স্বর্গের নিচে তিন পাপী

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পায়ের নিচে যদি সর্ষে হয় আমাদের হুমায়ূন আহমেদ লিখলেন তাঁর পায়ের তলায় খড়ম। এবং এ ব্যাপারে বইটির প্রথমেই ‘অন্যকথা’য় বিশদ করে লিখেছেন ব্যাপারটা কী এবং কেন। উৎসাহীরা পড়ে দেখতে পারেন। আমি যেহেতু হুমায়ূন আহমেদের খড়ম, তাও এক্কেবারে বউলাআলা খড়ম। তিনি নিজেই বলেছেন, এ এক কষ্টকর প্রক্রিয়া। তবে তার পরেও ভ্রমণকাহিনীর নাম রেখেছেন পায়ের তলায় খড়ম।
খড়ম তা সে যে প্রকারেরই হোক, খড়ম নিয়ে আমার একরকম প্রবল ভীতি সঞ্চারই রয়েছে। ছোটবেলায় আমার এক প্রবল প্রতাপান্বিত জেঠামশাই ছিলেন সাক্ষাৎ ত্রাস। তিনি ছিলেন আমাদের গ্রামপ্রধান। সামান্য একটু উনিশ-বিশ হলে কত লোককে যে খড়মপেটাই করতে দেখে শিউরে উঠেছি তা আর বলবার নয়।
হুমায়ূনের সঙ্গে আমার তেমন সখ্য জমেনি যে তাঁর অবারিত বন্ধু বা সঙ্গ হওয়ার সৌভাগ্য হবে। তার পরেও যে দু-একবার তাঁর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে, তা-ও তাঁকে আমি আমার মতো করে বলি। অন্যের মহিমায় গৌরবান্বিত। অর্থাৎ হুমায়ূন যতবারই সুনীলকে তাঁর ডেরা নুহাশপল্লীতে বা ঢাকায় এনেছেন, ততবারই কিন্তু প্রকারান্তরে নেপথ্যে আমার যৎসামান্য সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হয়েছিল হয়তো। অবশ্য সেটা হয়তো প্রথম কয়বারই।
তারপর তো এত বড় বিশ্ব একজনের পায়ের নিচে সর্ষে, অন্যজনের পায়ের তলায় খড়ম। আর যেহেতু পৃথিবীটা গোলাকার, কোথাও না কোথাও তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। এ ছাড়া দুজনই বাংলা সাহিত্যের দুই গগনের দুই বৃহস্পতি। সে যা-ই হোক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পায়ের নিচে যদি সর্ষে হয় তাঁর দীর্ঘকালের সঙ্গী-সাথীদেরও যে সেই সর্ষের ওপর পদচারণ থাকবে না, তা কী করে হয়! এখানে আমি যদি সে রকম কয়েকটি কাহিনীর অবতারণা করি, তা যে নেহাত অপ্রয়োজনীয় হবে না, আশা করি সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার আবার যে রকম উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ সেহেতু দুই দেশেরই সব কিছু বলতে গেলে সাতকাণ্ড রামায়ণেও কুলোবে কি না সন্দেহ।
তাই এখানে যত দূর সম্ভব সংক্ষিপ্তাকারে সীমান্তের ওই পার এই পারের দু-একটি ঘটনা দিয়েই শেষ করতে চাই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পায়ের নিচে যতই সর্ষে থাকুক না কেন এবং সেসব নিয়ে তিনি কত যে লেখক-লেখিকার প্রভূত সুনাম অর্জন করেছেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। ভ্রমণ যতই চিত্তাকর্ষক হোক না কেন, একা একা যতই ভ্রমণ করা যাক না কেন, ভ্রমণের আসল আনন্দ কিন্তু সঙ্গী-সাথীদের নিয়েই। যত হুল্লোড় মাতামাতি। আর ভ্রমণে আমাদের পায়ের নিচে সর্ষেওয়ালাদের যাত্রা শুরু থেকেই আরম্ভ হতো নানা রকমের রগড়। আমাদের দলগুলোও হতো নানা চরিত্রের সংমিশ্রণে একেকটা থেকে অন্যটা একেবারে বিপরীত চরিত্রের।
সুনীলদা দিয়েই শুরু করা যাক। সেবার আমাদের দলপ্রধান হলেন ইন্দ্রদা। শেষমেশ তুমিও চলে গেলে ইন্দ্রদা! মনে পড়ে, একবার কেন জানি ইন্দ্রদাকে আমি তুমি করে বলেছিলাম- তারপর কোথায়! সে কী ফোঁস। তুমি আমাকে তুমি করে বললে? আশ্চর্যের আশ্চর্য। পরে ব্যাপারটা বহু কষ্টে সামাল দিয়ে বাঁচি আর কী। হ্যারিসন রোডের একচিলতে ঘরে যে কত রকমের লোকের সমাগম হতো, তা আর বলবার নয়। একদিন একটা বেঁটে মতন লোক এলো বেশ আহ্লাদ করে। দেখলাম ইন্দ্রদাও, ভাগ্যিস তখন ওই ঘরে বইপত্রের ডাঁই ছাড়া আর অন্য কোনো লোকজন ছিল না। একগাল হাসি নিয়ে লোকটি কুশলাদি সুধিয়ে বললেন, ভাই, সত্যি তুমি বেড়ে আছ। বিয়েথা করোনি, বেশ আছো। লোকটি অনায়াসেই বলতে পারত, কই, আপনিও তো বিয়েথা না করে দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুধু আমাদেরটাই দেখলেন। নিজেরটা নিয়ে কী বলবেন। ইন্দ্রদা কেন জানি না সেদিন প্রসন্ন মেজাজেই ছিলেন। ভেতরে ভেতরে খুশি থাকলে এবং পছন্দসই লোক হলে আর কথা নেই। আসলে ইন্দ্রদা মানুষটাই ছিলেন নির্ভেজাল খাঁটি মানুষ। যাঁর ভেতরে-বাইরে ছিল না কোনো দ্বিচারিতা। নিচে নেমে হাওড়াগামী ২৫ নম্বর ট্রাম ধরে বললেন, দেখছো কী, উঠে এসো। আমি বুঝে গেলাম আমাদের গন্তব্যস্থল কোথায় এবং কেন। এখন ওই ভদ্রলোককে নিয়ে চিৎপুর রোডের মোড়ে নাখোদা মসজিদের অদূরে রয়েল হোটেলে নিয়ে গিয়ে রয়েলের বিখ্যাত চাপসহযোগে রুমালি রুটি আর টক দই কিংবা বিরিয়ানি আপ্যায়ন করা হবে। কথায় কথায় জানা গেল, ভদ্রলোক কোনার্ক সূর্য মন্দিরের কেয়ারটেকার। মন্দিরসংলগ্ন বাংলোয় তিনি একাই থাকেন। রয়েলের অত্যুৎকৃষ্ট চাপসহযোগে বিরিয়ানি খেতে খেতে একসময় পরম আহ্লাদে ইন্দ্রদাকে সবান্ধবে কোনার্ক ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানালেন।
এর দিন কয়েক বাদে ইন্দ্রদা বললেন, আজ সন্ধ্যায় আমরা কোনার্ক যাচ্ছি। সুনীল, তুমি আর আমি। কথাটা যত সহজে লিখছি ইন্দ্রদা কিন্তু অত সহজে বলেননি। প্রথমে তিনি বেশ রহস্য করেই কথাগুলো এমনভাবে বলছিলেন যেন আমরা এমন একটা অভিযানে যাচ্ছি যা অন্য কাউকে বলা যাবে না। আসলে যেকোনো বিষয়ে রহস্যময়তা ইন্দ্রদার একটি অতি সহজাত প্রবণতা। তা আমি সুনীলদার নামটা শুনে খানিকটা স্থির নিশ্চিত হলাম যে ব্যাপারটা কেবল কথার কথা নয়। ওই যে কয়েক দিন আগে কোনার্কের কেয়ারটেকার ভদ্রলোকের আমন্ত্রণের একটা যোগসূত্র খুঁজে দেখছিলাম।
এর পরেই বললেন, চলো, একটু নিউ মার্কেটটা ঘুরে আসি। বাবুর আলির দোকান থেকে একটা ভালো টমেটো কেচাপ আর ফরাসি ডেনিকেসি মাস্টার্ড। সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে যা জমবে! ইন্দ্রদার গলায় তক্ষুনি একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর। এসব হচ্ছে কমলদার টোটকা। সবই ফরাসি সুখাদ্যের কমনীয় দিক।
হাওড়া স্টেশনের ঘড়ির নিচে টায়ে টায়ে নির্দিষ্ট দিনক্ষণে সন্ধে ৮টায় তো পৌঁছানো গেল। টিকিট-ফিকিটের ব্যাপারটা ইন্দ্রদা থাকতে আমাদের আর চিন্তা কী? আমাদের শুধু হাজির হওয়া। দুপুরে নিউ মার্কেট থেকে কেনাকাটা করে ফেরার পথে রেটিতে একচক্কর কালীদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মায়ের চরণবৃত্ত পান না করে এলে কী করে হয়! বেশ ফুরফুরেই লাগছিল। জানালা ঘেঁষে গাড়ির এক কোণে আমরা তিনজন আসন পেতে নিলাম। আমাদের সঙ্গে মালপত্র বলতে শুধু আমেরিকা থেকে আনা সুনীলদার একটা মাঝারি সাইজের স্যুটকেস। আমার আর ইন্দ্রদার গোটা তিন-চার ঝোলা। যেগুলোর মধ্যে একটি থেকে তোলা খাঁটি এক নম্বরের বেশ কয়েকটি বোতল। একসময় দেখা গেল কটক যাত্রী বেশ কিছু যাত্রী আর তাদের মালসামানায় গোটা কামরাটা ভরে গেল। আমরা খালি ভাবছিলাম দুগ্গা দুগ্গা করে কখন গাড়িটা ছাড়বে। একসময় যথানিয়মে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে ঘটাং ঘটাং করে নানাবিধ আওয়াজ তুলতে তুলতে আউটার সিগন্যাল পেরিয়ে তার নির্ধারিত গতিতে চলতে শুরু করল। এখানে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি তার আপন নিয়মে চার পাশের নিকষ কালো অন্ধকার চিরে চলতে শুরু করে দেওয়ার পরই প্রথমে সুনীলদা স্যুটকেস হাতড়িয়ে একটা বোতল বের করে টাকরায় খানিকটা ঢেলে বোতলটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল। তারপর থেকে একই নিয়মে আমি খানিকটা গলায় ঢেলে দিয়ে ইন্দ্রদার দিকে এগিয়ে ধরলাম। বেশ এভাবে চলন্ত ট্রেনের দুলকি তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের মধ্যে বোতলের আদান-প্রদান যেমন চলতে থাকল, তেমনই সহযাত্রী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যেও ক্রমেই ভ্রু কুঁচকে আসছিল। ওরা ব্যাপারটাকে অনুমোদন করতে পারছিল না। মাঝেমধ্যে রোষ কষায়িত নেত্রে আমাদের দিকে দৃকপাত করছিল। আমরা তখন বেশ মৌতাতে এসে যাওয়ায় আমাদের সাহসও বেড়ে গেছে। কে কার তোয়াক্কা করে। আর এদিকে গাড়িরও যেন চলার একটা আলগা জোশ এসে গেছে। সিটি দিতে দিতে কত কান্তার পেরিয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট কামরা ভরে উঠছিল কড়া বাংলা মদের গন্ধে। সহযাত্রী বন্ধুরা কলকাতা থেকে কাপড়ের থান কিনে নিয়ে যাচ্ছিল। প্রথমদিকে ওরা খুব সম্ভবত বেশ বড় দাঁও মারার হিসেবনিকেশ নিয়ে ব্যস্ত ছিল বলে আমাদের দিকে তেমন একটা দৃকপাত করার সময় পাচ্ছিল না।
ধীরে ধীরে রাত যত বেড়ে চলছিল, ততই তারা রাতের আহার শেষে খানিকটা ঝিমিয়ে পড়ছিল। আমাদের মদ্যপানটাকে গর্হিত কাজ মনে করলেও মুখের অভিব্যক্তিতে ঘৃণা ছাড়া আর কি-ই বা করার ছিল ওদের। একটা সময়ে ওরা ঘুমে কাদা কাদা হয়ে এ ওর গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যে গোটা গাড়ির যাত্রীদের মধ্যে যেন একটা নির্দিষ্ট তাল লয়ে গাড়ির তীব্র ঝনাৎকার শব্দ সমেত নাক ডাকার বিচিত্র বৈভিন্নসহ ছায়ানৃত্য শুরু হয়ে গেল। একদিকে যখন ব্যবসায়ীদের অঙ্গাবরণ শিথিল হয়ে আসছিল আর সেই সঙ্গে এ ওর গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছিল, তখন একমাত্র আমরা তিনজনই কেন জানি না একদম নির্দোষ রগড়ে মেতে উঠে ওদের পাঠভাঙা জামাকাপড়গুলো তো সিগ্রেটের ছেঁকা দিয়ে ফুটো করে দিচ্ছিলাম। আসলে যেকোনো অন্যায় কাজ যখনই শুরু হোক না কেন, প্রথমে সেটা বেশ নির্দোষই মনে হয়। এভাবে রাত ভোর ভোর যখন, ওই ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কটক স্টেশনে নেমে যাচ্ছিল, তখন ওদের জামাকাপড়ে অজস্র নির্দোষ ফুটোতে ভরে গিয়ে লুক থ্রু কাপড়ে পরিণত হয়েছে, সেটা দেখে যে আমরা কী বিমল আনন্দ পেয়েছিলাম এবং অকারণে হেসে উঠছিলাম তার কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছিল না। হয়তো এটা বয়সেরই দোষ। পরদিন আমরা ভুবনেশ্বরে নেমে যথারীতি কোনার্কে গিয়ে হাজির। কড়া নাড়তেই ইন্দ্রদার সেই খাটো বন্ধুটি দরজা খুলে দাঁড়ালেন। তিনি যে আমাদের দেখে খুব একটা উৎফুল্ল হলেন, বলা যাবে না। তেরো বছর আগের দেখায় তাঁকে যতটা হর্ষোৎফুল্ল দেখা গিয়েছিল, এবার ঠিক তা মনে হলো না। ইন্দ্রদাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে কিসব বললেন যেন। আমি বাংলো ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখলাম একটি ঘোমটা টানা কিশোরী সলজ্জভাবে উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ইন্দ্রদার বন্ধুটি এবার যেন লজ্জা ঝেড়ে বেরিয়ে এসে বাইরে একটু ভেতরের দিকে যেখানে একটা গোয়ালঘর মনে হলো আমাদের জিনিসপত্র নিজেই টেনে নিয়ে সেখানে উপস্থিত করলেন। ঘরের ভেতর ছড়ানো-ছিটানো তিন তিনটি লেয়ারের বিছানা পাতা। ভেতর থেকে গোচনার কটু গন্ধ ভেসে আসছিল, যেটির গন্ধে আমাদের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল। তিনজনই চা-ফায়ের অপেক্ষা না করে সটান বিছানায় শুয়ে পড়লাম দুচোখ বুজে।
ঘুম ভাঙতে উঠে দেখি বেশ রোদ চড়চড় করছে। তবে শরীরটা বেশ চনমনে লাগছে। সারা রাত্তিরে নির্ঘুম অবস্থা। পরে ভদ্রলোকের কাঁচুমাচু মুখেই জানা গেল। দেশ থেকে ফেরার পথে মা-বাবা গুরুজনরা আর একা ছাড়তে রাজি হননি। এত ভালো চাকরি। তার ওপর পেলাম বাংলো ঘর। তারা সবাই দিনে একটি চতুর্দশীর সঙ্গে গাঁটকানি বেঁধে দিলেন। অবশ্য তাতে যে আমাদের খুব একটা অসুবিধে হবে না, সে কথা জানাতেও ভুললেন না। আমরা চানফান করে রেডি হয়ে বললুম এবার বেরিয়ে পড়ি সমুদ্র পাড়ে। সমুদ্রতীরে গিয়ে দেখি লুমিয়ারা তখন মাছধরা শেষ করে ফিরে এসেছে। ইন্দ্রদা মাছ দেখেছে, কী হয়ে গেছে। নানা ধরনের টাটকা তাজা মাছ কিনে একটা লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে দরদস্তুর করে ওর হোটেলে এসে আমাদের তিনজনের জন্য পরিমাণ মতো সাদা ভাত, পমফ্রেট ফ্রাই, আরো নানা ধরনের মাছের রকমারি পদ তৈরিতে লেগে গেলেন হোটেলঅলার বৌয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে। এর মাঝে আমাদের জনচিকিৎসা বিরতিহীনভাবেই চলছিল। এসব খাবারদাবারের ব্যাপারে ইন্দ্রদার বাঙাল উৎসাহের পাশাপাশি মাদারীপুরের বাঙাল সুনীলদার উৎসাহেরও কোনো ঘাটতি ছিল না।
একসময় ঘণ্টা দুই কি আড়াই বাদে সুস্বাদু ওড়িয়া চালের সুগন্ধি ভাতের সঙ্গে উৎকৃষ্ট গাওয়া ঘি আর গরম গরম পমফ্রেটেই ভাজা আর অন্যান্য মাছের ঘ্রাণ পদের সঙ্গে তোফা ভরপেট ভোজনের পর আমরা আবার কেয়ারটেকার মহাশয়ের গোয়ালঘরে গিয়ে যাকে বলে ভাতঘুমে বেলা কাবার করে যখন উঠলাম, তখন দেখি আশপাশ বেশ আঁধারে ছেয়ে গেছে।
অদূরে চন্দ্রভাগা নদীর ধার ঘেঁষে শুক্লাদ্বাদশীর পরিপূর্ণ চাঁদ। আমরা তিনজন শুকনো বালিময় চন্দ্রভাগা নদী বরাবর সাগর অভিমুখে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আবছা আলো-আঁধারিতে দেখি সুনীলদার মাথায় তো এমনিতেই ঘন গাঢ় চুলের বাহার, তার ওপর পরনের জামাকাপড় খুলে পাগড়ির মতো মাথায় বেঁধে সম্পূর্ণ উদোম অবস্থায় হেঁটে চলেছেন। ও মা, তারপর দেখি ইন্দ্রদাও একই পথের পথিক, আমিও ভেবে দেখলাম, এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন? আমিও দাদাদের অনুগামী হয়ে যেতে মুহূর্তখানেক সময় নিলাম না। সুনীলদার উদাত্ত গলায় কত যে মনকাড়া রবীন্দ্রসংগীত আর রবীন্দ্রসংগীত। আমিও ভাবছিলাম এ দিগম্বর বেশে রবীন্দ্রসংগীত কী গাওয়া যায়। তাকে তো ততক্ষণে ঝাউপঙক্তি ছেড়ে তপ্ত বানিয়াবাড়ির ওপর এসে পড়েছি। অদূরে নুনিয়াপাড়ায় কয়েকটা কুকুর কঁকিয়ে উঠল। বাঁধভাঙা জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে পারাবার। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি। কখন যে সমুদ্রের জলে পা জোড়া ভিজে এসেছে।
হঠাৎ একটা দূরাগত ধ্বনির মতো কানে ভেসে এলো। ও বেলাল, ও ইন্দ্রনাথ। আর ওদিকে যেও না। অদ্ভুত এক মায়াময় গলা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। আর কে হবে। হতে পারেন?
সেদিন সত্যি সত্যি একটা বিয়োগান্ত নাটকের পরিসমাপ্তির হাত থেকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন সুনীলদা।
কেননা, পরদিন জানা গেল আমরা যে জায়গাটায় গিয়েছিলাম ওখানে অনেক কাষ্ঠ দেখা দিয়েছিল। দু-একটার সঙ্গে যে ঢুস খাইনি, তাও বা কী করে বলি।
গল্পটা আমি এখানে সংক্ষিপ্তাকারেই বর্ণনা করলাম। আরো কত ঘটনার ঘনঘটা ছিল পরতে পরতে। এ রকম ঘটনা বা গল্প আরো কত যে আছে আমাদের জীবনে। ভিন্ন প্রেক্ষিতে।
এ গল্পটির এখানেই শেষ নয়। ফিরে আসার পর আমাদের মুখে গল্প শুনে আমাদের শ্যামলদা ‘স্বর্গের নিচে তিন পাপী’ নামে আস্ত একটা উপন্যাসই লিখে ফেললেন। উৎসাহীরা খুঁজে পেতে পড়ে ফেলতে পারেন। বলতে পারি, ঠকবেন না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s