মকবুল সমুদ্রে যাবে

image_1243_310406কায়েদি আজম যখন তেঁজগাও বিমান বন্দর থেকে
হাজার হাজার মানুষের পাঁজর ভেদ করে বিকেলের হঠাৎ
বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া তরুনগুলির তেরচ্ছা
কুর্নিশ নিতে নিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন,
মকবুল তখন নদীর ধারে পলির ভেতরে পা ডুবিয়ে,
গর্তে লোহার শিক ঢুকিয়ে বড় বড় কাকড়া বের করে আনছিল।

আইয়ুবের মার্কিন খাপ থেকে যেদিন ইয়াহিয়া খা মরচে ধরা তলোয়ার বকশিক পেলেন,
সেদিন মকবুল উঁঠোনে গাবের কষে জাল স্বিদ্ধ করছিল।
মনে সওয়াস্তি নেই মকবুলের।
বাদলার রাতে যখন দক্ষিন পশ্চিম থেকে হাওয়া উঠে, তার ঘুম ভেংগে যায়।
বহুদুর থেকে কালা পানি তাকে ডাক দেয়
ভোর হতে না হতেই সে নৌকো ভাসিয়ে চলে যায় দুর দুরান্তে
কোথায় কুতুবদিয়ার চর, মহেশখালি, কক্সেস বাজার,
কোথায় সেই পরান কথার দেশে।
শংখনদী ফিরাইল মরা গরু জিয়াইল।

আবার সন্ধ্যার আজান আর কাশর ঘন্টার রেষ মিলাইয়া যাওয়ার পর
সুপুরি বনের অন্ধকার বেয়ে তার নৌকো ঘাটে ফিরে আসে।
সঙ্গে লাই ভর্তি কোড়াল কিংবা লাওক্ষা মাছ।
কর্ণফুলির তীরে দামনা বেড়ার ঘর পাশে মইঅলুর ক্ষেত
মাঝরাতে হরিণের পাল নেমে আসে, উঠোনে আড়াআড়ি জাল শুকোয়।
তিনটে ছেলেমেয়ে সারা গায়ে আঁশটে গন্ধ জড়িয়ে ছুটোছুটি করে হরিণ ধরে।
পেছনে বারইয়া গুজে উড়িয়ে দিয়ে হাততালি দেয়।
তারপর জাল থেকে খুজে খুজে শুকনো চুনো মাছ ছাড়িয়ে নেয়
পুড়িয়ে পানিভাতে সঙ্গে খাবে বলে জমিয়ে রাখে।

একগাল ধোয়া ছেড়ে হুকোর মুখটা মুছে গোবন্দের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে মকবুল বলে
‘বুজ্জয়সনি গয়িন নদীরত পেট ভইরব মন ভইরত ন’।
পুবদিকে গুন্ডা হাতীর পালের মত সারি সারি টিলা
বাড়ীর পাশদিয়ে অরন্যের গান গেয়ে যায় পাহাড় ভেংগে বেড়িয়ে আসা কর্ণফুলি
দূরে দক্ষিন পশ্চিম আলিশান ধরিয়া, শাওন ভাদ্র মাসে গভীর রাতে তাকে ডাক দেয়।
মকবুল সেদিক পানে উদাস চোখ মেলে সুতো পাকায়।
তার নজরবন্দি চেলা গোবিন্দের হাতেও সুতোর গুলি
মনে বড় হাওস উস্তাদ তাকেও সঙ্গে নিবে।

রমনার ময়দানে যেদিন বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি হাতে নিয়ে
একের পর এক ঢেউ আছড়ে পরে মুজিবের গলায় গর্জন করছিল
সেদিন মকবুল মিয়া রাংগামাটির পাহাড়ে একটা বেজায় ঝুনু শাকওয়ান গাছের গোড়ায়
কুড়ুল চালাচ্ছিল। তার ডিঙি ছোট্ম বড় নৌকো চাই।
মকবুল অথই জলে পাড়ি দেবে।
যেখানে রোজ বিয়ানে এবং সাজের বেলায় আসমান সোনার শাঁকনি ধুয়ে নেয়
সেই অনন্তকাল জলের মহাদেশ থেকে মাঝে মাঝে খোদার ফরমানের মত কাল তুফান ছুটে আসে।
যেখানে সেয়ানা মানুষদের সমস্ত দুনিয়াধারী খতম হয়ে যায়,
মকবুল সেই গজরানো গজবের দুনিয়ার নৌকা ভাসাবে, আল্লা কসম।

যেদিন চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী এবং ঢাকার সমস্ত বাড়ির মাথায়
রাতজাগা খলিফার সেলাই করা বাংলার উপর সুর্য্য পতপত করে উড়ছিল
সেদিন মকবুল নিশান উড়ায়নি
সারাদিন করাত চালিয়ে সন্ধ্যের পর রাতের আলোয় ডান হাতের আঙ্গুলের ফাকেফাকে
তারপিন তেল ঢলতে ঢলতে বেড়ার গায়ে ভয়ে দুলে উঠা
ছায়ার সামনে সংকুচিত গোবিন্দকে শাসাচ্ছিল।
ইনছছাল্লা তরে যদি কাটি না ফালাই ত আর নাম নাই।
গোবিন্দ দুপুরে দুটো কাঠের গজাল ভুল জায়গায় পুতেছিল।
মানুষের আকাংখা এবং প্রাপ্তির মধ্যে স্বপ্ন এবং সংগঠনের মধ্যে কোথাও একটা মস্ত খন্ড আছে।

জংগম বাংলার গনসিন্ধু মন্থন করে একদিকে যখন সামরিক বিষ ফেনিয়ে উঠছে,
আর একদিকে লাফিয়ে উঠা বাঘিনীর মত গর্জন করছে রক্তের ঢেউ,
তখন একদিন মকবুল দেখল লোহার মত শক্ত তক্তার এক জায়গায়
যে কাঠের নকশা ফুটে উঠেছিল সেই অংশটা ঘুনে ঝুরঝুরে আর গোল হয়ে খসে গেছে
নৌকো তৈরি শেষ, সমস্ত তক্তাও ফুরিয়ে গেছে টিন লাগালে নোনা জলে মরচে ধরবে
অন্য কাঠ লাগালে পঁচে যাবে।
কি করে গর্তটা ভরাট করা যায় ভাবতে ভাবতে ভাবতে
নৌকোটাকে কর্ণফুলির ডাংগায় চিত করে ফেলে রেখে
চেঙাট গোবিন্দকে সঙ্গে নিয়ে বিরাট একটা কড়ই গাছের তলায় বসে
গেজিয়ে উঠা দুহাড়ি তালের রস খেয়ে দুজনেই ভো হয়ে পরে রইল

এদিকে শহরের নাড়িভুরি খেয়ে-ধেয়ে কখন যে সৈন্যরা গায়ে ঢুকে
প্রথমে টুংকু সওদাগরের তারপরে হাজী সাহেবের তারপর ফকীর মিস্ত্রীর
এবং নিরঞ্জন পুরোহিতের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে,
বেহুস মকবুল জানে না।
কেবল দক্ষিনের বাতাসে যখন উড়ে আসা ছনের ছাই চোখে পরল
এবং কানে এল বাচ্চাদের আর মেয়েদের বুক ফাটা কান্না
মকবুল চোখ রগড়ে উঠে বসল।
বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে লুঙ্গিটাকে ঠিকঠাক করার আগেই
তার বুক বরাবর তিনটে বেটে লোহার নল রৌদ্রে চকচক করে উঠল।

পাকা লাউ বীচির মত দাতের ফাক দিয়ে থুথু মাখা কয়েকটি শব্দ বেড়িয়ে এল
‘শাহালা বাইনচুত-বোট লাগাদে পানি পর’।
ট্রাক যাবার রাস্তা নেই, মুক্তিবাহীনি কেটে দিয়েছে।
নৌকো চেপে অন্য গায় গুলিতে ঢুকে বাড়ি জ্বালাবে লুটপাট করবে
আর মেয়েদের ছিড়ে খাবে।
পুরুষের বেশিরভাগই পাহাড়ে জংগলে আশ্রয় নিয়েছে।
মকবুল বলতে চাচ্ছিল – নৌকোর তলায় গর্ত
উপরের ছৈ আর পাটাতনের জন্য গর্ত দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু মেয়েদের চিৎকার থেমে গেলেও তখন উত্তর আকাশে ফুলকী
তখন বাতাসে পোড়া গন্ধ।

মকবুল দাত বের করে বলল – ‘চল চল চল মিয়া, এহুনি দিয়ুম’।
গোবিন্দ কচুপাতার মত কাপছিল আর তাড়ির ঘোরে বেকুবের মত
দুটো ঢেবঢেবে চোখ মেলে উস্তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সৈন্যরা উঠে পরার সংগে সংগে মকবুল নৌকো স্রোতে ঠেলে দিয়ে দু’পা পিছু হটে এল
এক চক্কর ঘুরেই নৌকো কর্ণফুলির মাতাল টানে বিদ্যুৎবেগে ছুটে চলল
মকবুল খানিকক্ষন সেইদিকে তাকিয়ে রইল,
তারপর আকাশ ফাটিয়ে সে আচানক চিৎকার করে উঠল –
‘আল্লাহ হু-আকবার, ডুবি যা, ডুবি যা, ডুবি যা। বদর বদর ক, গাজী গাজী ক।
হালার পুত হালারা ডুবি যা, ডুবি যা – বাইনচুত ডুবি যা’।
ফেনী নদীর তীর থেকে আরাকান সীমান্ত পর্যন্ত্য
চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে ধুসর দিগন্ত রেখার মত সন্দীপ
সমস্ত পাহাড়ের ঢেউ আর চা বাগান সমস্ত নদীর জল ক্ষেতখামার আর স্বপ্নের মত
দেবাগ্রী পাহাড় যখন মকবুলের বুক ফাটা চিৎকারে কেপে উঠছে

তখন ধীরে ধীরে এপাড়া ওপাড়া থেকে কয়েকটা ভাংগাচুরা মানুষ আর একটা রোগা কুকুর
মকবুলের পিছনে এসে দাড়াল।
তাদের চোখের উপর কর্ণফুলির অরাজক টানে কয়েকটা সামরিক টুপি
ঘোরপাক খেতে খেতে চলেছে দক্ষিন সমুদ্রের দিকে।
মকবুল আবার রাঙামাটির পাহাড়ে যায়, হাতে কুড়োল
পাশে উস্তাদের মায়ায় আছন্ন গোবিন্দ।
মকবুল সমুদ্রে যাবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s