বঙ্গোপসাগর ও লেখার ভুবন

সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা
সমুদ্র বিশাল। বঙ্গোপসাগর একটি উপসাগর মাত্র, বঙ্গ নামক উপসাগর। তাও তার উত্তর তীরের বাংলাদেশ, আকিয়াব বা সিটউই ও ইয়াঙ্গুনের কূলের খানিকটা মাত্র দেখেছি। পশ্চিম উপকূলের পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন থেকে উড়িষার চিল্কা পর্যন্তই আমার চর্মচক্ষে দেখেছি। মনের চোখে শ্রীলঙ্কা, সুমাত্রার বান্দ্রা আচে পয়েন্ট ও পুবের বাকি আন্দামান-নিকোবর উপকূল দেখা হয়েছে ব্রিটিশ আমলের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চোখের দেখা থেকে। সুনামি জলকম্পের বিবরণ পড়েছি আপনাদের মতো দৈনিক পত্রিকায়, আর মনের চোখে।
১৯৯৬ সালে বিচিত্রায় একটি ছোট উপন্যাস (নাকি গল্প?) লিখেছিলাম। শাহদাৎ চৌধুরী তখন সম্পাদক। ছোট উপন্যাসটির নাম- ‘আমি তোমার কাছে সমুদ্রের একটি ঢেউ জমা রেখেছি’। তার একটু বর্ণনা তুলে ধরা যায়,
“…একা সাগর দেখার মধ্যে একটা আলাদা মেজাজ ও অনুভূতি পাওয়া যায়। জানি, একা কোনো কিছুই সম্পূর্ণ নয়। একের বিপরীতে আছে আরেকটি এক। ওই এক তার বিপরীত এককে খোঁজে। এটি মৌলিক সত্য! ঘৃণার বিপরীতে আছে ভালোবাসা। হিংসার বিপরীতে অহিংসা। চাঁদের আলোকিত অংশের উল্টো পিঠে আছে অন্ধকার। চাঁদের এই পিঠ সব সময় আঁধারে থাকে। তাহলে চাঁদ কি এক পিঠওয়ালা রুপোর চাকতি! একদিকে সব সময় আলো আরেক দিকে সব সময় অন্ধকার।…ঢেউ উঠছে আর ভাঙছে, শব্দ উঠছে আর পড়ছে। সমুদ্রকে বলা উচিত শব্দশিল্পী। সে সারা দিন ঢেউয়ের শব্দ গড়ে, শব্দের জাদু দিয়ে কূলে আছড়ে পড়ে। আমি সেই শব্দের অর্থ করার চেষ্টা করছি। দূরে আছড়ে পড়া বা ভেঙে পড়া শব্দ এক রকম, কাছে ভেঙে পড়া শব্দ অন্য রকম। দূরের শব্দ বিউগলের মতো মোটা, কম তার কারুকাজ। কাছের ঢেউয়ের শব্দ সহস্রনাদী। দূরের শব্দ যদি একক শিল্পীর সংগীত হয়, কাছের শব্দ হবে সিম্ফনি। দূরের শব্দ যদি বিউগলের বিষাদের সুর, কাছের শব্দ হবে মিলনের ঐকতান। মিলনের বলে সে তার শব্দছানি দিয়ে ডাকে। সুরে সুরে অবগাহনের জন্য কাছের ঢেউয়েরা মায়াবী আহ্বান জানায়। এমনকি সেই আহ্বানে মৃত্যুর হাতছানিও আছে।…”
এই কাহিনীর অন্যত্র আছে, “মার্কেজের গল্পে পড়েছি তাঁর দেশে কোনো কোনো এলাকায় মৃত মানুষকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়। নেলসন ম্যান্ডেলা কি তখন আটলান্টিক বা ভারত মহাসাগরের সমুদ্রে স্নান করেছিলেন? ইয়াসির আরাফাতের প্যালেস্টাইন সমুদ্রহীন দেশ? সমুদ্রে স্নান করার সময়ও তাঁর নেই। ওখানে কোনো তরুণ-তরুণী ঘরে বসে গরম জলে স্নান করতে পারে। বঙ্গবন্ধু কি কখনো বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে ছোটাছুটি করে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন?”
‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ বঙ্গোপসাগরের পোষ্যপুত্র উপকূলবাসীদের নিয়ে লেখা উপন্যাস। তাও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে আর জোতদারদের নিয়ে জীবনযুদ্ধের কাহিনী। তার শুরু এভাবে,
“দুধের সরের মতো টলটলে চর জেগে ওঠে জোতদারের সাধ-আহ্লাদ মেটাতে। জন্ম থেকেই চরের ওপর পড়ে জোতদারের লোলুপ দৃষ্টি। কৌশল, ফন্দিফিকির আর জোরজবরদস্তি করে তাদের অবৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। অথচ জমির ওপর ভালোবাসা যদি কারো থাকে সে হলো চাষির। চাষি জানে জমিতে কিভাবে চাষ দিতে হয়। ফসল ফলাতে হয়, সূর্যের তাপে জমি ফেটে যখন চৌচির হয়, মাটি যদি বন্ধ্যা হয় অথবা বানের পানিতে ডুবে যায় তখনো চাষিই জমির প্রতি আজন্ম মমতায় ছুটে যায়। আর জমির ন্যায্য বণ্টন যদি কেউ করতে পারে তা সেও চাষিই, জোতদার নয়।
“কিশোরী চাঁদ যেমন দিনে দিনে যুবতী হয়ে ওঠে, চরও তেমনি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। পানি শক্ত হয়, যেন একদল চাষি রাতারাতি মই চালিয়ে সমান করে দিয়ে গেছে পুরো চরটা। দিগন্ত বিস্তৃত চরটা তখন মানুষের বুকের মতো ওঠা-নামা করে, শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। অথবা মানুষের পেটের সঙ্গেও তুলনা করা চলে। নতুন জাগা চর এভাবে অনেক দিন পড়ে থাকে, জোয়ারে ডোবে, ভাটায় জেগে ওঠে। তারপর দু-এক গাছি ঘাস থেকে উরি-ঘাসের জঙ্গল হয়ে যায়। তত দিন চর হাতছানি দিয়ে ডাক দিয়েছে সকলকে। আশপাশ এলাকার চাষিদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেছে, জোতদারের চোখ কিন্তু তার আগেই সেখানে বহাল তবিয়তে হাত-পা মেলে দিয়েছে। দলবল নিয়ে তত দিনে সে পতাকা পুঁতে দিয়ে গেছে আর গাঙচিল, কাদাখোঁচা, টিট্টিভ জাতের পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়েছে তো সেই কবে থেকেই। ছোট ছোট পায় ভর দিয়ে, ডাঙায় বিশ্রাম নিয়ে দরিয়ার চিলেরা আবার আকাশে উঠে ক্রিক ক্রিক ডাকতে শুরু করে। তারপর মাঝে মাঝে তির্যক গতিতে নেমে কাঁকড়া মাছ, পোকামাকড় ছোঁ মেরে আকাশে উঠতে উঠতে পেটে চালান করে দিয়ে আবার তৈরি হয় নতুন শিকারের জন্য। জোতদারেরাও একটা চর দখল করার পর নতুন জাগা চরের অপেক্ষায় ওত পেতে থাকে, তাদের পোষা সঙ্গী সাঙ্গাতেরা খোঁজখবর পেলে ছুটে গিয়ে জানিয়ে দেয়, ‘চর জেগেছে, শেফালির চরের পাশে নতুন চর জেগে উঠেছে….”
এভাবে আমার ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ উপন্যাসের শুরু। তিন পর্বে ৩৩৩ পৃষ্ঠার উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যে বঙ্গোপসাগর, সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, সিডর ও সমুদ্র উপকূল নিয়ে কোনো উপন্যাস আমার জানামতে রচিত হয়নি।
সচেতনভাবে বিষয় নির্বাচন করে গল্প লেখা শুরু করিনি, এ কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে আমার গ্রাম, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগর আমার গল্প-উপন্যাসের মৌলিক উপাদান ও এলাকা হয়ে ওঠে। প্রথম গল্পবই ‘সাদা কাফন’ প্রকাশিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ সালে। গল্প লিখতে শুরু করি সমকাল সাহিত্য পত্রিকায়, সিকান্দার আবু জাফরের সম্পাদনায় ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে। কিন্তু সেই গল্প আমার এ পর্যন্ত লেখা ২৯টি গল্পবই এর কোনোটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। জাফর ভাই কেন সে গল্পগুলো ছেপেছিলেন, বেঁচে থাকলে এখন হয়তো জানতে চাইতে পারতাম। কেন ছেপেছিলেন তা একেবারে জানি না তা বোধ করি নয়। তবুও এ প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ তো শুরু করা যেত।
‘সমুদ্র সওয়ার’ বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পটভূমিতে লেখা প্রথম গল্প। ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমীর একুশে সংকলন পত্রিকায় ছাপা হয়। দ্বিতীয় গল্প ‘সমুদ্র-সম্ভোগ’ বাংলা একাডেমী একুশের সংকলন ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত। ১৯৭৮ সালে আমার গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের সহপাঠী প্রভাত জলদাসকে মনে করে লিখি ‘প্রভাতের যুদ্ধযাত্রা’। এটিও ফৌজদারহাট সমুদ্রসৈকতের জেলেপাড়া ও সাগরে মাছ ধরা নিয়ে গল্প। আর প্রভাত ছিল আমার গ্রামের পশ্চিম সীমান্তে কর্ণফুলীর সঙ্গে ইছামতি নদী যেখানে মিশেছে, সেখানকার। স্কুলে যেত আমার বাড়ির সামনে দিয়ে। বর্ষায় পাহাড়ি ঢল ও স্থানীয় প্রবল বৃষ্টির কারণে হতো বান। বানের সময় প্রভাতরা নৌকোয় করে পরিবার নিয়ে রাঙ্গুনিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে চলে যেত আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে। একটি টিলার ওপর স্কুল। অনেক মানুষ সেখানে আশ্রয় নিত। জেলে, হিন্দু, মুসলমান সবাই। বঙ্গোপসাগর নিয়ে লেখার সময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প লেখাও চলতে থাকে। তখন বঙ্গোপসাগর অনেকবার দেখা ও জেলে মনীন্দ্রের নৌকোয় করে সমুদ্র ভ্রমণ হয়ে আমি বেশ বাস্তব ও স্বপ্নসমৃদ্ধ হয়ে উঠেছি। ১৯৮৯ সালের দিকে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতে থাকে সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাতের আগ্রহ ও প্ররোচণায়। চলন্তিকা বইঘরের মালিক মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ১৯৯০ সালে এর প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। তখন মাত্র ১০৪ পৃষ্ঠার বই, প্রচ্ছদ করেছিলেন বীরেন সোম। শোভন সংস্করণ ৪৫.০০ টাকা ও সুলভ ২৫.০০ টাকা। কী উত্তেজিত আমি তখন, কিন্তু কবীর চৌধুরীর সমালোচনায় এর পটভূমির তুলনায় বইয়ের পৃষ্ঠার বিস্তার কম বলে ইঙ্গিত করাতে আমার চোখ খুলে যেতে থাকে। পরে এই কিশোরী হয়ে ওঠে আরো দুটি পর্বে পীনোন্নত বা বটবৃক্ষ। ৩৩৩ পৃষ্ঠার বই, সময় ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯। দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০৯, মূল্য ২৫০.০০ টাকা, প্রকাশক জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ৬৭ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০। যথারীতি দুই প্রকাশক অবহেলা করেই গেলেন লেখককে। এ রকম বহু প্রকাশক আমার আছেন বহাল তবিয়তে। এসব সত্য পিশুন বাক্য আজ এইটুকু থাক, কালের কপোল তলে কালি হয়ে।

চেনা-অচেনা প্রিয় বঙ্গোপসাগর
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসে বঙ্গোপসাগরের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন গঙ্গা-সাগর সঙ্গমে। তাঁর বর্ণনা, “…গম্ভীর জলকল্লোল তাঁহার [নবকুমারের] কর্ণমধ্যে প্রবেশ করিল; তিনি বুঝিলেন যে, এ সমুদ্রগর্জন। ক্ষণকাল পরে অকস্মাৎ বনমধ্য হইতে বহির্গত হইয়া দেখিলেন যে সম্মুখেই সমুদ্র। অনন্তবিস্তার নীলাম্বুমণ্ডল সম্মুখে দেখিয়া উৎকটানন্দে হৃদয় পরিপ্লুত হইল। সিকতাময় তটে গিয়া উপবেশন করিলেন। ফেনিল, নীল, অনন্ত সমুদ্র! উভয় পাশ্র্বে যত দূর চক্ষুঃ যায়, তত দূর পর্যন্ত তরঙ্গভঙ্গ প্রক্ষিপ্ত ফেনার রেখা; স্তূপীকৃত বিমল কুসুমদামগ্রথিত মালার ন্যায় সে ধবল ফেনরেখা হেমকান্ত সৈকত, ন্যস্ত হইয়াছে; কাননকুন্তলা ধরণীর উপযুক্ত অলকাভরণ। নীলজলদমণ্ডলীমধ্যে সহস্র স্থানেও সফেন তরঙ্গভঙ্গ হইতেছিল। যদি কখন এমত প্রচণ্ড বায়ুবহন সম্ভব হয় যে, তাহার বেগে নক্ষত্রমালা সহস্রে স্থানচ্যুত হইয়া নীলাম্বরে আন্দোলিত হইতে থাকে, তবেই সে সাগর তরঙ্গ ক্ষেপের স্বরূপ দৃষ্ট হইতে পারে। এ সময়ে অস্তগামী দিনমণির মৃদুল কিরণে নীলজলের একাংশ দ্রবীভূত সুবর্ণের ন্যায় জ্বলিতেছিল। অনতিদূরে কোনো ইউরোপীয় বণিকজাতির সমুদ্রপোত শ্বেতপক্ষ বিস্তার করিয়া বৃহৎ পক্ষীর ন্যায় জলধিহৃদয়ে উড়িতেছিল।”
‘কপালকুণ্ডলা’য় গঙ্গার সাগরসঙ্গমের আরো বর্ণনা আছে।
এর পরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে স্টিমারে করে বার্মা যাওয়ার সময় বঙ্গোপসাগরের ঝড়ের বর্ণনা আছে। তার সামান্য অংশ এখানে তুলে ধরা যায়,
“…হঠাৎ মনে হইল, জাহাজের গায়ে কালো জল যেন ভিতরের ধাক্কায় বজবজ করিয়া ক্রমাগত উপরের দিকে ঠেলিয়া উঠিতেছে। দূরে চোখ পড়িয়া গেল- দৃষ্টি আর ফিরাইতে পারিলাম না। একবার মনে হইল ও বুঝি পাহাড়, কিন্তু পরক্ষণেই সে ভ্রম যখন ভাঙিল তখন হাতজোড় করিয়া বলিলাম, ভগবান! এই চোখ দুটি যখন তুমিই দিয়েছিলে, আজ তুমিই তাহাদের সার্থক করিলে। এত দিন ধরিয়া তো সংসারে সর্বত্র চোখ মেলিয়া বেড়াইতেছি; কিন্তু তোমার এই সৃষ্টির তুলনা তো কখনো দেখিতে পাই নাই। যত দূর দৃষ্টি যায়, এই যে অচিন্তনীয় বিরাটাকার মহাতরঙ্গ রজতশুভ্র কিরীট পরিয়া দ্রুতবেগে অগ্রসর হইয়া আসিতেছে, এত বড় বিস্ময় জগতে আর আছে কি!
“সমুদ্রে তো কত লোকই যায় আসে; আমি নিজেও তো আর কতবার এই পথে যাতায়াত করিয়াছি; কিন্তু এমনটি তো আর কখনো দেখিতে পাইলাম না। তা ছাড়া চোখে না দেখিলে, জলে ঢেউ কোনো গতিকেই এত বড় হইয়া উঠিতে পারে, এ কথা কল্পনার বাপের সাধ্যও নাই কাহাকেও জানায়।…
“…আশেপাশে, উপরে-নিচে চারিদিকেই কালো জল। জাহাজসুদ্ধ সবাই যে পাতালের রাজবাড়িতে নিমন্ত্রণ খাইতে চলিয়াছি, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। এখন ভাবনা শুধু এই যে খাওয়া-দাওয়াটা তথায় কী জানি কী রূপ হইবে। কিন্তু মিনিটখানেক পরে দেখা গেল, না- ডুবি নাই, জাহাজসুদ্ধ আবার জলের উপর ভাসিয়া উঠিয়াছি। অতঃপর তরঙ্গের আর শেষ হয় না, আমাদের নাগরদোলা-চাপারও আর সমাপ্তি হয় না, এতক্ষণে টের পাইলাম, কেন কাপ্তেন সাহেব মানুষগুলোকে জানোয়ারের মতো গর্তে পুরিয়া চাবি বন্ধ করিয়াছেন। ডেকের উপর দিয়া মাঝে মাঝে যেন জলের স্রোত বহিয়া যাইতে লাগিল। আমার নিচে হাঁস-মুরগিগুলা বার-কতক ঝাপট করিয়া এবং ভেড়াগুলা কয়েকবার ম্যা-ম্যা করিয়া ভবলীলা সাঙ্গ করিল।…”
‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের এই সমুদ্রযাত্রায় জাহাজের মানুষজন নিয়েও চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে আমি জাহাজে চড়ে পড়িনি। কিন্তু কয়েকবার জাহাজে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়েছে। ১৮৬২ শকাব্দে আমার জন্ম। কোষ্ঠিপত্রে তাই লেখা আছে। সেই অনুযায়ী ১৯৪০ সালে জন্ম। বাংলা একাডেমী থেকে জেনেছি (ভুল-শুদ্ধ জানি না) ২০ শে সেপ্টেম্বর ছিল দিনটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯ সালে। ১৯৪৩ সালে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে দুর্ভিক্ষ হয় বৃটিশ ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে, এই বাংলায়। ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৫৮, ১৯৬০, ১৯৬৩, ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালে একের পর এক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হয়। ১৯৫৮ সালের প্রলয়ংকরী ঝড়ের কথা আমার মনে পড়ে, ওই বছর জাপানের বিজ্ঞানী ইয়েকাসেকি ধূমকেতু আবিষ্কার করেন। ১৯৬০ সালের মহাঝড়ে আমার গ্রামের বাড়ি পড়ে যায় উবু হয়ে। আমি তখন কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে কমার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সন্ধ্যার পরপর শুরু হয় ঝড়। পশ্চিম দিকের আকাশ রক্তাভ হয়ে যায়, আর কী তর্জনগর্জন ঝড়ের! আমাদের ছাত্রাবাসের টিন উড়িয়ে নিচ্ছে, দলামোচা পেকে পড়ছে সামনের খালি মাঠে। মাটির দেয়াল বলে ঝড়ে দেয়াল উড়িয়ে নিতে পারেনি। ‘৫৮ সালে রাঙামাটিতে ছিলাম বলে ঝড়ের কবলে পড়িনি। প্রত্যক্ষ দেখলাম ‘৬০ সালে। পরদিন সকালে হেঁটে রওনা দিলাম। তিন মাইল হেঁটে কর্ণফুলী পার হয়ে আরো পাঁচ মাইল হেঁটে গিয়ে দেখি বাড়ি নতজানু হয়ে আছে। গ্রামে অনেকের ঘর পড়ে গেছে। কী দুর্দশা! এই প্রথম আমার ধ্বংসস্তূপ থেকে লোকের ঘর মেরামতিতে সাহায্য করার পাঠ শুরু। তখনো বঙ্গোপসাগরের উপকূলের মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও হাজার হাজার মৃতের লাশ দেখিনি। তখন শুধু ডায়েরি লিখতাম। গল্প ও কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম গোপনে। কাকে দেখাব। কে কী ভাববে! বঙ্গোপসাগরই দেখিনি তখনো। এর পরপর কোনো একসময় দেখেছি। সে কথায় পরে আসছি।
কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিয়ে যে বঙ্গোপসাগরকে আমরা দেখতে বা উপভোগ করতে যাই, প্রিয় মানুষী বা মানুষের সহচর হয়ে যাই, সেই উপসাগরটিই কি আদি ও আসল? বা অনাদি বা অনবদ্য রূপ? নাকি এই ধরিত্রী একসময় জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড ছিল? তারপর একসময় পৃথিবী ঠাণ্ডা ও শান্ত হলো। তাও লক্ষ লক্ষ বছর পরে। তার পরও পৃথিবীর সাগর-মহাসাগরের জলধি তরঙ্গ, তর্জনগর্জন বা তোলপাড় কম ছিল না। সেটাই কি আমরা এখনো দেখি সামুদ্রিক ঝড়, সাইক্লোন, সিডর, সুনামি বা জলকম্প রূপে? বৈশ্বিক উষ্ণায়নের রোষবহ্নিরূপে? হ্যাঁ। তবে পরিবর্তিতরূপে। তাও লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।
বঙ্গোপসাগর আমার খুব কাছের মানুষ। আমার পূর্বপুরুষের একশো বছরের বাড়িভিটে থেকে মাত্র কুড়ি মাইল দূরে কর্ণফুলী নদীর মোহনায়। ওর গোপন অন্ধিসন্ধি না জানতে পারি, কিন্তু রুদ্র রূপ দেখে আসছি আজন্ম। শান্তশ্রীও। এমনকি ‘চট্টগ্রাম জেলা গেজেটীয়ার’ পড়ে দেখতে পাই ১৭৯৫ সাল থেকে। এই ঝড়-বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস মৌসুমি বৃষ্টিপাতের জোয়ার-ভাটা নয়। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর ঝড়-বৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ভীষণ তার রুদ্র রূপ, ভয়ংকর তার ধ্বংসশক্তি। ১৭৯৫ সালের ৩রা জুন সন্ধে ৭টা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত সে তার ভয়ংকর রূপ দেখিয়ে যায় কোনো ন্যায়-নীতির তোয়াক্কা না করে। এর প্রবল আক্রমণ ছিল উত্তরে চকরিয়া থানা থেকে দক্ষিণে টেকনাফ। নাফ নদীর মোহনার তখনকার বিশাল অরণ্য সে তছনছ করে দিয়ে যায়। দশটি গাছের মধ্যে একটি গাছ আনুপাতিক হারে রক্ষা পেয়েছিল। তখন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত জানার জন্য উল্লেখ করা যায়, চট্টগ্রামে বার্ষিক ১০২.০৮”, কক্সবাজারে ১৩২.০১”, কুতুবদিয়ায় ১১৬.৮৭” ও মীরেরসরাইতে ১১৯.০৯”। মে থেকে অক্টোবর মাস হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সুপক্ব সময়।
এরপর জেলা গেজেটীয়ারে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের হিসাব দেওয়া হয় ১৮৭৬ সালের। ৩১ শে অক্টোবর এই ধ্বংসাভিযান চলে। ঢেউ ১০ থেকে ২০ ফুট, কোথাও বা তার চেয়ে বেশি। রাতে শুরু হলেও ১১টার সময় একটু থেমে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর ১৮৯৭ সালে হয় মহান ঘূর্ণি ও জলোচ্ছ্বাস। যার নাম চট্টগ্রামে এখনো বলা হয় ঊনষাট মঘীর তুফান। তারপর ১৯০৪, ১৯০৫, ১৯০৬, ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৫৮, ১৯৬০, ১৯৬৩, ১৯৬৫, ১৯৭০ একের পর এক আছড়ে পড়ে। আগের তুলনায় এত ঘন ঘন ঝড়-ঝঞ্ঝা ও জলোচ্ছ্বাস হওয়ার কারণ বিজ্ঞানীরা জানেন। আমার জীবনে ১৯৫৮, ১৯৬০, ১৯৬৩, ১৯৬৫ সালের বঙ্গোপসাগর প্রবলভাবে নাড়া দেয়। তখন আমি সদ্য ম্যাট্রিক পাস করে জীবন ও জগতের মুখোমুখি হচ্ছি। প্রকৃতিকে নিজের চোখে চেনার হাতেখড়ি। গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ি ও ত্রাণকাজে সক্রিয় অংশ নিচ্ছি। ঘর বাঁধা ও মেরামতের সকল কলাকৌশল শিখে নিচ্ছি। খুঁটি, বেড়া, ঘর ছাওয়া, বাঁশ ও বেতের কাজ সবই শিখে নিয়েছি। খুঁটিনাটি সব। হাল-চাষ থেকে বীজ বোনা, ধান রোয়া থেকে গোলায় তোলা পর্যন্ত সব কাজ পরীক্ষায় পাসের মতো রপ্ত করে নিয়েছি। কাজগুলো দারুণ মজার। গরিব গ্রামবাসী থেকে সম্পন্ন সবার কিছু না কিছু ক্ষতি হয়েছে। কাজের অত লোক কোথায়। গল্পে যেমন কাহিনী থাকে, ভাষার বাঁক বা বাঁকা স্রোত থাকে, শব্দ ব্যবহারের রহস্য থাকে ঘর তৈরিরও এ রকম অনেক পুষ্ট গোমর আছে। পড়ে যাওয়া চালা-বেড়া-খুঁটি আগে উদ্ধার করতে হয় যাতে আর নষ্ট না হয়। মাটি কেটে রাস্তা ভরাট ও পুকুর খোঁড়ারও রীতিনীতি আছে।
সুন্দরবন থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রোপকূল তার সংলগ্ন গ্রামের এই বিধ্বস্ত চেহারা পত্রিকায় পড়ে সঠিক উপলব্ধি করা যায় না। বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা ও নবকুমারের এক ঝলক বঙ্গোপসাগর দেখা থেকে শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের নায়কের সমুদ্রপথে বার্মা যাত্রায় আছে অনেক বাস্তব ও বিস্তারিত বর্ণনা। কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সিন্ধু বা বঙ্গোপসাগর নিয়ে কবিতা লিখেছেন। সমুদ্রবিষয়ক ছাড়াও অন্যান্য গান ও কবিতায় রূপক ও প্রতীক হয়ে সাগর-মহাসাগর এসেছে ঘুরেফিরে। আধুনিক গল্পকার ও কবিদের কবিতায়, গানে আছে।
জীবনানন্দ দাশই একমাত্র কবি যিনি সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর, আরব সাগরের জুহু সমুদ্রতট এবং ‘পৃথিবীর সব সিন্ধু ছেড়ে দিয়ে একা/বিপরীত দ্বীপে দূরে মায়াবী আরশীতে হয় শুধু দেখা/রূপসীর সাথে এক;’… বলে সমুদ্রের বিচিত্র বাক্প্রতিমার সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর ‘সহজ’ (ধূসর পাণ্ডুলিপি), ‘সিন্ধুসারস’ (মহাপৃথিবী), ‘সুরঞ্জনা’ (বনলতা সেন), ‘নাবিক’ (সাতটি তারার তিমির), ‘নাবিকী’ (ঐ), ‘জুহু’ (ঐ), ‘সময়ের কাছে’ (ঐ), ‘সূর্যতামসী’ (ঐ), ‘বিভিন্ন কোরাস’ (ঐ) প্রভৃতি এবং আরো অনেক কবিতায় সমুদ্র এসেছে শৃঙ্খলিত রূপক-উপমা ও কাহিনীর কারুকার্যে, শিল্পচাতুর্যে। প্রাচীন সভ্যতার দেশ, মহামানব ও প্রাচীন পৃথিবীর বিখ্যাত নারী ও নর, মরুভূমি, নক্ষত্র, সূর্য, আকাশ, অন্ধকার, নদী, প্রকৃতি জীবনানন্দ দাশকে সৃষ্টির উন্মত্ত অভিযাত্রী করে রেখেছে। সম্ভবত তাঁর ‘পাখিরা’ (ধূসর পাণ্ডুলিপি)-র কবিতাটি সমুদ্র-সম্পর্কিত মহান আলেখ্য। শুনুন,
“ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে-
বসন্তের রাতে
বিছানায় শুয়ে আছি;
– এখন সে কত রাত!
ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,
স্কাইলাইট মাথার উপর,
আকাশের পাখিরা কথা কয় পরস্পর
তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে?
তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে।
শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে,
চোখ আর চায় না ঘুমাতে;
জানালা থেকে ওই নক্ষত্রের আলো নেমে আসে,
সাগরের জলের বাতাসে
আমার হৃদয় সুস্থ হয়;
সবাই ঘুমায়ে আছে সব দিকে-
সমুদ্রের এই ধীরে কাহাদের নোঙরের হয়েছে সময়?…”
এরপর আরো তিরিশ পঙ্‌ক্তি আছে। সমুদ্র নিয়ে এমন কাজ তাঁর মতো বাংলা সাহিত্যে কোনো কবির কবিতায় সহজলভ্য নয়। আমার জানা নেই।
বঙ্গোপসাগর আমাদের প্রাণ, অনিঃশেষ ভালোবাসা ও জীবন। আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, আমাদের শাসনও করে মায়ের নিষ্ঠুরতায়, আবার স্তন্য দেয় অপার স্নেহ-মমতায়। বছরের পর বছর এত ঝড়-ঝঞ্ঝা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে আমরা দিশাহারা কূলহারা হয়ে পড়ি। আমি ছুটে যাই তার ধ্বংস নিষ্ঠুরতা দেখতে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চরজব্বার, চরফ্যাশন ও উরিরচরে। চট্টগ্রাম শহরে ও আমার গ্রামে। ১৮৭৬ থেকে ২০১৩ সালের মহাসেন পর্যন্ত বছরগুলোর মধ্যে ফাঁক অনেক কমে গেছে শেষ দিকে এসে। অর্থাৎ এখন দু-তিন বছর পর পর, বা ঘন ঘন ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বেড়ে গেছে। এতে দোষ দেওয়া হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতাকে। বায়ুমণ্ডলে জমা কার্বন অর্থাৎ গ্রিন হাউস বিপর্যয়কে। ১৮৭৬ সালের পর থেকে সামুদ্রিক ঝড়গুলো শুধু বাংলাদেশে আঘাত করার হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে যে সমস্ত ঝড় পুব দিকে মিয়ানমার বা বার্মায় ও পশ্চিম দিকে পশ্চিমবঙ্গ উড়িষ্যা বা অন্ধ্র প্রদেশে চলে গেছে তার হিসাব দেওয়া হয়নি।
আমার গল্প-উপন্যাস অর্থাৎ সাহিত্যজীবনে বঙ্গোপসাগর কত গভীর প্রভাব ফেলেছে তার সন্ধান নিতেই এই লেখা। সেই সূত্রে নদীও এখানে গহিন ভূমিকা রেখে গেছে। নদীর সূত্রে হাত ধরে এসেছে বান, নদীর ভাঙন। বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী বঙ্গোপসাগর, নদী, ভাঙন, বান ও নীলিমা। খুব ছেলেবেলায় আমাদের বাড়ির উত্তর দিকে দুটি ভিটে ছিল। তারপর পার্বত্য চট্টগ্রামের কাউখালি-লক্ষ্মীছড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা ইছামতি মিলিত হয়েছে গ্রামের দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত কর্ণফুলীতে, দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে। বর্ষায় ইছামতিতে তীব্র পাহাড়ি ঢল নামত। কূল ভাঙত খুব। দেখতাম নদীতে বঙ্গোপসাগর থেকে জোয়ার এলে স্রোতের তীব্রতা কমে যেত, নদীর কূল ভাঙত না। কর্ণফুলীতেও তাই দেখতাম। এই জোয়ার আসত বঙ্গোপসাগর থেকে কর্ণফুলী বেয়ে। তাতে ইছামতি এবং আমাদের গ্রামের উত্তর দিকের শান্ত সুন্দরী খালের পানি উজাতে শুরু করত। বাবা, ঠাকুমা ও বড়দের কাছ থেকে জানতাম এর নাম জোয়ার, দিনে-রাতে দুবার হয়। সেই জোয়ার প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা পর আসত। এই আমার প্রথম বঙ্গোপসাগর দেখা। কল্পনায়।
তারপর বহু বছর পর প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্য আকাদেমী এবং রবীন্দ্র পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘সাগর থেকে ফেরা’ কবিতা বইটি পড়ি ১৩৭৫ বঙ্গাব্দে। তার আগে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এই গানটি শুনি। সুরকারের নাম জানি না। কেউ জেনে থাকলে বলুক। বঙ্গোপসাগর নিয়ে গান। গানটি আসলে কবিতা হিসেবে নাকি গান হিসেবে লেখা হয়েছিল, তাও জানি না। খুব সম্ভবত কোনো ছায়াছবিতে গানটি গাওয়া হয়। শুনুন তাহলে, কবিতাটির নাম, ‘সাগর থেকে ফেরা’।

নীল! নীল!
সবুজের ছোঁয়া কি না, তা বুঝি না,
ফিকে গাঢ় হরেক রকম
কম-বেশী নীল!
তার মাঝে শূন্যের আনমনা হাসির শামিল
কটা গাঙ চিল।
ভাবি, বলি, সাগরের ইচ্ছে,
সাদা ফেনা থেকে যেন
শাঁখ-মাজা ডানা মেলে আকাশের তল্লাশ নিচ্ছে।

মিথ্যেই
মিল-খোঁজা মন চায় উপমা।
নেই, নেই!
হৃদয় দু’চোখ হয়ে, শুধু গেয়ে ওঠে,
সেই! সেই!

মাটি, গাছ, তীর থেকে একেবারে ফেলে দিয়ে আসা,
সুবিশাল ডানা মুড়ে
নোনা ঢেউএ আলগোছে ভাসা,
কূল-ছাড়া জল আর
মেঘ, তারা, হাওয়া নিয়ে থাকা,
সময়ের নীলে শুধু
উদ্দাম অবিরাম আল্পনা আঁকা,
কি যেন কি যেন ঠিক
মন দিয়ে জানতে না জানতে,
স্টীমার পৌঁছে যায়
আজ-কাল-পরশুর প্রান্তে।
এখানে বঙ্গোপসাগর, নীল ও গাঙচিল হৃদয়-মন নিয়ে কবির কলমে উৎসারিত। এই বইয়ে আরো কয়েকটি কবিতায় সাগর এসেছে অনবদ্য হয়ে।
বাংলা সাহিত্যে সমুদ্র নিয়ে উপন্যাস এত সামান্য যে, এক হাতের আঙুলে তা গোনা যায়। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের আগে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৫৯) লিখে গেছেন ‘বেনের মেয়ে’। এই উপন্যাসটিই একমাত্র সমুদ্রযাত্রার উপজীব্য বই।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় একমাত্র ব্যতিক্রম, যাঁর চারটি উপন্যাস পাওয়া যায় সমুদ্র নিয়ে- “অলৌকিক জলবাস”, “সাগরে খুঁজে ফিরি”, “একটি জলের রেখা”, “ঝিনুকের নৌকা” ইত্যাদি।
বাঙালি সমুদ্রযাত্রা ও সমুদ্র বাণিজ্য হারিয়েছে, বড় মাপের জলদস্যুর জন্ম দিতে পারেনি। পাইনি কলম্বাস বা ভাস্কো-ডা-গামা; শুধু ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের উৎপীড়ন ও দাস হিসেবে লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে সমুদ্রপথে। এমনকি চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল ও কক্সবাজারে জাহাজে চলে ভ্রমণবিলাসী পাওয়া যায় না। নদী, হাওর ও বদ্বীপ বাসিন্দা হয়েও হাতের কাছে বঙ্গোপসাগর থেকেও অবহেলিত। এ জন্য সমুদ্র আমাদের দুঃখ ঘোচায় না। কারণ আমরা সমুদ্র-সচেতন নই। তাই সমুদ্র আমাদের প্রতি বিমুখ। তার অগাধ সম্পদ থেকেও আমরা বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত এ জন্য। আর মহেশখালী, কুতুবদিয়ার কাদাময় চর থেকে যখন জোয়ারের জল নেমে যায়, তখন কখনো কি সেখানে গাঙচিলদের খাবার খুঁজতে দেখেছেন? ওদের সারিবদ্ধ সাদা শরীরের অপার্থিব সৌন্দর্য। আমি ওদের এক টুকরো ক্যামেরায় ধরে রেখেছি।
চট্টগ্রাম শহর থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে সন্দ্বীপে গাঙচিলের বক্ষসৌন্দর্য দেখেছিলাম আমার ছুড়ে দেওয়া রুটি গোত্তা মেরে ধরে নেওয়ার সময়। সেই ছবি এখন কোথায় আছে খুঁজে পাওয়া ভালোবাসার মতো খুব কঠিন হবে আমার পক্ষে। কক্সবাজারের মাছ ধরার লঞ্চঘাটে নানা রকম লঞ্চ-নৌকোর ছবি তুলেছিলাম বঙ্গোপসাগরের রুপোলি-সোনালি শস্যের। কুয়াকাটার রাখাইনদের মাছের তেল সংগ্রহের ছবি ছিল। সুন্দরবনের লালদিয়া চরের দক্ষিণ দিকে বহুদিনের জমা মরা কাঠের পাহাড় দেখেছিলাম কূল বরাবর। সমুদ্রের জোয়ারের ঢেউয়ে এগুলো জমা হয়ে পাহাড় হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো টপকে যেতে পারিনি বলে জেলেপাড়ায় যেতে পারিনি। সমুদ্র তো কিছুই নিয়ে যায় না, সব সে ফেরত দেয়। তবে ঝড়-জলোৎসবে মানুষ ও জীবজন্তুর প্রাণ নিয়ে যায়, কিন্তু মৃতদেহ ফিরিয়ে দেয় আবেগ ভরে। রাগের সময় যা করেছে করেছে, রাগ পড়ে যাওয়ার পর তার দুঃখ হয়। মানুষ-জীবজন্তুর লাশ কূলে তুলে রেখে যায়। কিছু কিছু পারে না বলে কূলের কাছাকাছি ভাসতে থাকে। সমুদ্রের এই স্বভাব, তার আচরণের প্রসন্নতা। অপ্রসন্ন হলে, হিংসা থেকে হলে লাশ গুম করে ফেলত। ঝড় থেমে গেলে সমুদ্রকে কখনো দেখেছেন? তার দুঃখ প্রকাশ অনুভব করেছেন কখনো! কোনো মৃতদেহ মাছেরা খেয়ে, আধখাওয়া করে ফেলে যেতে দেখেছেন? সমুদ্র-ঝড়ের পর উদ্ধার করা মৃতদেহের ওপর ক্ষত-বিক্ষত দুর্দশা দেখেছেন? দেখবেন না, দেখতে পাবেন না। এটা সমুদ্র ও সমুদ্রের প্রাণীদের স্বভাব। খুনে হাঙর বঙ্গোপসাগরে নেই বললেই চলে। আর তারা ঝড়ের ঢেউয়ের সময় নিরাপদ গভীরতায় চলে যায়। কূলের কাছাকাছি থাকলে যে বিপদ- এই জ্ঞান তাদের খুব আছে। নগর-ধর্ম শুধু কমে যাচ্ছে মানুষের, মন্দ মানুষের সংখ্যাও আবহাওয়া বিপর্যয়ের মতো দিনে দিনে বেড়ে চলেছে, ভালো মানুষদের হৃদয় হচ্ছে মন্দ মানুষের হাতে শকুন ও শেয়ালের খাদ্য।

বঙ্গোপসাগর ও স্বপ্ন সুন্দর
সমুদ্রের কোনো ইতিহাস নেই- নিজস্ব ইতিহাস। বঙ্গোপসাগরও ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে না। সমুদ্রের ওপর মানুষের কর্তৃত্বের ইতিহাস আছে। তার ওপর দিয়ে মানুষের যুদ্ধযাত্রার ইতিহাস হয়, দখলদারিত্বের ইতিহাস সৃষ্টি হয় জাতিতে জাতিতে। তার মধ্যে কত মাছ আছে, ঝড়-ঘূর্ণি-তাইফুন আছে, কত খনিজ সম্পদ আছে, দ্বীপ আছে, লবণাক্ততা বা চোরাস্রোত ইত্যাদি ইত্যাকার সব থাকে। এগুলোকে যদি সমুদ্রের ইতিহাস মনে করা হয় তাহলে তার ইতিহাস আছে বলা যায়। কিন্তু এসব তো ইতিহাস নয়।
সমুদ্র সচল তার তরল জলসম্পদের জন্য, তার জলস্রোত আছে কিন্তু নিজে এক জায়গা থেকে অন্যত্র যেতে পারে না, এ জন্য সে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না মানুষের মতো। মানুষ তো নিজেকে দিয়েই বিচার করতে- ভূগোল, ইতিহাস, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, সাহিত্য বিভাজন করবে। মিসরের রানি নেফারতিতি বা ক্লিওপেট্রার ইতিহাস আছে, জীবনী আছে, বাসনা-কামনা ও উত্থান-পতন আছে। অন্য অর্থে পাথরের কুড়োলেরও ইতিহাস আছে। দশ হাজার বছর আগের বা তারও আগের মানুষের ব্যবহৃত কোনো বস্তুরও তা হলে ইতিহাস তো আছেই, সেটা তার প্রাচীনত্বের জন্য। কিন্তু সুপ্রাচীন হলেও সমুদ্রের ইতিহাস আছে মানুষকে ঘিরে।
বঙ্গোপসাগর বা মহাদেশগুলোর তাই ইতিহাস নেই, থাকতে পারে না। ইতিহাস মানুষের, সমাজবদ্ধ মানুষের। ভারতের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক অধ্যাপক অশীন দাশগুপ্ত ‘বঙ্গোপসাগর’ বক্তৃতায় বলেছেন, “আপনারা অবশ্যই বোঝেন, সমুদ্রের কোনো ইতিহাস নেই, কোনো ইতিহাস থাকতে পারে না। মহাদেশগুলোরও ইতিহাস নেই। ইতিহাস মানুষের। ইতিহাস সমাজবদ্ধ মানুষের।” এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, উপকূলে ভারতবর্ষ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ঐতিহাসিকদের চোখে পড়ল যে সমুদ্র বিভিন্ন সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধ করেছে। ভারতীয় মহাদেশের একটি উপসমাজ, ভারতবর্ষের সমুদ্র-বণিক, ভারত মহাসাগরের উপকূলে অন্য বিভিন্ন দেশের সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। সমুদ্রের বন্ধনকে স্বীকার না করলে, সমুদ্রের সম্পর্কগুলো বিশ্লেষণ না করলে, এদের ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। এই নতুন স্বীকৃতি থেকেই সমুদ্রের ইতিহাস।
আমার এই ইতিহাস খোঁজার কারণ ছেলেবেলা, তারুণ্য ও যৌবন অন্বেষণ। ওদের আমি ফেলে এসেছি আমার নিভৃত গ্রাম ও বঙ্গোপসাগরে। চন্দ্রঘোনা, রাঙামাটি, সীতাপাহাড়, কক্সবাজার ও বঙ্গোপসাগরে। আমার গল্প, উপন্যাস ও ভালোবাসার সাগর জলে। আমার পূর্বপুরুষের অর্জিত জমিজমার চাষবাসে, মনোদৈহিক ভালোবাসার বাস্তবতা ও গল্প-উপন্যাসে। তার অনেক কিছু আমি কোনো দিন বলার সুযোগ পাব না পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষের শ্লাঘা-শ্লীল মাত্রাভেদে। সেসব এখন রইল। আমার গল্প-উপন্যাস তো দলিল রইল।
বঙ্গোপসাগরের হুগলি, কলকাতা কী বালেশ্বর, অন্যদিকে উড়িষা অঞ্চলের পুলিকট, মসুলিপত্তন কী মাদ্রাজ প্রধানত বঙ্গোপসাগরেই বাণিজ্য করত। এই বাণিজ্যের অনুসন্ধান করলে বঙ্গোপসাগরেই করতে হবে। কিন্তু অধ্যাপক জর্জ উইনিয়নস তাঁর বই ‘দ্য “শ্যাডো এম্পায়ার” অফ গোয়া ইন দ্য বে অফ বেঙ্গল’ ইটেনারারিও, ভল্যুম ৭(২), ১৯৮৩-তে লেখায় তিনি জোরালোভাবে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বেসরকারি পর্তুগিজদের ভূমিকার কথা বলেছেন। আর ভারত সমুদ্রে পর্তুগাল সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজশক্তির তুলনায় বেসরকারি জীবন ও বাণিজ্য কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আজকাল ঐতিহাসকগণ লক্ষ করেছেন যে বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলেই বেসরকারি পর্তুগিজ আধিপত্য গুরুত্বপূর্ণ চেহারা নিয়েছিল। একমাত্র মালাক্কা ছাড়া পুরো উপসাগরে পর্তুগিজদের কোনো শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল না। ভারতের পুলিকট কী বার্মার পেগুর মতো বন্দর-শহরে বেশ কিছু পর্তুগিজ বাস করত। কিন্তু এই মানুষগুলোর সঙ্গে পর্তুগালের রাজশক্তির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। প্রয়োজনে এই যোগাযোগ ঘটতে পারত, আবার প্রয়োজন বুঝলে এই বেসরকারি পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা নিজেদের তফাতে সরিয়ে নিতেন। অর্থাৎ সাধারণভাবে বলা চলে, ভারত সাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ‘অরাজক’ পর্তুগিজরা স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। অন্য কোনো ইউরোপীয় জাতি এভাবে এশিয়ার সমাজে শামিল হতে পারেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশে সতেরো শতকের গোড়ায় এমন বেশ কিছু লোকের বাস ছিল। চট্টগ্রামের হার্মাদদের বাঙালি ভোলেনি। বাংলা ভাষায় তাদের অনেক শব্দও ঢুকে পড়েছে তখন থেকে। পরবর্তী যুগের অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিকেও বাঙালি মনে রেখেছে। চট্টগ্রাম শহরের ফিরিঙ্গি বাজার ও চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার আমার গ্রামের অদূরের ফিরিঙ্গি খিল গ্রাম এখনো তার সাক্ষ্য দেয়। ফিরিঙ্গি বাজার এখন হয়েছে ফেরাই বাজার, ফিরিঙ্গি খিল নাম পরিবর্তিত হয়েছে ফেরাইর বা ফরার খিল। আবার ‘ফরা’ বলতে চট্টগ্রামে ‘বুদ্ধ’-ও বোঝে। এই রাঙ্গুনিয়া থানায় আমার গ্রাম ইছামতি, মাত্র দুই মাইল দূরে ফিরিঙ্গি খিল গ্রামটি। শিলক নদীর তীরে।
পর্তুগিজ সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল Estado da India;এস্তাদোর রাজধানী ছিল আরব সাগরের তীরে গোয়াতে। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় গোয়া ছিল স্বাধীন রাজ্য, পরে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই গোয়া শহর থেকে সে সময় পূর্বে নাগাসাকি ও পশ্চিমে মোজাম্বিক পর্যন্ত ঘাঁটিগুলো এস্তাদোর শাসনাধীন ছিল। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে এই প্রশাসন ছিল দুর্বল। নাগাপত্তন কি হুগলিতে কী ঘটছে সে জন্য সে কথা গোয়াতে বসে ভালো বোঝা যেত না। চট্টগ্রাম তো নয়ই। ষোলো শতকের ইতিহাসে বঙ্গোপসাগরকে বোঝা তাই ছিল দুষ্কর। ষোলো শতকের প্রথমে কোরমণ্ডল উপকূলে প্রধান বন্দর ছিল পুলিকট। পুলিকটের জোর ছিল বঙ্গোপসাগরের পূর্ব প্রান্তে ভারত সমুদ্রের অর্থাৎ ভারত মহাসাগরের অংশ অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্দর মালাক্কায়।
ষোলো শতকের প্রথমে গুজরাটি বণিকরা ছিল প্রতিপত্তিশালী। তারা ধর্মে মুসলমান, কর্মে জাহাজি-বণিক, বাণিজ্য সম্পর্কে আরবদের ঘনিষ্ঠ। এর পরই কোরমণ্ডলের তামিল বা তেলেগু-ভাষী কেলিং বা ক্লিং সওদাগরেরা। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকেও বণিকরা মালাক্কায় যেতেন। অন্যদিকে চীনা সওদাগরেরা মালাক্কা বন্দরেই দ্বীপপুঞ্জের ব্যবসায় যোগ দিতেন। ভারতীয়দের সঙ্গে চীনা বণিকদের বাণিজ্য বেশি ছিল না বলা চলে। ভারতীয় বণিকদের একদল ছিল গুজরাটি, অন্য দলটি ওই কেলিং।
১৫১১ সালে আলবুকার্ক মালাক্কা আক্রমণ করলেন। গুজরাটি বণিকরা তখন পর্তুগিজদের প্রধান শত্রু। গুজরাটি বণিকরা মালাক্কার সুলতানকে সমর্থন করে পর্তুগিজদের বিরোধিতা ও শহর রক্ষা করতে বললেন। নিজেরাও এই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এদিকে চীনারা সাধ্যমতো আলবুকার্ককে সাহায্য করছিলেন। কেলিং বণিকদের গোষ্ঠীপতি হিসাবে নিনা চাটু (নৈনা চেট্টি?) তখন সব সওদাগরকে নিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইলেন। মনে করা হয়, জাভার বণিকরা কেলিংদের সঙ্গে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আলবুকার্ক মালাক্কা দখল করলেন। সব গুজরাটি বণিক সুলতানের সঙ্গে মালাক্কা ছেড়ে নিজেদের ব্যবসা রাজধানী জোহোরে চলে গেলেন। এবং পর্তুগিজ-বৈরী উত্তর সুমাত্রার আচে (আচিন) বন্দর গড়ে তোলেন।
মালাক্কাতে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে নিনা চাটু তাঁর সহযোগীদের নিয়ে মালাক্কা শহরে ফিরে আসেন এবং নতুন উদ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। পর্তুগিজ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা এবং পর্তুগিজ জাহাজে বাণিজ্য-জাহাজেও নিনা চাটু-র ব্যবসা চলত। অন্য এক বিত্তবান বণিক নিনা সূর্যদেব নামের এক ব্যবসায়ীরও নাম পাওয়া যায়।
বঙ্গোপসাগরের ইতিহাসে বিশাল পরিবর্তন আসে ষোলো শতকের দ্বিতীয় অর্ধে। ১৫৬৫ সালের তালিকোটার যুদ্ধে বিজয়নগরের প্রকৃত রাজা রামরায় পরাজিত ও নিহত হন। কিন্তু বিজয়নগরের সাম্রাজ্য সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায়নি। পরে গোলকুণ্ডার সুলতান ইব্রাহিম কুতুব শা নিঃশেষে বিজয়নগর শহরটি লুট করেন। এতে পুলিকট বন্দরের ভেতরের জোর নষ্ট হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে পর্তুগিজ নীতিও পাল্টে গেল। এত দিন বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্য ছিল রাজকীয় বাণিজ্য। রাজার জাহাজে বাণিজ্য চলত। এখন পর্তুগালের রাজা অনুমতি দিলেন ব্যবসায়ীদের নিজের জাহাজে বাণিজ্য করার। তখন থেকে পুলিকট থেকে ভারতীয় জাহাজ আর মালাক্কাতে বাণিজ্য করতে যেতে পারত না নতুন আইনকানুনে। এ সময় অর্থাৎ সতেরো শতকের প্রথমে ওলন্দাজ বণিকরা পুলিকটে আসেন। তাঁরা পুলিকটের অবস্থা দেখে নতুন বন্দর পত্তন করেন। বন্দরটি মসুলিপত্তন।
সতেরো শতকের প্রথম গুজরাটিদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে বন্দর আচে। তার নতুন নাম হয় ‘বন্দর-আচে-দার-উস-সালাম’। এটি নতুন রাজত্বের রাজধানীও হলো। উত্তর জাভায় বান্টাম বন্দরের প্রতিপত্তি হলো। উত্তর সুমাত্রায় আচে। সেই সঙ্গে গোলমরিচ ও মসলাপাতির ব্যবসা বেড়ে গেল। এই অঞ্চলের রাজত্বগুলো এই ব্যবসা যত পারে আয়ত্ত করার চেষ্টা করল। সুলতান আলাউদ্দীন রিয়াদ শাহ (১৫৩৭-১৫৭১) এবং সুলতান ইসকান্দর মুদার (১৬০৭-১৬৩৬) আমলে আচে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ যতটুকু পারে উপকূল দিয়ে বিস্তার করেছিল। এর ফলে জোহোরের সঙ্গে আচের বিবাদ বেধেছিল। পর্তুগিজদের সঙ্গে প্রতিরোধ ছাড়াও নিজেদের মধ্যে বিবাদ ছিল। এই ব্যবসা ও বিবাদ তুরস্ক ও ইউরোপ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বঙ্গোপসাগর মাঝখানে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্য পনেরো শতকে বাড়ছিল কিন্তু ব্রহ্মদেশের মধ্যে ছড়াচ্ছিল না। এই অবস্থার পরিবর্তন হয় ১৫৩০-এর দশকে। ইরাবতীর পুরো নদীপথই প্রায় এক সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হলো। এই রাজবংশের প্রথম যশস্বী সম্রাট তাবিনশোয়েটি (রাজত্বকাল ১৫৩১-১৫৫০) ব্রহ্মদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য ভেঙে রাজধানী সমুদ্রের উপকূলে পেনু শহরে নিয়ে এলেন। মন জাতি ও ঊর্ধ্ব ব্রহ্মদেশী মানুষ একত্র করে টুঙ্গু রাজবংশ নতুন জাতি গঠনের কাজ শুরু করলেন। সেই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্য ইরাবতী ধরে ঊর্ধ্ব ব্রহ্মদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ল। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলল বাণিজ্য। তাবিনশোয়েটির পুত্র বাইন-নাউং (রাজত্ব ১৫৫১-১৫৮১) এই বংশের শ্রেষ্ঠ কৃতী সম্রাট। তাঁর সময়ে ব্রহ্মদের বাণিজ্য বহর তৈরি হয়। তাঁর পাঁচ-ছয়টি বাণিজ্য জাহাজ বঙ্গোপসাগরে নিযুক্ত থাকে। এগুলো মসুলিপত্তনে যেত। এ সময় ব্রহ্মরাজার সঙ্গে পর্তুগিজদের বিবাদ-লড়াই লেগেই থাকত। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্য স্বাধীনতা বজায় রাখার এই চেষ্টা ইতিহাসে মসুলিপত্তনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ করে রাখে। সমুদ্রে স্বাধীনতা বজায় রাখার এই লড়াই কম-বেশি আড়াই শ বছর ধরে চলেছিল। পর্তুগাল তার সমুদ্র-সাম্রাজ্য আর কখনো বঙ্গোপসাগরে তৈরি করতে পারেনি।
ডাচ কম্পানি সতেরো শতকের মাঝামাঝি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবাধ বাণিজ্য আটকানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। সুরাট, হুগলি ও মসুলিপত্তনের দৃঢ় প্রতিরোধে এই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। আবার ইংরেজ কম্পানিও কোনো দিনই বঙ্গোপসাগরের সত্যকার স্বাধীন জাহাজি-বণিকদের তাদের কোনো ঘাঁটিতে ডেকে নিতে পারেনি। ইংরেজদের বিশেষ ইচ্ছে ছিল যেন জাহাজি-বণিকদের সম্প্রদায়টি সান থোমে থেকে মাদ্রাজে বাস উঠিয়ে চলে আসে। তবে সত্যকার স্বাধীন ও বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ীদের কি ডাচ কি ইংরেজ কেউই চাইত না।
এদিকে সুরাটে যে ধরনের স্বাধীন বণিক সম্প্রদায় তৈরি হয়েছিল, মসুলিপত্তনে তা হয়নি। আবার হুগলি বন্দরে যেমন মোগল রাজপুরুষদের সরাসরি বাণিজ্য চলত, সওদাগরদের বিশেষ কোনো ভূমিকা ছিল না, মসুলিপত্তন তেমনটি নয়। এই বন্দরের সুবিদিত ব্যবসায়ী, পরে রাজপুরুষ, মীর জুমলা ইউরোপীয় ব্যবসায়ী শক্তিগুলোর দুশ্চিন্তার কারণ ছিলেন।
বাঙালি মাত্রেই চাঁদ সওদাগরের নামে ভাবাতুর হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে ষোলো শতক এবং তার পরের দুই শ বছর যেভাবে বঙ্গোপসাগরকে পাল্টাল তারই চাপে পড়ে চাঁদ অদর্শন হন। এই অদৃষ্টের অভিশাপে দেবী মনসার কোনো ভূমিকাই ছিল না। তবে ষোলো শতকের গোড়ায় চাঁদ সওদাগর ছিলেন- যে নামেই থাকুন না কেন, ছিলেন এ কথা ঐতিহাসিকের। ষোলো শতকে চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রাম, পরে হুগলিতে পর্তুগিজদের বসবাস, ব্যবসা ও বোম্বেটে বৃত্তি যে এই সওদাগরি ব্যবসার বিশেষ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। প্রমাণ রয়েছে, সতেরো শতকের প্রথমেও ভারতীয় জাহাজ গঙ্গা নদী থেকে আচে কী বানটামে চলাচল করত। কিন্তু পর্তুগিজ বোম্বাটে-ব্যবসা এই চলাচলে বিপদসঙ্কুল করে তোলে। আবার চট্টগ্রাম বন্দরও ষোলো ও সতেরো শতকের অধিকাংশ সময় আরাকান রাজত্বের অন্তর্গত। বোম্বেটে শক্তি ও রাজশক্তির মিলনেই আরাকানের প্রতিপত্তি। ষোলো শতকের মাঝামাঝি থেকে এক শ বছর আরাকানের ক্ষমতা মধ্য বঙ্গোপসাগরে অপ্রতিহত।
অশীন দাশগুপ্ত ‘বঙ্গোপসাগর’ পুস্তিকায় (প্রকাশক : প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস প্রা. লি., ১৯৮৯) লিখেছেন, “রাজপুরুষের সরাসরি বাণিজ্য বাংলাদেশে দরকার ছিল। চাঁদ সওদাগরের ক্ষমতা ছিল না ষোলো শতকের শেষে সতেরো শতকের প্রথমে বঙ্গোপসাগরে কোনো রকম ডিঙা ভাসানো। সতেরো শতকে এই প্রার্থিত রাজপুরুষ পেয়েও ছিল। শাহ সুজা থেকে মিরজুমলা, শায়েস্তা খান ও আজিম উশ শান দীর্ঘদিন সরাসরি বাণিজ্যে যোগ দেন। সেই সঙ্গে যাবতীয় দেওয়ান এবং ফৌজদাররাও ছিলেন। সতেরো শতকের বাংলাদেশে রাজকীয় বাণিজ্যের যেমন প্রকোপ তেমনটি বোধ করি ভারতবর্ষের অন্যত্র কোথাও চোখে পড়ে না। ইউরোপীয় রাজশক্তি জলে কুমিরের রূপ ধরেছিল, ডাঙায় রাজশক্তি ব্যাঘ্র-ব্যবহার শুরু করে। সে জন্য গুজরাটে যখন স্বাধীন বণিকশক্তি দাঁড়াচ্ছে, কোরমণ্ডলে যখন সরকারি সাহায্যপুষ্ট বণিকগোষ্ঠী সমুদ্রে স্বাধীনতার লড়াই চালাচ্ছে, হুগলিতে সে সময় বাঙালি বণিক ক্রমান্বয়ে পরনির্ভর হয়ে উঠছে। অধ্যাপক ওম প্রকাশ দেখিয়েছেন যে রাজনীতির পরিবর্তনে যখন মোগল রাজপুরুষেরা সমুদ্র-বাণিজ্য থেকে সরে দাঁড়ালেন তখন বাংলাদেশের জাহাজ বলতে প্রায় কিছুই রইল না।”
বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে অনুল্লঙ্ঘনীয়ভাবে বঙ্গোপসাগর স্বপ্নের বেশে এসে দাঁড়ায়। বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুরের শব্দে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরাক্রমে। বঙ্গোপসাগর দিয়ে আসা পাকিস্তানি সামরিক অস্ত্রসম্ভার নিয়ে জাহাজে। আমাদের তখন জাহাজ বা যুদ্ধজাহাজ ছিল না। আমেরিকার সপ্তম নৌ-বহর এসে পড়েছিল বঙ্গোপসাগরের পথে। আমাদের স্বাধীনতার সঙ্গে এভাবেই বঙ্গোপসাগর ইতিহাসভুক্ত হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণে তখন বঙ্গোপসাগর শাসিত, আবার বঙ্গোপসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ তখন প্রভাবিত করে উপকূল। আমার গল্প-উপন্যাস লেখার ব্যাপক মালমসলা সংগ্রহ করতেই মসলা-বাণিজ্যের কেন্দ্র বঙ্গোপসাগর খোঁজা ও পড়া।
বঙ্গোপসাগর আমাকে কতভাবেই না নিজেকে উজাড় করে দেয়। স্বপ্ন দেখায়। ১৯৮৯ সালের গোড়ার দিকে বঙ্গোপসাগর আমাকে দুটি ছোট উপন্যাস রচনায় অব্যর্থ উসকানি দেয়। ‘বঙ্গোপসাগর আমার শত্রু’ অনু উপন্যাস বা গল্পটি প্রথম লেখা। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের শিশু হাসপাতাল বিভাগের পাশাপাশি দুটি কক্ষ এর অকুস্থল। ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের অশীল রাতে পট উন্মোচন। সেই বছর অক্টোবর সংখ্যায় ‘প্রতিরোধ’ পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়। ১৯৯০ সালের একুশে বইমেলায় অনিন্দ্য প্রকাশন থেকে বই হিসেবে ভূমিষ্ঠ হয়। বইটির নাম ‘স্বপ্নসমুদ্রে বনদেবীরা আছে’। তারপর সাহস বাড়িয়ে দিল সেই প্রলয়ংকরী ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। ১৯৮৯ সালে লিখি ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ প্রথম পর্ব। পরে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন পর্বে বর্ধিত সংস্করণ এবং ২০০৯ সালে দ্বিতীয় সংস্করণ হয় ‘জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন’ থেকে। বঙ্গোপসাগর কত ভয়াবহ বিভীষিকাময় তা বই লেখার পর আমাকে বিস্মিত করে। ঘটনাস্থল দেখতে গিয়েছিলাম নোয়াখালী উপকূলের চরজব্বার, চরফ্যাশন ও উরির চরের আশপাশ এলাকা। বন্ধু ঔপন্যাসিক মাহমুদুল হকসহ গিয়েছিলাম। দুজনে দুটি উপন্যাস লিখব বলে কথা হয়েছিল আমাদের। সেদিন ছিল পূর্ণিমা বা তার আগে-পরের একটি দিন। সেই রাতে আকাশে ছিল চাঁদ, মাথার এইটুকু ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা সাদা ও সাদা-কালো দ্রুত উড়ন্ত মেঘের অজস্র টুকরো-টাকরা। ‘আশা’ সাহায্য সংস্থায় আশ্রয় পেয়েছিলাম। দুঃখী মানুষ ও সমুদ্রচরের লণ্ডভণ্ড এর আগেও দেখেছি। পরে আরো বহুবার দেখেছি। এক জীবনে এত তাণ্ডব বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কে দেখাতে পারে! পরদিন সকালে আশা খাইয়েছিল খাঁটি দুধভাত। কতকাল পরে সকালে দুধভাত দিয়ে প্রাতরাশ! দুধে-ভাতে বাঙালি, ভুলেই গেছি।
অন্যদিক থেকে ১৯৭৬ সালে ‘সমুদ্র সওয়ার’ আমার প্রথম সমুদ্র দেখার অনুভূতি নিয়ে স্মৃতিকাতর গল্প। তারপর ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত গল্প ‘সমুদ্র-সম্ভোগ’। দুটিই পরপর ‘বাংলা একাডেমী : একুশে সংকলন’ ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত। এরপর আজ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর নিয়ে আমার গল্পের ভুবন মোট চার শতাধিক গল্পের সিংহভাগ। এখনো সে শ্রেষ্ঠ উসকানিদাতা।
সমুদ্র যেমন উপকূলের বন্দর-নগরী ও গ্রামগঞ্জকে নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি উপকূলের বন্দর-নগরী অরণ্য-জনপদও শাসন করে সমুদ্র-মহাসমুদ্র। তেমনি আমার গল্প-উপন্যাসও প্রকৃতিবিষয়ক ভুবন দখলদারের দাপানিতে সম্ভোগ করে। আমিও সুযোগ পেলে এবং নিজের থেকে নিজেকে ছুটিতে নিয়ে তৃষ্ণার্ত ছুটে যাই তার কাছে। ছিনিয়ে আনি তার কাছ থেকে কিছু শক্তি ও সাহস, সৌন্দর্য ও নোনাজলের তৃষ্ণা। উপকূলবাসীকে সমুদ্র যেমন শাসন করে, তেমনি তারাও সমুদ্র থেকে তেড়িয়া হয়ে ছিনিয়ে আনে খাদ্যসম্পদ। আমি নিয়ে আসি লড়াকু সাহস, সৌন্দর্য পিপাসা, ব্যাপ্ত হৃদয়, কঠিন-কোমল মন, ভাবনাবিলাস। এমনকি ঈর্ষা-বিষাদ-ক্ষমাহীনতাও। আবার যাওয়ার সংকল্প, রাতভর ওর সঙ্গে কাটানোর একাকিত্বের বাসনাও। তারপর নৌকো নিয়ে সাগর পাড়ি, জাহাজে ভাসা, মাছ ধরার ট্রলারে জেলেজীবন, জাহাজভ্রমণ, সার্ফিং, ইয়ট চালনা…। এমন কত কী ভাবি! গল্পে অদম্য বাসনার বিস্তার ও কাহিনী আছে। কারণ আমাকে নিয়েই সমুদ্র, তেমনি সমুদ্রকে নিয়েই ‘আমি-গল্প’। বড়-ছোট সবার জন্য। তরুণী-যুবতী, যুবক-তরুণ, বৃদ্ধা-বৃদ্ধ, এমনকি ভবিষ্যৎ বংশধরের জন্যও। ছন্নছাড়া কল্পকাহিনীও। স্বপ্নবাস্তব ও পরাবাস্তব এবং জন্মজন্মান্তরেরও। হাঙরের সঙ্গে লড়াই। সুন্দরবনের বাঘের সঙ্গে কল্প-সাক্ষাৎ, জেলে মনীন্দ্রের সঙ্গে বন্ধুপ্রতিম হয়ে মাছ ধরতে যাওয়া, জাপান সমুদ্রের তীরে তরুণী-তন্বীর সঙ্গে সাঁতার, আবার গিয়ে জাপান সাগর তীরের ফুকুওয়াকায় অলৌকিক কাহিনী…সব, সব, সব। আছে আমার উপচানো ভাণ্ডারে।
এ জন্যই বঙ্গোপসাগর সম্পর্কে বলতে গেলে আমার ‘কালোনদী’ উপন্যাসের কথাও আসে। থাইল্যান্ড, বার্মা, ভারত, জাপান সাগর, প্রশান্ত মহাসাগর- যাদের আমি বন্ধুজনোচিত ভালোবাসায় দেখেছি, সবার কথা এসে যায়। এ জন্যই চিরায়ত কথার গুরুগম্ভীর রচনা শুরু হলেও বলতে হয়, আমার কথাটি ফুরোল না, নটেগাছটি মুড়োল না। আর ছোট্ট উদ্ভিদ নটেগাছ না মুড়োলেই বা কী! আমার সমুদ্রসম্ভোগ তৃষ্ণা যে জীবনের পরপারেও অপেক্ষমাণ।

বঙ্গোপসাগর ও স্বপ্নবাস্তবতা
জেলেদের নৌকোয় করে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে কূল দেখা না গেলে তখন সাগরকে কিসের সঙ্গে তুলনা করবেন? অথবা তটরেখাকে যখন দিগন্তের মতো আকাশ-মাটির সংযোগের মতো মনে হয় তাকে কার সঙ্গে তুলনা করবেন? বিমানে চড়ে টোকিও শহরে যাওয়ার সময় যখন আকাশে অনেক ওপরে উঠে যাবেন, নিচে কিচ্ছুটি দেখা যাবে না, দিগন্ত বলে কিছু দেখা যাবে না, তখন সেই অবস্থাকে কার সঙ্গে তুলনা করবেন? যিনি কোনো দিন বিমানে চড়েননি, মহাসমুদ্র বা বঙ্গোপসাগর দেখেননি তাকে কী করে সাগর-মহাসাগরের ব্যাপ্তি বোঝাবেন? বঙ্গোপসাগরের দশ মাইল গভীরে নৌকো নিয়ে পৌঁছে আমার সেই দশা হয়েছিল। তাও জেলে মনীন্দ্রের কাছা উঁচু মাছ ধরার নৌকোয় বসে। বঙ্গোপসাগর বা সমুদ্রকে একমাত্র আকাশের সঙ্গে ছাড়া কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা চলে না। অন্য একটির সঙ্গে তুলনীয়, তার নাম মন- যার সীমাসরহদ্দ নেই।
১৯৬০ সালের প্রবল সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। কানুগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে আমার সহপাঠী বন্ধু মৃণালকান্তি বড়ুয়ার সঙ্গে প্রথম বঙ্গোপসাগরের সৈকতে পা ডোবানোর স্বর্ণ সুযোগ পাই। পেছনে মৃণাল। সঙ্গে আর কে কে ছিল মনে নেই। পতেঙ্গার তখনকার কিশোরীপ্রতিম নিবিড় সৈকতে। লোকজন ছিল না, এই আলেখ্য আমার গভীরভাবে মনে আছে। আমি পায়ে পায়ে চললাম বালিয়াড়ি ভেঙে আমার প্রথম দেখা কুমারী বঙ্গোপসাগরের মৃদু ঢেউয়ের জলরেখার দিকে। বঙ্গোপসাগরের টানে। আমি কখনো এভাবে সমুদ্রসম্ভোগের সুযোগ পাইনি। খালি পায়ে এই বিশাল প্রকৃতির কাছে এত অন্তরঙ্গ নিবিড়তার সুযোগ হয়নি। একেবারে ছেলেবেলায় কখনো পেয়ে থাকলেও আমার মনে পড়ে না। নদীপথে আমার বাড়ি থেকে বঙ্গোপসাগর ২০-২৫ মাইল দূরে, মামাবাড়ি থেকে ৮-১০ মাইল।
ঢেউ এসে আমার পা ছুঁয়ে গেল অথবা আমি ছোট ছোট ঢেউয়ের কাছে গিয়ে আমাকে বিনা শর্তে বিনম্র সমর্পণ করলাম! ওপাশে মৃণালেরা। সারা শরীর শিউরে উঠল। সেই অনুভবকে আমার প্রথম প্রেমের স্পর্শের সঙ্গে তুলনা করতে পারি, অন্য কিছুতে নয়। না, আরো বাকি আছে। পায়ের গোড়ালি ডুবিয়ে আরো একটু গভীরে যেতেই মনে হলো- এরপর যদি অতল খাত থাকে! তখন!
আমি জানি এ রকম হয় না, হতে পারে না। বালিয়াড়ি হঠাৎ করে এভাবে অতলস্পর্শী খাদে পরিণত হতে পারে না। কিন্তু মনের ভাবনাকে কে বাধা দেবে! ভয়কে কে আটকাবে হঠাৎ ও অতর্কিতে প্রচণ্ড সাহসে! মৃণাল আমার থেকে হাত পাঁচ-দশেক দূরে। আমার এই প্রথম অনুভব এখনো স্পষ্ট, জীবন্ত ও আবেগ-ভীতি ঘন। তারপর বহু বছর পরে জেলে মনীন্দ্রের নৌকোয় করে ওর জাল থেকে মাছ আনতে গেছি। ফৌজদারহাট সৈকত থেকে দু-চার মাইল দূরে। সকালে গিয়ে সন্ধের প্রদীপ জ্বলা আঁধারের আলোয় ফিরে এসেছি দুই খাঁচা মাছ নিয়ে। লটে, ফাইস্যা, অলুয়া, নরলি, হোন্দরা, পোয়া ইত্যাদি পাঁচমিশেলি ছোট মাছ নিয়ে। ডাঙায় মাছরাঙা নামক মহাজন বসে আছে! আমাদের দেশে গরিব-গুর্বোদের, শ্রমিকদের, সর্বহারাদের গায়ে এই ছাপ আঁটা।
গরিব ও ক্ষমতাহীনের পাশে কেউ-একটা থাকে না। মহাজন অর্থাৎ মাছরাঙা ব্যাপারী মনীন্দ্রের মাছ কিনে নিচ্ছে দরদস্তুর করে। বিক্রির সব টাকা মনীন্দ্র পাবে না। ওই মাছরাঙা বসে আছে বালিয়াড়িতে। তার আগে মনীন্দ্র আমাকে ও সৈয়দ ইকবালকে মাছ দিল ঘরে নিয়ে আসার জন্য। শিল্পী ও লেখক সৈয়দ ইকবালের পরিচয় আপনারা জানবেন। আমরা সেই বহু আগের সাঙাত। তারপর হলো কি সমুদ্রে গাঙচিল নিয়ে মনীন্দ্রের সঙ্গে আমরা বাড়াবাড়ি করাতে মনীন্দ্র তার বিশেষ সাংকেতিক ডাকে গাঙচিল হাজির করেছিল সাগরে পাতা জালের প্রায় কাছেই। তখন মাছ নিয়ে ফিরছিলাম জেলের পো জেলের মতো। এসব নিয়ে আমার গল্প আছে। স্মৃতিকাতরতা আছে। গর্ব আছে। লোকে বলে দেমাগ থাকা ভালো নয়। আমার ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ উপন্যাসের পটভূমি তখন থেকেই তৈরি হচ্ছিল। এই উপন্যাসের বিস্তার বঙ্গোপসাগর তীরের আনোয়ারা, বাঁশখালী, কঙ্বাজার থেকে উরিরচর পর্যন্ত। সামুদ্রিক দুটি ঝড় এই উপন্যাস ধারণ করে আছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান পাত্রপাত্রী, বৃহত্তর অর্থে বার্মা পর্যন্ত এই উপন্যাসের নায়কের পিতা মোজাহেরের পদচারণ। নায়ক মোবাশ্বের। এর জন্য আনোয়ারার সরল গ্রামে দুবার গিয়েছিলাম নুন তোলা দেখতে। সেদিকের নুন উৎপাদন ও সমুদ্র দেখতে। তখন আমার সঙ্গে ছিল রাশেদ রউফ, রহিম শাহ এবং সরল গ্রামের তরুণ লেখক-সাঙাতরা। তখন আমি সেখানে ধর্মান্ধদের প্রবল দাপানি দেখেছি। যার পরিপক্ব রূপ এখন দেখতে পাই। এই ২০১৩ সালে, রাষ্ট্রের পুলিশকে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছুড়ে মেরেছে।
বঙ্গোপসাগর নিয়ে লেখা, ওই কঙ্বাজারের পটভূমিতে ‘আমি তোমার কাছে সমুদ্রের একটি ঢেউ জমা রেখেছি’ নামক অনু উপন্যাস আছে। হোক অনু, অণুতেই পরমাণু থাকে, বলে লোকে। সরল গ্রাম থেকে কুতুবদিয়া যাওয়া যায়। ১৯৮৫ সালের সেই প্রলয়ংকরী ঝড়ের পর আমি নোয়াখালীর চরজব্বার, চরফ্যাশন হয়ে উরিরচরের নাগাল ধরেছিলাম। সঙ্গে ছিল বন্ধু বটু ওরফে মাহমুদুল হক, ঔপন্যাসিক ও স্বর্ণ-রত্নবিদ। আমরা সেখানে তিন রাত্রি ছিলাম। আকাশে ছিল পূর্ণিমার দু-তিন দিন আগের চাঁদ। বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসছে সাঁই সাঁই শব্দ বগলদাবা করে জলীয়বাষ্পের মেঘ। ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ উপন্যাসের একতারা বাজিয়ে গায়ক উমেদ আলী। ওই উপন্যাসের অনেক চরিত্রের নাম আমার দেখা এবং তাদের হুবহু ব্যবহার করেছি বলতে এখন আর দ্বিধা নেই। ওরা সবাই বঙ্গোপসাগরের কোলের মানুষ। সমুদ্রের মায়া, হিংস্র-সৌন্দর্য কিছুই এত অল্পে বোঝা সহজ নয়।
সমুদ্রের গাঙচিল, সবুজ বা সবুজে কচ্ছপ, অতিকায় লাক্ষা, হাঙর, ভোল পোয়া বা কোরাল মাছ এখন আর তেমনটি পাওয়া যায় না। বঙ্গোপসাগরে কত রকম মাছ আছে? পোয়া বা পোপা মাছ আছে আট-দশ রকম। লাল পোয়া, সাদা পোয়া, রুপা পোয়া, গুটি, লম্বু, লেইয়া ইত্যাদি কত রকম! আর যদি বলি ফলি চাঁদা, রূপচাঁদা, হাইল চাঁদা, মাখন চাঁদার কথা। হাঙর আমাদের দেশে সবাই খায় না। কিন্তু বিশ্বের অনেক মানুষের কাছে খুব খুউব জনপ্রিয় ও উপাদেয়। হাঙরের পাখনা খুব মূল্যবান। কঙ্বাজার থেকে চার শ টাকা নিয়ে পনেরো-বিশ কিলো মাছের শুকনো করোটি কিনে এনে ঘরে রেখে দিয়েছি। আর করাত মাছের দাঁত কিনেছিলাম বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত মৎস্য মেলা থেকে। দাম একুনে দুই শ টাকা। এবার হাঙরের নাম বলি, চিতা হাঙর, নাক-চোখা হাঙর, থুট্টি হাঙর, নীল হাঙর, ফেউরি হাঙর, সবুজ করাতি হাঙর, দাগি পিতাম্বরী কালি হাঙর, আইশ্যা করাতি হাঙর, পীতাম্বরী, হাতুড়ি মাথা হাঙর- কত কত নাম। সব হাঙর হিংস্র নয়। সব হাঙর বঙ্গোপসাগরের কূলের কাছে আসেও না। হাঙরকে বলে সমুদ্রের চলন্ত বিভীষিকা। ওরা ঘুমোয় চলতে চলতে, এক জায়গায় বিশ্রাম নিয়ে নয়। আমার ‘সমুদ্র’ বইতে এসব কথা লেখা আছে। ‘সাহিত্য প্রকাশ’ নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বইটি প্রকাশিত। হাঙরের চোয়ালে দাঁত থাকে কয়েক সারি। কোনো কারণে একটা দাঁত পড়ে গেলে পেছনের সারি থেকে একটি দাঁত আস্তে আস্তে এসে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নেয়। যেন দলবদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিযোগিতা। আবার খাওয়ার সময় চিবোয় না, টুকরো টুকরো গিলে খায়। কুমিরও এ রকম। হাঙর আবার পাকস্থলীতে আস্ত হাত-পা বা মানুষের শরীরের ব্যবহার্য গয়নাও জমিয়ে রাখে। হাঙরের পেট চিরে দেখে এসব জোনা গেছে। বঙ্গোপসাগরে এমন খুনে হাঙরের খবর পত্রপত্রিকায় এখনো পাইনি আমি। এসব দিকে আমার নজর বরাবর পক্ষপাতদুষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে পাওয়া গেছে। ভিক্টর হুগো, জ্যাক লন্ডনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
১৯৯১ সালে প্রলয়ংকরী সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। তার আগে ১৯৮৫ সালে তেমনই আরেকটি। এই দুটি বড় তুয়ান ও গর্কি নিয়ে আমার উপন্যাস ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ দুবার মুদ্রিত হয়েছে। ৩৩৩ পৃষ্ঠার বই। বঙ্গোপসাগর আমাদের মৌসুমি বায়ু নিয়ে এসে বর্ষার সমাগম ঘটায়। বাংলাদেশ, ভারত ও বার্মায় আটটি পথে মৌসুমি বায়ু আসে। আটলান্টিক থেকে এসে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর দিয়ে মৌসুমি বায়ু ঢোকে। সাধারণত ১৯ থেকে ২৪ জ্যৈষ্ঠ অর্থাৎ ২ থেকে ৭ জুন ভারতের কন্যাকুমারিকা হয়ে উত্তর বা উত্তর-পুব দিকে এই পরিত্রাতাপ্রেম মৌসুমি বায়ু আসে। এভাবে বাংলা-ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষার সমাগম ঘটে। বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহেও বৃষ্টি হতে পারে। সেসব প্রাক-বর্ষার বৃষ্টি। কালবোশেখির বৃষ্টিও হয়। মৌসুমি বায়ুর প্রবাহে যে বৃষ্টি হয় তার জাত-পাত আলাদা। তার দেমাগ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, ভিন্নতর স্বাদে ভরপুর। আকাশে মেঘের পর মেঘ জমবে। কালবোশেখির মতো প্রায় বিনা নোটিশে হুড়ুদ্দুম করে এসে কোনো এক প্রান্তে বারিধারা ঢেলে দেবে না। মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টি একেবারে রাজসিক। সে এসে সমীহ আদায় করে নেবে রাজসিক কায়দায় কড়ায় গণ্ডায়। রাজপুত্রের মতো ঘোড়ায় চড়ে। আসবে তার খুড়ের শব্দ, চাবুকের শূন্যে আস্ফালনের ফোঁসফাঁস, একটুও গোপন করবে না। তারপর শুরু হলো তার ঝরঝর ধারাপাত। রবীন্দ্রনাথ এ জন্যই কি লিখেছেন, “আষাঢ়, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া।/মাঠের শেষে শ্যামল বেশে ক্ষণেক দাঁড়া।/জয়ধ্বজা ওই-যে তোমার গগন জুড়ে।/পুব হতে কোন পশ্চিমেতে যায় যে উড়ে,/গুরু গুরু ভেরী কারে দেয় যে সাড়া।”
ওর কি সময় আছে? কত কাজ তার! স্মৃতির চট্টগ্রাম, সারা দেশ, উপমহাদেশ, হিমালয়ের কাছে পর্যন্ত বৃষ্টি দিতে হবে না। তার বিচরণভূমি ছোটখাটো নয়। পুব দিকের বার্মা থেকে পশ্চিম দিকের কাশ্মীর পর্যন্ত তাকে বৃষ্টিস্নাত করতে হবে। নবীন কিশোরী থেকে যুবতী-যুবক, চাষি-গৃহিণী থেকে জোতদার গৃহিণীর গায়ের সন্তাপ দূর করতে হবে না! ঘামাচি যদি থাকে! সজল হাওয়ারও কাজ-অকাজ আছে, যূথীর বনে আছে কিছু কওয়ার। আমার আপনাদের বাংলাদেশ তখন মত্ত দাদুরীর (ব্যাঙের) ডাকে আকুল। অবশ্য লুপ্ত হতে বসা ব্যাঙের বংশ বৃদ্ধি এরই মধ্যে কিছু হয়ে থাকলে তো!
না, ঠিক হলো না বলা। বিশ-পঁচিশ বছর ধরে সোনাব্যাঙ আর তেমন নেই। চাষ না করে রপ্তানি আয় বাড়াতে গিয়ে ব্যাঙ শেষ। ব্যাঙের প্রধান শত্রু মশা এবং ধানের শত্রু পোকার উৎপাত তাই বেড়ে গেছে। প্রেমে মত্ত দাদুরি তাই নেই। নেই, নেই। কটকটি ব্যাঙেরাও এখন ভালো নেই ধানের কীটনাশকের ব্যবহারে। কচ্ছপ, শামুক, গুগলি, কুচে, কাঁকড়া সবাই বিপন্নের তালিকায় নাম লেখাতে লাইন ধরেছে। এখনো খাঁদোয়া বা বড় গোল লালচে শামুকের মাংস ঢাকায় আসে কিছু কিছু। এরা আবার হাঁস-মুরগির খাবার। পার্বত্যবাসী ও বড়ুয়ারা এর মজ্জার ভক্ত। কাঁকড়া আসে সুন্দরবন এলাকা থেকে। বাঁশখালী, সীতাকুণ্ড এলাকায় একসময় প্রচুর পাওয়া যেত। বড় লাল কাঁকড়া ও কোমল অস্থির কাঁকড়া চট্টগ্রামের সাগর উপকূলের খালে দেখেছি। সে অনেক কথা। অতীত এখন।
১৯৯১ সালের এপ্রিলের কুখ্যাত ঘূর্ণি-জলোচ্ছ্বাসের সময়। এক বিদেশি নাবিক, দক্ষিণ কোরিয়ারই হবেন। এই ঝড়ের বাড়াবাড়িতে জাহাজ থেকে ছিটকে পড়ে গেলেন। পড়েছিলেন সাগরের লেদারব্যাক কচ্ছপের গায়ে। ওই কাছিম বিশ-তিরিশ কিলো থেকেও বড় হয়। তার পিঠে একজন মানুষ বেঁচে থাকার দিশা পেতে পারে। হলোও তাই। নাবিক কচ্ছপের নাগাল পেয়ে দ্রুত গলা আঁকড়ে ধরলেন। আনাড়ি ঘোড়সওয়ারের মতো ধরে ভেসে রইলেন। বন্ধু কাছিমের সঙ্গে সাঁতরে চলেছেন। ততক্ষণে নাবিকের সাথিরা জানতে পারলেন যে তিনি পড়ে গেছেন। অমনি খোঁজ খোঁজ রব। দেখতে পেয়ে সঙ্গীরা জাল দিয়ে কাছিমসহ তাঁকে তুলে নিলেন। সঙ্গে বিপন্ন ভাগ্যবান নাবিক। কোরীয়রা কচ্ছপের দারুণ খাদ্যভক্ত হলেও কচ্ছপটি ছেড়ে দিলেন নাবিকের প্রাণ বাঁচানোর জন্য। এ রকম বহু প্রাণী মানুষের উপকারী বন্ধু। কিন্তু মানুষ তাদের খাবে, মারবে, শেষে পোষ মানাতে চাইবে। বাঘের চামড়া খুলে ঘরের দেয়ালে বা পায়ের নিচে পেতে রাখবে জাঁক দেখানোর জন্য। এই নিষ্ঠুরতা আপনি ক্ষমার চোখে দেখবেন?
বাংলাদেশের কিছু কিছু বেসরকারি সংগঠন এখন কঙ্বাজারের সমুদ্রতীরের বালিয়াড়ি থেকে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফুটিয়ে সাগরে ছেড়ে দেয়। আবার বাচ্চা সংগ্রহ করে ছেড়ে দেয়। সেই বাচ্চাগুলো বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চলে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত। পরের বছর ওরা আবার ছুটে আসে জন্মভূমি উড়িষা, কঙ্বাজার উপকূলে ডিম দিতে। এভাবে তাদের জীবনচক্র শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলছে। এই কচ্ছপের সরল অথচ কঠিন জীবনচক্রের কথা কখনো ভেবে দেখেছেন? না ভেবে থাকলে এখন থেকে ভাববেন? ভাবতে হবে। কারণ কচ্ছপ হচ্ছে সমুদ্রের তলদেশ পরিচ্ছন্নকারী সামুদ্রিক অমূল্য প্রাণী। আবার ওরা মানুষের খাদ্য। জগতে কচ্ছপের মাংস সুস্বাদু ও অত্যন্ত দামি খাদ্য। কচ্ছপের ঢালও মূল্যবান। একসময় কচ্ছপের ঢাল দিয়ে বিশ্ববিখ্যাত ও মূল্যবান মঁ ব্লা কলম তৈরি হতো। এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। তেমন একটি পুরনো ভাঙাচোরা কলমও আপনি যদি সংগ্রহ করতে পারতেন বা পারেন তার প্রত্নতাত্তি্বক মূল্য অন্তত দশ লাখ টাকা। কচ্ছপ, হাঙর মাধ্যপ্রাচ্যের দামি খাদ্য। সারা বিশ্বেও তাই। এই কচ্ছপ ১৯৭৫ সালেও প্রায় অঢেল পাওয়া যেত চট্টগ্রামের হাটে-ঘাটে। এখন কচ্ছপ মারা নিষিদ্ধ। কেন? কারণ নির্বিচারে হত্যার জন্য ওদের বংশ লুপ্ত হতে বসেছে। কচ্ছপ লুপ্ত হলে কী আসে যায়? যায়, বহু কিছু আসে যায়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ ও প্রাণীর সঙ্গে মানুষের বাঁচা-মরার সম্পর্ক সূক্ষ্ম সুনিবিড় ও অপরিহার্য। মানুষের স্বার্থেই বাঘ, হাতি, শজারু, বনবিড়ালকে তাই মানুষ বাঁচিয়ে রাখতে এখন এত তৎপর। কারণ সুন্দরবন থেকে সব বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেলে পরিবেশে কী বিপর্যয় নেমে আসবে বা ক্ষতির সম্মুখীন হবে, এখনো খোদ পরিবেশবিজ্ঞানীরা এর সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। তেমনই হাতি, বুনো জীবজন্তুও। তেমনই বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে গেলেও। আর মানুষ স্বপ্নশূন্য হয়ে গেলেও।
চট্টগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সাদা চিন, লাল চিন বৌদ্ধ বিহারে যে দুর্লভ হলুদ কচ্ছপ আছে তার প্রসঙ্গ এসে যায়। রামুর বৌদ্ধবিহার ২০১২ সালে আগুনে পুড়ে যাওয়ার সময় ওই সব হলুদ কচ্ছপের গায়েও আগুনের সাম্প্রদায়িক আঁচ লেগেছিল। ওরা স্তব্ধ হয়ে যায়। মানুষের সামনে আসতে তাই এখন ভয় পায়। বড় বড় বৌদ্ধবিহারের তিনতলা সমান গম্বুজের কাঠামোতে বেশ কিছু ভুতুম পেঁচা থাকত। ওদের কেউ তাড়াত না। দিন-দুপুরে ওদের এবং কচ্ছপদের আমি তিনবার দেখেছি। কথা বলেছি। ওদের কিছু কথা যে আমি বুঝিনি তা এখন আমি অনুভব করছি। ওরা এখন কোথায়? নিশাচর অন্য পাখিরা? আশ্রিতেরা?
আমার কথাটি ফুরোল না। তাই নটেগাছটিও মুড়োল না। ছেলেবেলায় মনে করতাম নটেগাছটি বিশাল বটবৃক্ষের মতো। আর গল্প শেষ হওয়ার পর ওটা শেষ হয়ে গেল? খুব কষ্ট পেতাম।
বঙ্গোপসাগর আমাদের শেষ আশ্রয়। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের সম্পদ তো অফুরন্ত নয়। পৃথিবীতে কোনো কিছু অফুরন্ত নয়। বঙ্গোপসাগরের মাছ, গ্যাস, তেল, মূল্যবান খনিজ পদার্থ কিছুই না। ইলিশ যে এখন আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না তার কারণ কী? চট্টগ্রামের পাহাড় কেটে কেটে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে তার বেলায়? নদী ও খাল যে মানুষের অত্যাচারে বুজে যাচ্ছে, কী হবে?
এ জন্যই আমার কথাটি ফুরোয় না। এ জন্য রূপকথার কাহিনীর শেষে ‘আমার কথাটি ফুরোল’ বলার পরও অনেক কথা আছে। কেন আছে? কারণ, মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা। হে আমার প্রিয় পাঠিকাবৃন্দ, আমাকে ক্ষমা-ঘেন্না করবেন। চট্টগ্রামের প্রকৃতির ওপর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সাংবাদিক হিসেবে চোখ বুজেও দেখার সাহসে বক্ষ স্ফীত করুন। স্বপ্ন দেখবেন না? দেখাবেন না? দেখতে ভালোবাসেন না? স্বপ্ন না দেখলে সৃষ্টি কি সম্ভব? আমাদের রাজনীতিক ও সংসদ সদস্যরা স্বপ্ন দেখে না বলেই আমাদের এই দুর্দশা। বঙ্গোপসাগর যেমন স্বপ্ন দেখায় তেমনি তাকে নিয়েও স্বপ্ন দেখা খুব উপকারী দরকার পর্যাপ্ত প্রচুর। আর সেও তো স্বপ্নপূরণ করতে চাইতে পারে! আপনি তা কি ভাবেন?

খাদ্যচক্রের বিশাল ভাণ্ডার
পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও উদ্ভিদের মাত্র ২০ শতাংশ বাস করে স্থলে, বাকি ৮০ শতাংশ জলে। সুপেয় মিষ্টি পানি বা নোনা অথবা পচা নালা-ডোবায়। এমনকি সুগভীর অতল মহাসাগরেও। জলভাগে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে। আরো কত যে আছে তা জানা খুব কঠিন। কারণ মহাসমুদ্রের অতল গহিনে সম্রাট সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। সেখানে কী কী আছে তা খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। এখনো দিনে দিনে আবিষ্কৃত হচ্ছে নানা প্রাণী। প্রতিবছর অনেক নতুন প্রজাতি, বর্গ, এমনকি বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাণী আবিষ্কৃত হচ্ছে। যেমন ৫০ লাখ বছর আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া কোয়েলোকন্থ জাতের দুটি মাছ ১৯৩৮ সালে আবিষ্কৃত হয়েছে। সে দুটি ধরা পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল থেকে। এই খবরে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানজগৎ বিস্মিত। সারা বিশ্বের বিস্ময় বঙ্গোপসাগরও, তা কি আমি আপনি কখনো ভেবেছিলাম!
সমুদ্র মানবজীবনের কল্পনাকেও জাগায়, আশ্বাসও দেয়। গভীরতর সামুদ্রিক অঞ্চলের ভয়ংকর অন্ধকার থেকে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির জীবিত প্রাণীর আবির্ভাব ও আবিষ্কার সম্ভব। এখনো আমাদের মনে হয় মানুষ সম্ভবত সামুদ্রিক প্রাণীর রাজ্যকে কখনোই সম্পূর্ণভাবে জরিপ করতে সক্ষম হবে না। কারণ সমুদ্রের গভীর গভীরতর ঘন অন্ধকার সামুদ্রিক অরণ্যাঞ্চল সব সময় মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে থাকবে। অথবা তা সম্পূর্ণ আবিষ্কার করার আগেই মানবজাতি পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে যাবে মানুষের অবিমৃশ্যকারিতার জন্য। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বৈরী মনোভাব স্বভাবের জন্য। আর সেই বোধ মানুষের মধ্যে জাগ্রত হলেও তার প্রতিকারের সময় তখন তার হাতের নাগালের বাইরে চলে যাবে। এখনই প্রায় চলে গেছে বলা যায়। ও আমার বঙ্গোপসাগর। স্টিফেন হকিং বলেই দিয়েছেন, আগামী দুই শ বছরের মধ্যে মানবজাতিকে বাঁচার জন্য অন্য গ্রহ খুঁজে নিতে।
উড়ুক্কু মাছ, ছোট সি হর্স, পাইপ মাছ, প্রজাপতি মাছ, গভীরতর স্তরের অন্ধ মাছ নেক্টনীয় শ্রেণীভুক্ত। এদের দলে টেলেওষ্ঠরা সমুদ্রের রাজা। এদের আকার, গঠন, জীবনযাত্রার ধারা ও বংশবিস্তারের অভ্যাস আশ্চর্য রকমের বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই দলে আছে সার্ডিন, ম্যাকারেল, চাঁদা, লাট (বম্বে ডাক), অ্যানকোভিস, স্কমব্রয়েড, সাদা পেট (হোয়াইট বেলি), কার্প প্রভৃতি মাছ। এদের অনেক মাছ আমরা চট্টগ্রাম-কঙ্বাজারের বাজারে দেখতে পাই। কাঁচা ও শুঁটকি করে রেঁধে খাই। খুব উপাদেয় এসব মাছ সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের কাছে। সারা বিশ্বে এসব মাছ এখন সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে লোভপ্রিয়। এ জন্যও বঙ্গোপসাগর বা মহাসমুদ্র আমার নজরবন্দি।
টুনা ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার গতিতে ছোটে ওই ছোট ছোট পাখা, লেজ ও শরীরের সঞ্চালনে। উড়ুক্কু মাছ ছোটে ৫০ কিলোমিটার বেগে। দশ বছরে একটি টুনা জন্মের পর থেকে ১০ লাখ কিলোমিটার সমুদ্রপথ বিচরণ করে। ম্যাকারেল মাছেরা বিশাল ঝাঁকে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। প্রজনন ঋতুতে সামুদ্রিক রুই-কাতলা ও বান-পাঁকাল জাতের মাছ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়। ওই ইলিশও। এরা স্বাভাবিক সামুদ্রিক বাসস্থান ছেড়ে নদীতে চলে যায়। নদীতে জন্মস্থানে এসে ডিম দেয়। সেই মাছ একটু বড় হতে হতেই সাগরে চলে যায়, আবার প্রজননের সময় তাদের আদি বা জন্মস্থান নদীতে ফিরে যায়। তা হলে ইলিশকে আমরা সাগরের মাছ নাকি নদীর বলব! সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম দেয় বালুচরে। মা-বাবা ছাড়া বালির গর্ত থেকে জন্ম নিয়ে ঠিক ছুটে যায় সমুদ্রে, একা একা। তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে ছোটে সমুদ্রের দূর দূর অঞ্চলে। খেয়েদেয়ে বড় হয়ে ডিম দেওয়ার সময় হলে সেই জন্মস্থানে ছুটে আসে নিজেরা ডিম দিতে। বান-পাঁকাল মাছ তাদের জীবনের অর্ধেক সময় সমুদ্রে ও অর্ধেক সময় নদীতে কাটায়। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও দেয়াং পাহাড়ের কোলে কর্ণফুলী নদীর মোহনা। সেখান থেকে ২০-২৫ মাইল উজানে চন্দ্রঘোনা অঞ্চল পর্যন্ত সামুদ্রিক ছোট ছোট মাছ চলে যায়। কাপ্তাই বাঁধ হওয়ার আগে বরকল পর্যন্ত চলে যেত। কর্ণফুলীর তীরে রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি গ্রামে আমার স্থায়ী আবাস। আমিও কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকায় প্রবাসে থাকি। আবার গ্রামে যাই, আবার ঢাকায়। একদিন আমাকে আপনাকে দেখা যেতে পারে টোকিও-ব্যাংককের কোনো নিভৃত অরণ্যে বা বিশেষ রেস্তোরাঁয়। প্রাণীদের এই স্বভাব। আবার আমাদের পোপা বা পোয়া চলে যায় বিদেশের অভিজাত হোটেলে। হাঙরও।
আমার ইছামতি গ্রামের দক্ষিণ পাশে কর্ণফুলী, পশ্চিম পাশে ইছামতি নদী। গত অক্টোবরে (২০১২) এক মাস পাঁচ দিন আমাকে গ্রামে থাকতে হয় পাকা ঘর নির্মাণ ও ‘অর্পিত সম্পত্তি’ মুসাবিদার কারণে। গ্রাম থেকে তহশিল অফিস, চট্টগ্রাম শহরের কাছারি পাহাড়ের কোর্ট, উকিলের সঙ্গে মোলাকাত ইত্যাদি কত কাজ! কোর্টের ডি.সি. অফিস থেকে জমির খতিয়ানের সই-মুহুরি নকল নিতে হয়েছে ১.৩০ টাকার একটি খতিয়ান ৩০০ টাকায়। আমার কাকা সেই ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরির সূত্রে কলকাতাবাসী হন। ব্যস, ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খানের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি শত্রু হয়ে গেলেন। আমাদের জমি বাবা ও কাকার যৌথ সম্পত্তি, যৌথ পরিবার ছিল। সেই শত্রু সম্পত্তি ১৯৭১ সালের পর ৪১ বছর দুঃস্বপ্ন ও নিপীড়নের পর এখন মিটমাট হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ হয়ে গেল ‘অর্পিত সম্পত্তি’। মাছের সমুদ্র ভ্রমণ ও জন্মস্থানে ফিরে আসার মতো, এই দীর্ঘ সময় ধরে এই সম্পত্তির খাজনা-ট্যাঙ্ দিয়ে আমি বাংলাদেশ সরকার থেকে লিজ নিয়ে যাচ্ছি। এই লিজ নেওয়ার কাজ বরাবর আমাকেই করতে হয়েছে। বাবা বেঁচে থাকাকালীন থেকে। বাবা ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের কারণে মনস্তাত্তি্বক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। আমি চলে যাই ভারতে। সেখানে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কথিকা লিখেছি। বাংলাদেশ আর্কাইভ সংগঠক ও কর্মী ছিলাম। বড়দা জিনদাশ বড়ুয়া ব্রিটিশ ইনফরমেশনে চাকরি করতেন। গ্রামে চলে এসেছেন ঢাকা ছেড়ে। গ্রাম থেকেও তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মেজদা কর্ণফুলী রেয়ন মিলে প্রকৌশলীর চাকরি করতেন। দুই দাদা স্ত্রী-পুত্রপুত্রী নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কাকা শ্রী বিজন কুমার বড়ুয়া কলকাতায়। জমিজমা বাবা ও কাকার নামে। সেই জমি অর্ধেক-অর্ধেক দুই ভাইয়ের।
সেই জমি এখন অর্পিত সম্পত্তি। এখন সরকার থেকে আবার দেনদরবার করে নিতে হবে। সে জন্য গ্রাম থেকে শহরের কোর্ট-কাছারি করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে আসে ২৯ সেপ্টেম্বর, মধু পূর্ণিমা। সেই রাতে রামু, উখিয়া, পটিয়া প্রভৃতি জায়গায় ১০টি বৌদ্ধবিহার আগুন দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের গ্রামে দুটি বিহারে আমাদের অজান্তে রাতে পুলিশ ছিল, টহল দিয়েছে। পরদিন ভোরে জানতে পারলাম। বঙ্গোপসাগর থেকে গর্কি আসে। রামুর বিখ্যাত প্রাচীন বিহারগুলোর ওপর সে রকম প্রলয় এলো। এতগুলো বিহার এক রাতে শেষ করে দিল! তা হলে হামলাকারীরা নিশ্চয়ই পূর্ব পরিকল্পনা করে নেমেছিল। এমনকি পুলিশকে খবর দেওয়ার পরও সাহায্য করতে আসেনি। এসেছিল পরে। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগগুলো কি আগে এসব জানত না! তাহলে আমাদের গ্রামের বৌদ্ধবিহারে পাহারা দিল কেন?
এই আমার দেশ। আমার গ্রাম। আমার কর্ণফুলীর কথায় যাওয়াই ভালো। তাহলে, কর্ণফুলী ও ইছামতি নদী আমার পুরনো ঘরবাড়ি, ভিটে ও আস্ত দক্ষিণ ও মাঝের পাড়া ভেঙে নিয়েছে। উত্তর সীমার সুন্দরী খাল নিরাপদ। দুটি নদীতে এখনো সামুদ্রিক মাছ আসে। চিংড়ি, পোয়া বা পোপা, ফাইস্যা, কাচকি, রিটা চলে আসে। জেলেরা রাতে মাছ ধরে সকালে গ্রামের চায়ের দোকানের সামনে এসে বসে। ডাক দেয়। আমি কান পেতে থাকি ডাক শোনার জন্য। বেশির ভাগ সময় জেলেদের থেকে মাছ কিনতে ব্যাপারীরা আসে। শুনি ব্যাপারীরা নদী থেকে কিনে নিয়ে আসে। চিংড়ি মাছ বুড়ো আঙুল থেকে বড় হলে বা ওইটুকু হলেই ৬০০ টাকা কিলো। ফাইস্যা পাঁচ শ টাকা। ধুলো ইছা হচ্ছে একদম ছোট। ওর দাম দুই শ। এদের চেহারা জুপ্লাঙ্কটনের মতোই প্রায়। এগুলো বেটে বড়া করে খেতে স্বাদ। এর কাবাব বানালে কথাই নেই। ওর নিজস্ব সুগন্ধটা ভোলার নয়। অনন্য।
সমুদ্র এক বিশাল খাদ্যচক্রের ভাণ্ডার। বিশাল সমুদ্রে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম উদ্ভিদের স্বাভাবিক সালোকসংশ্লেষ হয়। তার ফলে লাখ লাখ টন মৌলিক খাদ্য প্রস্তুত হয়। শৈবালজাতীয় উদ্ভিদও এতে অংশ নেয়। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, অসীম সমুদ্রে যে বিপুল পরিমাণে ফাইটোপ্লাঙ্কটন তৈরি হয়, তার তুলনায় এরা ভগ্নাংশ মাত্র। ছোট ছোট জুপ্লাঙ্কটন এসব ক্ষুদ্র উদ্ভিদ খেয়ে বাঁচে। ছোট্ট প্লাঙ্কটনীয় জীবেরা সমুদ্রের খাদক সম্প্রদায়। বড় বড় প্লাঙ্কটনীয় প্রাণী ও ছোট ছোট মাছ এদের ধরে খায়। ছোট মাছদের ও বড় প্লাঙ্কটনীয় জীবদের খায় বড় আকারের জীবেরা। এসব প্রাণীর একটা অংশকে খায় মানুষ, পাখি ও অন্যান্য জীব। এই খাদ্যচক্র জগতের ধর্ম।
আর আমাদের স্থল পৃথিবীর ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অঙ্াইডের কিছু অংশ সমুদ্র শুষে নেয়। প্রাণী ও উদ্ভিদ বায়ুতে কার্বন ডাই-অঙ্াইড ছাড়ে। ভূগর্ভ থেকে কার্বনেট, বাইকার্বনেট-ঘটিত শিলাও রাসায়নিক বিক্রিয়ার দরুন কার্বন ডাই-অঙ্াইড উৎপন্ন করে। উদ্ভিদজগৎ সালোকসংশ্লেষণে এই গ্যাসের কিছু অংশ ব্যয় করে। বাকি অংশ অর্থাৎ সমুদ্র শোষণ করে নেয় প্রায় ষাট শতাংশ। এ জন্যই আমাদের আবহাওয়া কার্বন ডাই-অঙ্াইডের দ্বারা বিষাক্ত হয় না, জীবজগতের বাসযোগ্য করে রেখে আমাদের প্রিয় ধরিত্রী মা। কিন্তু ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের দৌলতে বাতাসে কার্বন ডাই-অঙ্াইড প্রচুর জমতে থাকে। সারা বিশ্বে শিল্প বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ার ফলে সমুদ্রের পক্ষে এত কার্বন ডাই-অঙ্াইড শোধন করা সম্ভবপর হচ্ছে না। আর কার্বন ডাই-অঙ্াইড তো আকাশে যুগ যুগ ধরে বেঁচেই থাকে, বেঁচেই যায়। ফলে গ্রিনহাউস বিপর্যয় শুরু হয়েছে। এই কার্বন গ্যাসের কতটা অংশ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমুদ্র শুষে নিতে পারে তা যাচাই করে দেখার ভার সমুদ্রবিজ্ঞানীদের।
পৃথিবীর মানুষকে বহুকাল প্রতিকূল আবহাওয়াকে সঙ্গী করে টিকে থাকতে হয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টির লাখ লাখ যুগ পরে খুবই অনুকূল আবহাওয়া ফিরে এসেছিল, আজ থেকে প্রায় আট হাজার বছর আগে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই গ্রহের গত দশ কোটি বছরের ইতিহাসে আবহাওয়া বহুবার বিপুল পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। কোনো কোনো সময়ে প্রায় গোটা পৃথিবীটাই তুষার বা বরফে ঢাকা ছিল। আবার কোনো সময়ে পৃথিবীর শেষ উত্তরে (অর্থাৎ উত্তর মেরুতে) বা শেষ দক্ষিণেও দক্ষিণ মেরুর ওপরে কোনো বরফই ছিল না। তখন আমাদের মতো গরম দেশের প্রাণীরাই উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে হাঁটাচলা করত। চট্টগ্রামের গ্রামে বসে জমিজমার সঙ্গে এসবও আমি ভাবি।
এমনকি মানুষ যত দিন থেকে এই পৃথিবীতে আছে, সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার তুষার যুগ এসেছে। অনুকূল আবহাওয়া কেবল আট হাজার বছর ধরে। এই আট হাজার বছর ধরে আমাদের এই মা ধরণীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অঙ্াইড মোটামুটি একই রকম আছে। প্রত্যেক দশ লাখে ২৮০ ভাগ (পার্টস পার মিলিয়ন বা পিপিএম)। এই কার্বন ডাই-অঙ্াইডই ‘সবুজবাড়ি’র (গ্রিনহাউস) মুখ্য গ্যাস। সারা আকাশে এই সবুজ বাড়ির আচ্ছাদন হালকা লেপের মতো ছড়িয়ে আছে, অর্থাৎ পৃথিবীকে আবৃত করে রেখেছে। এই গ্যাসই পৃথিবীর আবহাওয়া কোন দিকে মোড় নেবে, তা মোটামুটি ঠিক করে দেবে। দুনিয়াদারি বুঝুন।
কার্বন ডাই-অঙ্াইডের পরিমাণ (২৮০) গত আট হাজার বছর ধরে প্রায় একই রকম ছিল। তারপর শুরু হলো শিল্প বিপ্লবের যুগ বা নবজাগরণ। ১৭৮০ সালে জেমস ওয়াট আবিষ্কার করলেন রেলগাড়ি। জলের বাষ্পের ইঞ্জিন চলল কয়লার উত্তাপে। কয়লা যত পুড়তে লাগল শিল্পজগৎও উন্নত হতে থাকল। নতুন নতুন শিল্প আবিষ্কৃত হতে লাগল, আরো কয়লা পুড়তে লাগল। যত কয়লা পোড়ে বাতাসে কার্বন ডাই-অঙ্াইডের পরিমাণ তত বাড়তে থাকে। ১৮০০ সাল নাগাদ পর্যন্ত মানুষ এর ভয়াবহ বিপদের কথা জানতও না। ভাবতেই পারেনি।
কার্বন ডাই-অঙ্াইড বড় পাজি গ্যাস। আকাশে গেঁড়ে বসে গেলে ১০০ বছর টিকে থাকবে। যত টিকে থাকবে ততই ‘সবুজবাড়ি’র কুফল ধরিত্রীকে সহ্য করতে হবে। নিদারুণ ধরিত্রী যন্ত্রণায় ভুগবে। সেই সঙ্গে সব প্রাণী, উদ্ভিদ। ধরণী গরম হবে, উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর তুষার গলবে। হিমালয়, কিলিমাঞ্জারো, আন্দিজের তুষার গলবে। এখন ওই কার্বন ডাই-অঙ্াইডের মাত্রা ২৮০ থেকে বেড়ে ৩৮০-তে ছুঁয়েছে। ২৫০০ সালে এর মাত্রা দাঁড়াবে ৫০০-তে। আর এখনো আমরা সুন্দরবন ও চকরিয়ার প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসাতে যাচ্ছি।
সুদূর অতীতের দিকে একবার ফেরা যাক। ২০০ থেকে ৪০০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে কার্বন ডাই-অঙ্াইডের মাত্রা ৫০০-তে পৌঁছায়। তখন সমুদ্রের জলের মাত্রা আজকের মাত্রার তুলনায় ৩০০ ফুট উঁচুতে ছিল। অর্থাৎ অর্ধেক পৃথিবী জলের নিচে। ‘ইন্টারগর্ডন মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেন্ট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি) খুব সংগতভাবেই ঘোষণা করেছে, ২১০০ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা আজকের তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেশি হবে। আমাদের প্রিয় পরিত্রাতা বঙ্গোপসাগর তিন ফুট জলের নিচে ডুবে যাবে। ভাবুন একবার!
জলবায়ুর এই পরিবর্তনে পরিত্রাতা বঙ্গোপসাগরের বুকে পানির উচ্চতা বাড়বে তিন ফুট। ওই ২১০০ সালে। এর জেরে স্থলবাসীর পানীয় জলের সংকট দেখা দেবে। ফসলের উৎপাদন কমে যাবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বেড়ে যাবে বাংলাদেশে। এই বিপন্নতার পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে ১৮ নভেম্বর বিশ্বব্যাংকের আবহাওয়া পরিবর্তনের ওপর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। ‘টার্ন ডাউন দ্য হিট’ শিরোনামে এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব সব দেশের ওপরই পড়বে। মরবে দরিদ্রতম দেশের মানুষ বা ভোগান্তি বেশি বাড়বে। বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার, মেঙ্েিকা ও ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন শহর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার ফলে এই আভাস। দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যায় বলতে হবে, হা গরম, হা মরণ। এমনকি রাতেও হায়-হায়।
ধরণী তপ্ত হলে ওই তিন ফুট সামুদ্রিক জলের মাত্রা উঠে আসবে স্থলের ওপর। ফলে বাংলাদেশ, চীন, কলকাতা জলের নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ মরিশাস এ নিয়ে খুব উত্তেজিত। অস্ট্রেলিয়ার কাছের একটি দ্বীপ ইতিমধ্যে সমুদ্র অনেকটা গ্রাস করে ফেলেছে। মালদ্বীপের কয়েকটা ছোট দ্বীপ এরই মধ্যে ডুবে গেছে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার অজস্র দ্বীপের কথা ভাবুন। প্রশান্ত মহাসাগরে দ্বীপ সবচেয়ে বেশি। ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপে আবার দ্বীপের সংখ্যা খুব বেশি। তার কথা ভাবেন কি!
সবুজবাড়ির গ্যাসের উপদ্রবে ভূমিকম্প, প্লাবন, হারিকেনের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে এখনই। এত ঘন ঘন ভূমিকম্প পৃথিবীর ইতিহাসে লেখা নেই। সমুদ্রের জল বেড়ে যাওয়ার ফলে জলের ওজনও বাড়ছে। সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার যে রাজ্য তাকেও এই চাপ সহ্য করতে হচ্ছে, হবে। সেই চাপ বইতে হচ্ছে অন্ধকার রাজ্যের মাছদের। চাপের ঠেলায় সমুদ্রের গভীরে ধরণীর মাটি কেঁপে উঠছে! ঘন ঘন সুনামি, সুনামির ছড়াছড়ি। সাত-দশ বছর আগে আমরা সুনামির আস্ফালন দেখার কথা দূরে থাক, নামও শুনিনি বলা যায়। সুনামির সত্য ঘটনা নিয়ে আমার ৮-১০টি গল্প আছে। সে কথা বলব? বলি তাহলে। সুনামি জাপানি শব্দ। অর্থ জলকম্প, সমুদ্রতলে ভূপৃষ্ঠের স্থানচ্যুতির ফলে ওপরের জলস্তরে জাগে বিরাট কম্পন। ফলে সমুদ্রের সম্পদ জল হয় উদ্বেল, উতলা ও ভয়ংকর। তার রোষে নোনা পানি আছড়ে পড়ে স্থলভাগে।
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকালে জলকম্প বা সুনামি এসেছিল ভারত মহাসাগরের উত্তর অংশ থেকে। সুমাত্রা, থাইল্যান্ড, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, শ্রীলঙ্কা, ভারতের মাদ্রাজ উপকূল পর্যন্ত। উত্তর দিকে দুর্বল হয়ে সুন্দরবন অঞ্চল আর ভারত মহাসাগরের মালদ্বীপ, লাক্ষা দ্বীপ হয়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে গিয়ে জলকম্পের ঢেউ হিংস্রতা নিয়ে দুর্বলভাবে আছড়ে পড়েছিল। তখন কেনিয়ার একটি খোকা জলহস্তী ও বুড়ো কচ্ছপ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল। আমি তখন কলকাতায় ব্যক্তিগত ছুটি কাটাতে গিয়েছিলাম আমার মেয়ে-বউয়ের কাছে। ছেলে তখন কল্যাণীতে ইলেকট্রনিকস ও টেলিকমিউনিকেশন পড়ছে। ওদের ঘর রক্ষাকারী তরুণ শেখ আবু ওর বাড়ি থেকে আসার পথে পুকুরে দেখে জল ঢেউ খেলছে। সবাই অবাক হয়ে গেল। ভূকম্পন নেই অথচ জলকম্পন কেন? সম্ভবত সে বছরই বাংলাদেশ-ভারত প্রথম সুনামি দেখে। আমারও কোনো ধারণা নেই। সুনামি নামটিই বলে দেয়, ওটা ওদের একচেটিয়া দুর্গতি-দুর্ভোগ। অথচ শব্দটির প্রথমে আছে ‘সু’।
পরদিন থেকে দৈনিক পত্রিকায় জানতে শুরু করলাম বিস্তারিত বিধ্বংস। টেলিভিশনে তো অত খুঁটিনাটি বলে না। বললেও অতক্ষণ টিভিতে আমি বসে থাকতে পারি না। তার ওপর ডিসেম্বরে ছুটি কাটাতে গেছে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মা-বাবারা। আন্দামান, থাইল্যান্ডের ফুকেট, ইন্দোনেশিয়ার বান্দ্রা, আচে প্রভৃতি বিখ্যাত পর্যটন-তীর্থের দুর্দশার খবর আসতে লাগল। আনন্দবাজার পত্রিকার রোমহর্ষক খবরগুলো সংরক্ষণ করে যাচ্ছি। মাদ্রাজ উপকূলে রিজাল শাহপুত্র ছেলেটি রোজকার মতো ভোরে মসজিদ ঝাড়পোঁছ করতে গিয়ে ভেসে গেল সমুদ্রে। মসজিদের নারকেলগাছটিসহ ভেসে গেল সাগরে। সেই গাছের ডাব ও নারকেল খেয়ে অষ্টম দিন শেষ হওয়ার আগে একটি জাহাজ তাকে উদ্ধার করল। গল্পটির নাম দিয়েছি ‘সুনামি ও কুকুরছানা’। রিজাল শাহপুত্রের বাড়িতে পাঁচটা কুকুরছানা হয়েছে। উদ্ধার পেয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেনকে রিজাল শুধু বলতে পেরেছিল, ‘আমার কুকুরছানাগুলো?’ নিজের জীবন বাঁচার পর মা-বাবা-বোন নয়, কুকুরছানা, জীবন বুঝি এরকমই।
সুনামি নিয়ে এ ছাড়া আরো গল্প ‘এক যে আছে রাজা’, ‘সুনামি, খোকা জলহস্তী ও দাদু কচ্ছপ’, ‘রাজকুমারী ট্যাঙ্গো’, ‘সুনামি ও ছোট্ট মেয়ে চিয়া’ এবং ‘সমুদ্রকে ভয় পাই না’ গল্পগুলো লিখেছি। শেষ দুটি গল্প নিয়ে কলকাতার দোয়েল নামক প্রকাশনী থেকে ছবি-বই প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। ছবি আঁকেন প্রখ্যাত শিল্পী ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য। বাকি চারটি গল্পের সঙ্গে আরো ছয়টি গল্প নিয়ে ‘সুনামি, বাঘ ও মুক্তিযোদ্ধা’ নামে শিশু-কিশোর বই প্রকাশ করে অঙ্কুর প্রকাশনী। সেখানে বঙ্গোপসাগরের অংশ সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে আছে দুটি গল্প। ‘মুক্তিযোদ্ধা ও যমরাজা’, ‘শুব্রার বাঘ’, ‘ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ’ গল্পগুলোও আছে। আমিও হই এভাবে সুনামি আক্রান্ত।
১৯৬৫ সালের পর প্রলয়ঙ্করী ঝড় বলতে যা বোঝায় তার আঘাত আসে ১৯৭০ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এটা প্রকাশ না করে চেপে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ধরা পড়া এই বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের কথা। জাপান ও অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রচারিত হলে পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ প্রথম জানতে পারে। তারপর দেশের পত্রিকার মাধ্যমে সবার চোখে পড়ে। ঘূর্ণি ও জলোচ্ছ্বাসের খবর আগাম প্রকাশ বা সাবধানবাণী প্রচার না করায় প্রচুর লোকের প্রাণহানি ঘটে। সেই সঙ্গে গবাদি পশু ও ঘরবাড়ি তো আছেই। তারপর ১৯৭৬, ১৯৮৪, ১৯৯১, ২০০৭, ২০০৯ এবং সব শেষ মহাসেন আসে ২০১৩ সালে। মহাসেন মিয়ানমারের দিকে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশে ক্ষতি হয় অল্প। তার পরও বঙ্গোপসাগর আমাদের পরম আকাঙ্ক্ষিত বন্ধু। বঙ্গোপসাগর ছাড়া আমরা বাংলাদেশকে কল্পনাও করতে পারি না। বঙ্গোপসাগর ছাড়া আমার কল্পনা কে সমৃদ্ধ করবে?
আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক মাপ অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ সীমার পশ্চিম প্রান্ত ধরা হয়েছে শ্রীলঙ্কার সর্ব দক্ষিণ বিন্দু ডান্ড্রা হেড (Dundra Hd.)-কে। আর পূর্ব প্রান্ত ধরা হয়েছে সুমাত্রা দ্বীপের সর্ব উত্তর বিন্দুকে। একটি সরলরেখার দ্বারা এই দুটি বিন্দু যোগ করলে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণের সীমানা পাওয়া যায়। উত্তরে বাংলাদেশ ও ভারত, পশ্চিমে ভারত, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বে বার্মা বা মিয়ানমার ও আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। এই আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বঙ্গোপসাগরকে আন্দামান সাগর থেকে আলাদা করেছে। বঙ্গোপসাগরের মোটামুটি আয়তন ২২,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার বা ৮,৪৯,৪২০ বর্গমাইল। এর কতখানি বাংলাদেশের তা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে তা এখন বিচারাধীন এবং বাংলাদেশের দাবি আন্তর্জাতিক সংস্থায় গৃহীত হয়েছে বলে জুন মাসে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। সেই বিপুল সৌন্দর্যের প্রবাল এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে বলে জানা যায়। এ ছাড়া এর বড় দ্বীপগুলো হলো মহেশখালী, কুতুবদিয়া, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, মনপুরা ইত্যাদি। আর গঙ্গা ও পদ্মার ব-দ্বীপ এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক বিখ্যাত সুন্দরবন। আগে এই সুন্দরবন মেঘনার মোহনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এখন সুন্দরবনের পূর্ব দিক হরিণঘাটা নদীতে গিয়ে ঠেকেছে। আগে পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুরের দক্ষিণ অংশ ছিল সুন্দরবনের মধ্যে। ইংরেজ শাসকরা খাজনা আদায়ের লোভে সুন্দরবনের ধ্বংস শুরু হয়। এখনো সেই ধারা নানাভাবে অবিরত অব্যাহত রয়েছে।

হায় দূষিত বঙ্গোপসাগর
স্থলভাগের সব আবর্জনা, শিল্প-কারখানার রাসায়নিক পদার্থ, বিখ্যাত মারাত্মক ডিডিটি নদীবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে আশ্রয় নেয়। নদীবাহিত পলিমাটি উপকূলের কাছাকাছি ভূমি গঠন করে। সমুদ্রের তলা হচ্ছে অন্য সব জঞ্জাল জমার পাত্র। ডাস্টবিন। জৈব ও অজৈব সব সব। কার্বন ডাই-অঙ্াইড, নাইট্রেট, ফসফেট প্রভৃতি অজৈব কাঁচামাল থেকে জৈব পদার্থ তৈরি হয়। স্বাভাবিক মাত্রার হলে এতে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রতলবাসী জীবের জন্ম ও মৃত্যুর হার সমান থাকে। বেশি মাত্রায় এসব অজৈব আবর্জনা জমতে থাকলে বিপন্নতার রোগ মহাসমুদ্রেরও হবে বৈকি।
১৯৭৯-৮০ সালের জরিপের ফলে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরে তলদেশ-বিহারী মাছের পরিমাণ ১,৫০,০০০ টন। সমুদ্রচারী মাছ ৬০,০০০ টন। জে ডাব্লিউ পেননের মতে, তলদেশ-বিহারী মাছের মজুদ ২০০-২,৫০,০০০ টন থেকে বার্ষিক ১০০-১,২৫,০০০ টন ধরা সম্ভব। আর সমুদ্রচারী মাছের মজুদ হচ্ছে ১৬০-২,০০,০০০ টন, ধরা সম্ভব ৩০-৬০ হাজার টন। চিংড়ির মজুদ চার-ছয় হাজার টন, ধরা সম্ভব দু-তিন হাজার টন। ১৯৭২ সালে ফিশিং নিউজ পত্রিকায় ড. গুলান্ড (দ্য ফিশিং রিসোর্সেস অফ দি ওশান) জানান, বঙ্গোপসাগরে তলদেশ-বিহারী মাছের মজুদ ২.৫-৪ লাখ টন।
এই সমুদ্রদূষণে মাছের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বলে যৌক্তিক অনুমান করা যায়। নর্দমাবাহিত শহরের আবর্জনা ও শিল্প-কারখানা আবর্জনার দুটি জোগানদাতা অংশ। জৈব ও অজৈব ক্ষতিকর পদার্থের অংশ। অজৈবের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর পারদঘটিত আবর্জনা। জাপানের মিনি মাতা উপসাগরে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৫৩ সালে। একটি প্লাস্টিক কারখানার বর্জ্য পারদঘটিত বস্তুতে ওই উপসাগরের মাছ মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়ে। ওই মাছ খেয়ে প্রথমে শতাধিক মানুষ মারা যায়। যারা মরেনি তাদের অনেকে অন্ধ, বধির হয়ে যায়, পাকস্থলী ও মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কিছু বিড়াল ওই মাছ খেয়ে পাগল হয়ে যায় এবং তারা সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়। অর্থাৎ বিড়ালের আত্মহত্যা রোগ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে। সারা বিশ্বে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগের নাম হয় মিনি মাতা। ১৯৬৫ সালে আমার মেজদা জাপানে উচ্চতর প্রশিক্ষণে গেলে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এই খবর পাই। পরে দুবার জাপানে গেলে এর বিভীষিকা সম্পর্কে জানতে পারি।
ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল ট্রাইক্লোরো-ইথেন (ডিডিটি) আবিষ্কার করেন পি এইচ ম্যুলার। এ জন্য তিনি ১৯৪৮ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। পরে এর ক্ষতিকর ক্রিয়ার ধীরগতি মানুষের চোখে পড়তে থাকে। এত দিনে এই ধরণীর বাতাস, মাটি ও জলে কয়েক মিলিয়ন টন ডিডিটি ছড়িয়ে পড়ে। এর ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকাল অসম্ভব দীর্ঘ, আপনা থেকে সহজে নষ্ট হওয়ার নয়। জীবদেহে এর সঞ্চয় অদ্ভুতভাবে বেড়ে চলে। উদ্ভিদভোজী প্রাণীর চেয়ে প্রাণীভুক প্রাণীর দেহে এই বিষ আরো বেশি ঘনত্বে জমা হয়। সাধারণত প্রাণিদেহের চর্বিতে কীটনাশক বেশি জমে। সুমেরু অঞ্চলের এস্কিমো এবং কুমেরু অঞ্চলের পেঙ্গুইনের দেহে অর্থাৎ যেসব অঞ্চলে ডিডিটির ব্যবহারই হয়নি, এই কীটনাশকের অস্তিত্ব সেখানে লক্ষ করা গেছে। পৃথিবীর সব সমুদ্রে মাছের শরীরেই এখন ডিডিটি জাতীয় কীটনাশকের বিষ ঢুকে গেছে। পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ ও বার্মায় মশা নির্মূলের জন্য ব্যবহৃত ডিডিটি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে জমে সর্বনাশ করে যাচ্ছে। অথচ এখনো ডিডিটির কারখানা স্থাপিত হচ্ছে গরিব-ধনী দেশগুলোতে।
সাগরের মতো বিশাল হ্রদেও ইতিমধ্যে এই কাণ্ড ঘটেছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ ইরি এ জন্য এখন মৃত। কৃষ্ণসাগর ও বাল্টিক সাগরও কার্যত জলচর প্রাণীহীন। এসব ঘটেছে চারপাশের কলকারখানার নিক্ষিপ্ত বর্জ্যে। মহাসমুদ্র এখনো এই মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রেখেছে তার মাতৃসুলভ বিশালতায়। কিন্তু আর কত দিন! মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান ও চাহিদা ও লোভ কেবলই বাড়ছে লাগামহীম। তার বর্জ্য বিপজ্জনক জৈব-অজৈব আবর্জনার পরিমাণও কেবলই বাড়ছে আর বাড়ছে। তবু বলা হচ্ছে, এগুলো সমুদ্রদূষণের পরোক্ষ কারণ।
প্রত্যক্ষ কারণ জাহাজের পেট্রোলিয়াম। পেট্রলবাহী জাহাজ বা ট্যাংকার দুর্ঘটনায় পড়ে সব পেট্রল সাগরে ছড়িয়ে পড়ে। দু-একটি করে সারা বিশ্বে ট্যাংকার তো ডুবছেই। ১৯৯০-৯১ সালে কুয়েত-ইরাক যুদ্ধে বহু তেল সাগরে মিশে গেছে। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে বঙ্গোপসাগরে এবং ১৯৯৪ সালে পশুর নদে বিদেশি জাহাজ ডুবে পরিবেশ দূষিত করেছে। এখন সুন্দরবনের পাশে ও চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূলে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে। তাতেও সমুদ্রদূষণ অনিবার্য। অনিবার্য ধ্বংসের দিকে মানবজাতি ছুটছেই। বাংলাদেশও।
আমাদের একমাত্র প্রধান দ্বীপ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রবাল সংগ্রহ, জলপাই রঙের রিডলি কচ্ছপ ও সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করে কচ্ছপ নিধন, সি-আরচিন এবং তারা মাছ ব্যাপকভাবে ধরা, সমুদ্রের ধারের স্বাভাবিক ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে জ্বালানি ব্যবহার ও জমি উদ্ধার বঙ্গোপসাগর দূষণের গুরুতর কারণ। এমনকি নির্বিচারে মৎস্যসম্পদ আহরণ, পর্যটন ও বিনোদনকাণ্ডে পানিদূষণ, অপরিকল্পিতভাবে, মূর্খতাবশত নানা রকম উন্নয়নকাণ্ড বাংলাদেশে অনবরত ঘটেই চলেছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এদিকে দৃষ্টি দেয় না বললেই চলে। তা অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে বা থাকবে কি!
এই আমাদের প্রিয় এবং পরিত্রাতা-প্রেম বঙ্গোপসাগরের অবস্থা বা দুর্দশা। মাছধরা ট্রলার ও দেশীয় নৌকোর শ্রমিকদের পরিবেশ সম্পর্কে কোনো রকম বা সামান্যতম জ্ঞান না থাকায় সাগরদূষণ অবিরাম নিয়মিতভাবে ঘটে চলেছে। চলতেই থাকবে। আমরা জানি না কবে এর থেকে নিস্তার পাব। তত দিনে আমাদের সাগর ও সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশিষ্ট যা থাকবে তা কঙ্কাল-করোটি মাত্র।

বঙ্গোপসাগর গল্প-উপন্যাসের শস্যভাণ্ডার
এবার আমি আমার একটি বই ‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আমি’ থেকে এই নামের গল্পের কিছু অংশ এখানে বলি। বঙ্গোপসাগরকে নিষ্ঠুর, আমাকে সন্দেহপ্রবণ ও বিশ্বাসহীন বুঝতে হলেও এর দরকার আছে। তাহলে শুনুন :
“জেলে মহিনের সঙ্গে আমি দরিয়ায় যেতাম, ওদের ফৌজদারহাট জেলেপাড়া থেকে। খুব ভোরে সে বেরিয়ে যেত।…
“একদিন আমি একা চলে গেলাম মহিনের নৌকোয় পাল তুলে। কূলের দিক থেকে বাতাস বইছিল, ঘন দুধের মতো। আবার বাতাস আমাকে দেখা দিল ছায়াপথের মতো দানা দানা হয়ে। দানার ফাঁক দিয়ে আমি দরিয়া বঙ্গোপসাগর দেখছি, বাতাসে ওড়া সাদা তুষের মতো বাতাস, দানা দানা কুয়াশার মতো হাওয়া। ওই ফাঁকে কখন জালের বাঁওচা (জালের ভেসে থাকা বাঁশের নিশানা, জোয়ারের সময় ওটা দেখে জাল শনাক্ত করা যায়) ফেলে দূরে কোথায় চলে গেছি! কোথা থেকে উড়ুক্কু মাছের মতো ঘন তীব্র টুকরো টুকরো হাওয়া এবং তার সঙ্গে ঢেউয়ের আঁটি কে যে খুলে দিয়েছে, আমার নৌকোও উল্টে গেল। নদীতে উল্টে গেলে নৌকো কী করে ফের উল্টিয়ে পানি সেচে নিতে হয়, সেই কসরত জানি। কিন্তু সেটা দরিয়ায় সম্ভব নয়, ওখানে দাঁড়াবার জন্য মাটি কোথায় পাব।
“যাক গে! নৌকোর চ্যাপ্টা সমান্তরাল পিঠে চড়ে বসলাম। কসরত করে নৌকো ওল্টাতে তো পারি বলেছি। তাতে লাভ নেই, পানি সেচা তো সম্ভব নয়, বরং নৌকোর পিঠে বসে দরিয়া সেচা সম্ভব। দরিয়ার এসব নৌকোর কাছা বেশ উঁচু, নৌকোও তাই বেশ গভীর, তাই ভারীও। ওল্টানোও খুব সহজ নয়। ওল্টালে নৌকোর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আহা, যদি উপায় থাকত নৌকোর জীবন দেওয়া! না সেচাই ভালো, দরিয়ায় পাতা নৌকোর পিঠের কাঠের তক্তা তো পাওয়া গেল। কিচ্ছু না। মাঝ দরিয়ার কিনারে পালিশ করা আলকাতরায় মাখা চকচকে একটা লম্বা তক্তা তো পাওয়া গেল। বসা থেকে শোয়া, এমনকি উঠে হাঁটা-চলাও করা যাবে। ঝড় উঠলে আর ভয় নেই। ভীতু গাঙচিল বা ছোট পাখিরা দিনের বেলায় এখানে একটু বল-ভরসা পাবে। সারা দিন ঢেউ ঠেকানো মেহনতের কাজ হলেও ঠিকমতো করা যাবে। শীতের হাওয়া বা মলয় বাতাস অথবা গরমের হাওয়া নৌকোর পিঠে বসে একটু দম নেবে; আর বলবে, বেশ তো গড়িয়ে নেওয়া যায় একটুখানি। গড়িয়ে নিতে নিতে হাওয়ারা ভেবে নিত, দরিয়ায় এমন একটা জায়গা পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা, আর যা-ই বলো লোকটার বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, বাপের বেটা বটে। সূর্যও ডুবতে ডুবতে একচোট হেসে নিত দেমাগ না দেখিয়ে। আর চাঁদ উঠে অবাক হয়ে যেত (কারণ চাঁদ আমার ভাই, ধরিত্রী মায়ের সন্তান আমার চাঁদা ভাই, আমিও ধরিত্রীর সন্তান), আর জ্যোৎস্নার আলোয় খুঁটে খুঁটে দেখতে দেখতে বলত, ‘সারা জীবন আর যা-ই করুক, যত খুশি কিছু করুক আর না করুক, এই একটা কাজের কাজ করেছে, তার কাঠের খোলা ঘরটিকে চারদিকে দরিয়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। এই হলো গিয়ে একটা কাজের মতো কাজ, মাথার বুদ্ধি একটু খরচ করেছে।’ আমিও ভাবলাম ভালো বুদ্ধি একখানা। সারা দিনের শেষে নৌকোর পিঠের মাঝখানটিতে নিজের হাতে একটি মাত্র মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে-বসে থাকার মতো জায়গা। দরিয়ার মাছেরা এখানে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়বে আর আমার খাওয়ার সুযোগ করে দেবে। চিংড়িগুলো লাফ দিয়ে পেছন দিকে ছোটে। ওই করতে গিয়ে উঠে পড়বে আমার কাঠের বাড়িতে। তার সঙ্গে জ্যোৎস্না লুটিয়ে পড়ে হাওয়ার সঙ্গে দোল খাবে। বাসমতি চালের মতো ওর টুকরো দেখা যাচ্ছে, জ্যোৎস্নার টুকরো, পোলাও রাঁধলে যে রকম বড় বড় হয়ে যায় আর চকচক করে, ফুটফুটে হয়ে যায়। সে রকম।
“এমন সময় রাতের বেলায়, ধপধপে বাসমতি থেকে ফিরোজা হওয়া জ্যোৎস্নায় নৌকোর পিঠের অন্য প্রান্তে একজন লোক উঠে এলো। দরিয়া পেরিয়ে এসে উঠলেও তাকে একটু ক্লান্ত মনে হলো না। বখাটেও না, একটুখানি হাঁফ ছাড়ছে, তাও না। না, ভিজে জবজবও করছে না তার পোশাক, নতুন বলে বরং ঝকঝক করছে। আর কী আশ্চর্য, কী অদ্ভুত! আমরা দুজন মানুষ কিন্তু একজন। শুধু আমার থেকে তার বয়স বছর দশেক বেশি, এ জন্য আমার মতো মাথাভর্তি চুল হলেও একটু বেশি পাকা। আমার চুল পঁচিশ ভাগ পাকা হলে, ওর চল্লিশ-পঞ্চাশ ভাগ। আর ওরই বা বলছি কেন, সেও তো আমি। প্রথম দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে একটা ফয়সালা হয়ে গেছে, দুজন আমিই এটা মেনে নিয়েছি, পাশাপাশি দুই রাষ্ট্রের অভিন্ন নদীর পানি-চুক্তির মতো সানন্দে। (সিংহ পরিবারের দুটি সিংহ যেমন একে অপরকে মেনে নেয়, আট-দশটি সিংহীও যেমন দুটি পুরুষ সিংহের লড়াই শেষে অবশেষে একই পরিবারের সদস্য হয়ে যায়) এ রকম মেনে নেওয়াতে আমাদের লাভ হলো, কথা বলার সঙ্গী পেয়ে গেলাম। দুই অথচ এক আমি।
“সমুদ্র দিয়ে ঘেরা আমার উন্মুক্ত ঘরের ওপাশ থেকে সে বলল, ‘তোমার এ অবস্থা হবে আমি জানতাম, সে জন্যই আমি এখানে চলে এলাম, তোমাকে বাঁচাতে। তোমার মরার সময় এখনো হয়নি বলে।’
“‘তার মানে আমি এখানে মরে যেতাম নাকি! তুমি না এলে?’
“‘আর আমি নিশ্চিন্ত এটা তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এরপর তুমি আমাকে স্বপ্নে দেখবে, কিন্তু সেগুলো এর মতো বাস্তব বা সত্য হবে না। সেসব হবে তোমার কল্পনা।’
“‘তার মানে? কী বলতে চাও তুমি? আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?’
“‘তার মানে আজকের পর আমার মৃত্যু হবে, কাজেই তোমার কাছে জীবিত আমি আর আসতে পারব না। তোমার কাছে আজকের তারিখটা কত?’
“‘গতকাল ছিল আমার আটষট্টিতম জন্মদিন, তারিখটা তুমি বের করে নাও, তুমি যদি সত্যিই আমি হও তারিখটা বের করো তো শুনি।’
“‘আমি জাগ্রত অবস্থায় এখন আটাত্তর বছর, আমি গতকাল শেষ জন্মদিন পালন করেছি, অর্থাৎ ১৯৪০ শকাব্দের ২ আশ্বিন, আমার আটাত্তরতম জন্মদিন ছিল। তোমাকে এই রাতে (২০১৮ সালে) পৌঁছবার আগে এটিই শেষ দেখা। তোমার সঙ্গে জীবিত আমি-র আর দেখা হবে না।’
“‘এই দুনিয়ার সবাই জানে কে কখন মরবে ঠিক নেই, তবে আত্মহত্যা করলে এক কথা, আবার নিজেকে খুন করার জন্য ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করলেও আলাদা কথা।’
“‘তোমার উপন্যাসে তুমি এসব ব্যাপার প্রয়োগ করবে আমি জানি, সেই উপন্যাস তোমার মৃত্যুর আগে প্রকাশিতও হবে। তবে তুমি হচ্ছো মুখচোরা, নরম-শয়তান গোছের।’
“‘আরো দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে? আমার বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগ মেনে না নিয়েও বলছি।’
“‘আমার হবে না। আমার সঙ্গে তোমার এই শেষ দেখা। যেকোনো মুহূর্তে আমি মরে যেতে পারি। তবে আমার দ্বিতীয় অস্তিত্বের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। আর এটাই মৃত্যুর পূর্ণ ও পূর্ব লক্ষণ। এটা আমি অর্জন করেছি এবং তোমার জন্য রেখে যাচ্ছি, তোমার কাজ দেবে।’
“‘তাহলে এখানে এবং আজ আমার মৃত্যুর পূর্বঘোষিত দিনপঞ্জি তৈরি করতে লেগে গেছি বলতে পারি।’
“‘এই খসড়ায় আমার মৃত্যুর সঠিক দিনটি থাকবে না।’
“‘কেন?’
“‘কারণ আমি এই বয়সে আবার প্রেমে পড়েছি। আমি পড়েছি বললে অসত্য বলা হবে। বলতে হবে সে পড়ে তারপর আমাকে টান দিয়েছে। বুঝতেই পারছ, এই বয়সের প্রেম কত গভীর হয়। ওর স্বামী আছে। স্বামীর বয়স আমার চেয়ে কম হলেও আমার চেয়ে বেশি বুড়ো। কাজ-কম্মো না থাকলে মানুষের যা হয় আর কি।’
“‘তুমি তো আমাকে ধন্দে ফেলে দিলে হে। আবার প্রেম? আমার বউ অবশ্য আমার বেলায় বলবে, আমার নাকি এ রকম হতেই পারে, এটা সে আগে থেকে জানত, আমাকে বিয়ে করার আগে থেকেই।’
“‘মনে হচ্ছে তুমি খুব উৎসাহী হয়ে উঠেছ।’
“‘এই দশ বছরের মধ্যে আর কী কী স্মরণীয় কাজ করেছ?’
“‘নিজের ভবিষ্যৎ বেশি জানা থাকা ভালো কিছু নয়।’
“‘সে জন্যই আজ আমি এখানে। আমার মনে হয়েছিল মহিনকে সঙ্গে না নিয়ে আমার একা এখানে আসা উচিত। একজন সাহিত্যিকের জন্য একা হওয়া খুব জরুরি বিষয়। ঘরে একা তো আছিই। দরিয়ায় একা হওয়া এত সহজ নয়। এটা আমার বহু দিনের ইচ্ছে, মহিনকে কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানতে দিইনি। আর আশ্বিন মাস পড়লে দরিয়া শান্ত হয়ে যায়। মহিন তবে এতক্ষণ আমার জন্য খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে। ওর বউ ওকে পইপই করে মানা করেছে আমাকে দরিয়ায় নিয়ে না যেতে। ওর কথা হলো নৌকোয় করে দরিয়ার আট-নয় মাইল যাওয়া ভদ্রলোকের জন্য নয়। ওটা ওদের মতো জেলেদের কাজ।’
“‘আমি জানি এ রকম করবে তুমি।’
“‘তোমার নতুন প্রেমিকার সঙ্গে তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করতে পার?’
“‘একটা বিষয়ে সে আমাকে খুব উৎসাহিত করে।’
“‘কী বিষয়ে?’
“‘সেটা এখন না বলাই ভালো। তাহলে তোমার কল্পনাশক্তিকে লাঞ্ছনা করা হবে। স্বপ্ন ও কল্পনাকে কোনো সাহিত্যিক মরতে দেয় না। ওটা তার মৌলিক শক্তি।’
“‘সব সাহিত্যিক একসময় নিজের সবচেয়ে বেশ বোকা শিষ্য হয়ে যায়। অথচ সে বুদ্ধিমান।’
“‘আর তখনই ওই সাহিত্যিকের প্রেমে পড়ার সময় হয়। প্রেমে পড়ে সে ঝরঝরে চৌকস হয়ে যেতে পারে।’
“‘তুমি তাহলে আমার সব খবর রাখো দেখছি।’
“‘যা এখন তোমার বর্তমান, তা আমার অতীত, তবে সবই আমার অস্পষ্ট স্মৃতি হয়ে গেছে। তুমি আমার অস্পষ্টতম সঙ্গিনীকে, তোমার বর্তমান প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে এলে না কেন, সে তোমার সঙ্গে আসার জন্য তৈরি হয়েই ছিল।’
“‘নিয়ে এলে কী অবস্থা হতো এখন বুঝতে পারছ। দরিয়া ঘেরা কাঠের তক্তার এক পিঠওয়ালা এই ঘরে!’
“‘ওকে নিয়ে এলে তোমার এই অবস্থা হতো না। তখন মহিন থাকত, এভাবে নৌকো ডুবত না। এখন সে তোমার সব খবর পেয়ে গেছে। মহিন বলে দিয়েছে তুমি নৌকো নিয়ে একা বেরিয়ে পড়েছ আর ফিরে যাওনি। এখন তুমি যে প্রায় মরতে বসেছ, বুঝতে পারছ?’
“‘না, আমি এখন এমন এক মাধুর্য ও সুখ অনুভব করছি যা আগে কখনো পাইনি। আমার এই পেল্লাই অনুভূতি আমি বর্ণনা করে বোঝাতে পারব না। অভিজ্ঞতার এমন অংশীদারিত্ব একাই সম্ভব। আর তুমি যদি ভবিষ্যতের আমি হই তাহলে তুমিই একমাত্র অংশীদার হলে। এ জন্য আমি তোমাকে ঘৃণা করি। আমি তো দেখছি আমি কোনো কাজ একেবারে আমার একান্ত নিজস্ব করে করতে পারি না। আজ এখানে একাকিত্ব উপভোগ করতে এলাম, দলমাকে সঙ্গে আনলাম না, তাতেও তোমার আপত্তি। এ জন্য আমি তোমাকে ঘৃণা করছি। তোমার মুখটা দেখতে চাই না, ওটা আমার মুখের ব্যঙ্গচিত্র। দশ বছর পরে আমার মুখ তোমার মতো ভাঙাচোরা হয়ে যাবে? এ জন্যও আমি তোমাকে ঘৃণা করছি। তোমার কণ্ঠস্বর কেমন ফ্যাসফ্যাসে হয়ে গেছে, তোমার বাক্যরীতি ও শব্দচয়ন কী দুর্বল! কী করুণ তোমার অধঃপতন। আমি তোমার করুণ মুখ আর সহ্য করতে পারছি না।’
“‘সবার এই অবস্থা হয়। সত্তর বছর পার হলে, বয়স যদি ভার হয়ে পড়ে তখন নিজেই নিজেকে ঘৃণা করে। এই ঘৃণা নিজেকেও ভালোবাসার অন্য পিঠ। এ জন্য ভালোবাসার যদি শুধু একটি পিঠ, একটি তল থাকত তাহলে ভালো হতো। যেমন ধরো, চাঁদের একটি পিঠ ও সূর্যের একটি দিকই আমরা দেখি। তেমনি ভালোবাসার শুধু একটি দিক থাকত তাহলে এত সমস্যা ও রহস্যময়তা থাকত না। আমাকে তোমার এই ঘৃণার জন্যই তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না বলছি। এ জন্যই আমি বহুদিন ধরে আত্মহত্যার কথা ভাবছি।’
“‘তুমি আত্মহত্যার কথা ভাবছ বলে তোমাকে আরো বেশি ঘৃণা করতে ইচ্ছে হচ্ছে।’
“‘তুমি কি নিজেকে কখনো ঘৃণা করো না? দলমার সঙ্গে তোমার স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ ভালোবাসা ঘৃণার উদ্রেক করে না?- এ কথা গভীরভাবে ভাবতে চেষ্টা করে দেখেছ?’
“‘দলমারও স্বামী আছে, মনে রেখো।’
“‘এবার তোমার হাতখানা দাও, রাত শেষ হতে চলল। বকমণ্ডলের বকটি মাঝ আকাশ পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, তার পেছনে পক্ষীরাজ ছুটছে। গ্রিক বীর পারসিয়াস তার পেগাসাস নামক পক্ষীরাজে চড়ে সুন্দরী এনড্রোমিডাকে উদ্ধার করেছিল। বিপদগ্রস্ত নারীকে উদ্ধার করা খুব সহজ নয়। তোমার হাতখানা একবার ধরতে দাও। এটিই হবে তোমার আমার শেষ জীবিত স্পর্শ।’
“‘না, যদি হাত দুটি এক হয়ে যায়! আমার সন্দেহ হচ্ছে।’
“‘দরিয়ায় একা পড়ে আছ তাতে ভয় পাচ্ছ না, আমাকে সন্দেহ কেন?’
“‘আমি এত তাড়াতাড়ি তুমি হতে চাই না। আমি আত্মহত্যাও করতে চাই না।’
“‘দেখো, এখন তুমি যে ভয় পাচ্ছ আগামী বার স্বপ্নে পড়লে তুমি অন্য রকম হয়ে যাবে। প্রত্যেক মানুষ কতগুলো স্বপ্ন বারবার একই রকম দেখলেও পাশাপাশি নতুন অনেক স্বপ্ন দেখে। তুমি যখন পরে নতুন স্বপ্ন দেখবে তখন আমি এখন যেই মানুষ তুমি সেই মানুষে পরিণত হয়ে যাবে।’
“‘আর তুমি তখন কী হবে?’
“‘তুমি হবে আমার স্বপ্ন। আমার অতীত অথচ স্বপ্ন। আমার ভবিষ্যৎ তো আমি দেখে ফেলেছি, এখন আছ আমার অতীত তুমি, সেই তুমিই হবে আমার স্বপ্নমধুর।’
“‘তাহলে আমি তোমাকে আর ঘৃণা করব না বলছ?’
“‘কাল তোমার এই ঘৃণা কেটে যাবে।’
“‘আমার ঘৃণা কেটে গেলে আমি কালই এটি লিখতে বসব।’
“‘হ্যাঁ, তোমার স্বপ্নবাস্তবতার জোয়ারের কোনো স্তরে এটি জমা পড়বে। তুমি যখন লিখবে তখন তোমার মনে আমার জন্য স্বপ্নমায়া রচিত হবে। আমি প্রায় হলফ করে বলতে পারি, কাল তোমার লেখা হবে না। কারণ কাল তুমি আমার চেয়ে জরুরি এক কাজে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছ।’
“‘সেটা কী রকম?’
“‘মানুষ মাত্রেই ভবিষ্যৎ জানতে চায়। তুমিও ভবিষ্যতের জন্য উদগ্রীব। থাক-না ওটাও আগামীকালের পেটে। আজ ভবিষ্যতের পেট কাটাকুটি করে বের করার চেয়ে, আগামীকাল তাকে প্রসব হতে দাও। প্রসূতিরা বলেন, প্রসব বেদনার সমাপ্তিতে মধুর বেদনার সুখ নামে সারা শরীরে। তখন একটি মাত্র টোস্ট বিস্কুট দিয়ে এক কাপ গরম চা খেতে খেতে যে ঘুম নামে তার কোনো তুলনা হয় না।’
“‘এই অভিজ্ঞতা তোমার কবে হলো?’
“‘এটি আমার বউয়ের। আমাদের প্রথম সন্তানের জন্মের পর সে অনুভব করেছে, আর আমাকে বহুবার বলেছে, তুমি তো জানোই, এসব ভুলে গেলে কী করে?’
“‘এটিও আমি লিখে রাখব। আর কী কী আমি ভুলে গেছি মনে করিয়ে দাও। অন্তত এ জন্যও তোমাকে ঘৃণা করা থেকে বিরত হতে পারি।’
“সে কোনো উত্তর দিল না। আধশোয়া হয়ে কথা বলতে বলতে তক্তার ওপর শুয়ে পড়ল। খুব সহজভাবে। আমি তাকে খুব করে ডাকলাম। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে দরিয়া, খৈয়ের মতো জ্যোৎস্না ফুটছে। বঙ্গোপসাগর।
“তার পরও সে আর কথা বলে না, দরিয়া-ঘেরা আমার কাঠের পাটাতনের খোলা ঘরে সে কাত হয়ে পড়ে রইল। কোনো উত্তরও দিচ্ছে না, নিজের থেকেও কিছু বলছে না। গিয়ে ওর কাঁধে হাত দিলাম। দেওয়ার আগে অনুভব করলাম ওর মৃত্যু হয়েছে। সে বলেছিল এটিই আমাদের জীবিত শেষ সাক্ষাৎ। অক্ষরে অক্ষরে তা ফলে গেল। ওর জন্য কাঁদতে পারি, কিন্তু সে তো আমার জন্যই কাঁদা হয়ে যাবে। নিজের জন্য কাঁদায় অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। তাহলে দরিয়ার ঘরে একা পড়ে থাকার জন্যই তো আগে কাঁদতে হয়। না, আমি কাঁদব না। মায়ের কোলে কাঁদা যায়, মায়ের জন্যও কাঁদতে পারি। নিজের জন্য খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত ঘরে নয়।
“দেখি দলমা আমার কাঁধে হাত দিয়ে ডাকছে। আমি এটাও স্বপ্ন ভেবে ওর কোলে মাথা রেখে চুপ করে রইলাম। তার পরেই হঠাৎ আমার সন্দেহ হওয়াতে চোখ খুলে দেখলাম। আকাশে সাদা ছেঁড়া ছেঁড়া অনেক মেঘ অলস হয়ে পড়ে আছে, কোথাও যাওয়ার তাগিদ নেই ওদের।
“দরিয়া-ঘেরা আমার ঘর দলমায় ভরভরন্ত। পাশে নৌকোয় মহিন। অমনি আমি জাগরণ থেকে জেগে উঠলাম। দরিয়াও আমাকে সুযোগ দিতে আর কথা বলে না। একদিক থেকে আমি যার সঙ্গে মরে গিয়েছিলাম তার থেকে বেঁচে উঠছি। হয়তো বা বেদনার্ত হয়ে জাগছি, কারণ তখনো আমার জাগরণ সম্পূর্ণ হয়নি হয়তো। জাগরণেও তো আমরা ঘুমিয়ে থাকি।
“একবার ভাবলাম দলমাকে ভালো করে ধরে রাখি, কিন্তু এখানে বাইরে বা যেখানে ঘর বলে কিছু নেই, কোনো বিছানা নেই, নীরব কোনো ঘরের কোণ নেই, পাখি-ফুলের ছায়ানিবিড় ঝোপালো গাছ নেই, তারা ভরা অন্ধকার নেই, উদ্যান নেই, কাশবনের ঝোপ নেই আড়াল রচনার জন্য, বালুচর নেই, কর্ণফুলীর তীর নেই, কিন্তু পানি আছে, আমার পাশে তক্তার ওপর আধখানা খাওয়া দুটি রূপচাঁদা পড়ে আছে, আমার মনে পড়ল ওরা আমার খাবার হওয়ার জন্য দরিয়া থেকে লাফিয়ে আমার সামনে পড়েছিল, আমি নোনা পানিতে বারবার ভিজিয়ে খেতে শুরু করেছিলাম, এখন এনড্রোমিডা নেই, পারসিয়াসও নেই, ওরা ডুবে গেছে, আবার কাল রাতে দেখা দেবে ছায়াপথের ওপরে, বকমণ্ডলের বকটি পাড়ি দেবে ছায়াপথের নদীর ওপর দিয়ে। দু-একটি তারা মরে যাওয়া ছাড়া সবাই থাকবে।
“দলমাকে নিয়ে, মহিনের নৌকোয় আমার অন্য স্বপ্ন, আমার খুব কাছে এসে অপেক্ষা করে আছে। আর যে আমির আটাত্তর বছর বয়সে গত রাতে মৃত্যু হয়েছে সেও অপেক্ষায় থাকবে। আমার প্রতিপক্ষ আমিও থাকব। দরিয়ায় আমার একখানা দরিয়া-ঘেরা ঘরও থাকবে।”…
বঙ্গোপসাগর নিয়ে আমার অনেক ভাবনা ও লেখার এটা টুকরো মাত্র। আমার গল্পের সর্বশেষ ভঙ্গি ও কাঠামোতে এই গল্প লেখা। এই পর্বের লেখাগুলো ‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আমি’ বইয়ে ছাপা হয়েছে। প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। বঙ্গোপসাগরকে আমি কী চোখে দেখি, কেন এত ভাবি তার নিহিত অর্থ এখানে ছায়াপাত করেনি কি! কক্সবাজার নিয়ে লেখা ‘আমি তোমার কাছে সমুদ্রের একটি ঢেউ জমা রেখেছি’ অনু উপন্যাসে আমি একেবারে অন্য রকম। আবার প্রথম দিকের গল্প ‘সমুদ্র-সম্ভোগ’-এ জন্মান্তর ঘটে গেছে। অন্য প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের গল্প ‘প্রভাতের যুদ্ধযাত্রা’ আমার প্রথম গল্পের বই ‘সাদা কফিন’ গ্রন্থিত। ‘গাঙচিল’, ‘সমুদ্র ঝরোকা’ এবং আরো গল্প আছে বঙ্গোপসাগর নিয়ে। এখন অঙ্গে স্পর্শ করা যায়। বলি তাহলে।
সেন্ট মার্টিন হলো আমার বিপন্ন-প্রেম বঙ্গোপসাগরের স্বচ্ছ জলের এলাকা বা বলয়। সুন্দরবন বা মেঘনা-পদ্মার মোহনার জল ঘোলা। কক্সবাজার উপকূলবর্তী এলাকায় সুবৃহৎ নদী নেই বলে এখানকার জল ঘোলা হয় না। সেন্ট মার্টিন এলাকার স্বচ্ছ এলাকায় নানা রকম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ প্রচুর জন্মায়। প্ল্যাংকটন খুবই বেশি। এগুলোই সমুদ্রের নিচের এলাকার বিভিন্ন প্রকার খাবার। আমাদের মৎস্যসম্পদের ৭০ প্রজাতির মাছ এই দ্বীপ-সমুদ্র এলাকায় ধরা পড়ে। এখানে আছে বিশেষ করে চার রকমের হাঙর, তিন রকমের করাত মাছ। যেমন রশ্মি মাছ, গিটার মাছ, করাত মাছ, হাতুড়ি মাথা হাঙর, গ্রে হাঙর, প্রজাপতি রশ্মি মাছ, বাঘা হাঙর, রূপচাঁদা, এক রকম হেরিং, সার্ডিন, বম্বে ডাক (বড় লটে) বাইন, ভেটকি, লইট্যা, ম্যাকারেল, ইলিশ, ফুইট্যা ইলিশ, সালেট, এন্কভী, গোলক মাছ, গলদা চিংড়ি, লাক্ষা, পিলচার্ড, কাঁটা চাঁদা, টুনা, লাল পার্চ, গোবী, ছুরি মাছ, স্কেট, শিলা ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো গভীর সাগরের মাছ। এখানে এগুলো ধরা হতো। কিন্তু থাই মাছ-দস্যু ট্রলারের হামলায় এখানকার মৎস্য এলাকা ধ্বংসের পথে নব্বইয়ের দশক থেকে। এদের মাছ ধরার প্রক্রিয়া অবৈজ্ঞানিক। বৈজ্ঞানিক উপায়ে এরা বিস্ফোরক ও রাসায়নিক ব্যবহার করে মাছ ধরে। ভালো মাছ বেছে নিয়ে ছোট এবং যেসব মাছের চাহিদা কম বা কম মূল্যবান এরূপ মাছ সাগরে ফেলে দেয়। এভাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যে এমনকি দু-তিন বছরে মাছ এলাকা নষ্ট হয়ে পড়ে, মাছ ধরা তখন এসব এখানে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। শহীদুল্লাহ মৃধা রচিত ‘বঙ্গোপসাগর : জীব সমুদ্রবিজ্ঞান ও সমুদ্র সম্পদ’ দ্বিতীয় খণ্ড বই থেকে জানা যায়, এখানে ১৯৮৩ সালের পর কোনো মাছই আর ধরা পড়ে না। আর রুশরা ১৯৭২ সালের পর এখানে মাছ ধরে ছোট মাছগুলো ফিশ বল, ফিশ ফিংগার করে বাজারজাত করত। আমরা খেতাম স্বল্প মূল্যে। বড় মাছগুলো হিমায়িত করে বাজারজাত করত।
সেন্ট মার্টিনে বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে মানব বসতি শুরু হয়। তার পর থেকে গাছপালা কেটে দ্বীপ উজাড় হয়ে যায়। প্রবালগুলো ভেঙে যেতে শুরু করে, অনেকগুলো ভেঙে নিশ্চিহ্ন। সাগরের ভেতরে বহুদূর পর্যন্ত যে প্রবাল জন্ম নিত এখন অনেকটা কমে গেছে। অর্থাৎ এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন কোনো বিপর্যয় বা পরিবর্তন শুরু হয়েছে যার জন্য প্রবালসম্পদ আজ প্রায় বিলুপ্ত। তার আগে সাগর অ্যালগি কেল্প লতাগুলো জলের নিচে মনে হতো কেয়ারি করা অসাধারণ রঙিলা-সুন্দরী এক বাগান। বাগানের পর বাগান। বড় বড় লতার প্রশস্ত পাতা জলের নিচে দুলে দুলে চমৎকার ও অসচরাচর দৃশ্যাবলি সৃষ্টি করছে। কিন্তু ১৯৮০ সালে আর এ দৃশ্য দেখা যায়নি। একটি লতা বা গাছ জন্মে এখন সেখানে জলের নিচের সেই সৌন্দর্য সৃষ্টি করেনি। তার অর্থ বঙ্গোপসাগরের এই এলাকায় এমন কোনো পরিবর্তন বা বিপৎপাত হয়েছে যার জন্য এখানে সাগর-মরুর সৃষ্টি হয়েছে। স্থলের প্রাকৃতিক মরুভূমিতে আছে সেই পরিবেশ উপযোগী জীবজন্তু ও উদ্ভিদ। সেও এক অপার বিরান রহস্য। কিন্তু কক্সবাজারের সাগর মানুষের অত্যাচার-নির্যাতনে সৃষ্ট সাগর-মরুভূমি। তার কুফল ভোগ আমাদের করতেই হবে।
এই বিরান সাগর-মরু সৃষ্টির প্রধান কারণ মনে করা হয়েছে মানুষের অত্যাচার, ওই থাই দস্যু ট্রলার দল। রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করে মাছ ধরার জের। তার সঙ্গে দ্বীপের মানুষের বিভিন্ন রকম প্রবাল সংগ্রহ, বিভিন্ন রকম শঙ্খ-শামুক ও অন্যান্য জীব ধরে তার খোলস বিক্রি করা। তারা ধরত সাগর আরচিন, বড় বড় শঙ্খ, শামুক, ঝিনুক, মাছের করাত। প্রবাল তো আছেই। এ ছাড়া শিক্ষা সফরে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক জীব নিয়ে আসাও এর কারণ। আবার ভ্রমণকারীদের সংগ্রহও আছে। এভাবে সেন্ট মার্টিনের প্রাকৃতিক মনোলোভা সৌন্দর্য হয়ে পড়েছে হতশ্রী, দ্বীপ হারিয়ে ফেলেছে সৌন্দর্য। বিদেশি ভ্রমণবিলাসীদের আকর্ষণ করার মৌলিক বা প্রাকৃতিক শক্তিও সে হারিয়ে ফেলেছে। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রযন্ত্রের। সেদিকে তাদের জ্ঞান, নজর, দায়িত্ববোধের এতই অভাব যে তা বলে শেষ করা যাবে না। আমরা দেশের মানুষকে শিক্ষিত করতে পারিনি, রাষ্ট্র আইনের শাসন প্রবর্তন করেনি। রাজনৈতিক দল ও নেতার রাষ্ট্রদর্শনও নেই বলা চলে। তাহলে দেশের উন্নতি হবে কী করে! সমুদ্র বাঁচবে কী করে!
প্রবাল তৈরি হয় ‘প্রবাল কীট’ নামক আঠালো এক রকম সামুদ্রিক প্রাণীর কঙ্কাল থেকে। প্রবাল কীটের কঙ্কাল গঠিত হয় তার শরীরের বাইরে। এই কঙ্কাল প্রবালের শরীরের ভার রক্ষা ও বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। প্রবালের শরীর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কঙ্কালটিও বাড়তে থাকে। প্রতিটি প্রবাল কীট দেখতে এক-মুখ বন্ধ করা ছোট্ট এক ঢেউয়ের মতো। বন্ধ মুখে থাকে অনেক কর্ষিকা (Tentacle) অর্থাৎ আঁকড়ে ধরার জন্য সরু নরম অঙ্গ। প্রবাল কীটগুলো চুনের মতো পদার্থ ক্ষরণ করে, তার থেকেই সৃষ্টি হয় ওদের কঙ্কাল। জলের নিচে কোনো পাথরের সঙ্গে প্রবাল কীট নিজেকে আটকে রাখে। বড় কীট যখন মরে যায় তখন ছোট কীটই ওই কঙ্কালে থেকে যায়। এরা নতুন নতুন অজস্র কীট সৃষ্টি করে। এভাবে লাখ লাখ প্রবালের এক-একটি বসতি গড়ে ওঠে। আর সমুদ্রে ওই স্তরের পর স্তর প্রবাল সজ্জিত হয়ে সৃষ্টি হয় প্রবাল প্রাচীর বা দ্বীপ। প্রবাল বা চুনের ওই স্তরের বিভিন্ন রং হয়। লাল, গোলাপি, সাদা, ধূসর, নীল কত রং, কত তার বাহার। মানুষ সেগুলো সংগ্রহ করে ঘর সাজায়, ঘরে সমুদ্রের আবেশ সৃষ্টি করে। প্রবাল দ্বীপে যে সে গিয়েছিল তার সাক্ষ্য-প্রমাণ ঘরে এনে রাখে। সামুদ্রিক দূষণ না হলে দু-দশ খণ্ড প্রবাল কঙ্কাল এনে ঘর সাজালে প্রবাল দ্বীপ ধ্বংস হওয়ার কথা নয়। আসল কারণ মানুষের দ্বারা সমুদ্রদূষণ, সঙ্গে অত্যাচার। অর্থাৎ পৃথিবীর যাবতীয় সৌন্দর্য ও বস্তু, প্রাণী বা সম্পদ, জলবায়ু বা পাহাড়-পর্বত ধ্বংসের জন্য দায়ী মানুষ, মানুষ, মানুষ।
বলো মানুষ, তুমি আর কী কী গ্রাস করতে চাও! যে পৃথিবীতে বাস করো তাও!
তুমি সৌন্দর্য সৃষ্টির নামে পৃথিবীর আর কী কী ধ্বংস করবে বলো!
নদীকে বাঁধ দিয়ে নদী ধ্বংস, তিমির মাংসের জন্য তিমি হত্যা।
ঠোঁট রাঙানো, মুখের লাবণ্য মসৃণ করার জন্য তিমির চর্বি। আর কী চাও!
ঘরে বিদ্যুৎ আনার জন্য সুন্দরবনের পাশে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন! সংগীতে উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য ড্রাম, ঢোল, শব্দদূষণ বোল। দুর্লভ ও বিপন্ন পশু হত্যা করে তার চামড়া ব্যবহার। গৃহসজ্জার জন্য গণ্ডারের শিং, হাতির দাঁত, হরিণের শিং-চামড়া ইত্যাদি ইত্যাদি!
রবীন্দ্রনাথ ‘যদি তোর ডাক শুনে’ গানটিতে এ জন্যই কি বলেছেন,
‘যদি সবাই ফিরে যায়, ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়-
তবে পথের কাঁটা
ও তুই রক্তকমল চরণতলে একলা দলো রে
যদি আলো না ধরে, ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি ঝড়-বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরে-
তবে বজ্রানলে
আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে’
আর ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁর একটি ছোটগল্পে কী লিখেছিলেন? লিখেছেন, পেছনে শত্রুদল কর্তৃক তাড়া খাওয়া এক গ্রামবাসীর দুর্দশা থেকে বাঁচিয়েছিলেন তাদের এক তরুণ যুবক। সেই যুবক গভীর গহিন অরণ্যে গাছের অন্ধকারে পথ খুঁজে না পেয়ে নিজের হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে তার আলোতে অন্ধকার থেকে পথ বের করে নিয়েছিলেন। এই ভালোবাসা ও উদ্যোগ ছাড়া মানবজাতি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। এ জন্য মহৎ মানুষের দরকার, রাজনীতিবিদদের ভবিষ্যদ্রষ্টা হওয়া চাই।
সমুদ্র, নদী, পাহাড়, অরণ্য অর্থাৎ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়, নিজের মধ্যেই রয়েছে সবার সঙ্গে মিলেমিশে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখার সুপ্রশস্ত ও সুসমঞ্জস বিধান। মুক্তি। আমাদের ছোট্ট অথচ ষোলো কোটি মানুষের দেশটিকে বঙ্গোপসাগর বা পদ্মা-যমুনার তীরে দাঁড়ালে তা আমার একটুও ছোট বলে মনে হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর নির্জন টুকরো-টাকরার পাড়াগাঁয়ে গেলেও দিগ্বিদিক পাই না।
আবার জল, যার বিশাল আধার সমুদ্র তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে নদীর কথা এসে যায়। নদী ও নদীদূষণ সম্পর্কে প্রাচীন গ্রন্থ ঘাঁটতে গেলে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে গেলে একটা সূত্র পাই। তারও আগে গেলেও পাওয়া যাবে বৈকি! প্রাচীন মিসরে গেলেও পাওয়া যাবে। কারণ মানুষ ও জীবজন্তু জন্ম থেকেই জল পান করে। কারণ মানুষের শরীরে ৭১ শতাংশ জল, পৃথিবীতে ওই একই পরিমাণ জল। পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব প্রথমে জলে। তাই প্রাণীমাত্রেই ছোটে জলের খোঁজে, পানির কাছে, সাগরের কাছে। সাগরের জল বড্ড নোনা। মুখে নেওয়া যায় কিন্তু খাওয়া যায় না। সেই নুনও যে মানুষের বড্ড দরকার। পানি থেকেই তাকে সংগ্রহ করতে হবে। কাজেই সাগরের পানি কায়দা করে কূলের জমিতে তুলতে হবে। পানি শুকিয়ে বাষ্প করে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। নুন পড়ে থাকবে জমিতে। সমুদ্র চর ও দ্বীপে এভাবে নুন তুলে দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি করা সম্ভব। আবার ভারতের রাজস্থানের পাহাড়ের ওপর কয়েক শত বছর আগে নির্মিত দুর্গে জল তুলে নিয়ে দুর্গনগরীর প্রয়োজন মেটাত। আর সারা রাজ্যে রাজারা জলাধার নির্মাণ করে চাষবাসের প্রয়োজন মেটাত। এখনো সেখানে বড় বড় সেই ঝিল-বিল জলপূর্ণ। এমনকি পাহাড়ের ওপরও বড় বড় জলাধার রয়েছে। মাউন্ট আবু পর্বত শহরে এসব দেখে এসেছি ২০১১ সালে। সস্ত্রীক গিয়ে।

একটি উপন্যাস ও ছোটদের গল্প
আমার ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ উপন্যাসের নায়ক মোবাশ্বের বাঁশখালীতে গিয়েছিল নুন তুলতে? তার বিবরণ একটু শোনা যাক না হয়। কাছেই বঙ্গোপসাগর ও কুতুবদিয়া। সেখানকার ঘটনা-
“হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে মোবাশ্বের এসে পৌঁছল হারুন বাজারে। গ্রীষ্ম থেকে দিন একটুখানি ছোট হয়ে এসেছে, গ্রামের বাতি দেখা যাচ্ছে। আকাশে অজস্র তারা উঠেছে। গ্রামের বাতিগুলো ছাড়া আর সবই যেন মরে গেছে। হঠাৎ দু-একটা মানুষ আর কুকুরের ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। বাজারে লোকজন কমে গেছে। নদীর কূলে চায়ের দোকানে দেখা হয়ে গেল ইউসুফ আলীর সঙ্গে। অমনি ইউসুফ আলী হৈচৈ করে মোবাশ্বেরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করল। কুশল বিনিময়ের পর চা খেল গরম খাজা দিয়ে। টেবিলের ওপর মুখখোলা জগ থেকে পানি ঢেলে নিল গ্লাসে। দোকানের ভেতরে মিষ্টি তৈরির গন্ধ ভুরভুর করছে। টেবিলের এক পাশে হাত ধোয়ার একটা গামলা। বয় এসে গরম চা দিয়ে গেল। নদীতে কে যেন মালকা বানুর গান ধরেছে। সেই সুর চায়ের দোকান, মনিহারি মালের দোকান, কাপড়ের দোকান, নুনের গোলা সর্বত্র ঢুকে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে যাচ্ছে, আবার রাস্তা পেরিয়ে চলল পাশের গাঁয়ের দিকে। কৃষ্ণপক্ষের নবমীর রাত, চাঁদ উঠবে রাত ১২টার দিকে। ইউসুফ আলীর সিগারেটের আগুন ফুলকি ছড়াচ্ছে। মোবাশ্বের নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা একনাগাড়ে বলে গেল, তার বুঝি ভয় হয়েছে ইউসুফ আলী অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলে আর তার কথা শুনবে না।
“ইউসুফ আলী দাঁতের ফাঁক থেকে খাজার খাদ্যকণা বের করে থু করে ফেলে দিয়ে বলল, জানি জানি। তুঁই এখন আঁর হঙ্গে থাগিবা… তুমি এখন আমার সঙ্গে থাকবে, নুন তোলার কাজ করবে, হিসাবপাতি রাখবে। আমাকে যেতে হবে কুতুবদিয়ার লেমসিখালীতে। সেখানে কিছু জমি কেনার ইচ্ছা আছে, একসঙ্গে পাঁচ কানি জমি, বছরে দুই বার ফসল হয়, একবার ধান আরেকবার পাউন্ডি, রবিশস্য। তুমি এখানকার নুন তোলা ও বেচা-বিক্রি করবে। তারপর আগামী সনে তুমি নিজে জমি নেবে, নুন তুলবে। তোলার মতো একজন লোক আমার খুব দরকার। এখন চলো।
“ওরা উঠল। দোকানের টাকা দিয়ে ইউসুফ আলী ও মোবাশ্বের আরেকটা করে সিগারেট জ্বেলে নিল। বাজারের ভেতর দিয়ে ভাদালিয়া গ্রামের শেষ প্রান্তে সরল গ্রামের কাছে একটা বাড়িতে গিয়ে উঠল। ইউসুফ আলী ওই ঘর ভাড়া নিয়েছে, সেখানে থাকে। গ্রামের এক বিধবা বুড়ি ভাত রাঁধে ইউসুফ ও নুনের মাঠের কাজের লোক শুক্কুর মিয়ার জন্য। সকাল-দুপুর-রাত তিন বেলা ভাত নিয়ে যায় শুক্কুর মিয়ার জন্য পাড়ার একজন লোক। মাঠে সবার জন্য ভাত নিয়ে যেতে হয়। মেয়েরা ওখানে সাধারণত যায় না। মাঝে মাঝে শুক্কুর মিয়া এখানে এসে খেয়ে যায়।
“বুড়ি ভাত রেঁধে চলে গেছে। মোবাশ্বের ও ইউসুফ আলী ভাত বেড়ে খেয়ে নিল। বেগুন পোড়া ভর্তা ও ছুরি শুঁটকি দিয়ে ঝাল মসুর ডাল। খেয়েদেয়ে মাটির খোড়া দুটি রেখে দিল। হোগলার পাটি পেতে বিছানা করল। ইউসুফ আলীর দুটি বালিশ থেকে একটি মোবাশ্বেরকে দিল। বাড়ির মালিক তমিজউদ্দিন এলো গল্প করতে। বাইরে তখন হালকা শিশির জমতে শুরু করেছে। হেমন্তের শিশিরের অশ্রবিন্দুতে ধূসর সবুজ ঘাসের ডগা শীতের অনুভূতি ভালো করেই পেয়েছে, আসছে শীতের ঠাণ্ডা হিমেল পরশ। শেষকালে একদিন যখন সত্যি সত্যি শীত আসবে তখন ঘাসগুলো ধূসর হয়ে উঠবে শীতের সন্তাপে, সবুজের চিহ্ন ফুরিয়ে যাবে আর হাপিত্যেশ করবে বৃষ্টির কামনাঘন অপেক্ষায়। কিন্তু বৃষ্টি হলো নুনের পয়লা নম্বরের দুশমন।
“সব বুঝিয়ে দিয়ে দুই দিন পর ইউসুফ আলী কুতুবদিয়ার লেমসিখালীতে চলে গেল। মোবাশ্বের প্রায় সারা দিন নুনের মাঠে পড়ে থাকে। নুন তোলার এক কানি (চট্টগ্রামে জমির পরিমাপ, কুড়ি গণ্ডায় এক কানি) জমিকে ছোট ছোট ছয়টি কোঁডায় (টুকরোয়) ভাগ করা হয়। প্রথম খণ্ডের নাম কেঁচা কোঁডা। একবার চাষ দেওয়া জমি উঁচু-নিচু, এখানে প্রথমে নালা দিয়ে সাগরের নোনা পানি ঢোকানো হয়। এখানে সারা দিন সাগরের পানি জমা থাকবে। রোদে শুকোবে। দ্বিতীয় দিন সেই পানি যাবে তার পাশের সামান্য নিচু দোয়াইন্না কোঁডায়। এখানে পানি এক দিন শুকোবে। বাষ্প হয়ে কিছু পানি এখান থেকেও উবে যাবে। তারপর সেই পানি যাবে তেয়াইন্যা কোঁডায়। এখানেও পানি এক দিন শুকোবে মহামান্য সূর্যের তাপে। রোদ যত কড়া হবে নুন তত তাড়াতাড়ি জমবে। চতুর্থ দিন ওই পানি নিয়ে যাবে পাশের কড়া কোঁডায়। এই জমি কেঁচা কোঁডার মতো অসমান নয়, বরং সমান। হাত দিলে বোঝা যাবে এর পানি ভারী হয়ে উঠেছে, মুখে দিলে বেশ কড়া। পঞ্চম দিন ওই পানি পাশের একটু নিচু তাতাইন্যা কোঁডায় যাবে। এখানে পানি পুরো এক দিন রোদে শুকোবে। তারপর সূর্য পাডি কোঁডায় থাকবে তিন দিন। দ্বিতীয় দিন থেকে এই জমির তলায় সাদা নুন জমতে থাকবে। দুধ-সাদা দানাদার নুন মাটির ওপর জ্বলজ্বল করবে। সূর্য পাডি কোঁডার মাটির ওপর কাঠের রোলার দিয়ে চেপে সমান করা হয় যেন লেপাপোঁছা ঘরের মেঝে। তার ওপর জমবে পানি থেকে নুন। সূর্যই এর নিরাময় শক্তি। আকাশের মেঘ এর বড় শত্রু। নিচে নুন ওপরে পানি। মোবাশ্বের এই পানি মুখে দিয়ে দেখে বেশ তেতো স্বাদ। নুনও তেতো তেতো। আসলে নুন জমার পর পানি হয়ে যায় তেতো। নুন থেকে যখন পানি সরে যাবে, সেই নুনই হয়ে উঠবে খাওয়ার উপযোগী। বাঁশের পাট্টি দিয়ে নুন খাঁচায় ভরা হয়। মোটা বাঁশকে হাতখানেকের কম করে কেটে মাঝখান দিয়ে দুই ফালা করলে বাঁশের পাট্টি হয়। সূর্য পাডি থেকে নুন কোচানোর জন্য ছোট ছোট তক্তা ব্যবহার করা হয়। কড়া রোদের মধ্যে সূর্য পাডি কোঁডায় পানি বুদ্বুদ তুলে ফুটতে থাকে। রোদের তেজে বাষ্প হয়ে কিছু পানি উড়ে যায়। নুন তুলে নিয়ে এই পানি বের করে দেওয়া হয়। ওদিকে তখন তাতাইন্যা কোঁডায় পানি প্রস্তুত, সেখান থেকে আবার পানি আসবে সূর্য পাডিতে। এভাবে মাসে ১০ বার পর্যন্ত নুন তোলা যায়। এই নুন আবার পরিষ্কার করে আয়োডিন মিশিয়ে বাজারজাত করা হয়।
“তিন দিন পর মোবাশ্বের প্রথম দফা নুন তুলল।
“শুক্কুর মিয়া বলল, মোবাশ্বের ভাই, তুঁই বঅর্, ভাইগ্যইত্যা… তুমি বড় ভগ্যবান। খুব ভালো নুন হয়েছে এই দফায়, তিন বস্তার বেশি নুন হবে।”…
আমি এই নুন তোলা দেখতে দুই বার গিয়েছিলাম বাঁশখালীর সরল গ্রামের পাশের এই নুন তোলার জমিতে। কাছেই বঙ্গোপসাগর। গ্রামও গাছপালার জন্য দেখা যাচ্ছে না। এই গ্রামের কাছের আরেকটি গ্রাম নিয়ে লেখা আমার গল্প ‘মমতাময়ী’। সুদর্শন বড়ুয়া নামে আমাদের প্রিয় বইয়ের দোকান-মালিককে সন্ত্রাসীরা ঘরের মধ্যে আটকে রেখে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল। গল্পটি ‘গল্প সংগ্রহ ২০০১ থেকে ২০০৮’ গ্রন্থে ২০০৯ সালে লেখালেখি প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত। ৩২০ পৃষ্ঠার গল্পের বই। এখানে ‘মৃগয়া ও গোলাপি গন্ধের স্বপ্ন’, ‘সমুদ্রে মৃত্যুর উপাখ্যান’, ‘চোর ও ত্রাণকর্মী’, ‘ও আষাঢ়ী পূর্ণিমার চন্দ্রাবলী’ গল্পগুলো সামুদ্রিক। বঙ্গোপসাগর আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। ও কেবলই আমাকে ডাকে, ঝাঁপিয়ে পড়তে বলে। আমি পারি না। কক্সবাজার থেকে বার-সমুদ্রে যাওয়ার জন্য একবার সব ঠিকঠাক করে ফেলেছিলাম। পারিনি। জ্বর নিয়ে পর্যটনের মোটেলে দুই দিন পড়ে থেকে ঢাকায় ফিরে আসি। সেই যাত্রায় রাঙামাটি স্কুলের আমার দশম শ্রেণীর সহপাঠী ও তার বন্ধু দেবী প্রসাদ দুই দিনে সেন্ট মার্টিন ঘুরে ঢাকায় ফিরে আসে। ওরা কলকাতা থেক এসেছিল বেড়াতে। সহপাঠীর নাম অজিত গাঙ্গুলী। ‘চোর ও ত্রাণকর্মী’ গল্পটি লিখেছিলাম ১৯৯১ সালের সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস নিয়ে। আদ্যোপান্ত সত্য ঘটনা। ত্রাণকর্মীদের সঙ্গে কুতুবদিয়ায় গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন ডাক্তার আফরোজা, দলের একমাত্র মহিলা। ত্রাণসামগ্রীর সঙ্গে, আমাদের দল আট-দশজনের মধ্যে। একজন ভিডিও নিয়েছিলেন, পরে তার একটি কপি আমি সংগ্রহ করেছিলাম। সেটি যে এখন কোথায় আছে, মনেই করতে পারছি না। চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে ১১.২০টায় এমভি মহেশখালী জাহাজ ছাড়ল। কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে যাওয়ার পথে এক চোর ঢুকে পড়ে ড. আফরোজার কেবিনে। ঢুকেই সে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি এবং আরো একজন ওই কেবিনের বাসিন্দা। আমরা সমুদ্রের শোভা দেখতে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। সেই ফাঁকে চোর ওই কেবিনে ঢুকে বোঁচকা-ব্যাগ হাতাচ্ছিল। আফরোজাকে শাসিয়ে সে দামি জিনিসপত্র লুঙ্গির নিচে জাঙ্গিয়ায় ঢুকিয়ে নিচ্ছিল। কেবিনের গোল জানালা বা আলো ঢোকার কাচ দিয়ে আমাদের তৃতীয়জন ওকে দেখে ফেলে। ব্যস, চোর ধরা পড়ল। কিন্তু তার বিচারের ভার পড়ল জনতার হাতে। তাদের মধ্যে একজন ছিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ভাই। সেই সুবাদে অর্থাৎ ভাইয়ের অধিকারে চোরের বিচার হলো, ত্রাণকর্মীদের ওপর যে চোর হাত চালায়, তার বেঁচে থাকার ন্যায্য অধিকার নেই, তাই বঙ্গোপসাগরে হাত-পা বেঁধে ফেলে দিয়ে মৃত্যুই তার বৈধ প্রাপ্য। তাকে সেভাবে ফেলে দেওয়া হলো। আমরা তার কিছুই জানি না। তারপর জাহাজের সারেং যখন জানতে পারলেন, আবার তাকে উদ্ধার করা হলো। উদ্ধার করার পর তাকে চিকিৎসা করল ডা. আফরোজা। এসব করতে বেশ দেরি হওয়াতে কুতুবদিয়ায় পৌঁছেছি সন্ধ্যের সময়। ১০ পৃষ্ঠার নানা ঘটনার সংঘাতের গল্প ১০ লাইনে শেষ করলে গল্পের শ্লীলতা বলতে কিছু কি থাকে? তবু তা করতে হলো। আপনারাও বেঁচে গেলেন। তারপর আমরা রাতে জাহাজে থাকব, সেটিই নির্ধারিত ছিল। চোরও বায়না ধরল, সে রাতে জাহাজেই থাকবে। সকালে কূলে নামবে। জাহাজের কর্মচারীরা তাকে রাখবে না। শেষে চোরের দাবি মানতে হলো চোরের একরোখা শর্তে। দুই প্যাকেট বিড়ি, ১০টি টাকা ও জাহাজ থেকে নামার সাম্পান ভাড়া নিয়ে সে নামল। হাইজাককারীর মতো ন্যায্য শর্তে। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। রাত ১০টায় নিয়ম অনুযায়ী জাহাজের বাতি নিভে গেল। তারপর রাতের স্বাভাবিক ঢেউয়ে জাহাজের দোলা। সারা রাত! কী উৎপাত দুধভাতে!
আমরা যে সকালে কুতুবদিয়ায় নামলাম সেদিন ছিল ঝড়-প্লাবনের দশম দিন। সাম্পান থেকে নামলাম। ঘাটে আমরা নামিনি। সাম্পানে করে দুর্গত এলাকার এক বিরান গ্রামে পৌঁছলাম। সম্পূর্ণ দ্বীপই দুর্গত, তবু বাজার ও ছোট শহর ছেড়ে আমরা নামলাম লেমসিখালীর দিকে। সাম্পান থেকে নামতেই নাকে লাগল পচা দুর্গন্ধ। তারপর শুরু হলো মানুষ ও গরুর ফুলে-ফেঁপে ডোল হওয়া লাশ। প্রথমে চ্যানেলের কূলে জোয়ার সীমায় আটকে থাকা লাকড়ি খড় ইত্যাদির দঙ্গলে দেখা লাশ গুনলাম। নাকে-মুখে রুমাল বেঁধে নিলাম। তাতে কী! কাপড়ের সুতোর বুননের ফাঁক দিয়ে তো হাওয়া ঢুকছে। হাওয়াই তো লাশের দুর্গন্ধযুক্ত। বাঁচার জন্য সেই হাওয়া তো চাই। সঙ্গে সঙ্গে সামনে আরেকটি ফুলে নিটোল ও বিশালকায় এক নারী। তার পরনে সায়া ও ব্লাউজ। পরে জেনেছি সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বা গর্কি যখন আসে, ঘরবাড়িছাড়া মানুষ যখন ঘরের চাল বা ভেসে যাওয়া কাঠ, তক্তা বা ঘরের চালে আশ্রয় নেয়, তখন মহিলারা শাড়ি ফেলে দেয়। শাড়ির কারণে সাঁতার কাটা হয়ে পড়ে বিপজ্জনক। এ জন্য শরীরে শুধু সায়া আর ব্লাউজ। শরীর ফুলে উঠে ব্লাউজ হয়ে গেছে আঁটোসাঁটো, ফেটে পড়ার পূর্বক্ষণ। গায়ের ত্বক টান টান হয়ে ফর্সা ফুটফুটে। বাঙালি রমণীর ত্বকের লাবণ্য একটু কলো ঘেঁষা থেকে কালোর দিকেই। কিন্তু এখন যে আপৎকালীন সময়। বিল থেকে নেমে আসা খালের কূলের ঢালে আটকে আছে লাশ। নারী, পুরুষ, গরু। বাচ্চাদের গায়ে গেঞ্জি বা শার্ট ও হাফ প্যান্ট। কোনো শিশুর পরনে লুঙ্গি নেই। কারণ ভেবে নিলাম নিজে নিজে। লুঙ্গি এ সময় সামলানো কঠিন। বড়রা লুঙ্গিতে গিঁট মেরে পেছনে গোছ দিয়ে বাগ মানিয়ে রাখে। গুনতে গুনতে পেয়ে গেলাম ৩৫ জন। ওই ছোট্ট খাল পার হতে হবে। আমাদের দল বিপন্ন পথিকের মতো একে একে সারি বেঁধে চলেছে। সাম্পানের মাঝি ও সঙ্গীরা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসছে। সামনে পড়ল জমি। আলে ঘেরা জমি। এখানে ধান বা পাউন্ডি চাষ হয় মনে হলো আমার। খালের পাড়ের সঙ্গে লাগোয়া নুন তোলার জমি দেখে আমি চিনতে পারলাম। তাতাইন্যা কোঁডা তেমনি সমান মসৃণ পিচ্ছিল। আর তার ওপর শুয়ে আছে মা-বাবা-শিশু, তাদের কোমরে দড়ি বাঁধা, একটি দড়িতে তিনজন। আমি বুঝতে পারলাম। জলের প্রচণ্ড চাপে ও ঢেউয়ে যাতে একে অন্যের থেকে ক্ষণিকের অসতর্কতায় বা বড় মারণ ঢেউয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়, সে জন্য এই সাবধানতা। ঘরের চালে বা ঢেঁকিতে চড়ে বসলে স্রোতের প্রলয় নাচনে কেউ ছিটকে পড়লে দড়িই তো রক্ষা করবে। তাতাইন্যা কোঁডায় তিনজন শুয়ে আছে। মহিলা চিত হয়ে আছে, গায়ে ব্লাউজ ও সায়া। লোকে বলে, পানিতে মৃত্যু হলে নারীরা চিত হয়ে থাকে, পুরুষ উপুড় হয়ে। সব লাশ ফুলে ডোল, তর্জনী দিয়ে টোকা দিলেই ফেটে পড়বে তেমনি টানটান, টোলহীন। কী আশ্চর্য, ওর মুখও কালো। সারা গা বেশ ফর্সা বা উজ্জ্বল, কিন্তু মুখ কেন কালো! অথচ মুখও শরীরের সঙ্গে তাল রেখে ফুলে আছে। তার অর্থ কি শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর ফলে? নাকের রুমাল খুলে ফেললাম, কারণ বায়ুমণ্ডলই তো ওই মানুষের পচা গন্ধে ভরে গেছে। আমিও তো সেই মানুষ। মৃত মানুষ দেখতেই তো এসেছি। ওদের গন্ধে ভরা থাক আমার ফুসফুস। ওদের পাশ কেটে আল বেয়ে হেঁটে চলেছি। আলের ওপর এক কাতলা কাত হয়ে পড়ে আছে। তার গায়ে মাছি। ফুলে-ফেঁপে এক-দেড় কিলোর মাছটি দুই কিলোর সমান হয়ে আছে। ওকে টপকে চললাম। আবার মাথা নত করলাম মা-বাবা-সন্তানের লাশের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ মনে হলো, ওরা আর দড়িতে বাঁধা নয়, নুন তুলছে!
মায়া ভ্রম। মৃতদেহ গুনতে গুনতে ৪৩টি গোনার পর গোনা ছেড়ে দিই। কী হবে গুনে!
একটি মৃতদেহ, মানুষ কি গরু, সবার শরীর অক্ষত। কোনো শকুন, চিল, কাক বা শেয়াল, কুকুরের কামড় বসেনি। কুকুরের মরদেহ একটিও দেখিনি। কেন?
চলতে চলতে চোখে পড়ল কালো একটি কুকুর ঢ্যাং ঢ্যাং করে ওর স্বভাবজাত স্বভাবমতো আধাদৌড়, আধাহাঁটায় চলছে। মাঝে মাঝে এখানে ওখানে শুঁকছে, একটি পাতাহীন চারাগাছ দেখে পেচ্ছাব করে আবার চলছে। ওকে অমনি ডেকে বললাম, ‘এই, তুই বেঁচে গেলি কী করে!’ সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে আবার চলতে লাগল। ও কি মেসিস্তিফিলিসের অনুচর! মহাকবি গ্যেটের ‘ফাউস্ত’ কাব্যের শয়তানের অনুচর! না, ওর ছায়া আছে। ভালো কুকুর।
ছোট এক মেয়েকে পেয়েছিলাম একটি গ্রামে ঢুকে। সেখানে বেড়ার একটি বড় মজবুত ঘর উবু হয়ে পড়ে আছে। সেই ঘরে মজবুত ছাদ ছিল। সেখানে মানুষ থাকতে পারে। দেড় তলার ঘরের মতো। সেখানে আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের কিছু লোক আশ্রয় নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঘরটি ঝড় ও জলের ধাক্কা সইতে পারেনি। পড়ে যায়। কোথায় কে তখন ছিটকে পড়েছে, মরেছে বা বেঁচেছে, তার হিসাব আমি পাইনি। পেলেও কী করতে পারতাম!
ওই ছোট মেয়েকে পেয়ে প্রশ্ন করি, ‘তুই কিভাবে বাঁচলি রে!’ বলল, ‘মগরেবের অক্তে আমার ছোট ভাইকে নিয়ে গাছে উঠে পড়ি। উঠে গামছা দিয়ে নিজেদের বেঁধে ফেলি গাছের ডালের সঙ্গে। ফজরের আজানের পর আমরা গাছ থেকে নেমে পড়ি। তখন তুফান ও পানি যার যার জায়গায় চলে গেছে। বৃষ্টি শিরীষ গাছ রহমত করেছে।’
এখানে আসার সময় স্টিমারে একটি ১২-১৩ বছরের মেয়েকে দেখি। সে ঝড়ের সময় মা-বাবা থেকে ছিটকে গিয়েছিল। পানিতে ভাসতে ভাসতে একটি গরুর লেজ ধরতে পায়। লেজ থেকে পিঠ-কান ধরে ভাসতে থাকে প্রবল ঢেউয়ে। ভাসতে ভাসতে ভোরে দেখে সে কূলের ওপর মরা গরুকে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে। ঝড় নেই, ঢেউ নেই। চারদিক শান্ত। সে বাঁশখালীর কূলে চলে গেছে। সেখান থেকে লোকের সঙ্গে ১০ দিন পর কুতুবদিয়ায় ফিরছে। সে জানে না তার মা-বাবা, ভাই-বোন কে বেঁচে আছে, কে নেই। জাহাজ থেকে নেমে সে কোথায় তার নিজ গ্রামে গেছে জানি না। বেঁচে থাকুক শান্তিকল্যাণ নিয়ে। যারা বেঁচে গেছে তারা বেঁচে থাকুক। গাছপালা, পশুপাখি, জ্যোৎস্নাপরী ও ঢেউরাজকুমার, ভোরের দোয়েল বেঁচে থাকুক।

আবার বাঘিনী ও সিডর
বাঁশখালীর সরল গ্রামে একবার এক রাত ছিলাম। বড়ুয়া গ্রামে। সুপলাল বড়ুয়ার বাড়িতে। সঙ্গে রহীম শা। সেখান থেকে কুতুবদিয়ায় যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল। দুই কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেল পেরিয়ে আর যাওয়া হয়নি। তারপর এক যুগ কেটে গেল। ওখানে আছে নুনের সুদীর্ঘ মাঠ। গভীর সাগর থেকে ধরে আনা মাছের শুঁটকি তৈরির মাঠ। বাঁশের খুঁটি পুঁতে আড়াআড়ি বাঁশ বেঁধে শুকোনো হয় কাঁচা মাছ। বড় মাছ ফালা ফালা করে কেটে বাঁশে ঝুলিয়ে শুকোয়। ছুরি মাছ আস্ত এবং বড় হলে পেট থেকে নিচের দিকে চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে শুকোতে দেয়। আস্ত লাক্ষা, কোরাল ও ভেটকি লম্বা ফালি ফালি করে লেজ থেকে মাথা পর্যন্ত। তারপর লেজের দিকে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে শুকোয়। শুকনো এই শুঁটকি খুব দামি। ওই আস্ত শুঁটকি বিক্রি হয় ওজনে মেপে। লাক্ষা শুঁটকি বছর পনেরো আগে হাজার টাকা সের হিসেবে একবার কিনেছিলাম। ওই সময়ের দিকে চট্টগ্রাম শহরে কাঁচা লাক্ষা সাড়ে পাঁচ শ টাকা সের ছিল, চট্টগ্রাম শহরের টেরি বাজারে। রেয়াজুদ্দিন বাজার, বক্সিবাজার, চকবাজার, পাহাড়তলী বাজার সব সবখানে সমুদ্রের মাছের বিশাল মনোলোভা সমাবেশ। বিষাক্ত পটকা মাছও পাওয়া যায়। কেউ কেউ খেতে জানে। যারা জানে না তবু খেতে গিয়ে মরে। পত্রিকায় খবর আসে, অনেক খবর আসেই না। জাপানে এই পপার মাছ অভিজ্ঞ ও লাইসেন্সধারী পাচকরা রেঁধে বড় বড় হোটেলে বেচার অধিকারী। এতে এক ধরনের ঘুম ঘুম মাদকতা আছে, এ জন্যই এর এত কদর। ঢাকার বাজারেও মাঝেমধ্যে পটকা মাছ দেখি আর ভালো করে দেখে নিই। কোনো কোনো পটকায় চিতাবাঘের মতো ফুটকি আছে, খুব দৃষ্টিনন্দনও তারা। ঢাকার হোটেলে সামুদ্রিক বা দেশি বাইন মাছ বেশ দামি। আমি ২০১২ সালের ২৫ নভেম্বর প্রথম চাকমা ঔপন্যাসিক কে ভি দেবাশীষসহ খেয়েছিলাম। বুড়ো আঙুলের আধখানা থেকে একটু মোটা তিন টুকরোর দাম ১২০ টাকা। তোপখানা রোডের একটা রেস্তোরাঁয় খেয়েছিলাম। খেতে ভালো। তবে ঝোল আর একটু কম হলে সুস্বাদু হয়ে যেত বলে আমার অভিজ্ঞতায় বলে। সমুদ্রের মাছ কম ঝোল রেখে রাঁধতে হয়। অথবা ভুনা।
বাঘের দেখা পেয়েছিলাম সুন্দরবনে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে কাপ্তাই রোডে ওয়াগগা এলাকায়। জিপে করে কাপ্তাই যাচ্ছিলাম ১৯৭৩ সালে। আমাদের সামনে দিয়ে রাজসিক শৈর্যে পাকা সড়ক অতিক্রম করে যেতে দেখে অরণ্য-উত্তেজনা অনুভব করেছিলাম। বাঘ বলে কথা। আর না, ওই একবার, এক জীবনে। সুন্দরবনে দুবার গিয়ে বাঘের পায়ের তাজা ছাপ দেখেছিলাম হিরণ পয়েন্টের পর্যটন মোটেলে। ডাক শুনেছিলাম রাতে। সে কী উত্তেজনা! সেই যাত্রায় কুন্দা নদী ধরে বেশ ভেতরে চলে গিয়েছিলাম। এই নিয়ে লিখেছিলাম ‘হিরণ পয়েন্টের বাঘ’ গল্প। লিখেছিলাম পত্রিকায় একটি খবর পড়ে ‘বাঘিনী ও সিডর’ গল্প। ২০০৭ সালের সিডরের পর। ঝড়ের শুরুতে গাছের ডাল পড়ে তিনটি বাচ্চার মধ্য বড়টি মারা গেল। মেঝটা কোথায় হারিয়ে গেল। ছোটটিকে নিয়ে বাঘিনী খুব চিন্তায় পড়ল। শীতও করছে, বাচ্চাটা ভিজে কাঁপছে। মা কেওড়া ঝোপে ঢুকে ওকে দুধ খাওয়াল। সারা গা জিভ দিয়ে চেটেপুটে দিল। গরম করে তুলল। তিনটি বাচ্চার দুধ একা খেয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। কিন্তু কেওড়া ঝোপ নিরাপদ মনে করল না মা। গাছের গায়ে গাছ আছাড় খাচ্ছে। তবু বেরিয়ে পড়ল। সামনে পেল একটা বাড়ি। মংলা বন্দরের কাছাকাছি এক গ্রামে। বড় বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। পাকঘরের চাল ও বেড়া কোথায় উড়ে গেছে। আরেকটি প্রবল ধাক্কা এলো ঝড়ের। বড় ঘর মড়মড় করে উঠল। ভেতরের মানুষ আল্লাহ আল্লাহ করে উঠল। বাঘিনী চলে গেল। ঠাঁই না পেয়ে সামনে পেল আরেকটি ঘর। বাচ্চাটাকে মুখে নিয়ে সেই বেড়াহীন ঘরের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল। আধশোয়া হয়ে বাচ্চাটাকে আবার দুধ দিতে লাগল। ঝড়ের তোপে ঘরের চাল বুঝি এই উড়ে যায় যায়। ঝড়ের কোপে পাশের গাছের গায়ে গাছ মাথা ও শরীর রেখে আশ্রয় খুঁজছে। কী গোঙানি!
হঠাৎ ঝড়ের কী তর্জন, কী গর্জন! বড় ঘর থেকে বের হলো একটা লোক টর্চ নিয়ে। সোজা বাঘিনীর চোখে পড়ল টর্চের আলো। লোকটি বুঝতে পারল বাঘিনী ঝড়ে আশ্রয় নিয়েছে। থাক। বড় গাজী খাঁ খুশি হবে। লোকটা টর্চ জ্বেলে চলে গেল। যেতে যেতে বলল, ‘তোদেরও বিপদ, আমাদেরও। ঝড় চলে গেলে চলে যাস বনে। গাজীবাবার দোহাই।’
লোকটা ঘর থেকে বেরিয়েছিল বাঘের বোঁটকা গন্ধ পেয়ে। ঘরে গিয়ে সবাইকে সব কথা বলে দিল। ওদের ছোট মেয়েটির বয়স হবে সাত বছর। সে বাচ্চাসহ বাঘিনীকে ঘরে নিয়ে যেতে জেদ ধরল। পাশের ঘরের আরো দশজন সেই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। মেয়েটির কথা শুনে ওরা হা হা করে উঠল। তারপর কত কথা, কত ওজর আপত্তি, বাগ্বিতণ্ডা। ওদের কেউ বলল, ঝড়ে বাঁচলে ওটা আমাদের খাবে। বাঘ কি মানুষ পেলে রেয়াত করবে? কেউ শুনেছে কোনো দিন!
ছোট মেয়েটি চিৎকার করে বলল, কখনো না, ওদেরও মায়াদয়া আছে। আপদ-বিপদ বোঝে। ওর বাচ্চাটার কথা একবার ভাবছ না কেন? কচি বাচ্চা?
মা বলল, তুই চুপ কর।
বাবা বলল, গাজী খাঁর নাম লও।
একজন বলল, ওদের তাড়াব।
একজন বলল, টিন পিটিয়ে চিৎকার করো।
ছোট মেয়ে বাঘিনীর বাচ্চার জন্য কেঁদে দিল। ওর নাম গীতিআরা। ঝড়ের আরেক ধাক্কা এলো। সবাই মিলে টিন, থালা, বাসন, হাঁড়ি, টিনের বাকসো পেটাতে শুরু করল। ঘরের চারদিকেও ঝড়ের নৃত্য। ওদের টিন বাজনা যেন আবহ সংগীত।
এমন সময় বন্ধ ঘরের দরজায় খচখচ, ধমধম আওয়াজ। কিসের আওয়াজ? কে খামচাচ্ছে? আঁচড়ায়? মানুষ হলে তো ডাক পাড়ত।
গীতি বলল, আব্বু, দরজা খোলো।
বাবা বলল, কে ওটা, কেন খুলব?
গীতির পাশে ছোট্ট ভাইবোন হেনা ও সোহাগ এসে যোগ দিল। ও বাড়ির রহিমা আপা চলে এলো। গীতি আবার বলল, আব্বু দরজা খোলো। বাঘিনী এসেছে বাচ্চা নিয়ে।
বাবা ফজলুর রহমান মেয়েকে বুকে নিয়ে বলল, বাঘিনীকে কী করে এ ঘরে ঢোকাব? ও আমাদের খেয়ে ফেলবে।
হেনা বলল, এতগুলো মানুষকে একটা বাঘিনী খেতে পারবে? তুমি দেখো, ওটা বাচ্চাকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমরা কোলে নেব।
ঘরের দরজায় আবার নখের আঁচড় পড়ল। ঝড়ের গতি আরো তীব্র হলো। সবাই টিন পেটানো বন্ধ করে দিল। বড় খাঁ গাজীকে ডাকতে লাগল। তখন কে যেন হঠাৎ দরজা খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ওরা দেখল বাঘিনীর মুখে তার বাচ্চা। অপেক্ষা করে আছে যেন ঘরে ঢোকার ডাক শোনার জন্য। ঘর বাঘিনীর গন্ধে ভরে গেল। ১০-১৫ জন মানুষ ভয়ে চুপ। আল্লা মাবুদ জপতে লাগল।
তখন গীতি ডাকল, এসো মামু।
হেনা ডাকল, এসো খালা।
সোহাগ বলল, এসো বড় মিয়ার বোন। তোমার বাচ্চাটাকে আমার কোলে দাও।
সত্যিই বাঘিনী আধখোলা দরজার চৌকাঠের ভেতরে এক পা এগিয়ে দিল। দুই পা বাড়িয়ে দিল। তিন পা ঢুকল। মুখে বাচ্চাটি পরম সুখে ঝুলে আছে। আরো এগিয়ে এসে বাঘিনী তার একমাত্র বাচ্চাটি হেনার কোলে তুলে দিল। তারপর বাঘিনী একপাশে মাথা গুঁজে বসে পড়ল। এখানে গল্পের শেষ।
এটি গল্প নয়। সত্য ঘটনা, আমি পত্রিকায় পড়েছি।
আমার ওই বইয়ে বাঘ-বাঘিনীর অন্য গল্পগুলো হলো, ‘বনবি ও বাঘ’, ‘বাঘের সঙ্গে হাসপাতালে’, ‘লালদিয়ার বাঘ’, ‘ব্যাঘ্রশাবক শিকার’, ‘হিরণ পয়েন্টের বাঘ’। এসব গল্প আছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রকাশিত ‘বাঘ, পরী ও জাদুর আমের গল্প’ বইয়ে। আরো আছে অন্যান্য বইয়ে। এতে আরো আছে ‘জ্যোৎস্নাপরী ও ঢেউকুমার’ গল্প ও অন্যান্য। সুন্দরবন না থাকলে আমরা বাঘ পেতাম কোথায়? বাঘ নামক প্রাণীর গল্প এসব লিখতে পারতাম? বঙ্গোপসাগর না থাকলে সুন্দরবন কোথায় পেতাম? বাঘের এত রাজসিক রাজকীয় সুন্দর হিংস্র ক্ষিপ্রগতি কল্পনা করতে পারতাম? সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুনলেই কল্পনায় আমরা সেই বাঘের ছবি দেখতে পাই, তা কোথায় পেতাম? এই কল্পনা কি শুধুই কল্পনা? যারা কোনো দিন বঙ্গোপসাগর দেখেনি, আর আমাদের বাংলাদেশের কয় কোটি মানুষ সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর দেখেছে? চার-পাঁচ-ছয় কোটি? বাকি মানুষ? বঙ্গোপসাগর আমাদের মনোজগৎ ও সাহিত্য এভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ভাবুক, কাল্পনিক, কবি, গায়ক, নৃত্যশিল্পী করে তুলেছে। বঙ্গোপসাগরের নৃত্যের ঢেউ আমাদের নৃত্যশিল্পীদের সমৃদ্ধ করেনি বলতে চান? প্রকৃতি থেকেই তো মানুষ কথা বলা থেকে শিল্পকলা ও সাহিত্য সৃষ্টি করেছে।

পথপ্রদর্শক বঙ্গোপসাগর
ছোটদের জন্য আমার প্রকাশিত প্রথম বই ‘সূর্য লুটের গান’ প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে। দুটি গল্প নিয়ে ছবি-বই। আমাদের বঙ্গোপসাগরের পরেই সোজা দক্ষিণ দিকে শ্রীলঙ্কা দেশটি ভারত মহাসাগরের উত্তরে। সমুদ্র সব মানুষকে ভীষণ আকর্ষণ করে। মানুষও আকর্ষণ বোধ করে তার জিন-এর প্রভাবে। অর্থাৎ প্রাণের প্রথম আবির্ভাব সমুদ্রে, সেই জন্যই। ওই বইয়ে দুটি মাত্র গল্প। ছবি-বই বলে প্রচুর ছবি নিয়ে ৩২ পৃষ্ঠায় ডাবল ক্রাউন সাইজে ছাপা। তার দ্বিতীয় গল্পটি ‘সমুদ্রসঙ্গীত’। বিশাল একটি জাহাজ, তার ক্যাপ্টেন, প্রকৌশলী, খালাসি, বয়, বাবুর্চি সবাই খুব গান ভালোবাসে। এ জন্য তারা একটি সংগীত দল গঠন করে। সূর্য ডোবার আগে শেষ রোদের ঝিলিমিলিতে ওরা প্রতি দিনান্তে গান গায়, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে। তাই দেখে জাহাজের চারদিকে মাছেরা ঘুর ঘুর করে গান শোনে। একদিন জাহাজের তলায় বড় একটা ছিদ্র হয়ে জল ঢুকতে শুরু করে। সেই বিপদ থেকে জাহাজটি রক্ষা করে জাহাজের লোকদের গান শোনা তিমি মাছেরা। তারা জাহাজটি ডোবা থেকে রক্ষা করে কাঁধে-পিঠে তুলে নিয়ে। তারপর সে কী কাণ্ড! জাহাজ মেরামত করার পর মাছেরা জাহাজের ক্যাপ্টেন থেকে তাদের বাদ্যযন্ত্র চেয়ে বসে। ক্যাপ্টেনও উপকারী বন্ধুদের তা দিয়ে দিল। সেই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে তারা ফুটিয়ে তুলল সুরের মূর্ছনা। গল্পের শেষটুকু শুনুন-
“সেই থেকে ভারত মহাসাগরের ওই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ গেলেই যাত্রীরা শুনতে পায় খোল করতাল সেতার এস্রাজের ঐকতান। সুরের মূর্ছনায় সবাই বিভোর হয়ে যায়। আর সেই সুর শোনা যায় আকাশ যখন সন্ধ্যারাগে লালে লাল হয়ে যায়, আকাশ ও সমুদ্রে রংবদলের উৎসব শুরু হয়, যখন সারা দিনের কাজের শেষে জাহাজের লোকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে… হ্যাঁ, ঠিক তখনই, ঠিক তখনই।”
সমুদ্র নিয়ে এই স্বপ্নবাস্তবতা ছাড়াও আছে নিরেট বাস্তবতার কাহিনী। তেমন একটি সত্য কাহিনীর বাস্তবতা কল্পনাকেও হার মানায়। ১৯৭১ সালের আশপাশের ঘটনা, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মাঝামাঝি জায়গায়। একটি রুশ জাহাজ থেকে কোসিয়া নামের এক নাবিক জাহাজ থেকে পড়ে যায় সহকর্মীদের অজান্তে। তারপর সে দুই ঘণ্টা হাঙরের রাজ্যে বন্দি হয়ে সাঁতার কেটে গা ভাসিয়ে রাখল। তখন মাত্র জানা গেল কোসিয়া সমুদ্রে পড়ে গেছে। খোঁজ খোঁজ রব পড়ল। জাহাজের পাগলা ঘণ্টি বেজে উঠল। খবর পেয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ১৩টি জাহাজ ছুটল কোসিয়াকে খুঁজতে। ভারত থেকে জাহাজ গেল। শ্রীলঙ্কা থেকে হেলিকপ্টার ছুটল। বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ থেকে জাহাজ গেল, লিখেছি আমি। কোসিয়ার জন্য আমার ভালোবাসা জানাতে। তারপর আরো দুই ঘণ্টা পর কোসিয়ার দেখা পেল রুশ জাহাজটি। হাঙরের ঝাঁকের সঙ্গে সাঁতার-লড়াই করে সে কী করে বাঁচল তার বর্ণনা আছে। সেই ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে আমি জানতে পারি সব হাঙর হিংস্র নয়। আবার সব হাঙর নরখাদক নয়, নরখাদকেরা সাধারণত গভীর সমুদ্রের প্রাণী। সব হাঙর বেপরোয়া সাহসীও নয়। তবে কিছু হাঙর আশপাশে কোথাও রক্তপাত হলে টের পেয়ে সেদিকে ছুটতে শুরু করে। কোসিয়া শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়। উদ্ধারকারী বোটে তোলা হলে কোসিয়া কী বলেছিল জানেন? বোটে উঠে কোনোমতে সে বলল, ‘ক্যাপ্টেনকে বলুন, আমি ভালো আছি।’ এই বলে কোসিয়া মূর্ছা যায়। আর সেই মূর্ছা ভাঙল ঠিক সাত ঘণ্টা পর।
বঙ্গোপসাগরে ১৯৭৪ সালে সদ্য পরিচিত রুবী বড়ুয়ার সঙ্গে গিয়েছিলাম উত্তাল মার্চে। পতেঙ্গার সৈকতে। আমাদের দেখে তো বঙ্গোপসাগর উত্তাল বসন্ত-বাতাস ছেড়ে দিল। রুবির চূর্ণ চুলের উন্মাদনা দেখে আমারও ওড়ার ইচ্ছে জেগে গেল। সাগর থেকে উঠছে ভালোবাসার মতো আক্রমণাত্মক দখিনা হাওয়া। ওর বুকের স্ফীতি বেড়ে গেছে বসন্ত-বেদনায়। দূরের নৌকো ও জাহাজগুলোর নজর লেগেছে। ভরদুপুর বলে ভ্রমণবিলাসীও গোনাগুনতি। রোদও চিনিচাঁপা কলার মতো সোনার বরণ। আমার ক্যানন কিউএল সন্ত্রস্ত সুন্দর হয়ে উঠেছে। ক্লিক ক্লিক। ও হাসল, ক্লিক। বঙ্গোপসাগর কতভাবেই না মানুষের হৃদয়-মন ভরে দেয় আবার দেমাগেও। কী বন্ধুবৎসল বঙ্গোপসাগর! কী তার দুষ্টু অপাপবিদ্ধ অভ্যর্থনা! হাসি আনন্দ উদ্বেল উদারতা। আমি এ জন্য আজও ভালোবাসি বঙ্গোপসাগরকে।
আর একবার মাত্র গিয়েছিলাম আমাদের বিয়ের পর মেয়ে ও ছেলে জয়ী ও তূর্যকে নিয়ে। সেবারও আমাদের পেয়েছিল বসন্ত-বাতাসে। ওরা খেলায় মেতেছিল উদ্দাম জয়ী ও তূর্যের সঙ্গে। উড়িয়ে নিয়ে গেল তূর্যের লাল ফতুয়ার বোতাম বাঁধন। রুবী হেসে কুটি কুটি, নিরাপত্তার চিন্তায় সন্ত্রস্ত সুন্দর। সাগরও শিশুদের খুব ভালোবাসে বোধ করি। এমনকি আমাকেও প্রাণশক্তিতে ভরপুর করে দিল। রুবীকেও। সে ছুটছে রাতুল যুগল পা নিয়ে। ভেজা বালিয়াড়িতে নগ্ন পায়ে ছোটার ঐশ্বর্যই আলাদা। ব্যাপক আনন্দময় ও স্পর্শ সুখকর। কামনাসুন্দরও।
২০০৭ সালে কলকাতায় প্রকাশনা সংস্থা ‘দোয়েল’ প্রকাশ করল ছোট দুটি মেয়ের সত্য কাহিনী নিয়ে লেখা আমার বই ‘সুনামির গল্প’। ওই সমুদ্র তখন ভয়ংকর, সেই সঙ্গে কি সুন্দর নয়! ছোট্ট ছয় বছুরে মেয়ে ইয়ে চিয়া নি, সংক্ষেপে আদুরে নাম চিয়া। বাড়ি তাইপে, বড়দিনের ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে বেড়াতে এসেছে থাইল্যান্ডের ফুকেট দ্বীপে। ভ্রমণবিলাসীদের স্বর্গোদ্যান বলা যায়। সুনামিতে ভেসে যেতে যেতে চিয়া ধরতে পেরেছিল একটি ডাল। তাতেই সে ঝুলে থাকল। মোট কুড়ি ঘণ্টা ঝুলে থাকল চিয়া। তারপর উদ্ধার পেল। সাগর কি শিশুদের ভালোবাসে? অনিচ্ছায় ভাসিয়ে নেয়?
এ বইয়ের আরেকটি সমুদ্র-সুনামি গল্প ‘সমুদ্রকে ভয় পাই না’। ওর নাম ওয়াইরা। বাড়ি ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায়। সাগর ধারে বাড়ির উঠোনো ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলছিল। সুনামির ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ওয়াইরাকে। ভাসতে ভাসতে পেল একটি তোশক। সমুদ্রতীরে পেতে বেড়াতে আসা মানুষ ওতে শুয়ে থাকে। ভেতরে থাকে হাওয়া ভর্তি। ব্যস, ভাসতে ভাসতে ওটা ঠিক ধরতে পারল খপ করে। তারপর দুই দিন ভাসল আন্দামান সাগরে। উদ্ধার পেল। একজন সাংবাদিক ওকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি ভয় পেয়েছিলে?’
ওয়াইরা চট করে বলে দিল, ‘সমুদ্রকে ভয় পাই না। তবে- । শীত পেয়েছিল খুব।’ তারপর ওয়াইরাকে প্রশ্ন করল, ‘সবচেয়ে কী ভালো লেগেছিল?’
‘ডিমের কুসুমের মতো লাল সূর্য যখন সমুদ্র থেকে উঠল।’
‘কী খেয়ে থাকলে?’
‘কিছু না। দুদিন কিছুই খাইনি।’
ওই একই বছর ২০০৭ সালে ‘অঙ্কুর প্রকাশনী’ থেকে বেরিয়েছিল ‘সুনামি, বাঘ ও মুক্তিযোদ্ধার গল্প’ বই। ওখানে ভয়ংকর সুনামির গল্প আছে চারটি। সবই সত্য ঘটনা। আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে সংগ্রহ। সে সময় আমি কলকাতায় রুবীর ও ছেলেমেয়ের কাছে গিয়েছিলাম। গল্পগুলোর নাম ‘সুনামি ও কুকুরছানা’, ‘এক যে আছে রাজা’, ‘সুনামি, খোকা জলহস্তী ও দাদু কচ্ছপ’ এবং ‘রাজকুমারী ট্যাঙ্গো’।
‘এক যে আছে রাজা’ কাহিনীটি গ্রেট নিকোবর দ্বীপের। বঙ্গোপসাগরের পূর্বপ্রান্তে লতাপাতা ঘেরা দড়ির মতো উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত দ্বীপপুঞ্জ। রাজা, রানি, রাজকন্যা এবং ৪৪ জন প্রজা নিয়ে রাজা জিরাকের রাজত্ব। কিন্তু রাজপুত্র নেই, তাই রাজকন্যা হবেন বনের রাজার সিংহাসনের অধিকারী। এই কাহিনী আমার কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। সুনামি বা জলকম্পে আহত রাজা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বনের রাজার কি ফ্রিজ, টিভি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হাসপাতাল কক্ষ ভালো লাগতে পারে! এই সত্য কাহিনীও আনকোরা, তীক্ণ্ণ, মেদহীন কিন্তু হৃদয়স্পর্শী। বলদর্পী সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধজয়ের কাহিনী। শান্ত সমুদ্র দেখে তার জলকম্পের সংহার মূর্তিকে আঁচ করাই যায় না। এই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটিশ শাসনের সময় স্বদেশি বাঙালিদের দ্বীপান্তর হতো।
‘আকাশে প্রেমের বাদল’ বই প্রকাশিত হয় ‘সাহিত্য সমবায়’ থেকে ১৩৯৫ বঙ্গাব্দে। আটটি গল্পের সংকলন। বঙ্গোপসাগর-সুন্দরকে নিয়ে আমার প্রথম গল্প ‘সমুদ্র সওয়ার’ প্রকাশিত হয় ‘বাংলা একাডেমী একুশে সংকলন ১৯৭৬’ গ্রন্থে। বড়দের গল্প। অন্য গল্পটি ‘সমুদ্র-সম্ভোগ’। এটিও প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বাংলা একাডেমী একুশে সংকলন ১৯৭৭’ গ্রন্থে। বঙ্গোপসাগরকে আমার তখন দ্বিতীয় দেখা। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজে বাংলায় অনার্স পড়ছি। সেই ১৯৬৪ সালের দিকে প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থায়। কক্সবাজারের সমুদ্র দেখা। কূলের ঝাউগাছ ও মহাথিণ্ডগ্রী বৌদ্ধ বিহার দেখার কথা মনে আছে স্বপ্ন-ছবির মতো। ‘সমুদ্র সওয়ার’ গল্পে ওরা আছে। খুব সম্ভব, মানুষের জীবনে সমুদ্র নিয়ে কল্পনা ও বাস্তবতার অনবদ্য সময় আসে যৌবনেই। সমুদ্রকে দেখার সেই চোখ এখন হারিয়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরও বোধকরি এখন প্রৌঢ় হয়ে গেছে। তরুণদের কাছে সেই তরুণীই আছে। যুবতীদের কাছে যুবক। বুড়োদের কাছে? জন্ম অন্ধ ও বোবা-কালার কাছে সমুদ্র কেমন? সে হাতে-পায়ে স্পর্শ করতে পারলেও তার বিশালতা ও গর্জনকে কী করে অনুভব করবে? গরু-বাছুরের সমুদ্র দর্শন কী রকম হবে? আমি কক্সবাজারে গরুদের সমুদ্রদর্শন দেখেছি। ছবি তুলে রেখেছি। ওখানে সৈকত এলাকায় কিছু গরু-বাছুর দিন-রাত খোলা থাকে। ছাড়া-গরুর মতো। কিন্তু ওদের মালিক আছে। এক সকালে চোখের ঘুম পুছতে পুছতে সার্কিট হাউস থেকে প্রধান সৈকতে চলে গিয়ে আমার খাবি খাওয়ার অবস্থা। পাঁচ-সাতটা গোধন তখন বেলাভূমির জলের কিনারায় বালিয়াড়িতে শুয়ে-বসে জাবর কাটছে। দেখে অমনি ছুটলাম ক্যামেরা আনতে সার্কিট হাউসে। আমি সে শৌখিন ক্যামেরাধনের মালিক। পেশাদার হলে সঙ্গেই থাকত। সেই ছবিগুলো এখন দেখে বেশ লাগে। ওই নিয়ে তখন ভোরের কাগজে লিখেছিলাম ‘পশু-পাখির সমুদ্রদর্শন’। ৫ জুলাই ১৯৯৯ সালে ছাপা হয়েছিল। তখনো কক্সবাজার ও বাংলাদেশের আবহাওয়া ছিল প্রায় মনোরম। মূল্যবান, সুখদ, রুচিশীল। মোটামুটি সত্তরের দশক থেকেই তো আমি প্রকৃতির দিকে সচেতন দৃষ্টি দিতে শুরু করেছি। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় এসে কখন কোথায় কোন গাছে কদম ফোটে নজর কাড়ছে আমার মন। এমনকি মাঘ-ফাগুনে কোন গাছে কয়টি কদম ফুটেছে তাও আমার চোখদর্পণে ধরা পড়ছে। পড়ালেখার টেবিলে বসে শুনতে পাই জানালার ওপাশের গাছে কোন পাখি ডাকছে। মন দিয়ে শনাক্ত করতে না পারলে উঠে জানালায় চলে যাই। দেখে চিনতে না পারলে ‘পাখিদের প্রাতঃস্মরণীয়’ সালিম আলীর বই ঘেঁটে দেখি। চিনে নেই পাখিটাকে। আমরা এখন প্রাতঃস্মরণীয় শব্দটির অর্থর্ ভুলে গেছি, আমরা বইপত্রে ব্যবহার করি না। শিশুদের পাঠ্যপুস্তকেও আর ব্যবহৃত হয় না। পাখিদের তো আমাদের মতো বই নিয়ে স্কুলে পড়তে যেতে হয় না! তাদের মা-বাবারা ওই নিজের হাতে খেতে শেখা পর্যন্তই যা-কিছু শেখানোর সব শিখিয়ে দিয়েছে। কী শিখিয়েছে? নিজের হাতে চরে-বরে খাওয়া ও শত্রুকে চেনার পাঠ দিয়েই শিক্ষা শেষ। তারপর থেকে ওরা নিশ্চয়ই নিজে থেকে শিখে নিয়েছে। আমরা পাঠ্য বইয়ে পড়ে বাধ্যতামূলক শিখেছি বলে ভুলে গেছি। এ জন্য সালিম আলী মহোদয়কে বলেছি পাখিদের প্রাতঃস্মরণীয়।
ওই বিদ্যে নিয়ে বঙ্গোপসাগর বা পার্বত্য চট্টগ্রামের বনবনান্তর চেনা সম্ভব নয়। আবার সম্ভব। ওই না চেনা ও না-বোঝা নিয়ে বইপত্র ঘেঁটে ছিঁড়ে তবেই তো আমার শেখা। ব্যস, রইল সব মাথায়। এদিকে শিয়রে বাঘ বসে আছে। উদ্যত তার দাঁত ও নখরসহ থাবা। গল্পের বাঘ মামা। চলে এলাম লেখার টেবিলে। বাঘের গল্প লিখতে।
আজ ৩০ নভেম্বর। ২০১২ সাল। সকাল ৮.৩৫টায় দৈনিক দিয়ে গেল হকার।
আজ একুশ পৃষ্ঠায় খবর ‘চরম আবহাওয়ায় এ বছর কাবু ছিল বিশ্ব’। আমার পুবের আলো ঝলমল জানালার পথে কালো জামগাছটিতে বসে টুনটুনি টুনটুন করে সায় দিল। আগে ‘আমার রোদ ঝলমল পুবের জানালা’ নামে আমি দিনপঞ্জি বা বিবরণ লিখেছি। এখন সেখানে পাঁচ তলার নামে তিনটি ছয় ও সাড়ে ছয় তলা বাড়ি উঠে রোদ আসা বারণ হয়ে গেছে। তার ওপর শীতের মাস এসে যাচ্ছে, সূর্যের উত্তরায়ণ চলছে। তিনি এখন সোজা পুব দিকে নেই। তার ওপর আবহাওয়ার খবরদারি। রাতে একটা কম্বলে চলছে না। আজ ৩০ নভেম্বর, বঙ্গাব্দের ১৬ই অগ্রহায়ণ। এখন বঙ্গোপসাগর শান্ত, নিম্নচাপজনিত সমস্যা নেই।
আজ দৈনিক কালের কণ্ঠে চলতি বছরের (৩০.১১.১৩) আবহাওয়ার খবর দিয়েছে দোহায় চলমান জলবায়ুসংক্রান্ত জাতিসংঘের বার্ষিক সম্মেলন। পৃথিবীর আবহাওয়া ও বৈশ্বিক উষ্ণতার কথা যাঁরা ভাবেন তাঁদের কাছে এই খবর উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার। রিপোর্টে বলছে, চরম আবহাওয়ায় এ বছর কাবু ছিল বিশ্ব। দাবদাহ, খরা, বন্যা, প্রচণ্ড ঝড় ও উত্তর মেরুতে রেকর্ড পরিমাণ বরফ গলা হয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়ার মুখোমুখি ধরিত্রী। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডাব্লিউএমও) ২৮ নভেম্বর সংস্থার প্রধান মাইকেল জেরড বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমাদের চোখের সামনেই জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং এটা চলতেই থাকবে।’ জানুয়ারি থেকে অক্টোবর এই ১০ মাসে যে তাপমাত্রা লক্ষ করা গেছে তা ১৮৫০ সাল-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। আরো বলা হয়েছে, ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে পৃথিবীপৃষ্ঠ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রার চেয়েও এই ১০ মাসের তাপমাত্রা ছিল ০.৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। আর ওই ৩০ বছরে পৃথিবীপৃষ্ঠ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৪.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তর মেরুতে বরফ গলার তথ্য আরো ভয়াবহ। শুধু এই বছরেই ৩০ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকার বরফ গলেছে। উত্তর মেরুতে বরফ গললে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী মানুষেরও সমস্যা। আমরা কাউকে অবহেলা করতে পারি না। দক্ষিণ মেরু বা আন্দিজ পর্বতের বরফ গললেও বিশ্বের আরেক প্রান্তের টনক নড়তে বাধ্য।
২৯ নভেম্বর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবরে ছিল প্রতিবছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে ৩.২ মিলিমিটার। জার্মানির পোস্টড্যাম ইনস্টিটিউটের জলবায়ু প্রভাব-সংক্রান্ত গবেষকদল ২৮ নভেম্বর এই তথ্য জানান। পোস্টড্যাম আরো জানায়, দশকপ্রতি পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে প্রায় ০.১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে। ২০০৭ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বর্তমানের তুলনায় ৫৯ সেন্টিমিটার বাড়বে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। নোবেলজয়ী এই সংগঠনটি তাদের পরবর্তী পর্যালোচনার প্রতিবেদন আগামী বছর প্রকাশ করবে। এসব হিসাব জাতিসংঘের।
চুলোয় যাক। ৮০০ কোটি বিশ্ববাসীর যা হবে আমাদেরও তা-ই হবে। বিশ্বের এত সাগর-মহাসাগরের জল বাড়লে বঙ্গোপসাগর কী করবে? ভয়ংকর বিভীষিকার পর্দা কাঁপানো সিনেমা যেন দেখছি। ভূমিকম্প, জলকম্প (সুনামি), ঝড় টাইফুন সাগর পারের মানুষের কপালে হামেশা ঘটতে থাকবে। থাকুক। মানবজাতির মৃত্যুই যদি ধ্রুব সত্য হয়, তাহলে আমার কী করার থাকে! সে এখনো হাজার বছরের ভবিষ্যতের কথা, দেখা যাক তত দিনে মানবজাতির হালহকিকত কী হয়! মানবজাতির মেধা ও মননের পরীক্ষা হোক।
‘আমি তোমার কাছে সমুদ্রের একটি ঢেউ জমা রেখেছি’ বইটি উৎসর্গ করেছি, ‘আমি যার কাছে সমুদ্রের ঢেউ জমা রেখেছি সেই দুঃখ জাগানিয়াকে’ লিখে। সে এখন কোথায়? প্রকৃতির মতো মানুষও অনেক কিছু ভুলে যায়, এমনকি ইচ্ছা করেও ভুলে থাকে।
লেখকের কাছে পাঠকের বৈধ-অবৈধ দাবি থাকে সব সময়। গল্প-উপন্যাসের তা করে। তখন লেখকের শাঁখের করাত অবস্থা। যেসব গল্প-উপন্যাসের চরিত্র বা নায়ক ‘আমি’ তাকে ‘আমি উপন্যাস’ বলে। লেখকের এটি কৌশল আবার বিপত্তিও প্রচুর। আমার একটি ‘আমি উপন্যাস’-এর নাম ‘আমি এক টাকা দিয়ে একটি স্বপ্ন কিনেছিলাম’ পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে ২০১২ সালে প্রকাশ পায়। এক তরুণী বইটি পড়ে এসএমএস করে জানায়, ‘গল্পটি অসাধারণ, কারণ আপনি এর হিরো। ভালো থাকবেন।’ আসলে এটি ‘আমি উপন্যাস’। উপন্যাসের নায়ক ‘আমি’ একটা কৌশল, কখনো কখনো লেখক ওই আমির ভেতরে ঢুকে যায়, আবার বেরিয়ে আসে। আমার ‘শ্রামণ গৌতম’, ‘অচেনা’ এবং অনেক গল্পে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। আমার ‘আকাশে প্রেমের বাদল’ গল্প বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। বইটির নাম গল্পের নায়ক ‘আমি’। এই গল্প পড়ে আমার সেজ জামাইবাবু ধরেই নিয়েছেন তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ওই গল্পের নায়িকা কৃষ্ণচূড়া। কৃষ্ণচূড়ার সঙ্গে নায়ক আমির প্রেমঘন দৈহিক সম্পর্ক হয়। ব্যস, সেজ জামাইবাবু ধরে নিলেন গল্পের আমি এবং লেখক আমি একই চরিত্র। আমার উপন্যাস ‘ভেতরে একজন কাঁদে’ (১৯৯৬), ‘মুক্তিযোদ্ধারা’ (১৯৯১), ‘অশ্রু ও আগুনের নদী’ (২০০৬), ‘কালোনদী’ (২০১১) উপন্যাসের নায়ক ‘আমি’। চেনা পাঠকদের নিয়ে এই সমস্যা হয় লেখকের ভোগান্তি। কিন্তু উপন্যাসের অন্তঃশক্তির প্রতাপ দুর্দান্ত।
লেখককে এ সমস্যায় পড়তে হয় স্ত্রীর কাছেও। গল্প-উপন্যাসের চরিত্রও করতে পারে। গল্পের চরিত্র বাস্তবে যত সত্য, তার চেয়ে কম সত্য নয় গল্পে। গল্প ও বাস্তব জীবনের কাহিনীর মিল থাকতেই পারে। আবার গল্প ও জীবন খুব কাছের তেমনি খুব দূরেরও। বাস্তবতা ও স্বপ্নবাস্তবতা খুব নিবিড়, খুব সত্য এবং খুব কল্পসুন্দর। তারপর থেকে অর্থাৎ ‘আকাশে প্রেমের বাদল’ গল্প পড়ার পর বহু বছর সেজ জামাইবাবুর সঙ্গে আন্তরিক দেখাশোনা হয়েছে। তিনি কখনো এ বিষয় নিয়ে আমার কাছে মুখ খোলেননি, আমিও না। বাস্তবের আমার সঙ্গে নায়িকা কৃষ্ণচূড়ার ভাই এবং আরো দু-তিন বন্ধুর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখনো রয়েছে। তাদের বোনদের সঙ্গেও আমার সম্পর্ক সেই প্রথম যৌবনের মতো মধুর রয়েছে। কিন্তু গল্পের সেই নিবিড়তায় তারাও আমাকে বাধা দিতে পারে বা পারত? গল্প-ঔপন্যাসিকদের সামাজিক সমস্যা ও দায়বদ্ধতা কতভাবেই না প্রভাবিত করে। একজন লেখকের প্রথম পাঠ তার আশপাশের সমাজ প্রকৃতি-পরিবেশ। সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু হয়। আমিও আমার গ্রাম, নদী, গুমাই বিল, সীতা পাহাড় ও গ্রামের মানব-মানবী থেকে কাহিনীর উপাদান দুই হাতে আহরণ করেছি। বঙ্গোপসাগর থেকে তার বিপুলতার কল্পনা লুট করে নিয়েছি। আমার যৌবন উন্মেষের কালে আশপাশের আত্মীয় কুমার-কুমারীদের কল্পনা ও সংস্পর্শই তো আমাকে দীপিত করেছে। আমি সেসব কুমারী, নারী ও সহপাঠীদের ভুলি কী করে! আমার মনের গভীর থেকে অজান্তেই তারা উঠে আসবেই। সযত্নেও। কখনো কখনো কাহিনীর প্রয়োজনে হয়তো রাশ ধরেছি, কখনো বা উসকানি দিয়েছি। আবার কত অকপট সত্য ও আকর্ষণীয় ঘটনা আমি লিখতে পারি না শুধু আমার আশপাশের ঘটনা বলে। বঙ্গোপসাগরের স্মৃতি নিয়ে একজন পাঠক কি ডায়েরিতে সব সত্য অকপটে লিখতে পারেন? পারেন না, আবার পারেন। আমিও বহু সময় পারি, আবার পারি না। পাঠক ও লেখক কখনো বা সমান অসহায় ও নির্বোধ!
‘আমি তোমার কাছে সমুদ্রের একটি ঢেউ জমা রেখেছি’-তে সব বলা হয়নি। এই বইয়ের ‘স্বৈরাচারীর সঙ্গে বসবাস’ ও ‘একালের নায়ক’ অনু উপন্যাসেও বলা যায়নি। ‘একালের নায়ক’ কাহিনীতে নায়ক চলে গিয়েছিল পশুর নদী ধরে বঙ্গোপসাগরে। নায়িকা মন্ত্রীর স্ত্রী গিয়েছিল দৈবাৎ সেখানে। প্রাণের প্রথম উদ্ভব এই পৃথিবীতে হয় পানিতে। সেই রক্তের টানেই কি নিজেদের অজান্তে এই আশ্চর্য ভ্রমণ! আমি সচেতনভাবে তা করিনি; কিন্তু লেখা শেষ হওয়ার পর সেই মহাসমুদ্রের প্রাণভোমরা আমাকে নিয়ে প্রথম প্রেমের বিভোল হাসির ভাস্কর্য তুলে ধরে। সমুদ্রকে নিয়ে এই লুকোচুরি জীবনভর এভাবে চলে। একালের নায়ক রিয়াজুদ্দিন হিরণ পয়েন্ট থেকে কুঙ্গা নদী বেয়ে মর্দাত নদীতে ছুটেছে নৌকা নিয়ে, ‘…আড়াই শ গজ জোয়ার ঠেলে যেতে তোমার বাহু লাফিয়ে উঠেছে। যৌবন চলকে উঠেছে। জোরে জোরে বৈঠা ফেলছ তুমি। উত্তেজনায় টগবগ করছ। তোমার অহংকারে ঘা লেগেছে। তোমার ইচ্ছা করছে মেম সাহেবের কাছে ছুটে যেতে, ওর কোলে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছা করছে। তুমি ওকে হারাতে চাও না, চিরকালের মতো পেতে চায় তোমার মন ও শরীর। কিন্তু তুমি পার না। তুমি জোয়ার ঠেলে মর্দাত নদীতে পৌঁছতে পার, মর্দাতের জোয়ার ঠেলে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছতে পার, বঙ্গোপসাগর থেকে ভাটার টান অবহেলা করে মর্দাত ও পশুরের উজান বেয়ে নিজের গ্রামে যাওয়ার শক্তি তোমার আছে।…’ রাজনৈতিক সংঘাত ও মেম সাহেবের ওপর শরণার্থীর অধিকারে তার শরীর দখল ও জয় বঙ্গোপসাগরের বিস্তারের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল?

চলতে চলতে পথে পথে
বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে বঙ্গোপসাগর উঠে আসে। বঙ্গোপসাগরের ইতিহাস নেই, বাংলাদেশের আছে। সেই সূত্রে বঙ্গোপসাগর চলে আসে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গোপসাগর দিয়ে আসা পাকিস্তানি সামরিক অস্ত্র খালাসের মধ্যে ২৫ মার্চের কালরাত্রির আগুনের আঁচ পাওয়া যায়। আবার মুক্তিযুদ্ধের পরিপক্ব সময়ে ১৩ ডিসেম্বর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ সপ্তম নৌবহরকে সোভিয়েতের হুমকি মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। মুক্তিযুদ্ধেও এভাবে বঙ্গোপসাগরের কথা ইতিহাসভুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশ ও মিত্র দেশ ভারতের নিয়ন্ত্রণ তখন সমুদ্রকে জলে ও আকাশে শাসন করে। বঙ্গোপসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রভাবিত করে মুক্তিযুদ্ধকে।
১৯৮৯ সালের গোড়ার দিকে ‘বঙ্গোপসাগর আমার শত্রু’ অনু উপন্যাসটি লেখার সূত্রপাত। এ সময় আমার ছোট বোন আভার বড় ছেলে পার্থ বড়ুয়া ডিফথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসে এখন সে যশস্বী সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা। ‘বঙ্গোপসাগর আমার শত্রু’ কাহিনীতে ১৯৮৫ সালের সামুদ্রিক ঝড়ের রাতের বর্ণনা যুক্ত হয়। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের কক্ষে এর পট উন্মোচিত হয়। ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের সেই রাত্রি। মৃত্যুর সঙ্গে জীবন ও ভালোবাসাও কখনো কখনো সমান্তরাল শক্তি নিয়ে মুখোমুখি হয়। প্রকৃতি ও মানবজীবন লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়।
সে বছর অক্টোবরে ‘প্রতিরোধ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়। আসলে এটি গল্প। পরে ১৯৯০ সালের একুশে বইমেলায় অনিন্দ্য প্রকাশন থেকে ‘স্বপ্নসমুদ্রে বনদেবীরা আছে’ নামে প্রকাশিত। বইয়ের নাম-গল্পটিতে আগা খান সম্প্রদায়ের আজরা প্রেমে পড়েছিল বাঙালি তাজুর। এই ঘটনা ১৯৬৩-৬৪ সালের দিকের, আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র। তখন আমি গল্প লিখছি দৈনিক পত্রিকা ও সংকলনে। কবিতাও ছাপা হচ্ছে ঢাকার পত্রিকায়ও। আহসান হাবীব তখন ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। সিকানদার আবু জাফরের সমকাল মাসিক পত্রিকা চট্টগ্রাম থেকে পড়ছি। ‘নরনারী’ পত্রিকায়ও একটি গল্প ছাপা হয়েছিল ‘স্টেশনের গল্প’ নামে। সম্ভবত ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকায় কবিতা ছাপা হতো। কখন থেকে কবিতা ছেড়ে গল্পে ঢুকে পড়লাম, নাকি কবিতা আমাকে ছেড়ে গল্পে ঢুকিয়ে দিল, আমি বলতে পারব না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি তখন থেকে ঠিক করে রেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেতই আমার প্রিয়। প্রকৃতি ও লেখা তখন থেকে আমাকে আক্রান্ত করে রেখেছে, আমি একটুও বুঝিনি।
বঙ্গোপসাগরের সৈকত তখন ফৌজদারহাটে। পতেঙ্গায় একবার মাত্র গিয়েছি সেই ১৯৬১-৬২ সালের দিকে আমার প্রথম সমুদ্রদর্শনে। কর্ণফুলীর ওপাশে দেয়াং পাহাড়ও আমার স্বপ্নবাস্তবতার সঙ্গী। কিন্তু যাওয়া হয়নি।
‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ উপন্যাসের প্রথমপর্বের রচনাকাল ১৯৮৯ সালে। চলন্তিকা বইঘরের মালিক মোশাররফ হোসেন ভঁূইয়া অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ১৯৯০ সালে ছাপেন। কবীর চৌধুরী এই বইয়ের সুন্দর সমালোচনা লিখেছিলেন। আমার লেখা উপন্যাসে যে এত শক্তি আছে আমি ভাবনাতে তা অনুমান সেভাবে করেছি বলে মনে করতে পারছি না এখন। তিনি একটি কথা লিখেছিলেন এর বিরুদ্ধে, ‘আধার থেকে আধেয় ছোট’। ব্যস, পরে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি তিন পর্বে ৩৩৩ পৃষ্ঠায় ‘জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন’ থেকে ধ্রুব এষের অসাধারণ প্রচ্ছদ নিয়ে প্রকাশিত হয়। উরিরচরের সমুদ্রঝড় এতে যুক্ত হয়েছে। এসেছে তিন শতাধিক চরিত্র। প্রতিটি পরিচ্ছেদে ধ্রুব এষ লাইন ড্রয়িং দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছেন লেখকের মর্মকথা। আমার খুব আদরের বই। ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে দুবার মুদ্রিত হয়েছে জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন থেকে। আমার বঙ্গোপসাগর আমাকে কুনজরে দেখেনি, এ কথা বললাম নিজেকে। সেই যৌবনবন্দনা গাই এখন নিজের সঙ্গে নিভৃতে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের তীরবর্তী ও সকলকে ধ্বংস বা সৃষ্টি কোন ক্ষমতাবলে নিয়ন্ত্রণ করে তা আমার এখনো জানা-অজানার দোদুল্যমান অনুভব…রহস্য…মায়াবিভ্রম। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রঝড় কত ভয়াবহ ও বিস্তৃত তা আমাকে বই লেখার পর অন্যভাবে বিস্মিত করে। তেমন করে তুলে ধরতে পারিনি বলে অক্ষমতায় ক্ষতবিক্ষত হই। ১৯৮৫ সালে ঘটনাস্থল দেখতে গিয়েছিলাম চর জব্বার, চর ফ্যাশন ও উরিরচর। আমাদের খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক মাহমুদুল হক, যার ডাকনাম বটু, যাকে বন্ধুরা বটু বলে ডাকতাম। বায়তুল মোকাররমে পারিবারিক জুয়েলারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম ছয় ভাইয়ের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে [TASMEN] ‘তাসমেন জুয়েলার্স’। বটুর জন্ম ১৯৪১ সালের ১৬ নভেম্বর। ছুটলাম দুজনে। বাসে করে নোয়াখালী, সেখান থেকে আরেক বাসে চর জব্বার। ওখানে ‘আশা’ সাহায্য সংস্থায় থাকার জায়গা হয় আকস্মিকভাবে। মাহমুদুল হকের মৃত্যু হয় ২১ জুলাই ২০০৮ সালের রাত ২টায়। বাংলা কথাসাহিত্যে তাকে আমরা বলি রহস্যময়। বন্ধুবৎসল এবং কথার জাদুকরও। নোয়াখালীতে আমরা দুদিন ছিলাম। তখন কথা হয়েছিল আমরা এই বিষয়ে উপন্যাস লিখব। বটু লেখেনি। ওখানকার অনেক ঘটনা ও চরিত্র ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ উপন্যাসে তুলে ধরেছি। বিষয়বস্তুর দিক থেকে বা পটভূমি হিসেবে বঙ্গোপসাগর আমার গল্পের ভুবন সিংহভাগ দখল করে আছে। বঙ্গোপসাগরের সূত্রে সুন্দরবনের বাঘ এসে জায়গা করে নিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ঢেউকুমার এসেছে ছোটদের গল্পের ভুবনে। সুনামি, সিডর নিয়ে এসেছে থাইল্যান্ড, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, কেনিয়া উপকূলের জলহস্তী শাবক ও দাদু কচ্ছপ, মাদ্রাজ উপকূলের রিজাল শাহপুত্র এসে ভিড় করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের এক নাবিকের জাহাজ থেকে ভারত মহাসাগরে পড়ে যাওয়া নিয়ে কাহিনী আছে ‘হাঙরের সঙ্গে লড়াই’ নিয়ে। সবই বঙ্গোপসাগরের মায়াময় বাস্তবতা। মায়াবিভ্রম।
কক্সবাজারে দুপুর রাতে একা একা সমুদ্র দেখতে যাই। তার একমাত্র সাক্ষী ছিল মাঝরাতের প্যাঁচা-প্যাঁচারানি। পুরুষটি বিদ্যুতের তারে বসে ছিল। অমনি সে দুবার ডেকে সঙ্গিনীকে বলেছিল আমার একাকিত্বের কথা। রাস্তায় একটিও লোক নেই, একটি রিকশাও না। রাত ১টা হবে। সমুদ্রের তীরের ঝিনুক-শঙ্খের দোকানগুলো বন্ধ। হোটেলও। না, একটি মানুষও দেখিনি। বালির ওপর দিয়ে ভেজা বালিয়াড়ির কাছে চলে গেলাম। শুকনোতে বসলাম হাঁটু তুলে। অন্ধকারে বিশাল সমুদ্রও ডুবে যায়! যায়, কিন্তু শহরের আলো বেশ কিছুদূর মোটামুটি দেখা যায়। মাঝেমধ্যে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফসফরাস আলো ঢালে সাধ্যমতো। সবচেয়ে বিপন্ন বিস্ময় হলো সমুদ্র তখন তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে আমন্ত্রণ জানায়। মৃত্যুর আমন্ত্রণ। মায়াবী আহ্বান, যেন মৃত্যু খুব সুখকর কোনো বস্তু, সেই বস্তুটি যেন ফেলে দেওয়া যায়, আবার রাখাও যায়, যখন-তখন মদ্যের মতো পান করে মৌজ করা যায়, আবার ইচ্ছে না-হলে জমা রাখা যায় কালকের জন্য, অথবা চিরকালের জন্য। সেই মৃত্যুর মোকাবিলা তো করা যায়; কিন্তু মধ্যরাতের বঙ্গোপসাগর সরাসরি মৃত্যুর মায়াবী মোকাবিলায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে কেন? আমি ভয় পাইনি, আমি ভয় পেয়েছি। মৃত্যু সম্পর্কে বা আত্মহত্যা সম্পর্কে কোনো ভাবনা আমার নেই বলে ভয় পাইনি; কিন্তু পেয়েছি ভাবনা সদ্য জন্ম নিতে বসেছে বলে, আমার বঙ্গোপসাগরের মোকাবিলার আমন্ত্রণ পেয়ে। তার পরও আমি বসে থেকেছি। অন্ধকারে আস্তে আস্তে সে গর্জন তুলছে, আমাকে ভয় দেখাতে শুরু করেছে। আমাকে ভীতুর ডিম বলে উপহাস করছে! পরিহাসও করে সাগর! ও এত মননশীল! তাহলে নিশ্চয়ই জানে আমি লিখি! আর এ জন্যই কি আমার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে চায়! আস্তে আস্তে দেখি ভয় দেখাতে শুরু করছে ঢেউ পাঠিয়ে দিয়ে। এতক্ষণ তো সে শান্তই ছিল। …ও, তাহলে জোয়ার পাঠিয়ে আমাকে তার শক্তিমত্তা প্রকাশ করছে! আমার সাহসের পরীক্ষা করছে কূটনীতি ছেড়ে সমরনীতির আশ্রয় নিয়ে! গায়ের জোরে!
তারপর আমি চলে এসেছি আমার সময়মতো। অভিজ্ঞতাটা দারুণ ও ব্যাপক শক্তিশালী। কোন গল্পে ব্যবহার করেছি কিছুতেই মনে করতে পারছি না। বোধ হয় বঙ্গোপসাগরের এও মায়াবিভ্রম। ও যে কত ছলনা জানে, কত মায়া, কত লক্ষ্যভেদী আর সংগ্রামশীল তা বোঝা মুশকিল। আবার দিলদরিয়া, অতুল বক্ষসুন্দরী, রুপালি-সোনালি ও বহু বিচিত্র রঙের শয্যার জলপ্রান্তর এবং মাছের ভাণ্ডারি, রসের মজুতদার, ছদ্মবেশী হিংসুক।
মধ্যরাত্রির বঙ্গোপসাগর নিয়ে কোন গল্পে লিখেছি তা মনে করতে পারছি না, এও তার মায়াবাস্তবতা। পাঠিকা-পাঠক সুন্দর, অতীতের বহু কিছু ভুলে যাওয়া আমার অর্জিত সম্পদ। অনবরত সঞ্চয় ও খরচ আমার স্মৃতিশক্তির স্বভাব।

প্রাচীন ও নবীন জল
তাহলে এই সুযোগে একটু জলের কথা বলে নিই। সমুদ্রের জল আমরা সরাসরি খেতে পারি না। জমিতে সেচের কাজও চলে না। তবে লবণাক্ততা দূর করে সব ধরনের ব্যবহার চলে। জলীয় বাষ্প হয়ে ওঠার সময় এই বাষ্প প্রাকৃতিক নিয়মে নুনটুকু ফেলে রেখে উঠে চলতে থাকে, বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। সেই জল আমরা বিশুদ্ধ হিসেবে পান করি। সুপ্রাচীন কাল থেকেই মানবজাতি বৃষ্টির জল পানে অভ্যস্ত। প্রাচীন ভারতবর্ষে জলের গুণমান সম্বন্ধে সমাজে সচেতনতার কথা ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয় সংহিতা ইত্যাদি থেকে জানা যায়। ‘প্রাচীন ভারতে পরিবেশ চিন্তা’ বইয়ে শুভেন্দু গুপ্ত লিখেছেন,
“বিশুদ্ধতার নিরিখে বৃষ্টির জল যে শ্রেষ্ঠতম, সে কথা বিভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের মতেও বৃষ্টির জল স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় পতিত হয়, তাই তাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়া অন্য কিছু থাকে না। বৈদিক সাহিত্যে দিবাকালীন বৃষ্টির জলকে সর্বাধিক বিশুদ্ধ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। একে বলা হয়েছে বিরড়াভৃৎ বা আতপবর্ষাঃ। ‘অথ যদ্ আতপবর্ষা অপো ভবন্তি তেজস্ব হ বৈ ব্রহ্মবরচসম।’ সূর্যতেজে দীপ্ত হয়ে বৃষ্টিবারি শক্তিপ্রদ ও বিপুল জীবনপ্রদ পানীয় হয়ে ওঠে। এই জলের রোগহরণ গুণ আছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন। আর্যঋষিরা বায়ুপ্রবাহের গতি, সৌরতেজশক্তি, বজ্র ও বিদ্যুতের বিভিন্ন পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট আট প্রকারের বৃষ্টিজলের শ্রেণীবিভাগ করেছেন।
(ক) জিনবরাভৃৎ- পুরবৈঁয়ার সঙ্গে বর্ষিত বৃষ্টিজল
(খ) উগ্ররাভৃৎ- বায়ুতাড়িত বৃষ্টিজল
(গ) ভৌমরাভৃৎ- বজ্রপাতসহ যে বৃষ্টি, তার জল
(ঘ) তি্বষারাভৃৎ- বিদ্যুৎসম্পাতের সময় বর্ষিত বৃষ্টিজল
(ঙ) পূর্তিবাভৃৎ- রাত্রিকালে বর্ষিত বৃষ্টিজল
(চ) শ্রুতরাভৃৎ- মুষলধারে বর্ষিত বৃষ্টিজল
(ছ) বিরাড়ভৃৎ- দিবাকালীন বৃষ্টিপাত যখন সূর্য প্রবলভাবে কিরণ দেয়
(জ) ভূপরাভৃৎ- যুগপৎ অশনিসম্পাত ও বজ্রপাতকালীন বৃষ্টি
বৃষ্টিজলের উপরোক্ত শ্রেণীবিভাগ করা হলেও আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতানুসারে ওপরে আলোচিত প্রভাবের ফলে বৃষ্টিজলের গুণগত পার্থক্য কতটা হয়, আদৌ হয় কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সমর্থন নেই।”
ছেলেবেলায় আমাদের গ্রামে একটি মাত্র টিউবওয়েল ছিল। গ্রামের উত্তরপ্রান্তে বৌদ্ধ বিহারের সামনে। আমাদের পুকুরের জল আমরা খেতাম না। ইছামতী নদী ভিটের অদূরে। সেই জল এনে ফিটকিরি ও কর্পূর দিয়ে শোধন করে খেতাম। বর্ষাকালে ইছামতীর জল ঘোলা শুধু নয়, কাদাযুক্ত ঘোলাতম। তখন বৃষ্টির জল ধরে রাখা হতো কলসিতে।
নতুন বানানো বেড়া বা কাপড় দিয়ে ধরে রাখা জল খেতাম। তখনো দেখেছি বৃষ্টির প্রথম দিকের জল ধরা হতো না। কারণ বাবা বলতেন, বায়ুমণ্ডলে যে ধুলোবালি আছে তা প্রথম বৃষ্টির সঙ্গে চলে যাক, তারপর পরিষ্কার জল আসবে। সেই জলই উত্তম, নিরোগ ও স্বাস্থ্যপ্রদ। তা ছাড়া গ্রামের যেসব পুকুর থেকে মানুষ খাওয়ার জল সংগ্রহ করত সেসব পুকুরের চারদিকে সাধারণত গাছপালা বেশি থাকত না। পুকুর পাড় উঁচু, বাইরের জল গড়িয়ে পুকুরে পড়ার সুযোগ নেই। বলা হতো, সূর্যের তেজে পুকুরের জলের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা কীট আপনা-আপনি ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাচীনকাল থেকে গ্রামের মানুষ সূর্যের তেজ বা রোদের গুণাগুণ জানত। তা ছাড়া নদীর জল সবাই খেত। তখন নদীতে আজকের মতো দূষণ হতো না।
আধুনিককালে শুধু নয়, প্রাচীনকাল থেকে গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনার জলে ‘শৌচ্য, আচমন, গাত্র সংবাহন, মলঘর্ষণ, বস্ত্রত্যাগ, ফুল-মালা-নির্মাল্য ইত্যাদি না দেওয়ার মতো ত্রয়োদশ বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়েছে।’ আধুনিককালে ভারতের গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের কর্মকর্তারা এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। অথচ কলকারখানার বর্জ্য, কেমিক্যাল বর্জ্য ইত্যাদি হামেশা ফেলেই যাচ্ছে। আমাদের সব নদীর তীরবর্তী শহর-নগর এই অপরাধে অপরাধী অথচ দণ্ডনীয় নয়। আর নদীবাহিত সব জৈব ও অজৈব বর্জ্য বয়ে চলেছে পরিত্রাতা-প্রেম বঙ্গোপসাগরে। সব বর্জ্যের শেষ আশ্রয়স্থলে।
কাচকি, অলুয়া, নরলি, বাঁশপাতি, ফাইস্যা তোমরা কেমন আছ?…তোমরা ছোট মাছ, তোমাদের কষ্ট কি বড়দের চেয়ে বেশি নয়…? নাকি কম…?- আমি প্রশ্ন করি আপন মনে।
ও শুশুক, ডলফিন, তোমরা জাহাজ থেকে পড়া তেলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তোমাদের নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট? সুন্দরবন ও ইরাবতী নদীর ডলফিনরা কি এ জন্য কমে যাচ্ছ?
ও সাদা বুক সিন্ধু চিল, সুন্দরবনে উড়ে উড়ে তোমরা মাছ শিকার করো, তোমরা সবচেয়ে বেশি জানো এসব কথা। তোমরা কেমন আছ? তোমাদের ধবল বুক কী নরম!
সুন্দরবনের অজগর ও বন শুয়োর উৎখাত হয়েই চলল। ও-হো-হো! ওরা টিকে থাকবে তো! ‘অ-তে অজগর আসছে তেড়ে’- এখন কেউ বিশ্বাস করবে না। কারণ অজগরেরা জেনে গেছে, মানুষই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর কুৎসিত প্রাণী। বাঘ, সিংহ, হাতি কিছুই পারে না মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সেই আদিমকালে মানুষকে কখনো কখনো হারাতে পারলেও এখন আর পারে না। এখন মানুষের জিঘাংসা ভয়ংকর, অস্ত্র আরো বেশি নিঠুর নিদয়া। মানুষের বিষ-প্রয়োগ আরো বেশি জঘন্য। মানুষ খালি হাতে লড়তে ভয় পায়। এ জন্য তার শতেক রকম অস্ত্র। বনের পশু-পাখিরা বলে, ‘এসো না, খালি হাতে, হয়ে যাক এক হাত!’ মানুষ যাবে না। খালি হাতে সে কেঁচো-কেন্নোর চেয়েও অধম।
আর মানুষ, তোমরা বলছ বঙ্গোপসাগর ডুবে যাবে তিন ফুট জলের নিচে। জলের আধার বঙ্গোপসাগর তিন ফুট জলের নিচে তলিয়ে যাবে? যাক না! এতে তুমি কীট-কেন্নো মানুষের কী? ওটা বঙ্গোপসাগরের মাথাব্যথা, তার সমস্যা, তার দুক্খু, তার ভাবনা। ও, তাতে তুমি বা তোমরা মানুষের অসুবিধে! তা এত দিন আমাদের এত অসুবিধা, এত বিপদ, এত তর্জন-গর্জন তোমাদের কানে গেল না। এখন নিজেদের ঘাড়ে পড়েছে বলেই তো এত চেঁচামেচি! দুবাই সম্মেলনে এ জন্যই জলবায়ু, গ্রিনহাউস, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে এত হাউকাউ! পাঁচতারা হোটেলে খেয়ে-দেয়ে-শুয়ে-বিলাস করে পত্রপত্রিকায় খবরবাজি! তোমরা মানুষেরা পারও বটে। তোমাদের লজ্জা-শরম আমরা কিন্তু দেখতে পাই।
বঙ্গোপসাগরে এক মধুর গর্জন-সম্পদ আছে। ওই যে তোমরা বলো ‘বরিশাল গান’ (বন্দুক)! বর্ষার মুষলধারে পরিচলন বৃষ্টির সময়, সাগর থেকে হাওয়া তীরের দিকে যেতে যেতে ভারি বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে যে প্রকাণ্ড কামান গর্জন হয়! গুড়ুম গুড়ুম গুড়ুম! তাহলে বঙ্গোপসাগরেরও স্বাধীনতা দিবস আছে! বিজয় দিবস, রাজকারদের বিরুদ্ধে ঘৃণা দিবস! থুতু ছিটিয়ে ঘৃণা প্রকাশ! থু থু থু! ও বঙ্গোপসাগর, এ জন্যই তোমাকে ‘সালাম সালাম, হাজার সালাম’। তুমি গর্জন করে যাও।
১৯৭০ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ বাংলার কত মানুষ নিহত হয়েছে? কত গবাদি পশু? কত পাখি? সামুদ্রিক প্রাণী, যারা কূলের কাছাকাছি মানব বসতিতে চলাফেরা করত! নুন তোলার জমি গেছে। ধান গেছে। উপকূলের গাছপালা গেছে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সব কিছু তছনছ করে দিয়ে সেই বঙ্গোপসাগর আবার যথাস্থানে গিয়ে একেবারে ধোয়া তুলসী পাতা। হ্যাঁ, তুমি মানুষও অসহায়। তোমার ছেলে-মেয়ে-বাপ-কাকা মারা গেলে তোমার কেমন লাগে? শুশুক, হাঙর, তিমির বাচ্চা-মা-পিসি মারা গেলে তিমির কেমন লাগে? গরুর বাচ্চা মারা গেলে তার হাহাকার অসহায়তা দেখেছেন? ও, মানুষের মতো ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদতে জানে না বলে! ওর চোখের জলও মানুষের মতো নোনা, দুঃখ থেকে তার উৎপত্তি।
মানুষের খুব কাছে এসে গেছে বিপর্যয়। নাকের ডগায় মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, মানবজাতির সৃষ্ট অপকর্মের পরিণাম। এখন কাঁদো মানুষ, কাঁদো। পাঞ্জাবির পকেট দিয়ে চোখ মুছে নাও, গামছা লও। রুমাল তো শত অপকর্মে নোংরা হয়ে গেছে, ধুয়ে নাও। এসব কথা বঙ্গোপসাগরের এবং সেই সঙ্গে আমারও। কারণ আমি বঙ্গোপসাগরের তীরের মানুষ। তার ঝড়-ঝাপটা আমি পোহাই, আমার বা আমি মানুষের দূষণে ওর দুঃখ বুঝতে শিখেছি আপদে পড়ে- মানুষই এসব খুঁজে পেতে বের করছে গবেষণা করে। মানুষ নিজের পায়ে কুড়ুল মারছে আবার গবেষণা করে কাহন কাহন অভিসন্দর্ভ বই রচনা করছে। ও মানুষ, তুমি পারও বটে!
প্রাচীন ভারতে নাসিক থেকে পাওয়া লেখ-এ উদকযন্ত্রের কথা জানা যায়। জল সরবরাহ করার জন্য অরঘট্টঘটিকা (বা বহট্টগড়িয়া) নামে একটি যন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। হাল রচিত ‘গাথাসপ্তশতী’তে এই যন্ত্রের নাম আছে। যন্ত্রটি চক্রাকার, তার গায়ে ছোট ছোট পাত্র লাগানো থাকত। ঘটির আকারের পাত্র। এ জন্য অরঘট্ট বলে পরিচিত। জলের ভেতর চক্রটি ঘোরালে ঘটিগুলো পূর্ণ হয়ে জল উঠে আসত। চক্রটি নিচে নেমে এলে সেই জল মাটিতে পড়ত। ইবনে বতুতা চতুর্দশ শতকে ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে কামরূপ যাওয়ার পথে নদীর তীরে ক্ষেতে সেচের জন্য এই জল নদী থেকে তুলতে চক্রাকার এই যন্ত্রটি দেখেছিলেন। এখনো বড় আকারে এ রকম সেচ বা জল তোলার চক্রাকার যন্ত্র রাজস্থানের কুয়ো বা জলাধার থেকে ব্যবহৃত হতে দেখে এসেছি ২০১২ সালে অঘোর শীতে।
প্রাচীন আর্য ঋষিরা জলের গুণমান সম্পর্কে সচেতনতার কথা ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয় সংহিতায় লিখে গেছেন। বিশুদ্ধতার নিরিখে বৃষ্টির জলকে তাঁরা বিভিন্ন প্রসঙ্গে বলে গেছেন। বৃষ্টির জলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়া অন্য কিছু থাকে না বলে শুদ্ধ জানতেন। আরো বলেছেন সূর্যতেজে দীপ্ত হয়ে বৃষ্টিবারি শক্তিপ্রদ ও বিপুল জীবনপ্রদ পানীয়। জলের কত রকম নামকরণ তাঁরা করে গেছেন- ক. জিনবরাভৃৎ, অর্থাৎ পুরবৈঁয়ার সঙ্গে বর্ষিত বৃষ্টিজল; খ. উগ্ররাভৃৎ বা বায়ুতাড়িত বৃষ্টিজল; গ. ভৌমরাভৃৎ বা বজ্রপাতসহ বৃষ্টিজল; ঘ. তি্বষারাভৃৎ বা বিদ্যুৎসম্পাতের সময় বর্ষিত বৃষ্টিজল; ঙ. পূর্তিরাভৃৎ বা রাতে বর্ষিত বৃষ্টিজল; চ. শ্রুতরাভৃৎ, অর্থাৎ মুষলধারে বর্ষিত বারি; ছ. বিরাড়ভৃৎ বা দিনের বৃষ্টিতে যখন সূর্য প্রবল কিরণ দেয় এবং জ. ভূপরাভৃৎ বা যুগপৎ বজ্র-বিদ্যুৎকালীন বৃষ্টি। তবে উপরোক্ত শ্রেণীবিভাগের জল আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বিচার বৃষ্টিজলের গুণগত পার্থক্য কত বা আদৌ হয় কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সমর্থন নেই। কিন্তু এ কথা আমরা জানতে পারি সেই বৈদিক যুগেও মানুষ পেয় ও সেচের জল সম্পর্কে পার্থক্য বিচার করতে জানত।
আবার প্রাচীনতম জলদূষণ সম্পর্কে চিন্তা থেকে কলুষতামুক্ত জলের ব্যবহারের কথা তারা জানত। এ জন্য জলকে কলুষিত করবে, যা জলের গুণমান ক্ষতি করবে তার সব কিছুই অপসারিত করতে হবে তা মানত। আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধের শিষ্যদের পাঁচটি অপরিহার্য ব্যবহৃত জিনিসের মধ্যে জলছাঁকনি ছিল অন্যতম। মনুস্মৃতিতে জলকে বস্ত্রখণ্ড দিয়ে ছেঁকে পান করতে বলা হয়েছে। এমনকি জলদূষণ রোধ করতে জলের উৎসে দূষণ প্রতিকার করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাহলে আজকের নগর সভ্যতার যুগে কলকারখানা ও বাসস্থানের পয়োনিষ্কাশন সম্পর্কে আমরা এত উদাসীন হতে পারি কী করে? উৎস থেকে শুরু করে নদীবাহিত বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে জমা হওয়ার শিক্ষা আমরা ভুলে গেলাম কী করে? নাকি মানুষের একগুঁয়েমি, ধ্বংসকামী বৃত্তি বা রাষ্ট্রযন্ত্রের অবহেলা? যে মানুষ রাষ্ট্রশাসন প্রবর্তন করেছে সেই মানুষই আবার নিজের তৈরি আইন নিজে অমান্য করতে শুরু করেছে। ইংল্যান্ডের টেমস নদী একসময় বর্জ্যে দূষিত হয়ে ট্রাউট মাছশূন্য হয়ে গিয়েছিল। তারা আবার সেই বর্জ্য পরিষ্কার করে বিখ্যাত ও খাদ্যোপযোগী ট্রাউট মাছের আবাস করে তুলেছে টেমস নদীকে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীকে কি তেমন দূষণমুক্ত করতে পারে না মুক্তিযুদ্ধ-স্নাত বাঙালি! শুভেন্দু গুপ্ত রচিত ‘প্রাচীন ভারতে পরিবেশ চিন্তা’ গ্রন্থে এসব বিষয়ে গভীর আলোকপাত করা হয়েছে। শিশুসাহিত্য সংসদ প্রা. লি.-এর প্রকাশক, ৩২ এ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, কলকাতা ৭০০০০৯।
বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশ, ভারত, বার্মা, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় ঘেরা উপসাগর। এর ওপর দিয়ে বাঙালি চাঁদ সওদাগর মালয়েশিয়া, বোর্নিও হয়ে চীন পর্যন্ত বাণিজ্য-তরী ভাসিয়েছিলেন কি না তার সঠিক বৃত্তান্ত আমাদের জানা নেই। কিন্তু চাঁদ সওদাগর বাণিজ্য-তরী ভাসিয়েছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার আরেক বঙ্গদেশীয় বীর বিজয় সিংহ সিংহল জয় করেছিলেন তাও আমরা জানি, গল্প-কাহিনীতেও ছড়িয়ে আছে। সেই বঙ্গোপসাগরের কতখানি আমাদের ন্যায্য পাওনা তার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বিচারালয়ে।

বিপন্ন রোগগ্রস্ত ধরণী
কয়েক শ কোটি বছর আগে এই সমুদ্রের বুকেই পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উন্মেষ ঘটে। এক কোষী আদিম প্রাণ এখন লক্ষ কোটি কোষবিশিষ্ট চিন্তাশীল বুদ্ধিমান জীবে পরিবর্তিত। মাঝখানে কেটে গেছে অন্তত সাড়ে তিন শ কোটি বছর। মাত্র দশ বা কুড়ি লক্ষ বছর আগে এই মানুষ হয়েছে মানুষ। আর দশ লক্ষ বছর পরে এই পৃথিবীতে কোনো মানুষই থাকবে না। মানুষের আত্মা যদি পরিবর্তিত হতে হতে দূর নক্ষত্রমণ্ডলে বা নীহারিকালোকে যদিও বা টিকে থাকে, আর তার যদি অনুভব আমার মতো থেকে যায়, তখন হয়তো দেখতে পাবেন অন্য রকম ঢেউয়ের আলোছায়ার খেলায় আমার প্রিয় বন্ধু ও প্রিয়তম শত্রু বঙ্গোপসাগর হাহাকার করছে বালুকা রাশিতে। প্রিয় বঙ্গোপসাগর জলহীন, মাছহীন, বায়ুহীন ও সৌন্দর্যবর্জিত সৈকত হয়ে মৃত চাঁদের মতো কাঁদছে। সেই কান্নার নোনা অশ্রুও নেই। কী ভয়ংকর সেই দৃশ্য! তাকে ভয়ংকর সুন্দর বলারও উপযোগিতা নেই। কোনো বর্ণনা তার জন্য যথেষ্ট বা যথাযথ নয়। সেই সাগরে জল নেই বলে তার সন্ধান মানুষের পরিবর্তিত সত্তাকেও চিনতে পারছে না। মা ও সন্তান কাঁদছে অশ্রুহীন মমতাহীন বায়ুহীন বিদ্যমানতাহীন অকরুণ অকান্নায়। তখন থাকবে হয়তো কিছু ব্যাকটেরিয়া!
কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবী ধ্বংসের সেই সময়ের অবকাশ এখন নেই। তার আগে শুধু মানুষের কারণে পৃথিবী দশ হাজার বছরের মধ্যে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। ধরিত্রীর প্রাণিকুলের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে স্তন্যপায়ী প্রাণী। জলবায়ু নিয়ে এখনকার মতো উদাসীন থাকলে চলতি শতকের শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২ থেকে ১১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে ঘূর্ণিঝড় ও খরার মাত্রাও দিন দিন আরো তীব্রতর হবে। গত কয়েক দশকে প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে না পেরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক প্রজাতির প্রাণী। হিমযুগ-পরবর্তী প্রাণিজগতের পরিবর্তনের পেছনে ছিল এই জলবায়ু। নির্বিচারে বন উজাড় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এখনো নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঝুঁকিতে আছে অনেক প্রজাতি। লন্ডনের জুলজিক্যাল সোসাইটির গবেষকরা জানিয়েছেন, জলবায়ু উদ্বেগজনক পরিবর্তনে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, স্থলভাগে প্রায় ছয় হাজার প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। স্থলভাগে এই প্রাণীদের অবস্থানের ঘনত্ব এবং ঘূর্ণিঝড় ও খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলোর সাদৃশ্য দেখে এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন গবেষকরা। তাঁরা কালো তিমি ও জুকাতান স্পাইডার বানরকে উদাহরণ হিসেবে হাজির করে দেখিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার কারণে প্রজাতিগুলো তাদের আগের প্রাত্যহিক অভ্যাসের ৯০ শতাংশ বিসর্জন দিয়েছে। প্রজাতি দুটি পরবর্তী পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সফল হতে না পারলে গত কয়েক শতকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া লক্ষাধিক প্রাণীর মতোই ভাগ্য বরণ করতে হবে তাদের।
গবেষক দলের প্রধান এরিক এমেকা বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও খরার কারণে ডাঙার এক-তৃতীয়াংশ স্তন্যপায়ী প্রজাতি তাদের মোট সংখ্যার ২৫ শতাংশে এসে পৌঁছবে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আরো বেশি সচেষ্ট না হলে ধারণার চেয়েও অধিক স্তন্যপায়ী প্রাণী বিপন্ন পরিস্থিতিতে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করে দেন। এই খবরের সূত্র টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, কালের কণ্ঠ দৈনিক।
এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর সঙ্গে প্রতিটি প্রাণীর বাঁচা-মরার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সব প্রাণী ও অপ্রাণী নিয়ে এই ধরণী একটি ছড়ানো জাল। এ কথা বলেছেন আমেরিকার এক লাল সর্দার, যাকে প্রচলিত কথায় রেড ইন্ডিয়ান বলা হয়। আমেরিকার সিয়াটল শহর নির্মাণের সময় ওই লাল সর্দারকে তাঁর দলসহ সিয়াটল বসতভূমি ছাড়তে বললে তিনি এই উত্তর দেন। তাঁর উত্তর দেওয়া চিঠিখানা এখন জাতিসংঘের চার্টার হিসেবে গৃহীত- বিশ্বের আদিবাসীদের সুরক্ষা সনদরূপে। আজ থেকে ১৫৮ বছর আগে এই ঘটনা ঘটেছিল। ১৮৫৪ সালে ওয়াশিংটনের বড় সাদা সর্দারের (আমেরিকার প্রেসিডেন্টের) কাছে সিয়াটল উপজাতির লাল প্রধানের এই চিঠি। এটি আমার ‘ও বৃক্ষ, ও নিসর্গ’ গ্রন্থে ‘এই পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি নয়’ প্রবন্ধে ছাপা রয়েছে। ২০০১ সালে ‘সময় প্রকাশন’ এই গ্রন্থ প্রকাশ করে।
বঙ্গোপসাগর জলবায়ুর কারণে বিদ্রোহী হয়ে (প্রাকৃতিক কারণেও) ধ্বংসকারী হয়ে ওঠে। ১৫৮৪ সালে আকবর বাদশার রাজত্বের সময় থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কত বার প্রলয়ঙ্করী ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল? এই খতিয়ান ও বর্ণনা আমার লেখা ‘প্রকৃতি ও প্রতিশোধপরায়ণ’ গ্রন্থে বিস্তারিত আছে। তবে এই হিসাব ‘বাখরগঞ্জ জেলা গেজেটিয়ার থেকে শুধু ওই জেলা সম্পর্কিত। আমার এই বইটি প্রকাশ করেছে ‘পার্ল পাবলিকেশনস্’। সালগুলো দেখুন- ১৫৮৪, ১৭৮৭, ১৮২২, ১৮৬১, ১৮৭৬, ১৯১০, ১৯৬৫, ১৯৭০, ১৯৮৫ ও ১৯৯১। অকাল বন্যায় প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন হয় ১৮৯২, ১৮৯৩, ১৯০৬ সালে। তার পরের বা আগের হিসাব গবেষকদের হাতের মুঠোয় আছে। বইপত্রেও। আমি শুধু বঙ্গোপসাগরের প্রসঙ্গে বুড়ি ছুঁয়ে যাচ্ছি। বাখরগঞ্জ নিবন্ধের শেষটুকু এই প্রসঙ্গে পড়ে দেখবেন? ২৮ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে দৈনিক দেশ পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়েছিল। পড়ুন তাহলে বই থেকে, ‘তাহলে আমরা কোথায় যাব? বাকলা, চন্দ্রদ্বীপ, বাখরগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ সুন্দরবন যদি বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে ডুবে যায়? আমাদের শস্যভাণ্ডার দক্ষিণাঞ্চল যদি ডুবে যায়? হিমালয়ের বরফ গলে গেলে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা, সিন্ধু, চন্দ্রভাগা, ইরাবতীতে শুকনো মরশুমে পানি আসবে কোথা থেকে? আমাদের প্রিয় সুন্দরবন, কক্সবাজার, রাঙাবালী, সোনাদিয়া, হাতিয়া থাকবে না? তার এত পাখি, এত ফুল, এত গাছ, এত নদী ডুবে যাবে? আমার ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’র নায়ক-নায়িকারা শান্ত হয়ে যাবে? কুয়াকাটা ও সেন্টমার্টিন থাকবে না?
“আমি ভাবতেও পারি না; আমার স্বপ্নসমুদ্রের বনদেবীরা আমাকে স্বপ্নে হলেও অন্তত বলে দাও কিছু কথা! ‘স্বপ্নসমুদ্রে বনদেবীরা আছে’ আমার একটি গল্প বইয়ের নাম।” [পৃ. ২৩]
বঙ্গোপসাগরের পটভূমিতে আমার আর কয়টি গল্প আছে আমাকে খুঁজতে হবে বঙ্গোপসাগরের দশ-কুড়ি কিলো ওজনের সুস্বাদু লাক্ষা শিকারের মতো। শিকার না হয় বাদই দিলাম, সাগরে জীবিত অবস্থায় ওদের গতিবিধি ও স্বভাব নিয়ে গবেষণার জন্যও তো দরকার। এখন যেমন খাঁটি সরপুঁটি, খাঁটি দেশীয় রুই প্রভৃতিসহ অন্তত পনেরো-কুড়ি রকমের মাছ প্রায় লুপ্ত হওয়ার পথে। আমাদের বেশির ভাগ মাছ যুগ্মভাবে সাগর ও নদীনির্ভর। বিল-বাঁওড়ে কিছু একান্ত বাঙালি মাছ আছে। কলকাতায় ‘বাঙালি পাঁঠা’র দোকানে খাঁটি পাঁঠার মাংস বিক্রি হয়, সাইনবোর্ড টাঙিয়ে। আমি দেখেছি। শোনার পর খুঁজে-পেতে নিয়েছি। কলকাতায় এখন যত ইলিশ রপ্তানি হয় তা পদ্মার ইলিশ নামে সেখানে বেচা হয়। রপ্তানির সময় এই নামে হয় কি না আমি জানি না। আমি তো জানি পদ্মার ইলিশ রপ্তানির মতো ধরা পড়ে না। পদ্মায় এখন কুড়ি-তিরিশ দিনের বিচরণশীল ইলিশ কি দশ-বিশ টন ধরা পড়ে? মেঘনায়? জেলেরা এর খাঁটি জবাব দিতে পারবেন। আমি পারলেও দাবি করুম না। এর চেয়ে বঙ্গোপসাগর-সুন্দরকে নিয়ে গল্প-উপন্যাসের কথা বলাই নিরাপদ। পদ্মার ইলিশ ভাজা ফেরিঘাটে আমি যৌবরাজ্যে ঢোকার পর থেকে তো খেয়েছি…আমাকে তার স্বাদ নতুন করে শিখতে হবে? পড়ে আছে বঙ্গোপসাগর, ঘুমিয়ে আছে ঢেউ। অথবা সে নিজেই নিজের ঢেউগুলো আঁটি বেঁধে রেখে দিয়েছে তার খুঁটের নিরাপত্তায়। হাওয়াও। বঙ্গোপসাগর এসব কাজে আন্তর্জাতিক বিনম্র সন্ত্রাসীর মতো দক্ষ। তার বুকে এখন রুপোর এক পিঠওয়ালা চাকতির মতো ঢেউ, মৃদু লাস্যে ইশারা জানাচ্ছে। রুপোর সেই চাকতির অন্য পিঠ নেই, কোনো দিন ছিল না, কোনো দিন দেখাও যাবে না।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা
আমাদের সমুদ্র অঞ্চল বা জলভাগ কতটুকু তা একটু দেখা যাক। ১. অভ্যন্তরীণ পানি বা জাতীয় পানি বলতে বোঝায় সব পানি-এলাকা, নোনা এবং মিঠে যা আঞ্চলিক জলের ভূমিরেখার মহাদেশ অভিমুখে অবস্থিত। উপকূলবর্তী দেশের কর্তৃপক্ষ এসব পানির ওপর পুরোপুরি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। ২. উপকূলবর্তী পানি অর্থাৎ সমুদ্রের তীর থেকে ১২ মাইল দূর পর্যন্ত সমুদ্রের সব কিছুর ওপর সার্বভৌম অধিকার থাকবে তীরবর্তী দেশের। এ অঞ্চলের শুধু জলসীমাই নয়, আকাশপথের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও থাকবে তাদের অধিকারে। তবে এই এলাকার ভেতর দিয়ে পৃথিবীর সব দেশের জাহাজের ‘নির্দোষ’ অতিক্রমের অধিকার থাকবে। ৩. সংলগ্ন এলাকা অর্থাৎ উপকূলবর্তী সমুদ্র এলাকার প্রশস্ততা যেখানে মাপা হবে ওই ভূমিরেখা থেকে ২৪ নটিক্যাল মাইল হচ্ছে সংলগ্ন এলাকা। এই এলাকায় তীরবর্তী দেশের সংজ্ঞায় তাদের কাস্টম, অর্থনৈতিক, স্যানিটারি এবং ইমিগ্রেশনের আইনগুলোর প্রয়োগ করতে পারবে। শাস্তি বিধানও করতে পারবে। তবে ২০০ মাইলের মহীসোপানের অঞ্চলের সীমানার মধ্যে এটা পড়ে যায় দেখে এর ব্যবহারিক মূল্য অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। ৪. মহাদেশীয় ধাপ বা মহীসোপান। সমুদ্রে নিমজ্জিত মহাদেশীয় ভূমিখণ্ডের অংশ হচ্ছে মহীসোপান। তীরবর্তী দেশের সমুদ্র সম্পদ আহরণের সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে তাদের মহীসোপানে। এর ন্যূনতম সীমারেখা হবে তীর থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল। ৫. একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল। সমুদ্রতীর থেকে মহীসোপানের ২০০ নটিক্যাল মাইলের এই দূরত্বই স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক সীমা বা সংক্ষেপে EEZ বলে চিহ্নিত।
এই অঞ্চলে সব রকম অনুসন্ধান, উত্তোলন, সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার কাজ (সমুদ্রতলের প্রাকৃতিক সম্পদ, উপমৃত্তিকা এবং অতিসংলগ্ন পানির), কৃত্রিম দ্বীপ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ক্ষমতা, বিভিন্ন কাঠামো স্থাপন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অর্থনৈতিক বিবিধ তৎপরতা, পানি, স্রোত, ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ সব কিছু ওই তীরবর্তী দেশের থাকবে।
ওপরের সমুদ্রসীমা বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরেছি শহীদুল্লাহ মৃধা রচিত ‘বঙ্গোপসাগর : মানুষ ও সমুদ্র’ বই থেকে। তবে সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও বার্মার সঙ্গে আমাদের বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে বার্মার সঙ্গে বিরোধ নিয়ে ২০১৩ সালে বিশ্ব সংস্থায় এর সমাধান চেয়েছে বাংলাদেশ এবং এতে বাংলাদেশের জয় হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s