সঙ্গে ছিল। সেলিম প্রথমে বাংলো থেকে শোয়েবকে নিয়েছে; বলেছে, আপনার আপত্তি না থাকলে ফারুকরেও নেই সঙ্গে। সে মানুষ ভালো। আমার বন্ধু।
সঙ্গে আরেকজনকে নিতে দ্বিধা ছিল শোয়েবের। হয়তো দেখা যাবে কথা বলতে বলতে একটা বিরক্তিকর পরিবেশ তৈরি করে ফেলেছে। তার দ্বিধা খেয়াল করে সেলিম বলল- সে মানুষ ভালো। সে আমার বন্ধু। আপনি তাকে গতকাল দেখেছেন।
আমি দেখেছি?
ওই যে, কাল স্টেশনে আসল না? আমার জন্য পাঞ্জাবি নিয়া আসল…।
ও আচ্ছা। ঠিক আছে, বলেন ওনাকে।
ফারুক সঙ্গে সঙ্গে ছিল, সে বলল- এই ভাই ঠিক বলছেন। সব গ্রাম এক রকম। আমি তো এইদিক ওইদিক গেছি। দেখছি।
আচ্ছা। সেলিম মাথা দোলাল। মানলাম। কিন্তু এই গ্রামে আমি অন্য রকম।
শোয়েব আর রাজ্জাক তাকাল সেলিমের দিকে। সেলিম বলল, আমি লোকাল না; কিন্তু আমার ঢাকা শহরের কথা মনেও পড়ে না, যাইতেও ইচ্ছা করে না- এই গ্রাম আমার নিজের না, এইটা আমার মনেও পড়ে না।
আহা, সেলিম ভাই। শোয়েব বলল। কেন, মনে পড়বে! আপনি কবেই এখানে মিশে গেছেন।
ফারুক মৃদু গলায় বলল, তুমি হইতেছ আপনার লোক।
সকালের নাশতাটা ফারুকের ওখানে সারতে হলো। এ রকম কথা ছিল না। কিন্তু ফারুক নাছোড়বান্দা টাইপের মানুষ। শুধু নাছোড়বান্দা না, মানুষকে রাজি করানোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা তার আছে। শোয়েব বলল- আচ্ছা, চলেন তাহলে।
নাশতার পর শোয়েব রেস্ট হাউসে ফিরে এলো, সে ঘুমাবে। কাল সে অনেক রাত জেগে কাজ করেছে, রুম থেকে না বের হলে ঘুম হয়তো আসত না; কিন্তু সে নাশতা খেতে খেতে টের পেয়েছে ঘুম। মাঝখানে আরো কিছু কারণে ঘুম জমা হয়েছে। তবে রুমে ফিরে সে তখনই ঘুমাতে যেতে পারল না। মাহজাবিনের ফোন- কী করছ তুমি?
ঘুমানোর প্রস্তুতিতে আছি। দরকারি কিছু?
নাহ্, তোমার সঙ্গে আর দরকারি কী, তোমার সঙ্গে যা কথা, তা ফালতু।
হুঁ। বিয়ের ডেট ফাইনাল হয়েছে কাল রাতে।
হয়নি। ব্যস্ত হয়ো না। হবে।
তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না, এটা খারাপ লাগে।
এভাবে বলছ কেন! হবে।
আমি আমেরিকা যাব তোমাকে দেখতে?
আমি কি দেশে আসব না?
হুঁ। তোমার দেশে আসার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
হয়তো আমিও দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকব।…ফিরছ কবে?
রাতে রওনা দেব।
তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
এখন বলবে, না ফিরে শুনব?
ফিরে শোনো। এখন আমি অন্য কারণে ফোন করেছি।
অল্পতে সারতে পারলে বলো। ঘুম পাচ্ছে।
অল্পতে সারা যাবে না। অত ঘুম দেখিও না।
ঠিক আছে, দেখালাম না। বলো।
তোমার ওই স্টেশন মাস্টার, কী নাম যেন…সেলিম…, উনি গল্পটা শেষ করেছেন?
না, ওই নিয়ে আর কথা হয়নি। কিন্তু কাল তুমিই গল্পটা শেষ করলে। করোনি?
আমি! জাবিন সামান্য হাসল। আমি কি লেখক? নেহাল হলে এক কথা ছিল।
তুমি বললে! ওটা সেলিমের কল্পনা।
হতে পারে না? ঘোর লাগে না মানুষের? হ্যালুসিনেশন হয় না? একা একা থাকতে, কারো, যে কারো অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তার ভেতর একটা ঘোর তৈরি হয়েছিল।
তাহলে রহিম করিম নয় কেন, কেন অমন এক তরুণী!
এটা তুমিও জানো। তোমার ওই স্টেশন মাস্টার কি গো? না। তখন তার বয়স কত? কম। তা, কেউ যদি তার কল্পনায় ট্রেন থেকে নামে, সে মায়াময় তরুণীই হবে।…ধরো, এই হ্যালুসিনেশনটা তার ভেতর স্থায়ী হয়ে গেছে। সে কখনো এটাকে সত্যি ছাড়া আর কিছু ভাবে না।
আজ গল্পের বাকি অংশটুকু শুনব, তখন বুঝতে পারব।
শুনলেই বুঝতে পারবে? শুনলেই সব বোঝা যায়?
অনুমান করা যায়।
হ্যাঁ, গল্পটা তিনি কিভাবে শেষ করেন, সেটা একটা ব্যাপার। দেখো।
গল্পের বিশেষ বাকি ছিল না। সেটা দুপুরের খাবারের পর সেলিমের বাগানে বসে শেষ হয়ে গেল।
সেলিম খাবার আয়োজন করেছিল বড় করে। শোয়েব বলল, আমি খেতে ভালোবাসি।
খেতে ভালো না বাসলে চলবে!
কিন্তু আপনি যা আয়োজন করেছেন, তা বাড়াবাড়িরও বেশি।
এইটা কিছু না। বসেন।
ফারুকের আসার কথা ছিল, আসেনি। তাকে ফোন করতে বলল শোয়েব, সেলিম জানাল ফারুক মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। শোয়েব বলল, তাহলে আমরা আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। ওনাকে ছাড়া শুরু করাটা উচিত হবে না।
সে এই রকম। সেলিম বলল, সে নাও আসতে পারে।
খাওয়ার কিছুক্ষণ পর তারা বাগানে এসে বসল। বাগানে দুটি চেয়ার রাখা হয়েছে, একটা টেবিল। হাসনাহেনা জানতে চেয়েছে শোয়েব চা খাবে কি না।
সেলিম জানাল, বাগানটা সুন্দর ছিল। তার বাগানের শখ।
শোয়েব মৃদু হাসল- বাগানের অবস্থা দেখে মনে হয় না আপনার বাগানের শখ।
এখন আর সময় পাই না।
এখন সময় পান না!
হাসনাহেনা এসেছিল চা দিতে। সে বলল, সারা দিন স্টেশনে গিয়া বইসা থাকো, তোমার সময় পাওনের কথা না।
হাসনাহেনা চলে গেল। যেন খুব গোপন কথা বলছে, এভাবে সেলিম বলল, আমি যে স্টেশনে যাই, এইটা নিয়া বউয়ের খুব রাগ।
যান কেন!
আর কী করব!
তাও কথা।
না গেলে অস্বস্তি লাগে।
হুঁ। এত দিনকার অভ্যাস।…সেলিম ভাই…।
লেখাটা ছাপা হইলে একটা পত্রিকা পাঠাইবেন।
পাঠাব। সেলিম ভাই, গল্পটা কিন্তু শেষ হয়নি।
সেলিম মুখ টিপে হাসল- হুঁ, হয় নাই।
এখন বলেন।
ছোট গল্প। গতকালই শেষ করতে পারতাম।
করলেন না?
না।
কেন করলেন না?
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সেলিম, বলল, হঠাৎ মনে হইল এইটা তো আমার গল্প। এইটা আমি অন্যরে বলে দিব!
কিন্তু গল্পটা আপনার বলতে ইচ্ছা করছিল।
সেই জন্য শুরু করলাম, তারপর হঠাৎ মনে হইল বলে দিব!
বলবেন না? শোয়েব হাসিমুখে তাকাল।
সেলিম মাথা ঝাঁকাল- বলব।
একটা ঘটনা হিসেবে বলবেন। আমি আপনার কাছে একটা ঘটনাই জানতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু শোয়েব ভাই, এইটা শুধু ঘটনা না। বলছি আপনারে।
ঘটনাই। ধরেন, আমি জানতে চেয়েছি রেলস্টেশনের ঘটনা, আপনি রেলস্টেশনের ঘটনাই বলেছেন; কিন্তু সেটা যত না রেলস্টেশনের ঘটনা, তার চেয়ে বেশি আপনার জীবনের ঘটনা।
জি, আপনে বুঝছেন।
তাহলে বাকিটা বলেন।
বাকিটা সেলিম বলল শোয়েবকে তার বাংলোয় পৌঁছে দেওয়ার সময়। সেলিমের আসার দরকার ছিল না, তার সঙ্গে বিদায় নিয়ে শোয়েব একাই যেতে পারত। কিন্তু সেলিম বলল- এইটা হয়!
এ জন্য এতক্ষণ আপনি কি গল্পটাও বলেননি?
সেলিম হাসল- এটুকু রাস্তা, রিকশা নিব না। হাঁটতে হাঁটতে বলব।
গল্পের খুব একটা বাকি ছিল না। বাংলোয় পৌঁছানোর আগেই সেটা শেষ হয়ে গেল। সেলিম বলল, গল্পটারে টানলে বড় করা যায়। কিন্তু এই গল্প এটুকুই।
শোয়েব সম্মত হলো- এই গল্প এটুকুই।…একটা কথা।
বলেন। যদিও ধারণা আছে কী বলবেন।
তারপর আর দেখা হয়নি?
জানতাম, এটা জিজ্ঞাসা করবেন। নাহ, দেখা হয় নাই।
আর আসেনি এখানে।
সেলিম দুপাশে মাথা নাড়ল।
আপনার দেখতে ইচ্ছা করে?
সেলিম চুপ করে থাকল।
বলেন, আপনার দেখতে ইচ্ছা করে?
সেলিম শান্ত গলায় বলল, এইটা আমি বলতে পারব না। আমি জানি না আমার দেখতে ইচ্ছা করে কি করে না।
কিন্তু আপনি মনে রেখেছেন…।
সেলিম ছোট করে বলল, রেখেছি। রাখতে ভালো লাগে।…আরেকটা কথা আছে।
শোয়েব অবাক চোখে তাকাল।
এইটা আমি কিছুতেই বলব না ভাবছিলাম!
কিন্তু সব বলে কিছুটা কেন বাকি রাখবেন?
কারণ এটা ঘটনা না। সেলিম সামান্য হাসল।
শোয়েব জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকল।
আমার একটা চিন্তা। হঠাৎ একটা ভাবনা আসছিল আমার মধ্যে। আমি সেই চিন্তা অবশ্য তাকে বলি নাই। পরে আমার এমন মনে হইল বলতে পারতাম।
বলতে পারেননি বলে খারাপ লেগেছিল আপনার?
একটু ভাবল সেলিম- নাহ্, বলতে পারতাম আর কি। এই হইল ব্যাপার।
বললে কি কিছু হতো?
ভাবল না সেলিম, সে তখনই দুপাশে মাথা নাড়ল, হইত না।
আমার কথাটা শোনার ইচ্ছা হচ্ছে। আপনি বলছেন কিছু হতো না, আপনি জানেন কিছু হতো না, তবু আপনার বলার ইচ্ছা হয়েছিল।
ইচ্ছা হওয়া তো অন্যায় না বাবা।
না। মৃদু গলায় বললেন সেলিম, অন্যায় না।
বাবা, জীবন বড়ই অদ্ভুত।
জীবন বড়ই অদ্ভুত। আমি জানি এটা। আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশি দেখেছেন। আপনি আমার চেয়ে এটা অনেক ভালো জানেন।
শুধু যে তাকে আমার হঠাৎ বলার ইচ্ছা হইছিল, জীবন এই জন্য অদ্ভুত না। জীবন আসলে বাবা এমনিতেই অদ্ভুত।…সেলিম হাসল- একটা ব্যাপার খেয়াল করছেন?
করেছি। আপনি আমাকে বাবা বাবা করে বলছেন।
জি, বাবা বাবা বলতেছি। আপনে রাগ হন নাই তো?
না। আমার ভালো লাগছে।
আপনে কি এই এলাকায় আবার আসবেন?
এটা তো বলা মুশকিল। একটু আগেই বললেন, জীবন অদ্ভুত। এমন হতে পারে, এই সুখানপুকুর আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
সেলিম মাথা ঝাঁকাল- হইতে পারে।…আপনি এলে ভালো লাগবে।
শোয়েব উত্তর দিতে চাচ্ছিল, তার আগে মাহজাবিনের ফোন এলো। শোয়েব সেলিমের দিকে তাকিয়ে কুণ্ঠার হাসি হেসে বলল, একটু ধরি ফোনটা? না ধরলে পরে মেজাজ দেখাবে।
ধরেন ধরেন। ধরবেন না ক্যান!
শোয়েব মাহজাবিনের ফোন ধরল- বলো।
হাসনাইন সাহেব…।
বলো।
আমার বিয়ের আগেই আমাকে ভুলে গেলে! বিয়ে হয়ে গেলে কী যে হবে।
কী হবে! বিয়ে হয়ে গেলে তোমার বিয়ে হয়ে যাবে।
তুমি বগল বাজাবে?
আমি ব্যান্ড পার্টির লোকজনের সঙ্গে আসব।
ওহ্।…কখন রওনা দিচ্ছ? তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে।
শোয়েব কথা শেষ করে সেলিমের দিকে তাকালে সেলিম জিজ্ঞেস করল, আপনে কথাটা কি সত্য বলছিলেন?
কোন কথা? শোয়েব মনে করার চেষ্টা করল। পারল না।
আপনার বান্ধবীর সঙ্গে আপনার সত্যিই বিবাহ হবে না?
সত্যি কথা। কারণ বিয়ে হওয়ার কারণ নেই।
সব কিছু কি কারণ ধইরা চলে?
কারণের বাইরে কিছুই হয় না।
তাহলে আপনারা বিবাহ করার কারণ বাইর করেন।
এটা হবে না। আমরা দুজনই বাস্তবটা মেনে নিতে চাচ্ছি। তা ছাড়া আমি জানি না জাবিন আসলে কী চায়।
আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেন। দেখেন, ফোন ধরে আপনি একটু দূরে সরে গেছেন। আপনাদের মধ্যে কী কথা হইছে, তা আমি জানি না। তবু আমি ঠিকই বুঝছি এইটা আপনার বান্ধবীর ফোন।
হুঁ।
কেমনে বুঝলাম, বলতে পারবেন?
কিভাবে?
আপনার মুখে ভালোবাসার একটা ছায়া পড়ছিল। অর্থাৎ ওই মেয়েরে আপনে ভালোবাসেন। যারে ভালোবাসেন, তার মনের কথা কী, এইটা আপনার না বোঝার কথা না।
শোয়েব হাসল- বুঝলাম। কিন্তু সব সময় বুঝলেই কি হয়? বোঝাই শেষ কথা না।
সেলিম এমনভাবে মাথা নাড়ল যেন শোয়েবের সঙ্গে সে একমত আবার সে যে একমত হয়েছে, এই নিয়ে তার ভেতর দ্বিধা। তার কিছু বলার ইচ্ছা, তবে ঠিক কিভাবে বলবে, এটা সে বুঝতে পারছে না। সে কিছু না বলে শোয়েবের দিকে তাকিয়ে থাকল।
আমরা কী কথা বলছিলাম? শোয়েব জিজ্ঞেস করল।
আপনার দাওয়াত থাকল। আপনার আর আপনার বান্ধবীর। আপনারা বিবাহের পর এখানে বেড়াইতে আসবেন।
শোয়েব হাসতে আরম্ভ করল।
বাবা, আমি হাসির কিছু বলি নাই।
ঠিক আছে, বলেন নাই।
আমি এখন আপনাকে একটা কথা বলব। সেলিমের গলার স্বর হঠাৎ বদলেছে। এতক্ষণ সে ঠিক এভাবে কথা বলছিল না। তার বলার ভঙ্গিতে কিছু একটা ছিল। শোয়েব সামান্য হলেও চমকাল।
এই কথাটা…সেলিম বলল, ঠিক করছিলাম একদম শেষে বলব। ধরেন আপনে বাসে উঠে গেছেন।
তখন বললাম।
তখন বলবেন না? এখন বলতে ইচ্ছা করছে?
হ্যাঁ, আমি কি এখন বলব? আপনি শুনবেন?
শুনব না কেন! আমি শুনতেই চাই।
ওই যে মেয়েটা চলে গেল না…?
হ্যাঁ। বলেছেন আপনি। চলে গেল।
মেয়েটা চলে গেল, ট্রেনে উঠল, ট্রেন ছেড়ে দিল, ট্রেন চলে গেল। আমার মনে হলো, তারে আমি বলতে পারতাম, থেকে যাও।
তাকে থেকে যাও বলতে পারতাম।
সেলিম সামান্য মাথা দোলাল।
কিন্তু তখন কি আর ওই কথা বলার যুক্তি আছে?
যুক্তির কথা বলতে পারব না। আর…আর…।
শোয়েব তাকিয়ে থাকল সেলিমের দিকে।
আর ধরেন…ওই রকম আমার বলার ইচ্ছা হইছিল, কথা এইটাই। যুক্তির কথা জানি না। থেকে যাও- এই রকম আমি তারে বলতে পারতাম।

হাঁটতে হাঁটতে শোয়েব আর মাহজাবিন কফি ওয়ার্ল্ড পার হয়ে গেল। তাদের কফি খেতে খেতে আড্ডা দেওয়ার কথা। সঙ্গে ব্রাউনি থাকবে। মাহজাবিন এটার নাম দিয়েছে বিদায় মিলন। বিদায় মিলন অর্থাৎ বিদায়ের আগে মিলন। এই নিয়ে শোয়েবের আপত্তি- তুমি এমন একটা নাম দিয়েছ, ধরেই নিয়েছ আমাদের আর দেখা হবে না।
আমাদের নিশ্চয় দেখা হবে। তবে নাম ঠিকই আছে।
তাহলে বিদায় মিলন কেন! নামটাও পচা।
হোক। বিদায় মিলন এ কারণে যে এটা বিদায়ের আগে শেষ মিলন। এর পরও তোমার সঙ্গে নিশ্চয় আমার দেখা হবে; কিন্তু সেসব দেখা কোনো অর্থ বহন করবে না।
তুমি খুব নিষ্ঠুরের মতো কথা বলো।
হ্যাঁ, আর তুমি ঠোঁটে চিনি মাখিয়ে রাখ। শোনো…।
বলো।
আজ যখন দেখা হবে মুখে করল্লার রস মাখিয়ে রাখবে না।
রসগোল্লার রস লাগিয়ে রাখতে হবে?
হুঁ।
আমার অত রস নেই।
তোমার রস না, রসগোল্লার রস। শোনো হাসনাইন, ব্যাপারটা উপভোগ করো।
করছি তো। কিন্তু একটু দুঃখ দুঃখ ভাবও রাখতে চাচ্ছি।
কী দরকার! একটা প্রেম, প্রেমই থাকল, বিয়েতে গেল না- এটুকুই ব্যাপার।
বিয়েতে গেল না- এই এটুকুই উপভোগ করব?
হ্যাঁ।
বিয়েতে গেল না। এত দুঃখ দেখব না?
না।
বেশ।
তারা কফি ওয়ার্ল্ড পার হয়ে এলে দুজনেই পেছনে ফিরে তাকাল, থামল না। তারা হাঁটতে হাঁটতে ২৭ নম্বর রোডের প্রায় মাথায় চলে এলো।
কী করবে? মাহজাবিন জিজ্ঞেস করল।
ওই যে জেনেটিক প্লাজা। শোয়েব বলল। ওখানে একটা হাসপাতাল আছে। ডাক্তাররাও বসে। আমরা ডাক্তার দেখাতে পারি।
কেন?
এমনি।…এমনি দেখলাম। কিছু করার নেই তো।
চলো, ফিরে যাই। কফি ওয়ার্ল্ডেই বসব।
তারা কফি ওয়ার্ল্ডে এসে বসল। তারা এখানে পরিচিত মুখ। শোয়েব জানাল অর্ডার পরে দেবে। আধাঘণ্টা পর। সে ফিরল মাহজাবিনের দিকে- তুমি বিয়ের পরপরই চলে যাচ্ছ?
বিয়ের পর বউকে কে ফেলে রাখে। বলো যদি নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে। নিয়ে যাবে। আমার যাওয়ারই ইচ্ছা। থেকে কী হবে।
কিছু না।
হুঁ, কিছু হবে না। হাসনাইন, আমার জন্য তোমার খারাপ লাগবে।
একটু।
একটু!
বেশি লাগলে আমার অসুবিধা হতে পারে। তোমার?
কী?
তোমার খারাপ লাগবে?
আমারও একটু।
তোমারও একটু!
হ্যাঁ, বেশি করলে আমার সংসার করতে অসুবিধা হতে পারে। আমার সংসার করতে অসুবিধা হোক, তুমি কি সেটা চাও?
মাঝে মাঝে মনে হয় তেমনই হোক, সংসার করতে অসুবিধা হোক তোমার।…না, চাই না।
গুড বয় হাসনাইন।…কী ঠিক করেছি জানো? ওখানে সিনেমাটোগ্রাফির ওপর পড়াশোনা করব। নির্দিষ্ট করে বললে ডিরেকশন। এটা আমার অনেক দিনের শখ, তুমি জানো?
হুঁ। জানি।
তুমি আমাকে একটা চিত্রনাট্য করে দেবে?
আমি!
তুমিই পারবে, আমি জানি।
দেব তাহলে।
তোমার চিত্রনাট্য নিয়ে হবে আমার প্রথম কাজ। হাসনাইন।
শোয়েব তাকিয়েই ছিল মাহজাবিনের দিকে। সে ডাক শুনে আরো একটু তাকাল।
আমরা এখন আর আমাদের কথা বলব না।
আচ্ছা।
কী লাভ বলে! তুমি কফির অর্ডার দাও। কফি খেতে খেতে তোমার ওই গল্পটা শুনব। তুমি ওই গল্পের শেষ অংশ আমাকে এখনো বলোনি।

বড় বোন সাজরিন ফোন করল রাতে- তুই কেমন আছিস?
আমার জন্য ভালো পাত্র জোগাড় করেছিস। খারাপ কী করে থাকি বল?
খোঁচা মারব কেন! তুই কি খোঁচা মারার মতো কাজ করেছিস? তোর কী মনে হয়?
আমি যা করেছি তোর ভালোর জন্য…।
তুই কী বলবি, সেটা বল।
এসব বলব।
এসব বলার কী দরকার। আমি কি ‘না’ বলেছি নাকি? আশ্চর্য তো।
শোন, ছেলেটা খুবই ভালো।
তাই? তোকে খালাম্মা খালাম্মা বলে খুব সম্মান করে?
সাজরিন রেগে গেল- আমাকে কেন খালাম্মা বলবে!
ওহ্, তা হলে খালাম্মা বলে না?
আশ্চর্য! জাবিন, তুই কী ইয়ার্কি মারছিস এসব!
তোদের শেষ ভিডিও যেটা দেখলাম, বাপরে কী যে মোটা হয়েছিস তুই। আপি, তোর এখন ওজন কত?
তোর সঙ্গে কথা বলা আর শয়তানের বিবির সঙ্গে কথা বলা একই কথা।
শয়তানের বিবি! বাহ্! জানিস, হাসনাইনকে সবাই শয়তানের বিবি বলে।
হাসনাইনটা কে?…ও, বুঝেছি। ফালতু একটা।
ফালতু? বুঝে ফেলেছিস! শোন, আমার এক্স প্রেমিককে ফালতু বলার অধিকার তোর নেই।
হুঁ, ওসব প্রেমিক অনেক দেখেছি।
প্রেম করতি তিনটা। প্রেমিক তো দেখছিই।
আমি…আমি তিনটা প্রেম করতাম!
আর কী করতি, সেটা বলব না।…আমি, শোন।
কিছুক্ষণ সময় নিল সাজরিন, থমথমে গলায় বলল- বল।
একটা ব্যাপার একটু ফাইনাল করে নেওয়া দরকার। বিয়ের পর ছেলেটা আমার কথা শুনবে তো?
তুই নিশ্চয় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলবি না।
না, অতটা দরকার হবে না। তুই তো জানিস, আমার সিনেমা নিয়ে আগ্রহ আছে। আমি ডিরেকশনের কাজটা শিখতে চাই।
তো? কী করতে হবে?
তুই ওই ছেলেকে বলে রাখবি, আমাকে যেন ওখানে কোনো কোর্সে ভর্তি করিয়ে দেয়।
ও মা, এটা কোনো ব্যাপার হলো! দেবে না কেন!
আমি সিনেমা বানাব, বুঝেছিস?
বানাবি। নিশ্চয় বানাবি।
আচ্ছা, এক কাজ কর। তুই ওই ছেলের ফোন নাম্বারটা দে।
কথা বলবি? গুড। গুড ডিসিশন।
আমিই কোর্সের কথা বলে রাখব। তোকে বিশ্বাস নেই।
ইয়ার্কি মারছিস? ঠিক আছে, তুই-ই বল। তোদের কথা শুরু হোক।
কথা তো শুরু হয়েছে। দুদিন কথা বললাম না! কিন্তু ফোন নাম্বার নেই।
মাহজাবিন সাজরিনের কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে লাইন কেটে দিল।

রেলস্টেশন নিয়ে তার লেখাগুলো পাঠকরা পড়ছে। পত্রিকায় চিঠি এসেছে, শোয়েব নিজে ফোন পেয়েছে বেশ কিছু। সুখানপুকুর নিয়ে যে পর্বটি, সেটি ছাপা হওয়ার পর পাঁচ কপি পত্রিকা পাঠিয়েছে সে সেলিমের ঠিকানায়। সেলিম খুব খুশি হয়ে তাকে ফোন করেছিল- খুব খুশি হইছি বাবা। আপনি আবার কবে আসবেন?
সম্পাদকের সঙ্গে বার দুই কথা হয়েছে শোয়েবের- এর পর কী করবে? কিছু ভেবেছ?
শোয়েবের ইচ্ছা রেলস্টেশনের মাস্টার বা আর কারো ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে লিখবে সে। শুধু তো সুখানপুকুরের সেলিমের না, আরো কয়েকজনের গল্প সে শুনেছে। শোয়েবের ধারণা, পাঠক এসব খুব পছন্দ করবে।
সম্পাদক সাহেবের অবশ্য ভিন্নমত- উঁহু।
কেন রশীদ ভাই, গল্পগুলো কিন্তু ইন্টারেস্টিং।
তোমার আরো দুটি কিস্তি বাকি আছে, তাই না?
জি, আর তিনটা।
বেশ কয়েক দিন ধরেই কিন্তু ছাপা হলো। এরপর আবার যদি তুমি রেলস্টেশন নিয়েই শুরু করো, পাবলিক খাবে না, হোক সেটা ব্যক্তিগত গল্প, নানা রকম, রেলস্টেশন ব্যাপারটা থাকবে বলেই পাঠক বিরক্ত বোধ করবে।
তা বটে। শোয়েব বলল এবং সে ভেবে দেখল কথা মিথ্যা না।
তুমি অবশ্য একটা কাজ করতে পার।
জি, বলেন।
সবগুলো গল্প নিয়ে শেষ দিন একটা লেখা লিখতে পার। একটু বেশি স্পেসই না হয় তোমাকে দেওয়া হলো।
প্রথমটায় শুনে শোয়েবের ভালো লাগেনি, পরে তার মনে হয়েছে, আপাতত এটাই সেরা ব্যবস্থা। লোকজন আবার রেলস্টেশনের গল্প শুনতে বিরক্ত বোধ করবে। এখানে আরো একটা ব্যাপার আছে। তার শোনা গল্পগুলো অধিকাংশ এমন, পাঠকের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন। সেলিমের গল্পটা নিয়েই সেদিন তার মাহজাবিনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলল, এটা কোনো গল্প, বলো!
মাহজাবিন অবশ্য সেই মুহূর্তে একমত না- এটা গল্প না!
আমার কাছে এটা গল্প। কারণ আমি এটা যার গল্প, তার মুখ থেকে শুনেছি। গল্পের পরিবেশ আমি বুঝেছি- এইসব মিলে।
কিন্তু আমার কাছেও এটা গল্প।
কারণ তুমি আমার মুখ থেকে শুনেছ। অন্য অধিকাংশের মনে হতে পারে- এটা কী! তা হতে পারে। নির্জন একটা রেলস্টেশন। স্টেশন মাস্টার একা থাকে। ছোট স্টেশন, সারা দিন অল্প কিছু ট্রেন যায় আসে, যাত্রীও নামে হাতে গোনা, সারা দিন স্টেশন মাস্টারের বলতে গেলে প্রায় কিছুই করার নেই।
এই, এই পটভূমিটাই গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন হতো, প্রচুর ব্যস্ততার একটা স্টেশন। ট্রেন একটার পর একটা এসে থামছে, লোকও নামছে অনেক, তখন কি এ রকম কোনো ঘটনা ঘটতেই পারত?
এ রকম কোনো ঘটনা ঘটতেই পারত। কিন্তু সেটা কি স্টেশন মাস্টারের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত?
কথা এটাই। তোমার কী মনে হয়, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত।
পারত, আমি মনে করি পারত। কেন, বলি সেটা। আমি মনে করি সব মানুষের ভেতরই কিছু একটার জন্য অপেক্ষা থাকে। তুমি যে সেলিমের কথা বলছ, তার অপেক্ষার সঙ্গে তার ঘটনাটা মিলে গেছে। অর্থাৎ তার ঘটনাটাই এমন ছিল। আবার ধরো, খুব ব্যস্ত কোনো রেলস্টেশন। স্টেশন মাস্টারেরও ফুরসত ফেলার সময় নেই। অনেকেই আসছে যাচ্ছে, ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছে, এর মধ্যে হঠাৎ কারো আগমন ও অবস্থান স্টেশন মাস্টারকে থমকে দিতে পারে, তার ক্লান্তি দূর করতে পারে, আবার তার প্রস্থান মাস্টারকে নতুন করে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। তার মনে হতে পারে- এত ক্লান্তি এত ক্লান্তি জীবনে! এবং পরে তার এমনও মনে হতে পারে, তার পরে মনে হতে পারে- মেয়েটাকে সে বলতে পারত- থেকে যাও।
তুমি কি জানো, এই থেকে যাও শব্দ দুটো শুনে আমার বুকের ভেতর হু হু করে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, এর চেয়ে বেশি আকুতি আর কিছুতে নেই।
থেকে যায়নি বলেই শব্দ দুটো সুন্দর।
শব্দ দুটো এমনিতে সুন্দর না?
তোমার সেলিম সাহেব, উনি তো বিবাহিত, তাই না?
হুঁ। এক দুপুরে খেলাম ও বাসায়।
কী মনে হলো, সুখের সংসার?
সেটা কি এক দুপুরে বুঝে নেওয়া যায়! এমনিতেই পরিপাটি…গোছানো…।
এক দুপুর কেন বহু দুপুরেও সেটা বোঝা নাও যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে মানুষের বোঝা অধিকাংশ সময়ই ডিসেপটিভ। সে যাক। ধরো স্টেশন মাস্টার সেলিম মেয়েটিকে বলল, থেকে যাও। মেয়েটি থেকে গেল। তারপর কী হতো তাদের? তাদের সংসার হতো। তাদের বাচ্চাটাচ্চা হতো। না হাসনাইন, আমার ধারণা- এই থাকার কথা তোমার সেলিম মাস্টার বলেনি। সেলিম মাস্টার শুধুই থেকে যাও বলেছিল, সে জন্যই এটা অত সুন্দর।
এই শুধুই থেকে যাও- এ ব্যাপারটা কী রকম?
এটা একটা আকুতি হাসনাইন, এটা একটা ইচ্ছা- থেকে না যাওয়ার মধ্যে এর সৌন্দর্য। ভাবো, থেকে যদি যেত, এই গল্পটা ওভাবে তৈরি হতো?
উঁহু। দুপাশে মাথা নেড়েছিল হাসনাইন। না, হতো না।
আমার অবশ্য এখনো ধারণা, এটা একটা গল্প, প্রবল মানসিক ঘোর থেক তৈরি…।
মাহজাবিনকে কথা শেষ করতে দেয়নি শোয়েব- উঁহু, একমত না। আমি সামনে বসে এই গল্প শুনেছি।
সামনে বসে শুনলেই কি সব গল্প সত্যি হয়ে যায়!
আমি তার মুখ দেখেছি। তার আন্তরিকতা…।
জীবনে কিছু কিছু কল্পনার প্রতি মানুষ খুবই আন্তরিক থাকে।

মাহজাবিনকে ডেকে পাঠাল রাকা। আজ ছুটির দিন। বদরুলও বাসায়। রাকা ঠিক করেছে সে কেনাকাটা শুরু করবে। না, আরো অনেকের মতো ইন্ডিয়া বা সিঙ্গাপুর যাওয়ার ইচ্ছা তার নেই। আদিখ্যেতা সে পছন্দ করে না। তবে মাহজাবিন যদি যাওয়ার বায়না ধরে, যাবে। তার ধারণা, মাহজাবিন অমন বায়না ধরবে না। মেয়েটার মধ্যে উৎসাহ কম। তবে সে চায়, নিজের বিয়ের বাজারটা মাহজাবিন নিজে করুক, সে থাকবে সঙ্গে, তবে মাহজাবিন নিজে করুক।
সে বদরুলকে বলল- শোনো, আমি এখন জাবিনকে ডেকে পাঠাব। তুমি কিন্তু ওর পক্ষ নেবে না।
বদরুল বলল- কী বলো! আমি সব সময় তোমার পক্ষের লোক।
তুমি হচ্ছ মিচকা শয়তান। আমার পক্ষে থাকবে।
আহা, সে আর বলতে!
আর জাবিনের সঙ্গে যখন কথা বলব, যেন এই পৃথিবীতেই তুমি নেই, এমন ভাব নিয়ে তুমি এখান থেকে উঠেও যাবে না।
আরে না না, কী বলো!…তা, কী নিয়ে কথা বলবে ওর সঙ্গে?
ওর বিয়ের বাজার নিয়ে। এটা শুরু হওয়া দরকার।
তা তো নিশ্চয়ই। তবে ডেট ঠিক হলে…।
ডেট তো ঠিক হবে। হবে না? বদরুল, তুমি জ্বালাও কেন!
ডেট তো ঠিক হবেই। তবে বাজার এসব হচ্ছে তোমাদের ব্যাপার। আমি থেকে কী করব?
কিছু করতে হবে না। চুপ করে বসে থাকবে। চলবে?
বদরুল মাথা নাড়ল- চলবে।
রাকা মাহজাবিনকে ডাকল এবং মাহজাবিন বলল সে বিয়ের বাজার নিয়ে ভাবছে না।
রাকা অবাক গলায় বলল- তোকে ভাববে, আমি?
সেটাই উচিত মা। মাহজাবিন বলল। তোমার একবার বিয়ে হয়েছে, তুমি ভালো বুঝবে।
এসব কী কথা জাবিন?
শোনো মা, তুমি ব্যাপারটা সেরে ফেল। কবে থেকে শুরু করবে?
তুই বললে কাল থেকেই শুরু করব।
কাল? মাহজাবিন একটু ভাবল। কাল না, দুটো দিন সময় নাও।
তার পর থেকে তুই সঙ্গে থাকবি তো?
দুটো দিন সময় নাও তো আগে।
আচ্ছা। এখন লিস্টটা কি একটু দেখবি?
না, এখন ইচ্ছা করছে না। পরে দেখব।
রাখ তোর কাছে। ইচ্ছা হলে দেখবি। যোগ-বিয়োগ করবি, যদিও বিয়োগ করার কিছু নেই। যোগ করার থাকতেই পারে।
রাখো তোমার কাছে। নেব আমি।
মাহজাবিন রাকাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাকা হতাশ গলায় বলল- আমি জানতাম।
বদরুল মাথা দোলাল- আমিও।
রাকা বিরক্ত হয়ে বদরুলের দিকে ফিরল- কী, কী জানতে তুমি!
এই যে, জাবিন লিস্ট দেখতে চাইবে না।
খুব বুঝি আনন্দের ব্যাপার এটা?
না, না, তা কেন হবে! তবে ও হচ্ছে মুডি। হয়তো এক ঘণ্টা পর এসে বলবে- দেখি মা, লিস্টটা দাও তো দেখি।
ছাই বলবে। শোনো, কাছে আসো। পাশে বসো। লিস্টটায় চোখ বোলাও।
আমি! আমি কি এসব বুঝব!
হ্যাঁ, তুমি। রাকা প্রায় গর্জন করেই উঠল। আর বুঝবে না কেন! বিয়ে করোনি?
মুখ খুলতে গিয়ে থমকে গেল বদরুল। কিছুক্ষণ সে চুপ করে থাকল। রাকার দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসল। রাকা ভুরু নাচাল- কী?
আমাদের বিয়ের কথা মনে পড়ে গেল। কী যে অসহায় ছিলাম আমরা!
রাকা হাসল সামান্য।
আমার শুধু তোমার সাহসের কথা মনে হয়…।
কী করব! সাহস না দেখিয়ে আর কি উপায় ছিল?
কোনোমতে তোমার একটা শাড়ি কিনেছিলাম…।
শাড়িটা সুন্দর ছিল বদরুল…।
ওটা মাহজাবিনকে দিয়ে দিয়েছ?
না। ও চেয়েছিল। কিন্তু ওটা দিয়েছি আরমানের বউকে, ওটাই নিয়ম। ছেলের বউকে।
হুঁ।…স্যুটকেসটা আছে? বদরুলের মুখে চাপা হাসি।
সেই হাসি খেয়াল করল রাকা- তুমি কি মজা করছ?
ঢং?
নাহ্। মাথা নাড়ল বদরুল। হাসি একটু পাচ্ছে বৈকি। কারণ নেই। তবে ওই ছবিটাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, প্রায়ই দেখি, তুমি ছোট একটা স্যুটকেস হাতে দাঁড়িয়ে আছ। তোমার মুখে ক্লান্তি ও আতঙ্ক, আমাকে দেখার পর এমন হলো তোমার যেন তুমি কেঁদে ফেলবে…।
রাকার মুখে মৃদু হাসি ছড়াল- কী ভয়ে যে ছিলাম, তা যদি তুমি বুঝতে!

রাত ৩টা যখন শোয়েবের ফোন বাজতে লাগল। আগে সে ফোন অফ করে শুতো। অনেকে বলল, সাংবাদিকের ফোন অফ থাকতে নেই। যদিও সে সে ধরনের সাংবাদিক না, যার কাছে গভীর রাতে জরুরি ফোন আসবে, সে ফোন অন রাখতে আরম্ভ করল, তবে রিঙার সে অফ করে রাখল। অনেকে বলল, রিঙারই যদি অফ রাখবে তবে ফোন অন রেখে লাভ কী, বিশেষ করে সে যখন ঘুমাচ্ছে! সুতরাং এখন শোয়েব ফোন অন করে রাখে, রিঙারও, একটু কম ভলিউমে। একে কম ভলিউমে, আর সে ছিল গভীর ঘুমে, ফোন যে এসেছে, এটা বুঝতে বুঝতেই শোয়েব বেশ কিছুটা সময় নিল। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সে ফোনটা কার, সেটাও দেখল না। সে বিরক্তির সঙ্গে বলল- হ্যালো, কে?
ওপাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর হতাশ নারী কণ্ঠ শোনা গেল- হায়, তুমি আমাকেও চিনতে পারছ না!
কে?…কে, হ্যাঁ?
তুমি সুস্থ আছ?
কে?…ও, জাবিন তুমি! শোয়েবের গলায় বিস্ময়। সে সত্যিই অবাক হয়েছে। বেডসাইড টেবিল থেকে সে হাতঘড়ি নিয়ে দেখল। রাত ৩টা। রাত ৩টায় কেন জাবিন তাকে ফোন করেছে? সে বলল- জাবিন, কী হয়েছে তোমার?
হয়নি। হবে।
কী?
তুমি কী করছ?
আমি কী করছি মানে! রাত ৩টায় আমি কী করব! ঘুমাচ্ছি।
ওহ্ গড, ওহ্ গড! এমন একটা রাতে তুমি ঘুমাচ্ছ?
আজ কি পূর্ণিমা?
বেশ আগে একবার এমন হয়েছিল। জাবিন শোয়েবকে বলেছিল- একটা কাজ করবে? আজ সারা রাত ঘুমাবে না। পারবে?
পারব। কিন্তু না ঘুমিয়ে কী করব? তোমার কথা ভাবব?
না। আজ পূর্ণিমা। তুমি ছাদে বসে পূর্ণিমা দেখবে। আমার কথা ভাবতে হবে না। কারণ আমি ঘোর তৈরি করতে পারি না, পূর্ণিমা পারে।
কী যে বলো! তুমি ঘোর তৈরি করতে পার না?
তেল দিও না হাসনাইন। আমি তেল পছন্দ করি না। আমি জানি আমি কী, আমি কী না। যা বলেছি তা করবে। ছাদে বসে, শুতেও পার- পূর্ণিমা।
বন্ধুরা মাহজাবিনকে বেশ কয়েকটি নামে ডাকে। পূর্ণিমা নিয়ে বাতিকের কারণে তার একটি হলো- পূর্ণিমা পাগলী।
মাহজাবিন বলল- না, আজ পূর্ণিমা না। হলে ভালো হতো। তবে পূর্ণিমা যে না, তার জন্য ক্ষতিও হয়নি কোনো।
কিন্তু কী, সেটা বলো।
রেডি হতে বেশি সময় নিও না হাসনাইন। প্লিজ, তাড়াতাড়ি।
শোয়েব বলল- আমি বুঝতে পারছি না। রেগো না। একটু খুলে বলবে?
খুলে বলার কিছু নেই হাসনাইন। জ্বালাবে না?
কী? শোয়েব সত্যই বুঝতে পারল না।
তোমাকে আরো আগেই জানাতে পারতাম। কিন্তু সানির সঙ্গে কথা বলতে হলো।
সানি কে?
যার সঙ্গে আমার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল।
কী বলেছ ওকে?
বললাম ওকে আমি বিয়ে করতে পারছি না। স্যরি বললাম। স্যরি অবশ্য বললাম এই কারণে যে বিয়েটা যে করতে পারব না এটা আমার আগেই জানানো উচিত ছিল।
দেখো, তুমি কী বলছ, আমি কিন্তু সত্যিই বুঝতে পারছি না।
সানি আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। তবু বললাম- দেখুন, আমি আসলে হাসনাইন নামে একজনকে ভালোবাসি। আমার ধারণা, তার সঙ্গেই আমার জীবনটা সুন্দর হবে।…হাসনাইন, তোমার কী ধারণা? আমি ঠিক বলেছি তো?
শোয়েব তোতলাতে আরম্ভ করল।
মাহজাবিন বলল- এই যে তুমি তোতলাচ্ছ, আমার ভালো লাগছে। আমি বুঝতে পারছি তুমি আনন্দে আটখানা। ভুল বললাম?
ষোলো ষোলো ষোলো। ষোলো আনা।
সুখানপুকুরের ট্রেন সকাল ৭টায়, তাই না?
হুঁ, ৭টায়। বলেছি তোমাকে।
তুমি তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও। চলে আসো। আমি অপেক্ষা করছি।
তারপর?
আমাকে তুমি নিয়ে যাবে। আমরা স্টেশনে গিয়ে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকব। ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে ভালো লাগে। লাগে না? তারপর ট্রেন আসবে। আমরা সুখানপুকুর চলে যাব।
…কোথাও কোনো সমস্যা দেখছ?
না। একটুও না, একটুও না।
শোনো, তোমার গাড়ি নেই, কিন্তু গাড়ি নিয়ে আসতে হবে তোমাকে। পারবে? ভোররাতে রিকশা করে যাওয়া ভয়ের ব্যাপার। হাইজ্যাকার। গাড়ি আনতে পারবে তো?
বাস, বাস নিয়ে আসব?
আসো।…হাসনাইন…?
বলো।
তুমি খুশি হয়েছ?
খুউব।
তোমার কী করতে ইচ্ছা করছে?
বিশ্বাস করো জাবিন, খুশিতে আমার নাচতে ইচ্ছা করছে।
মারব থাপ্পড়, ফাজিল কোথাকার! দমকা হাসি চেপে মাহজাবিন বলল। এমন ভাব করছ যেন তুমি জানতে না এমন ঘটবে। জানতে না?
শোয়েব হো হো করে হাসতে আরম্ভ করল- জানতাম তো।

মাহজাবিন আর শোয়েবের বিয়ের রাতে সত্যিই পূর্ণিমা নামল। মাহজাবিন ফিসফিস করে বলল- আমার পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছা করছে।
তারা যখন পৌঁছাল সুখানপুকুর, রেলস্টেশনে ছিল সেলিম আর ফারুক। সেলিম সামনে, ফারুক পেছনে। তাদের দেখে সেলিম চিৎকার করতে আরম্ভ করল- আমি জানতাম, সত্য কই, এইটা আমি জানতাম।
মাহজাবিন কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের অপেক্ষা করল না। সে সেলিমকে হাসিমুখে বলল, আপনি জানতেন বলেই আমরা এলাম। আপনার জানা তো মিথ্যা হতে পারে না।
তারা উঠল সেলিমের বাসায়। মাহজাবিন বলল, আমরা থাকব দুই রাত। আজ আর কাল। পরশু দুপুরে আমাদের বিয়ে। রাতে আমরা চলে যাব।
এইটা কী কথা! সেলিম চোখ কপালে তুলল। যেই দুপুরে বিবাহ, সেই রাতে রওনা!
জি। ব্যবস্থা সে রকমই।
শুনেন মা, এইটা হয় না। আপনারা আসছেন, থাকবেন।
একটা ব্যাপার আছে। এটা বিশেষ ব্যাপার। কাউকে বলব না ঠিক করেছি। আপনি নিশ্চয়ই শোনার জন্য জোর করবেন না? মাহজাবিন এমনভাবে বলল, সেলিম আর জোরগলায় কথা বাড়াবার সুযোগ পেল না। সে অবশ্য মৃদু গলায় বলল- এইটা কোনো কথা হইল!
হলো। এটা একটা মাইনসের মতো। হাসনাইন, মানে শোয়েব জানে।
শোয়েবকে অবাক দেখাল, কারণ সে জানে না। কিন্তু সেটা সে বুঝতে দিল না। সে একটা গম্ভীর হাসি ঝুলিয়ে রাখল মুখে, পরে যখন একা পেল মাহজাবিনকে, জিজ্ঞেস করল- ব্যাপার কী
কী জানি আমি?
তুমি জানো না। এমনি বলেছি।
তাহলে বলো এখন।
এখন?…না, এখন না। তোমাকে তো বলবই। এখন বরং আমরা অন্য কথা বলি। তোমার কী ধারণা ইন, তুমি স্বামী হিসেবে কেমন হবে?
ভাবতে হলো না শোয়েবের, সে বলল, ভালো হব না।
আমারও সে রকমই ধারণা। কিন্তু সমস্যা কী জানো, তোমাকে ছাড়া আমি আমার বাকি জীবনটা কল্পনা করতে পারছিলাম না।
দেখো, জীবনটা কেটে যাবে। সানি সাহেবের সঙ্গে বিয়ে হলেও কেটে যেত। ‘থেকে যাও’ না বলতে পেরেও সেলিম ভাইয়ের যেমন কাটছে। আবার থেকে যাও বলে ফেললেও কাটত।
ফিলোসফি? ইন, আমি ফিলোসফি তোমার চেয়ে কম বুঝি না।…আচ্ছা, সেলিম আঙ্কেল কি জানেন, ওনার গল্পটা আমি জানি?
না। ওনার এটা জানার কথা না।
বোলো না। আমি বলব।…আচ্ছা, তুমি বলতে পারবে আমরা এখানে কেন এসেছি?
এখানে! তুমি এলে, তাই।
আমি কেন এলাম? আমরা ঢাকা শহরেই বিয়েটা সারতে পারতাম।
শোয়েব দুপাশে মাথা নাড়ল- বলতে পারব না। জানি না।
মাহজাবিন মাথা ঝাঁকাল- জানার কথা না। আমিও জানি না।

ব্যবস্থাটা এমন হলো- কনে থাকবে সেলিমের বাসায়, বর আসবে ফারুকের বাসা থেকে। শোয়েবের থাকার ব্যবস্থাও এ দুই দিন ছিল ওখানে। সে কিছুটা ঝামেলার মধ্যেই ছিল। তাদের বিয়ে নিয়ে সেলিমের উৎসাহ বিশাল, ফারুকের উৎসাহ তার চেয়ে অনেক বেশি। সে এটা করতে চায়, ওটা করতে চায়। সে ঠিক করে, হাতি নিয়ে আসবে, বরং হাতিতে করে যাবে, সে এসব প্রস্তাব কখনো শোয়েবকে দেয়, কখনো সবাইকে। সেলিম বেশ কিছুটা উৎসাহ দেখায়, তবে জাবিনের কাছে এসে তার সব প্রস্তাবই বাতিল হয়ে যায়। সে বলেছে, আমাদের বিয়েতে ১৭ জনের বেশি লোক হবে না।
১৭ জন কেন, এই নিয়ে সেলিম আর ফারুক গভীর চিন্তায় পড়ে, শোয়েবও।
জাবিন বলে, ১৭ সংখ্যা একটা বিশেষ সংখ্যা। তবে কেন বিশেষ, এটা এ মুহূর্তে বলা যাবে না। শোয়েবকেও সে বলতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত সে অবশ্য ১৭ সংখ্যার বাধ্যবাধকতা থেকে সরে আসে। সে বোঝানোর মতো করে বলে, ভিড় আমাদের ভালো লাগে না।
বিবাহ করবেন, লোক আসবে না, হৈচৈ হবে না?
কারা হৈচৈ করবে? তারা আমাদের চেনে?
চিননের দরকার কী! বিবাহে হৈচৈ এমনিই করা যায়।
করা যায় হয়তো। কিন্তু আমরা সেটার দরকার দেখছি না। শুধু আপনাদের দুই পরিবার। এর বাইরে আর কারো থাকার যুক্তি আছে, বলেন?
সেলিম কিছুটা বুঝলেও ফারুক এটা বুঝতে চায় না। সে গ্রামের লোককে খাওয়াবে, সে হাতি নামাবে, সে গান আর নাচের আসর বসাবে।
এর মধ্যে দুবার রেলস্টেশনে গেছে জাবিন- দেখেছ, এখন মনে হয় অমন একটা গল্প তৈরি হয়েছিল এখানে?
শোয়েব বলেছে, গল্প এখনো তৈরি হতে পারে। অন্য রকম। গল্প সব সময়ই তৈরি হতে পারে। চিত্রনাট্য আলাদা হবে, এই যা।
তোমাকে যে চিত্রনাট্যের কথা বলেছিলাম, কত দূর?
গোছাচ্ছি।
শুরুই করোনি!
শুরু হলে শেষ হতে সময় লাগবে না।
মাথা ঝাঁকিয়েছে মাহজাবিন। তারপর সে আবার স্টেশন প্রসঙ্গে ফিরে গেছে। শেষে একসময় সে নিরাশ হয়েছে- ভেবেছিলাম আমি কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারব কতটা নির্জন ছিল এই স্টেশন, কতটা নির্জন থাকলে ও রকম একটা গল্প তৈরি হতে পারে।
যার গল্প তার মুখ থেকে শুনলে কিছুটা নিশ্চয়ই বুঝবে।
মাহজাবিন মাথা ঝাঁকায়- হয়তো।

মাহজাবিন বলল, আমি আসলে একটু পাগলা আছি।
সেটা আমি অনুমান করতে পারি।
আমি আসলে এই কয়েক ঘণ্টায় হাঁপিয়ে উঠেছি। আমি যে রকম ভেবেছিলাম একটুও সে রকম নয়।
তুমি কী রকম ভেবেছিলে?
বলতে পারব না। অন্য রকম।
শোয়েব মৃদু হেসে চুপ করে থাকল।
তোমার কি মন খারাপ হলো?
একটু অবাক হওয়ার চেষ্টা করল শোয়েব- কেন!
এই যে আমি অন্য রকম ভেবেছিলাম, সে জন্য।
কী বলব, বুঝতে পারছি না।
কিছুই বলতে হবে না। ইন, এটা নিয়ম।
কোনটা? শোয়েব তাকাল মাহজাবিনের দিকে।
এই যে, এটা।
কোনটা?
এটা। মানুষ ভাববে…দেখো ভাববে বলার চেয়ে বরং চাইবে বলি…মানুষ চাইবে এক রকম; কিন্তু হবে আরেক রকম।
পুরনো কথা।
ভুল। এটা পুরনো কথা নয়। এটা সব সময়ের কথা।
আমি বলতে চেয়েছি এ কথাটা বহুদিন থেকে চলে আসছে।
তবু কথাটা পুরনো হয়নি। এটা সব সময় নতুন। যখনই তোমার অমন মনে হবে, তুমি দেখবে তুমি ওটাকে নতুন উপলব্ধি হিসেবেই দেখছ।
এবার শোয়েব বলল- হয়তো।
তোমার সেলিমকে আমার খুব সাদামাটা মনে হয়েছে।
সেটাই কি মনে হওয়ার কথা না? ওনার কি উজ্জ্বল হওয়ার কথা?
কথা আসলে সেটা না!…তোমার মুখ থেকে ওনার ওই গল্পটা যতবার শুনেছি, আমার ওনাকে অন্য রকম মনে হয়েছে। কী রকম, সেটা আমি বলে বোঝাতে পারব না। অন্য রকম। মনে হয়েছে, যার অমন একটা গল্প আছে, যে উৎসাহ নিয়ে এত বছর পরও ওই গল্প অচেনা একজনকে শোনায়, সে কেমন-না মানুষ।
এখন ওই গল্পের সঙ্গে তাকে মানানসই মনে হচ্ছে না?
এখন মনে হচ্ছে, গল্প যে কারো থাকতে পারে।
গল্প যে কারো থাকতে পারে।
হ্যাঁ, ইন। অনেক সময়ই মানুষ ব্যাপার না, গল্পটাই ব্যাপার।

মাহজাবিন আর শোয়েবের বিয়ের পর সেলিম প্রথম কথাটা বলল, আপনারা সুখী হন। আপনাদের জীবন আনন্দের হোক। বলে সে উঠে গেল।
মাহজাবিন চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল- ইন, আমরা কি সুখী হব?
শোয়েবও গলা নামিয়ে নিল- বলা কঠিন।
আমাদের জীবন কি আনন্দের হবে?
এটাও বলা কঠিন।
ঠিক বলেছ। মাহজাবিন হাসিমুখে বলল।
কিন্তু আমরা সুখী হওয়ার চেষ্টা করব, আনন্দে থাকারও।
হুঁ, এটাও ঠিক।
গহনার বাক্স হাতে তাদের দুজনের কাছে চলে এসেছিল ফারুক। সে এই কথাগুলো শুনল। শুনে দুজনের দিকে তাকাল। খুব প্রচ্ছন্ন হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে।
আমরা কি ভুল কিছু বলেছি? মাহজাবিন জিজ্ঞেস করল।
ফারুক না-সূচক মাথা নাড়ল।
জীবন সুখের বা আনন্দের হবে, তা কি বলাই যায়?
ফারুক আবারও না-সূচক মাথা নাড়ল।
কিন্তু আপনাকে এই গলার হার কে আনতে বলেছে! আপনি এত টাকা কেন খরচ করেছেন? আমরা আপনাদের এত ভালোবাসার মূল্য কিভাবে দেব!
দিতে হবে না। ততক্ষণে সেলিম আবার তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ফারুক এ রকম। এভাবে বললে তার মন খারাপ হবে।
তাই বলে…।
আমার আর হেনার বিবাহের সময় সে যে কী করছিল!
আশ্চর্য! আপনি আর আমরা এক হলাম! আপনি ওনার কবেকার বন্ধু।
যে মানুষ করে, সে বন্ধু অবন্ধু বিচার করে না।
ফিলোসফার। মাহজাবিন নিচু গলায় বলল।
আর আপনারা কি পর? আপনেই বলেন।
দাঁত বের করে দুপাশে মাথা নাড়ল মাহজাবিন- জি না। আমরা আপন মানুষ।
আমার আর হেনার বিবাহের সময় ফারুক এলাহী কাণ্ড করছিল। সেলিম বলল, বিবাহের পরিকল্পনাও সে-ই নিয়েছিল! আমারে সে একদিন বলল…।
মাহজাবিন বিয়ের আসরে বসে সেলিমের গল্প শুনতে আরম্ভ করল।

ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে মাহজাবিন আর শোয়েব। একটু পেছনে আছে সেলিম, ফারুক, সেলিমের ছেলে ফয়সাল। হেনার আসার ইচ্ছা ছিল স্টেশনে। সেলিমের আপত্তি ছিল না। মাহজাবিন রাজি হয়নি, সে বাসা থেকেই হেনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছে।
তাদের এই মাঝরাতের পর যাত্রা নিয়ে আবার কথা উঠেছিল। জাবিন তাদের আবার মনে করে দিয়েছে, এটা তার কাছে মানতের মতো। এটা অনেক দিন ধরে তার ভেতর আছে, যদি এমন না হয়, সে খুব কষ্ট পাবে।
তোমার মানতটা কী? ট্রেনে ওঠার আগে একটু বলবে?
আমরা রওনা দেব। এটাই মানত।
সেটা কালও হতে পারত।
উঁহু, বিয়ের দিনই আমরা রাতের রেলগাড়িতে উঠে বসেছি, এটা একটা ব্যাপার না?
এটা তোমার মানত?
হুঁ।…পছন্দ হয়নি?
হয়েছে। খুব।
একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ?
না। অনেক ব্যাপার চারপাশে। কোনটার কথা বলছ কে জানে!
সেলিম চাচার ছেলের সঙ্গে ফারুক চাচার চেহারার অনেক মিল।
শোয়েব পেছন ফিরে ফয়সাল আর ফারুককে দেখল।
মিলল না? দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাও এক রকম, অনেকটাই।
কিছু বলতে চাও?
নাহ্। মানুষের জীবনে কত গল্প, কয়টা বলবে কে?…সেলিম চাচা, ও সেলিম চাচা। মাহজাবিন গলা তুলে ডাকল। কাছেই তারা, স্টেশনে ভিড়ও নেই তেমন, অত জোরে ডাকার দরকার ছিল না। সেলিম কিছুটা চমকেই উঠল- কী বলেন মা?
আসেন তো। আপনার সঙ্গে একটা গল্প বাকি।
সেলিম দ্রুতই এগিয়ে এলো- কী গল্প?
এই রেলস্টেশনে আপনার একটা গল্প আছে। অনেক অনেক আগের। সেই গল্প।
সেলিমকে প্রথম অবাক, তারপর বোকা বোকা দেখাল। বেশ কিছুটা সময়ও নিল সে- সেই গল্প আপনি জানেন? কে বলেছে?
শোয়েব। বলার কথা ছিল না। তবু বলেছে। আমাকে কিছু না বলে ওর পক্ষে থাকা কঠিন। বলেছে বলে কি আপনি ওর ওপর রাগ করবেন?

ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে। স্টেশনের আলো বেশি দূর পর্যন্ত যায়নি। রেললাইন দুদিকেই কিছু দূর পর্যন্ত দেখা যায়, তারপর অন্ধকার। ট্রেন যেদিক থেকে আসবে, সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেলিম বলল- আপনাদের একটা ব্যাপার বুঝাইতে পারব না।…আর এখন বললে বুঝবেনও না।
শোয়েব বলল, তবু বলেন, শুনি।
সেই অনেক বছর আগে, একা একা, কিছু করার নেই, চারদিকে অন্ধকার, শুধু টিমটিমা বাতি জ্বলে, এর মধ্যে হঠাৎ দানবের মতো একটা ট্রেন চইলা আসে। কেউ নামুক না নামুক, কেউ উঠুক আর না উঠুক, ট্রেন কিছুক্ষণ থাকে।…তার বিশাল শরীর…তারপর আবার শরীর টান দেয় ট্রেন…তারপর আবার স্টেশনে খাঁ খাঁ। তাকায়া থাকলে দেখি ট্রেন অন্ধকারের ভেতর ঢুইকা গেছে। ভয় হইতো। অন্ধকারের মতো বড় হাঁ। তার ভেতর ট্রেন কই যায়।…তবে ওইটা আমার কথা না।
কোনটা?
ট্রেন কই যায়। ফারুকের। সে বলত, আমারে ফেলায়া ট্রেন কই যায়।
আপনি বলেছিলেন, উনি কয়েকবার চেষ্টা করেছেন ট্রেনে করে চলে যেতে…।
করছে। পারে নাই। সে পারবে না। সে ফেরত আসইন্যা মানুষ।
কী করতেন আপনি? স্টেশনে বসে থাকতেন?
ঘুমাইতাম। আবার ঘুম ভাঙলে এইখানে বসতাম। মাঝে মাঝে ভয় লাগত।
আর দুপুরবেলা? মাহজাবিন জিজ্ঞেস করল।
দুপুরবেলা কী মা?
আর দুপুরবেলা কেমন লাগত?
সেলিম একটু সময় নিল। যেন সে মনে করার চেষ্টা করছে। তবে সে কিছু বলার আগেই মাহজাবিন বলল, আর দুপুরবেলা লাগত ঘোর, না?
ঘোর?
ঘোর লাগার কথা। দুপুর বিকাল- এই সময়গুলো যেন কেমন!
সেলিম হাসল- হ্যাঁ, এইটা ঠিক।
মাহজাবিন বলল, ওই রকম এক দুপুরে এক তরুণী এসে নামল এই স্টেশনে?
সেলিম সামান্য হাসল- বলছি তো?
আপনি একদম একা ছিলেন?
ছিল আরো দু-তিনজন। এইদিক ওইদিক…।
তাদের থাকা কোনো ব্যাপার ছিল না। অর্থাৎ আপনি একাই ছিলেন…। চাচা, একটা কথা।
বলেন, মা।
আপনার পরিষ্কার মনে আছে সব কিছু?
দিনের আলোর মতন মা, দিনের আলোর মতন।
একটা কথা বললে কি আপনি রাগ করবেন?
সেলিম উত্তর দিল, না। সে মাহজাবিনের দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন সে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল।
আমি আপনাকে একটা কথা বলব। বললে কি আপনি রাগ করবেন?
সেলিম দুপাশে মাথা নাড়ল- নাহ্ মা, রাগ করার বয়স নাই।
আমি যে কথাটা বলব, সেটা এক অর্থে ভয়ংকর। ইন বারবার বারণ করেছে।
সেলিম শোয়েবের দিকে তাকাল, তারপর মাহজাবিনের ওপর চোখ ফিরিয়ে আনল- অসুবিধা নাই, আপনি বলেন।
আমার ধারণা, আপনার গল্পটা সত্যি না।
কোন গল্পটা সত্যি না? সেলিমকে অবাক দেখাল।
এই গল্পটাই, এক দুপুরে এক তরুণী নামল…।
সেলিম হাসতে আরম্ভ করল- কী যে বলেন মা!
আমি বলছি গল্পটা সত্যি না।
একদম দিনের আলোর মতন দেখতে পাই।
তবু সেটা সত্যি না।
মেয়েটা নামে নাই?
না?
সে আমার রুমে অপেক্ষা করে নাই?
না।
তারপর এক তরুণ আসছিল তরুণীর খোঁজে, দেরির জন্য দুঃখ করছিল, তারপর তারা দুজন পরের ট্রেনে চলে গেছিল…সত্য না?
না।
মারে, গল্প বানায়া আমার কী লাভ? আমি কেন মিথ্যা বলব!
আপনি মিথ্যাও বলছেন না।
সেলিম হকচকিয়ে গেল- মানে!
আপনি ভেবেছেন ও রকম ঘটেছে।
সেলিম বুঝতে সময় নিল, যখন বুঝল হেসে ফেলল- মা, কী যে বলেন!
আপনার কাছে আজগুবি মনে হবে। কিন্তু আমার মনে হয় আমিই ঠিক। একা থাকতে থাকতে একটা ঘোর তৈরি হয়েছিল আপনার মধ্যে, ওই ঘোরের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেছে, আপনি ভাবতে আরম্ভ করেছেন অমন ঘটেছে। আপনার এই ভাবনাটা এতই প্রবল ছিল। পরে আপনার একবারও মনে হয়নি ওটা আপনার কল্পনা ছিল।
আমার তারে বলার ইচ্ছা হইছিল- থেকে যাও। যে ছিল না, তারে আমার এ রকম বলার ইচ্ছা হলো!
ছিল না কে বলল, ছিল তো। আপনার কল্পনায়।
সেলিম মাহজাবিনের দিকে তাকাল, তারপর শোয়েবের দিকে, তারপর সে ছোট করে আড়মোড়া ভাঙল, বলল- ট্রেন কখন, মাস্টাররে একটু জিজ্ঞাসা করি।
সে আমরা জানি, একটু আগেই শুনেছি।
এই লাইনে লেট হয়। আসতেছি।
সেলিম চলে গেল আর শোয়েব ফিরল মাহজাবিনের দিকে- তুমি ওনাকে কষ্ট দিয়েছ। কোনো দরকার তো ছিল না।
মাহজাবিন চুপ করে থাকল।
তোমার কি মনে হয় উনি তোমার কথা বিশ্বাস করেছেন?
মাহজাবিন দুপাশে মাথা নাড়ল- না, একটুও না। তুমি যে ওনাকে কষ্ট দিয়েছি বলছ, সেটা ঠিক না। কারণ উনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি। আমার ওপর বরং একটু একটু রেগেছেন। এই যে সামনে থেকে চলে গেলেন না, ওটা অপ্রস্তুত হওন না, ওটা রাগ।
রাগাবার দরকার ছিল?
ওনার কথা সত্য হোক বা মিথ্যা, কল্পনা হোক বা বাস্তব- ওনার জীবনে ওটাই গল্প। মানুষের জীবনে গল্প লাগে, আমরা আগেও বলেছি। অনেক সময় মানুষ টের পায় না, গল্প এসে চলে যায়, ওনার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। উনি গল্পটা রেখে দিয়েছেন।…ইন…।
কী বলবে? আমাদের জীবনে কোনো গল্প নেই?
তুমি কি একটা ব্যাপার জানো?…আমার ধারণা, ফারুক চাচা আজ আমাদের সঙ্গে ট্রেনে উঠবেন। আমাদের সঙ্গে না, আমাদের পরে। কেন, বলতে পারবে?
না।
আমি নিশ্চিত, ওনার জীবনেও একটা গল্প আছে। গল্প দুই রকম হয়, কেউ গল্প সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিতে চায়, কেউ আবার সে গল্প থেকে পালাতে চায়। ফারুক চাচা এই দ্বিতীয় পর্যায়ের।
কিন্তু উনি বারবার ফিরে আসেন।
তাতে কী, পালানোর চেষ্টাটা আছে ওনার। কে জানে, হয়তো এবার পারবেন। মাহজাবিন ঘড়ি দেখল। ট্রেন এই এখনই এসে পড়বে…।
শোয়েব মুচকি হাসল- তারপর তুমি উঠে পড়বে? আমি কি তখন বলব- থেকে যাও?
কিংবা তুমি উঠে পড়বে, আমি বলব।
কিংবা আমরা দুজনই উঠে পড়ব, এই রেলস্টেশন বলবে।
কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়? টিকিট কাটা আছে এক গন্তব্যে; কিন্তু আমি যত দূর চিনি তোমাকে, তুমি সেখান পর্যন্ত যাবে না। হয়তো মাঝস্টেশনে নেমে পড়বে।
কী অসুবিধা, নেমে পড়লে! ধরো ট্রেন চলছেই, আমরা বারবার মাঝস্টেশনে নেমে পড়ছি। ট্রেন বারবার বলছে থেকে যাও, কিন্তু আমরা বারবার নেমে পড়ছি…।
কিংবা আমরা বারবার ট্রেনে উঠে পড়ছি, স্টেশন বারবার বলছে থেকে যাও, কিন্তু আমরা উঠে পড়ছি।…এই তো?
শোয়েব আর মাহজাবিন অপেক্ষা করতে লাগল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s