বাহির থেকে ডাকবো না

বন্যা
আজ অনেক বছর পর তোমাকে লিখতে বসেছি কম করে হলেও বিশ বছর তো হবেই ।এই বিশ বছরে কত বদলে গেছে পৃথিবী ।তেমনি বদলে গেছি আমরাও ।”বদলের আরেক নামই তো জীবন”।আজকাল চিঠি লেখা ছেড়েই দিয়েছি । বাবা বেঁচে থাকতে লিখতাম তিনিও লিখতেন । টেলিফোন টেলেক্সের যুগ পার হয়ে এখন ই-মেইল আর এসএমএস এর যুগ। তারপরও বাড়িতে ল্যান্ড ফোনের সাথে ফ্যাক্স টা এখনো চালূ আছে ।
যাই বলো না কেন চিঠির মতো আনন্দ ই-মেইল আর এসএমএস এ নেই । এ প্রজন্মের মধ্যে লেফাফা দেখার সংখ্যা খুবই কম । সেই হলুদ রঙের লেফাফার ভিতরে কি গভীর আনন্দ যে লুকিয়ে ছিল তা জানে আমার মত হয়ত অনেকেই।
তোমার সাথে আমার সম্পর্ক শেষ (!) হয়ে যাওয়ার পরো তোমার চিঠি গুলো সংরক্ষিত ছিল । দুঃখের বিষয় প্রবাসে আসার সময় আমি রেখে এসছিলাম বাড়ির আলমিরাতেই । কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারিনি । সে অনেক কথা অন্য আরেক দিন বলা যাবে ।
এখানে ঋতুর পরিবর্তন বড় বেশী চোখে পড়ে । হেমন্তে দিন এবং রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারনে গাছের পাতার রঙ্গে পরিবর্তন বলে দেয় শীত আসছে । তুমি যদি এসময় পাহাড়ের দিকে বেড়াতে যাও দেখতে পাবে গাছের পাতা লাল থেকে সোনালি রঙ্গে ডেকে গেছে ।বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ হলেও সব ঋতুর পরিবর্তন চোখে পড়ে না । যেমন হেমন্ত থেকে শরৎ। শীতপ্রধান দেশে দেখতে দেখতে ১৭ বছর কেটে গেল ।
মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা গ্রীস্ম প্রধানদেশের মানুষেরা কত সুখী ,আমাদের দেশে এক কাপড়েই অনেকেই কাটিয়ে দেন সারাটি বছর । আর এখানে দেখো গায়ের কাপড় থেকে শুরু করে পায়ের জুতা , গাড়ির টায়ার পর্যন্ত  ঋতু পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তন করতে হয় । বছরে একবার দেশে গেলে আমি বিদেশ থেকে আমদানী করার গাড়ির চাকার দিকে তাকাই … মনে মনে খুব হাসি পায় । এত চমৎকার গাড়ি কিন্তু টায়ারের অবস্থা দেখে মনে পরে যায় জুতার সুখতলি র কথা , তোমার যদি সময় হয় খেয়াল করে দেখো ।বাংলাদেশের এক সেলিব্রেটির (অনিবার্য কারনে নামটি প্রকাশ করলাম না ) গাড়িতে করে গুলশান থেকে পুরনো ঢাকায় এক পিঠে উৎসবে যাচ্ছিলাম । তিনি নিজেই ড্রাইভ করছিলেন । আমাকে সিট ব্যাল্ট বাঁধতে দেখে  তিনি আমাকে বললেন “মিতা ,ভয়ের কিছু নেই এদেশে তোমার জাপানের মত দ্রুত গাড়ি চালানো যায় না “। আমি বললাম আসলে অভ্যাস। জাপানে গাড়ির সকল যাত্রীর সিট ব্যাল্ট বাঁধা বাধ্যতামুলক । আর একবার কি হলো সোনার গাঁও হোটেল থেকে গাড়িতে(ট্যাক্সি ক্যাব) করে  বিমান বন্দরে যাচ্ছিলাম । ড্রাইভার আমাকে তার পাশের আসনে বসার জন্য দরজা খুলে দিলে আমি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে ড্রাইভিং সিটের পিছনের আসনে বসাতে ড্রাইভার খুব আশ্চর্য্য হয়ে জানতে চাইল  আমি কেন চালকের পাশের আসন ছেড়ে পিছনের আসনে বসলাম । আমি উনাকে বললাম ” এ আসনটি হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ আসন । আর এ কারনেই বিদেশে চাইল্ড সীট এখানে থাকে । চালকের পাশের আসনটি সবচেয়ে বিপদজনক আসন । ” আর একটি কথা বলি আমাদের দেশে যে সব প্রাইভেট গাড়ির প্রচলন আছে । সে সব গাড়ির চালকের আসনটিই হচ্ছে সবচেয়ে আরামদায়ক । একটি কারন তোমাকে বলি গাড়িতে শীততাপ নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা চালু করলে চালকের আসনটিই প্রথমে সেই সুবিধা ভোগ করে পরে অন্যরা কেন এমনটি হয় তার কারন হচ্ছে যে সব দেশ গাড়ি তৈরী করে তাদের দেশের প্রায় সবাই নিজের গাড়ি নিজে ড্রাইভ করেন (আমি একবার তোমার গাড়িতে চড়েছিলাম তোমার ড্রাইভার রাখার সামর্থ্য থাকলেও আমার না থাকার কারনে নিজেই নিজের ড্রাইভার !) ।

আমার ছেলে বলে “গ্রীস্মপ্রধান দেশের মধ্যে কোন উন্নত দেশ নেই।” ভেবে দেখলাম তাই।জি ৮ এর মধ্যে গ্রীস্মমন্ডলের কোন দেশ নেই । কয়েক দিন আগে ইউরোপের কোনো একটা দেশ সম্পর্কে টিভি প্রোগ্রাম দেখে ছিলাম দেশের নামটি মনে নেই (তোমার জানা থাকলে জানাবে) সেখানে দিবা নিদ্রার জন্য ২ ঘন্টা অফিস আদালত থেকে দোকান পাট সব বন্ধ থাকে।খুবই মজার তাই না ।

শীতকালে আমার এখানে প্রচুর তুষারপাত হয় । বাড়ির সামনে তুষার জমে জমে ৩/৪ ফুটের মতো পাহাড় হয়ে যায় । গড়পরতা হিসেবে এ মাসেই প্রথম তুষার পাত হবে । তবে এ তুষার জমবে না  দু/একদিন পরেই গলে যাবে ।  ডিসেম্বর এর ক্রিসমাস থেকে তুষার জমা শুরু হবে । মাঝে মাঝে এত তুষার পাত হয় ঘর থেকে বের হতে মন চায়   না ।

এ মাসের শেষ দিক থেকে আমার বাগানের গাছ গুলোকে তুষারের আক্রমন থেকে রক্ষা করার জন্য বাঁশ দিয়ে বেঁধে দিতে হবে যাতে তুষারের ভর থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে । পরের চিঠিতে ছবি পাঠাব ।

গত বছর থেকে ১৪ রকমের গোলাপ গাছ লাগিয়েছি । গোলাপ সম্পর্কে আমার কোন ধারনা ছিল না এক ধরনের গোলাপ আছে যাকে বলা হয় ক্লাইবিং রোজ । এটি অনেকটা লতার মত বেড়ে চলে । গোলাপের মধ্যে একটি  হচ্ছে বছরে মাত্র একবার ফুল ফোঁটে আর অন্যটি হচ্ছে বছরে চারবার ফুল ফোঁটে । সামার স্নো নামের একটা গোলাপ লাগিয়েছি যার রঙ সাদা , এই গোলাপে কাঁটা নেই শুনে তুমি বলে ছিলে “কাঁটা না থাকলে কি গোলাপ হয় নাকি । ” আর একদিন তোমাকে গোলাপের যত্ন নেওয়ার কথা বলব । গোলাপ গাছের যত্ন নিতে নিতে আমার মনে হয়েছে গাছ গুলো যেন ছোট অবুঝ শিশু । রেইনবো রোজ নামে একটা গোলাপ আছে ,বেশ দামী । শুধু ছবিতেই দেখেছি ।

বছর পাঁচ আগে আপেল গাছ লাগিয়েছি তুমি ত জান । কিন্তু পোকার আক্রমন থেকে বাঁচাতে পারছি না । এক সময় ভাবতাম সার পানি না দিলেও চলবে । একদিন সেই ভুল ভাঙ্গল । আমাদের যেমন বেচে থাকার জন্য পুষ্টিকর খাবার এবং জিবানুর আক্রমন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হয় গাছেদের জন্যও তাই ।

আজ বড় এলে বেলে কথা লিখে ফেললাম । পরের চিঠিতে প্রকৃতির কথা এত লিখব না কথা দিচ্ছি ।

ভালো থেকো,সুস্থ থেকো । সুন্দর থেকো ,নিজের জন্যে ।

মিতা

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s