ভাষাই মানুষের ভরসা

আমি আগেও কোথাও হয়তো বলেছিলাম একমাত্র মানুষেরই ভাষা আছে। আর কোনো প্রাণীর ভাষা নেই। আছে ইশারা ইঙ্গিত চিৎকার এবং শীৎকার ইত্যাদি। মানুষ একাই কেবল ভাষার অধিকারী। ভাষা হলো অর্থবহ শব্দ উচ্চারণ উৎসারণ ইত্যাকার বিষয়ের সমবেত শক্তিস্বরূপ। অন্যান্য প্রাণী দুঃখ পেলে ক্রুদ্ধ হলে কিংবা অন্যবিধ অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য প্রয়াসী হয়। এই প্রয়াসকে কেউ ভাষা বলে না। ভাষা শুধু একাই মানুষের সম্পদ। মানুষ ভাষার দ্বারা রচনা করে গ্রন্থ এবং কিতাবাদি প্রভৃতি। মানুষ ভাষার দ্বারাই জগৎকে নিজের করায়ত্তে রেখেছে। সে কারণে সম্ভবত আমাদের মহান প্রভু আল্লাহ গাফুরুর রাহিম মানুষের সমাজে তার বাণী পাঠাতে প্রয়াসী হয়েছেন মানুষেরই ভাষায়।
এই ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে আমার দেশ ও জাতি প্রথম রক্তাক্ত হয়েছিল। এ নিয়ে সমকালের সমস্ত কবি সাহিত্যিক কিছু-না-কিছু সৃষ্টি করেছেন আমাদের ভাষায়। কবিতায় গানে আন্দোলনে উত্তপ্ত হয়েছে এ জাতির আশা ভরসা এবং ভবিষ্যৎ। আবার প্রমাণিত হয়েছে ভাষা মানুষের একান্ত আত্মপ্রকাশের বিষয়। ভাষা একটি জাতিকে পরিচিত করে তুলতে নানা দিকে তার উৎসারণ ঘটায়। ভাষার উচ্চারণই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে হৃদয়ের উত্তাপে বহ্নি তাপের মতো। মানুষের ভাষায় মানুষেরই অন্তরাত্মার ধ্বনি তরঙ্গ উচ্চারিত উচ্ছ্বসিত হয়ে জাতিকে উত্তেজিত রাখে। গ্রন্থাদি রচনাই ভাষার প্রধান কাজ নয়। বরং মানুষের উচ্চারণ ভাষণ বিবৃতি মাঝে মাঝে এনে দেয় তুফানের শক্তি। ভাষার ভেতরে বিদ্যুৎ তরঙ্গ বইতে থাকে। আকাশ ফাটিয়ে যেমন মাঝে মধ্যে বজ্রের শব্দ হয় তেমনি ভাষারও এই ধরনের বিদ্যুতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার শক্তি আছে। মানুষের বড় কাজ হলো যে, সে ভাষাকে কবিতা করে তুলতে পারে। এই শক্তি হলো মানুষের আদিশক্তি। মানুষের মধ্যে যত অসাধারণ নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়েছে সেসব নেতার প্রধান শক্তি ছিল তাদের জনতার মধ্যে ভাষায় বক্তব্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে বিপ্লব সাধন করা। ভাষা মানুষের যেমন এক শক্তি তেমনি এর অন্য একটি দিকও আছে। ভাষা মানব জাতির এক বিপজ্জনক ক্ষমতাও বটে।
ভাষাতে যেমন জনতাকে উত্তেজিত করে বক্তা তার উদ্দেশ্যকে পরিপূর্ণ করার জন্য বিপ্লবের আয়োজন করতে পারেন, তেমনি মানুষের ভাষণে ক্ষমতাধর সব কিছুর আসন নড়ে ওঠে। ভাষার দীপ্তির মধ্যে আলোকিত হয়ে ওঠে বক্তার আকাক্সা এবং অন্তরের বাসনাগুলো। মানুষের বক্তব্যের সাথে কিংবা বলা যায় মানুষের ভাষণের সাথে মানুষ নিজেই তাল রেখে চলতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষের কথাই অগ্রগামী হয়ে বন্ধ দরজার খিল ভেঙে ফেলেছে। এবং জোয়ারের শক্তির মতো প্রবেশ করেছে মানুষের ভাষার তরঙ্গায়িত উচ্ছ্বাস আবেদন আকাক্সা প্রতিবাদ ইত্যাদি ইচ্ছা। ভাষা সব কিছু পার হয়ে চলে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। ভাষায় বিপ্লব সৃষ্টি সম্ভবপর। মানুষকে আশায় উত্তেজিত করে আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্বুদ্ধ করে তোলে মানুষেরই ভাষা।
আবার এই ভাষাই সঙ্গীতের উত্থাপনকারীদের ঐকতান বা সিম্ফোনি তৈরিতে সমর্থ হয়। এর মধ্যে যেমন শান্তি ও শীতলতা মানুষের সৃষ্টিকে মর্যাদা দিয়েছে। আবার এই ঐকতানের শক্তি মানুষের প্রথাবদ্ধ সঙ্গীতের নিয়মকে অতিক্রম করে এক মহা ঐকতান বা সিম্ফনির জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে।
ভাষার জন্য মানুষের অবিরাম প্রয়াস মানুষকে মনুষত্বের স্তর থেকে আরো একটু এগিয়ে চলার সামর্থ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছে মনুষত্বের দিকবিজয়। মানুষ সর্বক্ষেত্রে সর্বত্র ভাষার জন্যই অমরত্বের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। মানুষের স্বভাব হলো সে কেবল কথা বলতে বলতে চলতে চায়। তার কথায় থাকে অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। মানুষ বলে সে ভবিষ্যৎ বক্তা নয়। কিন্তু তার সমস্ত কাজই আগ বাড়িয়ে ভবিষ্যতের পর্দা উন্মোচন করে দেয়। ইতিহাস অবাক বিস্ময়ে দেখে মানুষের বক্তব্য ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য অগ্রগামী হয়েছে। মানুষ ভবিষ্যৎ না জেনে ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়ে দেয়। সে দুঃখ পায় কিন্তু তার পরাক্রম ভবিষ্যৎকে ভেদ করে চলে যেতে উদ্ধত হয়। সে জানে না তার ভবিতব্য কী? সে মানে না যে তার পরাজয় সম্ভাবনাও আছে। মানুষ কোনো দিন কোনো অবস্থাতেই পরাজয় স্বীকার করে না বলেই সে পরিব্রাজক। সারা জগতের ওপর দিয়ে সে তার পদচারণায় অতিক্রম করে যেতে চায়। সে বলতে চায় সে কী কী দেখেছে। সে কী জানে। তবে সে বিপদ বাধা বিসম্বাদ কোনো গ্রাহ্য করতে চায় না। তার স্বভাব হলো একই সাথে চলা ও বলা। এই চলার বেগকে আমরা বলেছি গতি। আর তার বলার অভ্যাসকে আমরা বলেছি মানুষের ভাষার তরঙ্গ। মানুষ থামে না তবে কান্তিতে ঘামে। সে বিশ্রাম নিতে চায় না। কিন্তু পথপার্শ্বের বৃক্ষরাজি পাতার শব্দ তোলে তাকে ছায়ার আশ্রয় দিতে নীরব ভাষায় ডাকতে থাকে। মানুষ তার লোভ লালসা ইত্যাকার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারে না। তবুও তার মধ্যে যে শক্তি তাকে মহিমা দিয়েছে সেই শক্তির নাম মনুষত্ব। মানবতা দয়ামায়া ইত্যাদি সব কিছুই তাকে মানুষে পরিণত করেছে। মানুষ শব্দটিকে বলা হয় অমৃৃতের পুত্র।
‘সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই।’
আগেই উল্লেখ করেছি, মানুষ এক জায়গায় স্থির হয়ে কাল কাটাতে পারে না। সে কালের বহমানতার আগে পা বাড়িয়ে দিয়েছে। সে পেছন ফিরে দেখে না। অথচ তার কৌতূহল তাকে মাঝে মাঝে পেছনে দেখার প্রলোভনে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু মানুষের ভয় সে পেছনে তাকালেই নুনের স্তম্ভ হয়ে যাবে। মানুষ ভাবে তার এত গুণ সে নুন হয়ে যাবে কেন? এটা সে কিছুতেই মানতে চায় না। সে কেবল জানতে চায়। আর জানতে গেলে স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো উপায় নেই। কে যেন অদৃশ্য হাতে তাকে ঠেলতে ঠেলতে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়। সে ভাবে এই তো সম্মুখ। আমার তো মুখ বুক অন্তরাত্মা সব কিছুই সামনের দিকে ঠেলছে। আমি চলছি। আমার শক্তি সাহস এবং পরাক্রম প্রকাশ করতে। আমি অপরাজিত। আমি কখনো কোনো অবস্থাতেই হার মানিনি। আমি শুধু বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে চলে যেতে শিখেছি। আমি একটা বিষয়ই জানি, সেটা হলো চলা এবং বলা। আমার চলার থেকে আমার বলার ইচ্ছাকে কোনো অবস্থাতেই আলাদা করা যায় না। আমি চলি, বলি এবং দলে যাই। উদায়স্ত আমাকে এই গতি থেকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম নয়। আমি আছি আমি চলি বলে। আমার অস্তিত্ব সব সময় গতিতে পর্যবসিত হয়। আমি ছাড়িয়ে যাই আমি মাড়িয়ে যাই অথচ আমাকে কেউ তাড়া করেনি। আমি নিজের ইচ্ছায় সাহস বিক্রমে কেবল অগ্রসরমান। আমি আগেই বলেছি আমি শুধু চলি না আমি বলিও বটে। এই বলা হলো আমার অভিজ্ঞতারই অংশ। আমি দেখেছি বলেই অন্যকে তার বিবরণ বলতে চাই। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয় এই তো মানুষের শক্তি। দেখো দেখো কী সুন্দর সাহসী এবং চলন্ত। আমি মনে পড়ে না যে কখনো কোথাও থামার কথা বিবেচনা করেছিলাম। আমার ভেতরে মানুষেরই মর্যাদা সৃষ্টির অদৃশ্য তাগাদা রয়েছে। কে আমার গন্তব্য জিজ্ঞাসা করে? মানুষের কি কোনো শেষ আছে? মানুষের হয়তো বা কোনো দিন কোনো অবস্থাতেই বিনাশ নেই। কারণ সে চলে এবং একই সাথে এই চলার বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। কে জানে কোন অদৃশ্য হস্ত এই বিবরণ লিপিবদ্ধ করে! বাতাসে প্রকৃতি গাছপালা লতাপাতা দুলতে থাকে। প্রকৃতির যেমন চেতনে অবচেতনে তার অস্তিত্বকে মেলে ধরার আকাক্সায় উজ্জীবিত হয়ে আছে। তেমনি প্রাণেরও সব প্রয়াস তার অস্তিত্ব ঘোষণা করা। আমি আছি। আমি বাঁচি। আমি থাকব অনন্তকাল।
ভাষার মহিমা বলে কে শেষ করতে পেরেছে? ভাষাই হলো আগেই বলেছি মানুষের শক্তি সামর্থ্য এবং অগ্রগতির বিবরণ। ইতিহাস তার সাথে সদা সর্বদা তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হয়। ইতিহাস অবাক বিস্ময়ে দেখে মানুষ মানুষেরই কাহিনীর আগে পায়ের শব্দ তুলে হেঁটে চলে যাচ্ছে। বিরামহীন বিশ্রামহীন চলার গতিকে কে রোধ করবে? কেউ নেই।
১৬.০২.২০১৪

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s