গজারের পেটে একটি দুপুর

আগে মেজ নানার মুলতানি গাভির গল্পটা বলে নিই।মায়ের মেজ চাচা, মানে আমার মেজ নানা ছিলেন ব্রিটিশ মালবাহী জাহাজের সারেং। রিটায়ারমেন্টের পর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন। দিনে দিনে অদ্ভুত এক নেশা তৈরি হলো তাঁর। সেই নেশার নাম ‘গরু’। বাড়ির কয়েক মাইল দূরে গরুর হাট। প্রতি সপ্তাহে সেই হাটে গিয়ে নানা জাতের গরু দেখেন। পাইকার ব্যাপারীদের সঙ্গে গরুর জাতপদ ও চরিত্র নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। স্বপ্ন হচ্ছে একটি মুলতানি গাভি ক্রয়। মুলতানি গাভি সম্পর্কে তিনি বহু তথ্য জানেন। ওই গাভির কোনো তুলনা নাকি ত্রিভুবনে নেই। কিন্তু পাইকার ব্যাপারীরা মুলতানি গাভি জোগাড় করে দিতে পারছিল না। বহুকাল আগের কথা। সেকালেও টাউট-বাটপাড়ের কমতি ছিল না। গরুর দালালি করা এক বাটপাড় ভিড়ে গেল নানার সঙ্গে। হাড়-জিরজিরে কেংলামতন একটা গরুর শিংয়ে আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে মুলতানি গাভি পরিচয়ে নানাকে গছিয়ে দিল। নানা যারপরনাই মুগ্ধ। এই তো আসল মুলতানি গাভি পাওয়া গেছে। কুচকুচে কালো শিং মুলতানি গাভি ছাড়া অন্য কোনো গাভির নাকি হয় না। তো সেই গাভি বাড়িতে পৌঁছাল সন্ধ্যার পর। দুখানা হ্যাজাকবাতি উঠানে টানিয়ে দিল নানার পুরনো কাজের লোক। হ্যাজাকবাতির ফকফকে আলোয় উদ্ভাসিত তথাকথিত মুলতানি ঘাস-বিচালি চিবাতে লাগল। গ্রামের লোকজন ভেঙে পড়েছে ওই জিনিস দেখতে। ফজলু নামে ট্যাটন টাইপের এক লোক ছিল। ফাজিলের হাড্ডি। লোকে তাকে আদর করে ডাকত ‘ফক্কর’। বেশ একটা ভাব নিয়ে নানা বসে আছেন হাতলঅলা চেয়ারে, হাতে খানদানি হুঁকার নল। থেকে থেকে গুরুক গুরুক করছে হুঁকা। ফাঁকে ফাঁকে নানা মুলতানি গাভির গুণাগুণ বর্ণনা করছেন। একপর্যায়ে বললেন, বুঝলি ফজলু, এই মুলতানি গাভিটা খুবই শিক্ষিত। ফজলু সঙ্গে সঙ্গে ফক্কর হয়ে গেল। অতিশয় সিরিয়াস মুখ করে বলল, কী পাস, সারেং সাব? বিএ, না এমএ?মেজ নানার মুলতানি গাভির সঙ্গে ঘুরপথে নয়নের গজার মাছের একটা সাযুজ্য আছে। নয়নের পুরো নাম সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন। কালের কণ্ঠের ইভেন্ট এডিটর। সঙ্গে শুভসংঘ’র পরিচালক। একের ভেতর দুই। এদিক দিয়ে তার ওস্তাদ চৌধুরী আফতাবুল ইসলামের সঙ্গে বেশ মিল। আফতাব কালের কণ্ঠের জয়েন্ট এডিটর কাম হেড অব নিউজ। ওস্তাদ-সাগরেদ দুজনেই দুটো করে পদে নিয়োজিত, পদভারে অবনত। আফতাবের সঙ্গে নয়নের ব্যবধান হচ্ছে আফতাব খুবই ঘরমুখো, স্ত্রী আর পুত্রদ্বয়ে আবিষ্ট। নয়ন ঠিক তার উল্টো। বাড়িঘর ছেড়ে থাকতেই ভালোবাসে। আর ভালোবাসে হাত-পা ভাঙতে, কলারবোন ভাঙতে। আমার মগবাজারের ফ্ল্যাটে দেখা করতে এসে বছর সাতেক আগে বাঁ হাতের বাহু তিন ভাঙা দিল। হাতে রড-সিমেন্ট লাগিয়ে ঘুরে বেড়াল বেশ কিছুদিন। এবার ভাঙল কলারবোন। ভাঙার পর আমাকে ফোন করে এত স্বাভাবিক গলায় কথা বলল, শুনে মনে হলো কলারবোন ভাঙেনি, উষ্টা খেয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলে সামান্য ব্যথা পেয়েছে। ওই বস্তু ভাঙার আগে এক শুক্রবার চাঁদপুর জেলার মতলবে গিয়েছিল মাছ ধরতে। এই নিয়ে শুরু হলো তার গজার পর্ব।তার আগে আমাদের উপদেষ্টা সম্পাদক অমিত হাবিব, সংবাদপত্রজগতের অমিতদা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ বয়ান করতে হয়। কালের কণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক হয়ে এলো সে। এসেই ধীরে ধীরে অফিসের পরিবেশ অধিকতর প্রাণবন্ত করার নিমিত্তে তৎপর হলো। আমার রুমের ঠিক উল্টো দিকে তার রুম। সেই রুমের এক কোণে গোলটেবিল ফিট করল। সঙ্গে পাঁচখানা চেয়ার। এই হচ্ছে আমাদের ডাইনিং টেবিল। অমিত ছাড়াও আমরা চারজন খাদক জুটে গেলাম। নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল, আফতাব, আমি আর আমাদের নয়ন। আমরা সবাই বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসি। দুপুর ২টার দিকে অমিত আর আমার মিলিয়ে তিনজন অফিস সহকারী- সোহাগ, খায়ের, সাইদুল টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়। টিফিনবাটি আর প্লেটে সয়লাব হয়ে যায় টেবিল। একেক বাড়ি থেকে তিন-চার পদের তরকারি আসে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বারো পদ দিয়ে অন্নগ্রহণ চলে। শুধু নয়ন ফাউ। খেতে
বসে বিভিন্ন ব্যঞ্জনের স্বাদে বিমুগ্ধ নয়ন আহা-উঁহু করে।আমাদের বাড়িতে শোল-গজার মাছের একটা ভুনা হয়। লুডুর ছক্কার মতো, প্রায় ওই সাইজ করেই কাটা হয় মাছ। তেল-মসলার সঙ্গে টমেটোর কয়েকটা টুকরো ফেলে বেশ স্বাদু ভুনা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্যের মতো। খেতে খুবই আরাম। সেদিন ওই ভুনা ছিল। খেয়ে নয়ন মহামুগ্ধ। বলল, কী মাছ?আমাদের মধ্যে অমিত হচ্ছে মাছবিশারদ। মুখে দিয়েই বলে দিতে পারে কোনটা কী মাছ। কামাল-আফতাব ওরাও পারে। মাছ বিষয়ে সবাই বেশ জ্ঞানী। মূর্খ বলতে আমি। ছেলেবেলায় মাছের এলাকা বিক্রমপুরে থেকে, ম্যালা মাছ হাতড়ে, ওই নিয়ে সাহিত্য রচনা করেও মাছটা ঠিকমতো চেনা হয়নি। খলিশাকে কৈ মাছের বাচ্চা ভেবে খাই।তো নয়নের প্রশ্ন শুনে অমিত বলল, গজার।আমাদের ভোজনপর্ব চলছে, গজার নামটা শুনে ওই অবস্থায়ই নয়ন প্রায় লম্ফ দিয়ে উঠল। গজার? গজার আপনারা খান নাকি? গত শুক্রবার আট কেজির একটা গজার ধরলাম। কেউ খায় না ভেবে বন্ধুকে দিয়ে এলাম।আমরা উৎকর্ণ হলাম। অমিত চশমার ওপর দিয়ে নয়নের দিকে তাকাল। মাগুর মাছের মুণ্ডু চিবাতে চিবাতে বলল, বলেন কী! আট কেজির গজার! সে তো বিশাল। কোথায় ধরলেন?মতলব থানার সাদুল্লাপুর গ্রাম। মেঘনাতীরে বেড়িবাঁধ দেওয়া হয়েছে। বেড়িবাঁধের জন্য মাটি কেটে তোলার ফলে লেক হয়েছে। লেকটা ঢুকে গেছে একটা পুকুরে। ওই পুকুরে বড়শি নিয়ে গিয়েছিলাম। ছবি আছে, ছবি দেখাচ্ছি।এই নয়ন ধরাটা খেল।ভোজন শেষ হওয়ার পর ফোন অন করে ছবি দেখাতে লাগল। একটা ছবি হচ্ছে বড়শিতে ধরা গজার তোলার আগে পানির তোলপাড়। নয়ন ছিপ ধরে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এনিম্যাল প্লানেটে দেখা আমাজন নদীর কোনো মৎস্যশিকারি। পরের ছবিতে মাছ ডাঙায় তোলা হচ্ছে। শুধু মাথা দেখা যাচ্ছে গজারের। বড়ই মনে হচ্ছে। পরের ছবি, নয়ন গজারটাকে খাড়াখাড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। লম্বায় মাছ প্রায় ওর কোমর অবধি। কিন্তু গজারের স্বাস্থ্য তেমন সুবিধার না। মেজ নানার মুলতানি গাভির মতো কেংলাপনা। হুমায়ূন ভাই (হুমায়ূন আহমেদ) বাংলা-উর্দু মিলিয়ে বলতেন, ‘লেড়কার চে’ লেড়কাকা গু ভারি’। শহীদ কাদরী এক কবির বাড়ি দেখে বলেছিলেন ‘এতনা ছোটা কবিকা এতনা বড়া মাকান’! এসবের আদি ভার্সন হচ্ছে ‘বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি’!নয়নের গজারের ওপর তখন হুমড়ি খেয়ে আছি আমরা। অমিত সিগ্রেট ধরিয়ে ফেলেছে। আফতাবের সিগ্রেটের প্যাকেট থাকে তার লুজ ধরনের জিন্সের ডান দিককার পকেটে। পকেটে হাত দিয়ে কেমন করে যেন ঠিক একটাই সিগ্রেট বের করে সে। এখনো তা-ই করল। মুখটা গম্ভীর। ততক্ষণে কালের কণ্ঠ অনলাইনপ্রধান মাহবুব মোর্শেদ হাজির। হাতে পৃথিবী নিয়ে ঘোরে মোর্শেদ। দুহাতে সদ্যোজাত শিশুকে কোলে নেওয়ার ভঙ্গিতে ধরা ট্যাব। খায়ের আর সাইদুল টক দই দিয়েছে। নয়নের ওই গজারের কারণে টক দই চামচে তুলতে আমরা ভুলে গেছি।এখানে আমাদের শরীর এবং খাদ্য বিষয়ে বর্ণনা করা সংগত। শুধু ডাইনিং টেবিল ফিট করেই ক্ষান্তি দেয়নি অমিত। হণ্টনটা অত্যাবশ্যকীয় করেছে। সঙ্গে সুষম খাদ্যাভ্যাস। লাঞ্চের পর টক দই। এটা খুবই স্বাস্থ্যকর। বিকেলের মিটিং শেষ করে আমরা হাঁটতে বেরোই। প্রথম প্রথম দলে মাত্র তিনজন। অমিত, কামাল আর আমি। দিনে দিনে দল ভারি হলো। মিডিয়া অ্যাডভাইজার তৈয়ব ভাই হাঁটতেন আমাদের অফিস গ্রাউন্ডে। অমিত তাঁকে দলে নিয়ে এলো। সাড়ে ৫টা-পৌনে ৬টার দিকে তৈয়ব ভাই টকটকে হলুদ ফুলস্লিভ টি-শার্ট কালো প্যান্টের ভেতর ইন করে, মাথায় ক্যাপ, পায়ে কেডস্, প্যান্টের নিচের দিকে দুটো ফোল্ড দেওয়া, হাসিমুখে হাজির। বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামকে প্রথম প্রথম পটানোর চেষ্টা করেছি। চলো নঈম, হাঁটি। নঈম রাজি হয়নি। ইদানীং তার কাজ বেড়েছে অনেক। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিকের সম্পাদক, তার ওপর টিভি টক শো করছে প্রায় প্রতি রাতে। হাঁটার মতো বোরিং কাজে সময় ব্যয় করার সময় কোথায় তার! ঠিক এ সময়েই শরীর একটু তেড়িবেড়ি করল নঈমের। গেল ডাক্তা
ের কাছে। প্রতিদিন ঘণ্টাখানেক হাঁটা মাস্ট করে দিলেন ডাক্তার। নঈম খুবই সিরিয়াস টাইপের ছেলে। যা করে দু-তিন শ ভাগ মন দিয়েই করে। হাঁটাটাও মন দিয়েই শুরু করল। সাড়ে ৫টার দিকে অমিত, কামাল কিংবা আমাকে ফোন করে বলে, নামব?বিখ্যাত পীর হাবিবুর রহমান, আমি ডাকি পীর সাহেব, পীরও একদিন হাঁটতে গেল। আমাদের স্পিড ইত্যাদি দেখে ওই দিনই হলো তার হাঁটার শেষ দিন। তারপর যখনই হাঁটার কথা বলি, বলে, আমি রোজ ট্রেডমিল করি। ওয়েস্টিনে। সঙ্গে তাঁর ভুবনভোলানো হাসি। কিন্তু শরীরের নমুনা দেখে পীরের হাঁটার কোনো লক্ষণ অনুভূত হয় না। ভুঁড়ি দিনকে দিন স্ফীত হচ্ছে।একদিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের শামীমও গিয়েছিল হাঁটতে। তার কেতাবি নাম খন্দকার কামরুল হক শামীম। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে খানিক দৌড়াল, খানিক ফ্রিহ্যান্ড করল, ভাব দেখে মনে হলো বিরাট শরীরসচেতন। পরদিন থেকে তার আর খবর নেই। দেখা হলে পীরের মতো তাঁর মুখেও দেখি নারীভোলানো হাসি। আমি হাঁটি সকালবেলা। সুইমিংও করি।শেষ পর্যন্ত হণ্টনে টিকে রইল হারাধনের পাঁচটি ছেলে। সর্বজনাব মোহাম্মদ আবু তৈয়ব, নঈম নিজাম, অমিত হাবিব, মোস্তফা কামাল ও এই অধম। অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই বসুন্ধরা গ্রুপের মাননীয় এমডি জনাব সায়েম সোবহান আনভীর সাহেবের রাজপ্রাসাদের কাছে। ওখানকার নির্জন রাস্তায় দুটো চক্কর দিয়ে মেহেদি মার্টের রাস্তা ধরে ফিরে আসি।এমডি সাহেব আমাদের হাঁটার খবর রাখেন। দেশের এ রকম অবস্থা দেখে তিনি আমাদের জন্য সিকিউরিটির ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা হাঁটতে বেরোলেই আমাদের পেছন পেছন বাইক নিয়ে বেরোয় তাগড়া জোয়ান সিকিউরিটির লোক। আমরা নিশ্চিন্তে হাঁটি।বসুন্ধরা গ্রুপের মান্যবর চেয়ারম্যান জনাব আহমেদ আকবর সোবহান সাহেব হাঁটার ব্যাপারে একদিন বিপুল উৎসাহ দিলেন। বললেন, হাঁটা মিস দেবেন না। প্রতিদিন হাঁটবেন, সবাইকে নিয়ে হাঁটবেন। অমিত হাঁটে! আমি বিনীত গলায় বললাম, জি। নঈম নিজাম? জি, নঈমও হাঁটে। ওকে অবশ্যই হাঁটতে নিয়ে যাবেন। ওর শরীর বেশ ভারী হয়েছে।ভাবতে অবাক লাগে, বসুন্ধরার মতো বিশাল গ্রুপের প্রধান মানুষটি আমাদের শরীর নিয়ে ভাবছেন! এ আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা আমরা কোথায় রাখি।হাঁটতে হাঁটতে অনেক বিষয়ে কথা হয়। অমিতের স্বভাব হচ্ছে পুট করে একটা বিষয়ে তৈয়ব ভাইকে খুঁচিয়ে দেওয়া। সঙ্গে সঙ্গে তৈয়ব ভাই সেই বিষয়ে বিশদ আলোচনায় নেমে পড়েন। কখনো কখনো মজাদার সব বিষয়ে স্মৃতিচারণা করেন। তিনি একসময় বাংলাদেশ বেতারের স্বনামধন্য অ্যানাউন্সার ছিলেন। একদিন সরকার কবির উদ্দিনের খবর পড়ার কথা। তিনি সময়মতো পৌঁছেননি দেখে তৈয়ব ভাইয়ের ওপর পড়ল খবর পড়ার ভার। তৈয়ব ভাই উৎফুল্ল। তাঁর স্বপ্নই হচ্ছে রেডিওতে একদিন খবর পড়বেন। সেই সুবর্ণ সুযোগ এসে গেল। তিনি তৈরি হয়ে স্টুডিওতে ঢুকলেন। শুরু করলেন, বাংলাদেশ বেতার ঢাকা, খবর পড়ছি…, মাত্র নিজের নাম বলতে যাবেন, কে একজন ধাক্কা দিয়ে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, সরকার কবির উদ্দিন। তার মানে ঠিক ওই সময়ই স্টুডিওতে এসে ঢুকেছেন সরকার কবির। তৈয়ব ভাই নিজের নাম বলার আগেই কবির সাহেব তাঁর নাম বলেছেন। তৈয়ব ভাইয়ের খবর পড়া খতম। হৃদয় ভেঙে সেদিন খানখান হয়ে গিয়েছিল আমাদের তৈয়ব ভাইটির।প্রথম প্রথম আমরা একটু বেশি জোরে হাঁটতাম। তৈয়ব ভাই পেছন থেকে বলতেন, না না, এভাবে হাঁটবেন না, এটা সায়েন্টিফিক না। কদিন পর দেখা গেল তিনিই আমাদের চেয়ে জোরে হাঁটছেন। নঈম মজা করে বলল, তৈয়ব ভাই, আপনার হাঁটা সায়েন্টিফিক হচ্ছে না।প্রথম কয়েক দিন হাঁটা শেষ করেই তৈয়ব ভাই তাঁর সহকারীকে ফোন করতেন। নিম্বুপানি রেডি কর। অফিসে ফিরে আমাদের নিয়ে যেতেন তাঁর রুমে। সেখানে লেবুপানির সঙ্গে সামান্য লবণ, চমৎকার একটা পানীয় পানে আমরা তৃপ্ত। ওখান থেকে ফিরে আমার রুমে। আমি আর অমিত বসতাম ‘ওট’ নিয়ে। স্বাদগন্ধহীন ওষুধ টাইপের খাবার, তবে স্বাস্থ্যকর। দু-তিন দিন পর এই বিস্বা
জিনিসকে গজার ভুনার মতো স্বাদু করে ফেলল অমিত। ওটের সঙ্গে মেশাল চাঁপাকলা আর ননিবিহীন দুধ। জিনিসটা জমে গল। এখন আমরা পাঁচজনই নিম্বুপানির পর ওই জিনিস ভক্ষণ করি। হাসি, আনন্দ, আড্ডা ও কৌতুকে আমাদের একঘেয়ে কাজ অনেক প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে টিটো দত্ত গুপ্ত ফিরে এসেছে। আমরা সবাই খুবই পছন্দ করি তাকে। টিটোকে বলেছি, আমাদের সঙ্গে খাও। টিটো মাঝে মাঝে আসে, মাঝে মাঝে তাঁর অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ক্যান্টিনে খেতে চলে যায়।কয়েক মাস ধরে আরেকটা খাদ্যোৎসব করি আমরা। এটা শুরু করেছেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরডটকমের প্রধান সম্পাদক আলমগীর হোসেন। ভোজনরসিক বলতে যা বোঝায় আলমগীর ভাই ঠিক তা-ই। ফরিদপুরের বাড়ি থেকে দশ-বারো রকম মাছ আনালেন তিনি। সঙ্গে শুঁটকি। অসাধারণ রান্না করিয়ে আনলেন বাড়ি থেকে। আমরা দশ-বারোজন একত্র হলাম। আলমগীর ভাইয়ের রুমে চলল ধুম খাওয়াদাওয়া। এভাবে একেক সপ্তাহে একেকজন। ডেইলি সানের সম্পাদক আমীর হোসেন, দেখতে ছবি বিশ্বাসের মতো, আমি তাঁকে ডাকি ‘ছবি বিশ্বাস ভাই’, বেশ রসিক, প্রাণবন্ত মানুষ। তিনিও আমাদের খাদ্যসভায় যোগ দেন। তিনিও খাওয়ান। শুধু একজন মানুষ এসবের মধ্যে নেই। তৌহিদুর রহমান। কালের কণ্ঠের যুগ্ম সম্পাদক। তাঁর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। বাড়ি থেকে লাউ, পেঁপে অথবা জালি তরকারি আর ভাত নিয়ে আসে, নিউজ ম্যানেজমেন্ট রুমে বসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে দেড়-দুই ঘণ্টা ধরে খায়। কেউ কেউ গোপনে তাকে ‘জালিবাবু’ বলে ডাকে। আর হাঁটাচলা এত ধীর, অমিত একদিন বলল, তৌহিদের হাঁটাচলা মার্বেলের মতো। ছোটবেলায় যারা মার্বেল খেলেছে তারা বুঝতে পারবে, মার্বেল গড়িয়ে দিলে গর্তের কাছাকাছি গিয়ে যেভাবে ধীরে থামে, তৌহিদের ভঙ্গিটা ও রকম।অদ্ভুত উদ্ভাবন। তৌহিদের আরেকটি গোপন নাম ‘মার্বেল সাহেব’। অন্যদের তুলনায় শীত একটু বেশি কাবু করে তৌহিদকে। শীত পড়ি পড়ি করছে, তৌহিদ সঙ্গে সঙ্গে তার কালোর ওপর সবুজ খাঁজকাটা পুরনো মাফলারটা নামিয়ে ফেলল। মেয়েদের ঘোমটা দেওয়ার ভঙ্গিতে মাফলারের ঘোমটা দিয়ে নিঃশব্দে কাজ করতে লাগল। ওকে দেখলেই আমাদের শীত করে ওঠে। ভাতের মাড় দেওয়া পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোককে দেখলেই আমার যেমন খিদে পেত, অবস্থাটা ও রকম। তবে তৌহিদ খুবই রসিক। মিটিংয়ে বসে হঠাৎ হঠাৎ এমন কথা বলে, তুমুল হাসির কলরোল পড়ে। ঠিক আছে, তৌহিদ থাকুক তার মাফলার নিয়ে, আমি ফিরি নয়নের গজার মাছে।ছবি দেখে নয়নের গজার মাছ নিয়ে শুরু হলো তুমুল গবেষণা। অমিত বলল, এই মাছ আড়াই-তিন কেজির বেশি হবে না। নয়ন বলল, না না, ঠিক আট কেজি। আমরা মেপেছি। কামাল বলল, আরেকটু বাড়িয়ে দেন অমিতদা। সাড়ে তিন-চার কেজি করে দেন। অমিত সিগ্রেটে টান দিয়ে বলল, আপনি যখন বলেছেন, আচ্ছা দিলাম কেজিখানেক বাড়িয়ে। আফতাব গম্ভীর গলায় বলল, চার কেজি হতে পারে। মাছটা লম্বা আছে। এ সময় এলো বিজ্ঞাপন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার আমির হোসেন মাহবুব। ছয় ফিটের শরীর আর অম্লান বদনখানি নিয়ে সব শুনল, গজারের ছবি দেখল। অমিত বলল, বলেন এই মাছের ওজন কত? আমির ঠিক বুঝতে পারল না কতটা বললে আমরা খুশি হব। একবার অমিতের মুখের দিকে তাকায়, একবার কামালের, আরেকবার আমার। শেষ পর্যন্ত নিজে যা ভালো বুঝল, বলে ফেলল। পাঁচ-ছয় কেজি হতে পারে। তখনই এলো মফস্বল সম্পাদক খায়রুল বাশার শামীম। শামীম হচ্ছে আমাদের বিনোদনকেন্দ্র। অদ্ভুত সব গল্প তার কালেকশনে। ঘোড়ার টোকেনের গল্প বলে একদিন সারা দিন আমাদের হাসাল। আরেক দিন বলল অনাহারী কুকুরের গল্প। তার গল্প বলার ভঙ্গি বিস্ময়কর। মুখে মৃদু হাসির সঙ্গে রসাত্মক গল্প বলায় শামীমের তুলনা শামীম নিজে। সে এসে সব শুনল, ছবি দেখল, কোনো মন্তব্য করল না। ঝিম মেরে বসে রইল। বুঝলাম মাছ বিষয়ে শামীমের মাথায় কোনো গল্প ঘুরছে। এলো আমাদের ক্রীড়া সম্পাদক মোস্তফা মামুন। মামুন হচ্ছে আরেক রসের আধার। তবে মাছ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। কাঁটার ভ
ে মাছ সে খায়ই না। মাংসাশী। নয়নের গজার দেখে সরল হাসিমুখে বলল, এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। তখনই এলো সার্কুলেশনের রোমান্টিক জুটি হারুন-হাসান। যে আসে তাকেই গজারের ছবি দেখিয়ে অমিত জানতে চাইছে, বলেন এই মাছের ওজন কত? হারুন-হাসানকেও বলা হলো। হারুন খুবই ফাঁপরে পড়ে গেল। ভাবল মাছের ওজন যত বেশি বলা যাবে, ততই সবাই খুশি হবে। কোনো চিন্তাভাবনা না করে বলল, ২০ কেজি হবে। হাসান বলল, আরে না, এত হবে না। ৮-১০ কেজি হতে পারে।ইতিমধ্যে চা দেওয়া হয়েছে। কোন ফাঁকে চায়ে চুমুক দিচ্ছে একেকজন খেয়ালই নেই, চলছে গজারচর্চা। নয়ন খুবই বেকায়দায় আছে। এতজন এতভাবে ওজন নিয়ে কথা বলছে, কেউ বিশ্বাসই করছে না তার কথা, একেকজন একেক ওজন বলছে আর চলছে তুমুল হাসি। অমিত কিছুতেই তিন কেজির ওপরে উঠছে না। সে মাছবিশারদ; সুতরাং সে যা সাব্যস্ত করবে তা-ই হবে। নয়নও কম তেড়িয়া না, সেও ওই আট কেজিতেই আছে। অমিত মাহবুব মোর্শেদের দিকে তাকাল। মাহবুব, দেখেন তো গজার মাছের ইংরেজি নাম কী, কত ওজনের হয়। মাহবুব সঙ্গে সঙ্গে লেগে গেল কাজে। শুরু হলো তার গুগল সার্চ। গজারের ইংরেজি নাম বের করল ‘স্নেক হেড’, পাঁচ-ছয় কেজির বেশি হয় না ওজন। নয়ন কিছুতেই মানবে না। অমিত বলল, ঠিক আছে, মাছ এক্সপার্ট আলমগীর ভাইকে ফোন করছি। তিনি সমাধান দেবেন। আলমগীর হোসেনকে ফোন করল অমিত। সব শুনে আলমগীর ভাই বললেন, মাছটা দেখতে হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে এলেন অমিতের রুমে। অমিত বলল, আপনি কত ওজনের গজার দেখেছেন, আলমগীর ভাই? তিনি বললেন, ৩০ বছর আগে সাত কেজির একটা দেখেছিলাম। আর এই মাছটার ওজন সাড়ে চার-পাঁচ কেজি হতে পারে।এবার মুখ খুলল শামীম। শোনেন অমিতদা, এক লোক একটা মাছ ধরেছে। ধরে খুবই উত্তেজিত, উচ্ছ্বসিত। মাছ খাওয়ার জন্য আত্মীয়-বন্ধুদের দাওয়াত দিতে লাগল। বন্ধুকে ফোন করে বলল, দোস্ত, পদ্মায় গিয়েছিলাম বড়শি নিয়ে। পাঁচ কেজির একটা রুই ধরেছি। কাল রাতে ওই মাছ খাওয়া হবে। চলে আসিস। তারপর ফোন করল ভাইকে। ভাইজান, কাল রাতে আমার সঙ্গে খাবে। চার কেজির একটা রুই ধরেছি। তারপর ফোন করল দুলাভাইকে। আট কেজির একটা রুই ধরেছি। কাল রাতে আপনার দাওয়াত। ওই লোকের ভাগ্নে দাঁড়িয়ে ছিল সামনে। সে মামাকে বলল, মাছের ওজন একেকজনকে একেক রকম বলছ কেন, মামা? মামা মিচকা হাসি দিয়ে বলল, সবাই সব কিছু একভাবে নিতে পারে না। এ জন্য যে যতটা পারে তাকে ততটাই বলছি।অমিতের রুমে হাসির রোল পড়ল।নয়নের মুখটা তখন দেখার মতো হয়েছে। কোন কুক্ষণে সে গজারের ওজনটা বলেছিল। নয়নের দিকে তাকিয়ে অমিত বলল, আনেন তো আরেকবার দেখি আপনার গজার।নয়ন মহা-উৎসাহে মোবাইল ধরল অমিতের সামনে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অমিত খুবই তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, এই মাছের ওজন আট কেজি! বলেন কী! আরে এটা তো গজারের পোনা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s